
শেয়ারবাজারে যখন প্রায় সব খাত একসঙ্গে দর হারায়, তখন সেটাকে আর নিছক দুর্ভাগ্য বলা যায় না। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক একশ পয়েন্টের বেশি হারিয়ে নেমে গেছে গত আড়াই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে। লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রায় নব্বই শতাংশ প্রতিষ্ঠানের দরই পড়েছে সেদিন। কোনো একটি কোম্পানির খারাপ ফল দিয়ে এই ধরনের সর্বজনীন পতন ব্যাখ্যা করা যায় না। এটা আসলে গোটা বাজারের প্রতি আস্থার সংকট, আর সেই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি।
তাহলে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে, দায়ী কে? ডিএসইর পরিচালকেরাই বলছেন, এত বড় পতনের পেছনে কোনো একক কারণ নেই। কথাটি শুনতে স্বস্তিদায়ক না হলেও বাস্তবতা হলো, এমন ব্যাপক পতনের দায় একটি মাত্র কারণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। একাধিক কারণ, নীতি ও সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই একটি মাত্র কারণ খুঁজে পুরো পতনের ব্যাখ্যা দাঁড় করানোও ঠিক হবে না।
একটা বাজার যখন সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনা ছাড়াই ধসে পড়ে, তখন বুঝতে হয় সমস্যাটা ভিতরেই বাসা বেঁধেছে। জ্বালানি ও গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্প উৎপাদন বহুদিন ধরেই ব্যাহত। সুদহার বেশি বলে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। কোম্পানিগুলোর মুনাফা আর লভ্যাংশ দেওয়ার সামর্থ্যও কমছে ধারাবাহিকভাবে। এই সমস্যাগুলো নতুন নয়। প্রশ্ন হলো, পুরোনো এসব সমস্যা নিয়েই তো বাজার এতদিন চলছিল, তাহলে হঠাৎ এমন ধস কেন।
উত্তরটা পাওয়া যাবে আশা আর বাস্তবতার মধ্যকার ফারাকেই। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আর নতুন নিয়ন্ত্রক কমিশনকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে সূচক ছিল প্রায় পাঁচ হাজার চারশ পয়েন্টে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সেটা প্রায় ছয় হাজারের কাছাকাছি চলে যায়। অনেকে ভেবেছিলেন, দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে বাজার সত্যিই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেই ধারণা ভাঙতে শুরু করে, কারণ এই উত্থানের পেছনে বাস্তব কোনো কাঠামোগত উন্নতি ছিল না, ছিল শুধু প্রত্যাশা। নতুন কমিশনের প্রতি বিশ্বাস থেকেই বাজার গতি পেয়েছিল, কিন্তু শুধু বিশ্বাসের ওপর কোনো বাজার টিকে থাকতে পারে না। দেড় মাসে সূচক হারিয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ পয়েন্ট, বাজার মূলধন কমেছে বিশ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো সাধারণ মানুষের সঞ্চয়। তাঁদের অনেকেই হয়তো ধারদেনা করে কিংবা জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন।
তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই সময়ে কী করছে। বিভিন্ন কোম্পানির লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি যাচ্ছে, ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো নিজে অন্যায় নয়, এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন কোনো চিঠি বা তদন্তের খবর ছড়ালেই বড় বিনিয়োগকারীরা আগেভাগে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। যাদের দেখে ছোট বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেন, তারা সতর্ক হয়ে গেলে পুরো গোষ্ঠীই একসঙ্গে বিক্রির দিকে ছোটে। খবর সত্যি নাকি গুজব, সেটা যাচাই করার সময়ও কেউ পান না। শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়।
অথচ দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কাজ অনেকটাই থমকে আছে। ভালো কোম্পানিগুলোকে প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের জন্য শেয়ার ছাড়ার সুযোগ তৈরি করা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো উদ্যোগেও তেমন অগ্রগতি নেই। গত আড়াই বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন কোম্পানি প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের জন্য শেয়ারবাজারে শেয়ার ছাড়েনি বললেই চলে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে ঘন ঘন খোলামেলা মন্তব্য করার প্রবণতা। যে বাজারে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ বিশ্লেষণের চেয়ে আবেগ আর গুজবের ওপর বেশি নির্ভরশীল, সেখানে প্রতিটি কথার ওজন অনেক বেশি। এই দায়িত্ববোধের ঘাটতিই বারবার বাজারকে নাড়িয়ে দেয়।