মতামত/বছরে ১৪ হাজার আত্মহত্যা, তরুণদের এই জীবনবিমুখতার শেষ কোথায়?

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্পর্শকাতর ও আশঙ্কাজনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা, নিত্যপণ্যের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং খুন-ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধ বেড়ে যাওয়া সমাজজুড়ে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ মানুষের প্রাত্যহিক মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়ে এক সার্বিক বিষণ্ণতা ও তীব্র হতাশার জন্ম দিচ্ছে। চারপাশের এই নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি আছড়ে পড়ছে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর, যার ফলশ্রুতিতে বাড়ছে ভয়াবহ জীবনবিমুখতা। বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই—এই হতাশা, অস্থিরতা, মনোকষ্ট অথবা নানারকম মানসিক অসুস্থতায় মানুষ বেছে নিচ্ছে স্বেচ্ছামৃত্যু।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক সামাজিক গবেষণা বিশ্লেষণ করলে আত্মহত্যার এক ভয়াবহচিত্র ফুটে ওঠে। বিগত দুই বছরে বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারাদেশে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩১০টি; ২০২৫ সালে তা প্রায় ৩০% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৩ জনে। এর মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ৪৮ শতাংশ স্কুল পর্যায়ের কিশোর-কিশোরী। সামগ্রিকভাবে দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৪১ জন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণে এই গ্রাফ দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

এই মনোসামাজিক বিপর্যয়ের প্রধান শিকার হচ্ছে আমাদের কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজন্ম। বয়ঃসন্ধিকাল ও তারুণ্য মানুষের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়, যেখানে নিজের পরিচয় সংকট এবং ভবিষ্যৎ গঠনের চিন্তা মুখ্য হয়ে ওঠে। চারপাশের সামাজিক নৈরাজ্য, পরিবারের আর্থিক অনটন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের মানসিক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর সঠিক দিকনির্দেশনা ও মনস্তাত্ত্বিক সমর্থনের অভাবে বিশেষ করে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তীব্র বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা এবং একাকিত্বে ভুগছে, যা তাদের আত্মহননের মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জিপিএ-৫ বা অ্যাকাডেমিক ফলাফলের কারখানা হওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা, ক্লাব একটিভিটিজ ও স্পোর্টস ক্লাব সচল রাখা হলে, পরিস্থিতি বদলাবে। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পেশাদার সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দিতে হবে।

তবে এই অন্ধকারময় পরিস্থিতির মধ্যেও সবচেয়ে বড় আশার কথা হলো—আত্মহত্যা একটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্বজুড়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত হলো, সঠিক সময়ে সঠিক মনস্তাত্ত্বিক হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক সমর্থন পেলে অধিকাংশ আত্মহত্যাই ঠেকানো সম্ভব। কোনো ব্যক্তি আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছু সতর্কসংকেত দেয়। যেমন—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন বা বিদায়সূচক পোস্ট করা, নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেওয়া কিংবা জীবনের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা প্রকাশ করা। এই লক্ষণগুলো চিনতে পেরে তাকে দ্রুত সহানুভূতিশীল সান্নিধ্য দেওয়া এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়াই স্বেচ্ছামৃত্যুকে ঠেকিয়ে জীবনের পথে ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ।

পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে এই মানসিক অন্ধকার থেকে বের করে আনার অন্যতম কার্যকর ও সাশ্রয়ী হাতিয়ার হলো সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা ও মাঠের খেলাধুলা। সংস্কৃতি চর্চা মানুষের আবেগ প্রকাশের একটি মানবিক মাধ্যম। গান, নাটক, সাহিত্য, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনের মতো সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকলে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক হরমোনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এতে তারা যেমন নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে শেখে তেমনি আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতেও শেখে। নিউরোসায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, সৃজনশীল কাজ শরীরে মানসিক চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’ কমিয়ে প্রফুল্লতার হরমোন ‘ডোপামিন’ ও ‘সেরোটোনিন’ বৃদ্ধি করে। একইভাবে, মাঠের খেলাধুলা কেবল শারীরিক সুস্থতাই নিশ্চিত করে না, বরং হার-জিত মেনে নেওয়ার মানসিক শক্তি তৈরি করে। খেলায় হেরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর যে অভ্যাস মাঠে তৈরি হয়, তা বাস্তব জীবনের ব্যর্থতা মোকাবিলায় তরুণদের প্রস্তুত করে তোলে।

বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মানসিক সহনশীলতা বা ‘ইন্টারনাল রেজিলিয়েন্স’ কমে যাওয়ার পেছনে বিদ্যমান কিছু সামাজিক কারণ রয়েছে। যেমন—অতি-সুরক্ষামূলক অভিভাবকত্ব। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের ছোটখাটো প্রতিকূলতা বা ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে দেন না। এতে তারা ব্যর্থতাকে কিছুতেই মেনে নিতে শিখছে না।

আবার অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক বৈষম্য অল্পবয়সীদের মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। যেমন ছোটবেলা থেকেই জিপিএ-৫ অথবা প্রথম হওয়ার দৌড়ে সন্তানকে ঠেলে দেওয়া এবং সেখানে ব্যর্থতাকে স্বাভাবিকভাবে দেখার কোনো সুযোগ রাখা হয় না।

আরেকটি কারণ হচ্ছে ডিজিটাল আসক্তি। ভার্চুয়াল জীবনে অভ্যস্ত তরুণ প্রজন্ম কিছুতেই বাস্তবে সহজ স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব তৈরি করতে শিখছে না। বাস্তবে সামাজিক যোগাযোগে ব্যর্থ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে এবং অন্যদের চমকপ্রদ জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করে করে হীনম্মন্যতায় ভুগে জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

এছাড়া পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ার কারণে এবং বন্ধুহীন থাকার ফলে মনের কথা খোলামেলা বলার মতো বিশ্বস্ত মানুষের অভাব দেখা দিয়েছে সাংঘাতিকভাবে।

চারপাশের সামাজিক নৈরাজ্য, পরিবারের আর্থিক অনটন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের মানসিক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সন্তানদের মানসিক সহনশীলতা বাড়াতে হলে তাদের ছোটবেলা থেকেই জয় ও পরাজয়—উভয়কেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখাতে হবে। জীবনে ছোট-খাটো ব্যর্থতাই চূড়ান্ত সত্য নয় এবং ব্যর্থতা অনেক বড় হলেও যে নতুন করে শুরু করা যায়—এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মনের ভেতর গেঁথে দিতে হবে।

বর্তমানে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

শুধু বইয়ের ভাষায় নয়, আক্ষরিক অর্থেই পরিবারকে হতে হবে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সন্তান যত বড় ভুলই করুক না কেন, প্রথমে তার পাশে দাঁড়াতে হবে এবং তার ভুল থেকে তাকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করতে হবে। শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে শৃঙ্খলা শেখাতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জিপিএ-৫ বা অ্যাকাডেমিক ফলাফলের কারখানা হওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা, ক্লাব একটিভিটিজ ও স্পোর্টস ক্লাব সচল রাখা হলে, পরিস্থিতি বদলাবে। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পেশাদার সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দিতে হবে।

পাড়া-মহল্লা কালচার ফিরিয়ে আনাটা এখন সময়ের দাবি। পাড়া-মহল্লায় একে অপরকে চেনা, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে (যেমন: রক্তদান, সমাজসেবা) তরুণদের যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ ও সামাজিকমূল্যসম্পন্ন মনে করতে শিখবে এবং নানা ধরনের জনহিতৈষী কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করে দায়িত্ব নিতে শিখবে।

আমাদের দেশে এই ২০২৬ সালেও মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অথচ সুস্থ মনের ওপরই নির্ভর করে একটি সুস্থ সমাজ। মানসিক রোগ বা বিষণ্ণতাকে ‘মনের দুর্বলতা’ বা ‘নাটক’ মনে করার সামাজিক কুসংস্কারকে অবিলম্বে ভাঙতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সহজলভ্য হওয়া জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রতিটি প্রাণ অপরিসীম মূল্যবান। একটি ভুল সিদ্ধান্ত কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি ঘটায় না, বরং একটি পরিবারকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয় এবং সমাজকে নিঃস্ব করে। জাতীয় সংকট বা সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলতা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নাও হতে পারে, কিন্তু সঠিক সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা, পারিবারিক ভালোবাসা এবং সামাজিক সহমর্মিতার দেয়াল তুলে আমাদের তরুণদের আত্মহননের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। তারুণ্যের এই উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে রক্ষা করা আমাদের সকলের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।

  • ফজিলাতুন নেসা শাপলা: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত