এক্সপ্লেইনার/খেলাপি ঋণ কি শুধু ব্যাংকের ক্ষতি করে, নাকি আপনারও

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৩২ টাকা ৭৮ পয়সা এখন খেলাপি। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে তা বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

এই বিপুল পরিমাণ ঋণের টাকা যদি ফেরত না আসে, তাহলে কী হবে? এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতির ওপর। কারণ ব্যাংক হচ্ছে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী। মানুষের সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা ব্যবসা, শিল্প, কৃষি, ভোক্তা ও বিভিন্ন বিনিয়োগে ঋণ হিসেবে দেয়। সেই ব্যবস্থার বড় অংশ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব ধীরে ধীরে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পৌঁছাতে পারে। অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণের প্রভাব বোঝার জন্য তাই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে দেখা দরকার।

ঋণ ফেরত না এলে ব্যাংকের কী ক্ষতি হয়

ব্যাংক যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়, সেই ঋণ ব্যাংকের জন্য একটি সম্পদ। কারণ ভবিষ্যতে সেই ঋণের মূল টাকা ও সুদ ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু ঋণগ্রহীতা সময়মতো কিস্তি বা সুদ পরিশোধ না করলে ব্যাংকের প্রত্যাশিত নগদ অর্থপ্রবাহ ব্যাহত হয়। ঋণ দীর্ঘ সময় অনাদায়ী থাকলে সেটি থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা সাধারণত বাড়ে।

এখানে আসে ‘প্রভিশন’-এর বিষয়টি। কোনো ঋণ থেকে ভবিষ্যতে কতটা ক্ষতি হতে পারে, তার হিসাব করে ব্যাংককে সেই সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রভিশন রাখতে হয়। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ঋণক্ষতির প্রভাব ব্যাংকের আর্থিক হিসাবে আগে থেকেই প্রতিফলিত করা হয়। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের মুনাফার ওপর চাপ পড়ে। বড় অঙ্কের প্রভিশন রাখতে হলে সেই অর্থ মুনাফা হিসেবে দেখানো যায় না; দীর্ঘদিনের বড় খেলাপি ঋণ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের মূলধনেও চাপ তৈরি করতে পারে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ শ্রেণিতে থাকা ঋণের অর্থ এই নয় যে ওই ঋণের প্রতিটি টাকা নিশ্চিতভাবে হারিয়ে গেছে। তবে এটি দেখায়, খেলাপি ঋণের বড় অংশই গুরুতর অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই শ্রেণির ঋণ থেকে অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ বা অনিশ্চিত।

ব্যাংকের সমস্যা কীভাবে নতুন ঋণের সমস্যায় পরিণত হয়

এখান থেকেই খেলাপি ঋণের প্রভাব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার পথটি তৈরি হয়। একটি ব্যাংকের আগের দেওয়া ঋণের বড় অংশ ফেরত না এলে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা বাড়তে পারে। কারণ নতুন ঋণও যদি খেলাপি হয়ে যায়, তাহলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা আরও দুর্বল হতে পারে।

অন্যদিকে, খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের মূলধনে চাপ তৈরি হলে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও কমতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও মূলধন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে সেই অর্থের পুরোটাই নতুন ঋণ হিসেবে বিতরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বাড়লে একদিকে ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক হয়, অন্যদিকে মূলধনের ওপর চাপ বাড়লে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে। এখানেই খেলাপি ঋণের সমস্যা ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে বেরিয়ে অর্থনীতির ঋণপ্রবাহের সমস্যায় পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ পিটার রোজেনক্রানজ ও জুনকিউ লির ২০১৯ সালের গবেষণায় ৩২টি এশীয় দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখান, খেলাপি ঋণের অনুপাত বাড়লে ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ কমে, বেকারত্ব বাড়ে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি কমে। গবেষণাটিতে একই সঙ্গে দেখা গেছে, সম্পর্কটি একমুখী নয়; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে বা ঋণপ্রবাহ কমে গেলেও খেলাপি ঋণ বাড়তে পারে।