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাবই কি পতনকে এতটা তীব্র করছে? দরপতনের দিনগুলোতে শেয়ার বিক্রির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। বড় প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা না থাকায় বিক্রির চাপ সামলানোর মতো শক্তিও বাজারে থাকে না। লোকসানের ভয়ে একজন বিক্রি শুরু করলে অন্যরাও তাতে যোগ দেন। দর আরও কমে, আতঙ্ক বাড়ে। এভাবেই তৈরি হয় এক দুষ্টচক্র। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এই দুর্বলতা অবশ্য নতুন নয়। বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব, অর্থাৎ শেয়ার রাখার বিনিয়োগ হিসাবও কমছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের তুলনায় এখন এ ধরনের হিসাব ১৩ হাজারের বেশি কমেছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারী কিছুটা বাড়লেও বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর কমে যাওয়া তা পূরণ করতে পারছে না।
এই অবস্থায় শুধু ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের সান্ত্বনা দেওয়া যথেষ্ট নয়। আমার মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তথ্যের স্বচ্ছতা, আর সেই স্বচ্ছতা আসতে হবে ধাপে ধাপে।
প্রথমেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অস্পষ্ট বা ঢালাও মন্তব্যের বদলে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে হবে, কার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বা আদৌ চলছে কি না তা পরিষ্কার করতে হবে। অস্পষ্টতা যত দীর্ঘ হবে, গুজব তত বাড়বে, আর গুজবই এই বাজারে সবচেয়ে বিধ্বংসী। এর সঙ্গে দরকার তদন্ত ও তথ্য চাওয়ার একটা পূর্বানুমানযোগ্য পদ্ধতি। কোন পরিস্থিতিতে কোনো কোম্পানির কাছে তথ্য চাওয়া হবে, তদন্তের প্রতিটি ধাপে কী ঘটবে, তার একটা স্পষ্ট নিয়মকাঠামো থাকা দরকার, যাতে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রেখেই কাজ করা যায় এবং প্রতিটি চিঠিকেই বাজার আতঙ্কের সংকেত হিসেবে না নেয়।
এর পাশাপাশি ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনার গতি বাড়ানো জরুরি। গত আড়াই বছরে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভালো নতুন কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের হাতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং কয়েকটি পুরোনো কোম্পানির ওপর বাজারের নির্ভরতা কমবে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতেও নীতিগত প্রণোদনা দরকার, যাতে ব্যাংক, বিমা কিংবা পেনশন তহবিলের মতো বড় প্রতিষ্ঠান বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে থাকে এবং পতনের সময় বাজারকে একটা যৌক্তিক পর্যায়ে ধরে রাখার মতো একটা শক্তি তৈরি হয়। বিনিয়োগকারী শিক্ষাও এখানে অবহেলার বিষয় নয়। যে বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিশ্লেষণের চেয়ে গুজব আর অন্যের অনুসরণের ওপর বেশি নির্ভর করেন, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে সচেতনতা তৈরি না হলে একই আতঙ্কের চক্র বারবার ফিরে আসবে।
আর দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে জরুরি হলো জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের কাঠামোগত সমাধান, কারণ শেয়ারবাজার শেষ পর্যন্ত প্রকৃত অর্থনীতিরই প্রতিফলন। শিল্প খাতের প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা না ফিরলে বাজারের ভিত্তিও মজবুত হবে না, আর ভিত্তি মজবুত না হলে যত সংস্কারই আসুক, বাজার আবার একই জায়গায় ফিরে আসবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এই চিত্র নতুন নয়। প্রতিবার একই প্রতিশ্রুতি, একই আশ্বাস, তারপর একই রকম পতন। প্রতিবারই বলা হয়, ধৈর্য ধরুন, বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগকারী শিক্ষা আর কার্যকর নজরদারি ছাড়া, যাতে কয়েকজন প্রভাবশালী খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্তের ওপর হাজারো মানুষের সঞ্চয় নির্ভর না করে, প্রতিটি উত্থানের পরই আরেকটা ধসের অপেক্ষা থেকে যাবে। কেবল আশাবাদী কথার ওপর ভর করে কোনো বাজার টিকে থাকতে পারে না, এই সত্যটা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে। নইলে আজকের বিনিয়োগকারীরাও সেই একই পরিণতির মুখে পড়বেন, যা গত দেড় দশকে বারবার দেখা গেছে।
- শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
.png)








