
আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারের নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জাতীয় সংসদে। কিন্তু ভেবে দেখুন—সংসদের মূল কক্ষে বসে কি প্রতিটি আইন, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজ, বা সরকারি খরচের প্রতিটি খাত খুঁটিয়ে দেখা আসলেই সম্ভব? সংসদের কাজের পরিধি যত বড়, এই সীমাবদ্ধতাটাও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঠিক এখানেই কাজে আসে সংসদীয় কমিটি।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সংসদীয় কমিটি হলো সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি ছোট দল, যারা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়, মন্ত্রণালয়, আইন, সরকারি খরচ বা কোনো বিশেষ অভিযোগ নিয়ে গভীরভাবে খতিয়ে দেখে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নিজেই এই কমিটিকে বলেছে সংসদের ‘বর্ধিত কর্মহাত’। অর্থাৎ, মঞ্চের সামনে যা দেখা যায়, তার পেছনে যে বিস্তারিত কাজ চলে, সেটাই করে কমিটি।
কেন সংসদীয় কমিটি দরকার
সংসদীয় কমিটিতে যেহেতু সদস্যসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে, তাই তারা একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে অনেক সময় ধরে কাজ করতে পারেন। জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, একটি কার্যকর কমিটি ব্যবস্থা আইন তৈরি, সরকারি খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের কাজের ওপর নজরদারি—এই তিনটি ক্ষেত্রকেই আরও শক্তিশালী করতে পারে।
একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ধরুন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বড় প্রকল্পে অনেক টাকা বরাদ্দ হয়েছে। সংসদের মূল অধিবেশনে হয়তো এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা হলো। কিন্তু প্রকল্পে টাকা কত খরচ হচ্ছে, কাজ কতদূর এগোলো, টাকা সঠিকভাবে খরচ হচ্ছে কি না, বা মন্ত্রণালয় আগে যা বলেছিল তা বাস্তবায়ন করছে কি না—এসব বিস্তারিত বিষয় দেখার দায়িত্ব পড়ে কমিটির ওপর।
সংসদে কী ধরনের কমিটি আছে
সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার পেছনে সংবিধানেরই সমর্থন আছে। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, কমিটি অব প্রিভিলেজেস এবং নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য স্থায়ী কমিটির কথা বলা আছে। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতেও বিভিন্ন কমিটির গঠন ও কাজ ঠিক করা আছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কাজ দেখভালের জন্য এমন একটি করে কমিটি থাকে। বর্তমান ১৩তম সংসদের সরকারি তালিকা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, অর্থ, পানি সম্পদ, বাণিজ্য, শিল্পসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা আলাদা কমিটি রয়েছে।
এছাড়া আরও আছে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, এস্টিমেটস কমিটি, পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটি, কমিটি অব প্রিভিলেজেস, পিটিশনস কমিটি এবং সরকারি প্রতিশ্রুতি-সংক্রান্ত কমিটির মতো আরও নানা কমিটি।
কমিটি কীভাবে কাজ করে
সংসদীয় কমিটির কাজ শুধু বৈঠক করা নয়। প্রয়োজন হলে তারা তথ্য জোগাড় করতে পারে, সংশ্লিষ্ট মানুষ বা কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠাতে পারে এবং নথিপত্র পরীক্ষা করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ধরুন কোনো মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তখন কমিটি সেই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা মানুষ বা প্রয়োজনে অন্য যে কারও বক্তব্য শুনতে পারে। প্রকল্পের কাগজপত্র ও তথ্য চাইতে পারে। এরপর সব তথ্য যাচাই করে একটি প্রতিবেদন লিখতে পারে।
তবে একটা কথা মনে রাখা জরুরি—কমিটি আদালত নয়। কারও শাস্তি দেওয়া তাদের কাজ নয়। তাদের কাজ হলো সংসদের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা, সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া, সমস্যা খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজন হলে সুপারিশ করা।
আইন তৈরিতেও কমিটির ভূমিকা আছে
সংসদীয় কমিটির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আইন খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা। সংসদের মূল অধিবেশনে কোনো বিল নিয়ে আলোচনা হওয়ার পর সেটা যেতে পারে সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে। কমিটি তখন বিলের বিভিন্ন ধারা পরীক্ষা করে, প্রয়োজনীয় মতামত নেয়, এবং সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন কমিটি বিল পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার কাজে যুক্ত থাকে।
এর পাশাপাশি, জনগণের টাকা কীভাবে খরচ হচ্ছে সেদিকে নজর রাখাও সংসদের একটা বড় দায়িত্ব। এখানে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি টাকা খরচের হিসাব, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং এই সংক্রান্ত ব্যাখ্যা পরীক্ষা করে এই কমিটি সংসদের আর্থিক নজরদারিতে সাহায্য করে। একইভাবে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেট, কাজের অগ্রগতি, নীতি ও প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে পারে।
কমিটি কি শুধু বাংলাদেশের সংসদেই আছে
না, সংসদীয় কমিটি বিশ্বের অনেক দেশের আইনসভাতেই একটি পরিচিত ব্যবস্থা। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নিজেই বলছে, সরকারব্যবস্থা সংসদীয় হোক বা প্রেসিডেন্সিয়াল—দুই ক্ষেত্রেই সারা বিশ্বে কমিটি ব্যবস্থা দেখা যায়। তবে দেশ ভেদে কমিটির ক্ষমতা, গঠন ও কাজের ধরন আলাদা।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে কমিটি ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাউস অব কমন্সে বিভিন্ন সিলেক্ট কমিটি সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোর খরচ, প্রশাসন ও নীতি খতিয়ে দেখে। প্রতিটি বড় সরকারি বিভাগের কাজ পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট একটি কমিটি থাকে। এই কমিটিগুলো মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করতে পারে, বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিত বা মৌখিক তথ্য নিতে পারে এবং তদন্ত শেষে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সরকারও সাধারণত এসব সুপারিশের একটা জবাব দিয়ে থাকে।
ভারতের সংসদেও কমিটি ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে চালু আছে। লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিভিন্ন স্থায়ী ও অস্থায়ী কমিটি রয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিপার্টমেন্ট-রিলেটেড স্ট্যান্ডিং কমিটি বা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, যা চালু হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। বর্তমানে এমন ২৪টি কমিটি আছে, যেগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজ পরীক্ষা করে। এসব কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুদানের দাবি, তাদের আওতাধীন বিল, বার্ষিক প্রতিবেদন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করতে পারে। তবে ভারতে কমিটির সুপারিশ সাধারণত পরামর্শমূলক হিসেবেই ধরা হয়।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবশ্য এই সুপারিশ নিয়ে পরে কী ব্যবস্থা নিল, তার জবাব দিতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও কমিটি ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী। সেখানে সিনেটের স্থায়ী কমিটিগুলো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আইন পরীক্ষা করে, শুনানি করে, সরকারি সংস্থার কাজ তদারকি করে এবং তদন্তও চালায়। কংগ্রেসে কোনো বিল উত্থাপনের পর তা সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হতে পারে। কমিটি শুনানি করে, বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য শোনে, বিলের বিভিন্ন অংশ নিয়ে আলোচনা ও সংশোধন করে, এরপর পূর্ণ কক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে কমিটির তদন্ত করার ক্ষমতাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সংস্থাগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, খরচ ঠিক আছে কি না, আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না—এসব দেখতে কমিটিগুলো শুনানি ও তদন্ত চালায়।
কমিটি থাকলেই কি জবাবদিহি নিশ্চিত হয়ে যায়
না, একদমই নয়। কমিটি থাকা আর কমিটি সত্যিকার অর্থে কার্যকরভাবে কাজ করা—দুটো একদম আলাদা বিষয়।
একটা কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তথ্য পাওয়ার ক্ষমতা কতটা কার্যকর, সদস্যরা কতটা সক্রিয়, বৈঠকে কতটা গভীর আলোচনা হচ্ছে, এবং কমিটির সুপারিশের পর সরকার আসলে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে—এসবের ওপরই নির্ভর করে কমিটি কতটা কার্যকর।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টও স্বীকার করে যে, সিলেক্ট কমিটির সুপারিশ সরকারের জন্য সরাসরি বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রকাশ্য শুনানি, তদন্ত ও প্রতিবেদন সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও জনসম্মুখে জবাবদিহির একটা চাপ ঠিকই তৈরি করে।
ভারতেও কমিটির সুপারিশকে পরামর্শমূলক হিসেবে দেখা হয়, তবে মন্ত্রণালয়গুলোকে অনেক ক্ষেত্রে পরে তাদের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জবাব দিতে হয়।
বাংলাদেশে যেমন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি আছে, তেমনি যুক্তরাজ্যে আছে সিলেক্ট কমিটি, ভারতে ডিপার্টমেন্ট-রিলেটেড স্ট্যান্ডিং কমিটি, আর যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্যান্ডিং, সিলেক্ট ও জয়েন্ট কমিটি—নাম-কাঠামো আলাদা হলেও কাজ মূলত একই রকম। এর পেছনের মূল উদ্দেশ্য একটাই—সংসদের কাজকে আরও গভীর করা এবং সরকারের কাজকে আরও বেশি জবাবদিহির মধ্যে রাখা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ—কমিটি ব্যবস্থা, যুক্তরাজ্য পার্লামেন্ট—সিলেক্ট কমিটি, ভারতীয় সংসদ—কমিটি ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট—কমিটি ব্যবস্থা
.png)