নতুন ঋণ কমলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কী হয়

ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু ঋণগ্রহীতার ওপর পড়ে না। নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও পিছিয়ে যেতে পারে।

ধরা যাক, একটি কারখানা ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল। ঋণ না পাওয়ায় পরিকল্পনাটি এক বছর পিছিয়ে গেল। এর অর্থ শুধু কারখানাটির পরিকল্পিত উৎপাদন সম্প্রসারণ পিছিয়ে যেতে পারে তা নয়; নতুন কর্মী নিয়োগও পিছিয়ে যেতে পারে, যন্ত্রপাতি কেনার অর্ডার কমতে পারে এবং ওই কারখানার সরবরাহকারীদের ব্যবসাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

এভাবেই ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ অর্থনীতির অন্য অনেক খাতের সঙ্গে যুক্ত। এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি। খেলাপি ঋণ বাড়লেই সরাসরি বলা যাবে না যে এত শতাংশ বিনিয়োগ কমবে। অর্থনীতিতে একই সময়ে সুদের হার, পণ্যের চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাজার ও ব্যবসায়িক আস্থাসহ আরও অনেক বিষয় কাজ করে।

কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল থাকলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আইএমএফও একই ধরনের ঝুঁকির কথা বলেছে। সংস্থাটির ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান না হলে ঋণপ্রবাহ সীমিত হতে পারে, বিনিয়োগ কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি সমর্থনের জন্য ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও পুনর্গঠনকেও গুরুত্বপূর্ণ বলেছে আইএমএফ।

শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের বোঝা পুরো অর্থনীতির ওপর পড়ে কীভাবে

খেলাপি ঋণের প্রভাব শুধু ব্যাংকের হিসাবের খাতায় আটকে থাকে না। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব ঋণপ্রবাহে পড়তে পারে। ঋণপ্রবাহ কমে গেলে বিনিয়োগ ও ব্যবসার কর্মকাণ্ডেও চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে খেলাপি ঋণের আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো ব্যাংকের প্রতি আস্থার সংকট। কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা খুব দুর্বল হয়ে গেলে আমানতকারীরা ব্যাংকটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারেন। তখন অনেকে টাকা তুলে নিতে চাইলে ব্যাংকের তারল্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ যে সমস্যা শুরু হয়েছিল ঋণ ফেরত না আসা দিয়ে, সেটি পরে ব্যাংকের তারল্য ও আস্থার সমস্যাতেও রূপ নিতে পারে।

সেখান থেকে আবার রাষ্ট্রের ওপরও চাপ আসতে পারে। দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা, ব্যাংক পুনর্গঠন কিংবা প্রয়োজনে সরকারি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইএমএফ ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা থেকে সরকারের ওপর সম্ভাব্য আর্থিক চাপের কথাও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ, দুর্বল ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা দেওয়ার ফলে তৈরি সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি সহায়তার প্রয়োজনের মতো বিষয় রয়েছে।

খেলাপি ঋণের সমস্যা শুরু হয় ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে, কিন্তু সেখানেই এর প্রভাব শেষ হয় না। ঋণ আদায় ব্যাহত হলে ব্যাংকের আর্থিক শক্তি কমতে পারে। এর প্রভাবে ঋণপ্রবাহ দুর্বল হতে পারে, বিনিয়োগ পিছিয়ে যেতে পারে এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও চাপ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ চললে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এভাবেই খেলাপি ঋণ একটি ব্যাংকের সমস্যা থেকে পুরো অর্থনীতির সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

তথ্যসূত্র

• বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের ত্রৈমাসিক ‘শ্রেণিকৃত ঋণের প্রতিবেদন’

• বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫

• পিটার রোজেনক্রানজ ও জুনকিউ লি, এশিয়ায় খেলাপি ঋণ: নির্ধারক ও সামষ্টিক-আর্থিক সম্পর্ক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ২০১৯।

• আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বাংলাদেশ: আর্টিকেল ফোর প্রতিবেদন, ২০২৬

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত