ad

মৃত্যুবার্ষিকী/ফিরোজা বেগমের গান শুনে নজরুল বলেছিলেন, এত ছোট মেয়ে এই গান কোথায় শিখেছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ০৬
ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের গান পেয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। স্ট্রিম গ্রাফিক
ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের গান পেয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। স্ট্রিম গ্রাফিক

ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের গান পেয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। গানের মধ্য দিয়ে কবির সৃষ্টিকে পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। ‘নূরজাহান’, ‘চাঁদ সুলতানা’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’, ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’ কিংবা ‘আমি চিরতরে দূরে সরে যাব’—নজরুলের অসংখ্য গান তাঁর কণ্ঠে আজও মধুর মতো বাজে। এ কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নজরুলগীতির আরেক নাম হয়ে উঠেছেন ফিরোজা বেগম।

জন্ম ১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই, তৎকালীন ফরিদপুর জেলার কাশিয়ানী থানার ঘোনাপাড়ায়। বাবা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী। মা কওকাবন্নেসা বেগমও ছিলেন সংগীতপ্রেমী। তাঁর কণ্ঠ ছিল মিষ্টি। সংগীতের পরিবেশেই বড় হয়েছেন ফিরোজা। তাঁদের পরিবারের নয় ভাইবোনের সবাই কোনো না কোনোভাবে গানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অনেকেরই রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল এইচএমভি থেকে।

ফিরোজার শৈশব কেটেছে ফরিদপুর ও যশোরে। কৈশোরের কিছু সময় কেটেছে ভারতের কোচবিহারে। পরে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়। বাড়িতে নিয়মিত আসতেন বিভিন্ন ওস্তাদ ও সংগীতজ্ঞ। ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের ভিত শক্ত হয়ে ওঠে তাঁর।

নজরুলকে গান শোনাচ্ছেন ফিরোজা বেগম। সংগৃহীত ছবি
নজরুলকে গান শোনাচ্ছেন ফিরোজা বেগম। সংগৃহীত ছবি

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গান গেয়ে সাড়া ফেলেন। তাঁর গান শুনে অল ইন্ডিয়া রেডিওর সুনীল বোস মুগ্ধ হন। তাঁর আগ্রহেই ছোট্ট ফিরোজাকে কলকাতার এইচএমভিতে অডিশন দিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেই অডিশনের দিনটি ফিরোজা বেগমের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। সেখানে তিনি দেখলেন ঘিয়ে রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষকে। মাথায় টুপি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু ছোট্ট ফিরোজা তখনো জানতেন না, এই মানুষটির লেখা গান গাইতেই তিনি এখানে এসেছেন।

অডিশনে গান গাইতে প্রথমে তাঁর খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। তবু গান ধরলেন, ‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা’। ছোট্ট মেয়ের কণ্ঠে এই গান শুনে নজরুল অবাক হয়ে প্রশংসা করেন। জানতে চান, এত ছোট মেয়ে এই গান কোথায় শিখেছে। এরপর তিনি কমল দাশগুপ্তকে ডেকে ফিরোজার গান শোনান। কমল দাশগুপ্তও তাঁর গানের প্রশংসা করেন।

এই অডিশনেই ফিরোজার সঙ্গে কমল দাশগুপ্তের প্রথম পরিচয়। তখন কমল ছিলেন তরুণ সংগীতজ্ঞ। পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফিরোজা।

১৯৪২ সালে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয় ফিরোজা বেগমের প্রথম গানের রেকর্ড। তখনো লং প্লে রেকর্ডের প্রচলন হয়নি। ৭৮ আরপিএম রেকর্ডে প্রকাশিত হয় তাঁর গান। এক পাশে ছিল ‘মোর আঁখিপাতে’। অন্য পাশে ছিল ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’। তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশের খবর কলকাতার সংবাদপত্রগুলোতেও গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়।

এরপর আসে ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ ও ‘মোমের পুতুল’। এই দুটি গান ফিরোজা বেগমকে এনে দেয় বড় সাফল্য। ধীরে ধীরে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় নজরুল সঙ্গীত শিল্পী।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্য পাওয়া। নজরুলের কাছ থেকে প্রায় আড়াই বছর গানের তালিম নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। কবির কাছ থেকে গান শেখার এই অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতজীবনকে প্রভাবিত করে।

১৯৭৩ সালে ফিরোজা বেগম। ফিরোজা বেগম আর্কাইভ থেকে নেওয়া ছবি
১৯৭৩ সালে ফিরোজা বেগম। ফিরোজা বেগম আর্কাইভ থেকে নেওয়া ছবি

একসময় কাজী নজরুল ইসলামের গানকে আলাদা কোনো নামে ডাকা হতো না। সেই গানকে ‘নজরুলসংগীত’ নামে পরিচিত করার ক্ষেত্রে ফিরোজা বেগমের বড় ভূমিকা ছিল। এইচএমভিও তাঁর গান দিয়ে প্রথম নজরুলসংগীতের একক লং প্লে প্রকাশ শুরু করে। কবি অসুস্থ হওয়ার পর নজরুলসংগীতের স্বরলিপি তৈরি ও সংরক্ষণের কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

নজরুলের গানের সঠিক সুর ও স্বরলিপি সংরক্ষণ ছিল সহজ কাজ নয়। ফিরোজা বেগমকে এ জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাঁর কাছে নজরুলের গান ছিল শুধু সংগীত নয়। এটি ছিল একটি ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে শুদ্ধভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি সারাজীবন কাজ করেছেন।

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য জীবনে পেয়েছেন বহু পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র পুরস্কার, সত্যজিৎ রায় পুরস্কারসহ আরও অনেক সম্মাননা।

শুধু নজরুলসংগীত নয়, ফিরোজা বেগম গেয়েছেন আধুনিক গান, গীত, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাত। দেশে-বিদেশে তিনি ৩৮০টির বেশি একক সংগীতানুষ্ঠানে গান করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গানের মধ্যে রয়েছে ১২টি এলপি, চারটি ইপি, ছয়টি সিডি এবং ২০টির বেশি অডিও ক্যাসেট। জাপানের অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিবিএস থেকেও তিনি পেয়েছেন গোল্ড ডিস্ক।

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য জীবনে পেয়েছেন বহু পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র পুরস্কার, সত্যজিৎ রায় পুরস্কারসহ আরও অনেক সম্মাননা।

১৯৫৬ সালে কমল দাশগুপ্তকে বিয়ে করেন ফিরোজা বেগম। তাঁদের সংসারে জন্ম নেন তিন সন্তান—তাহসিন, হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ। হামিন ও প্রয়াত শাফিন আহমেদ পরবর্তী সময়ে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁদের হাত ধরে মাইলসও দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গান ছিল ফিরোজা বেগমের সঙ্গী। ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন, ৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা ২৮ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাই সময় যতই পেরিয়ে যাক, বাংলা সংগীতের ইতিহাসে ফিরোজা বেগমের নাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গেই উচ্চারিত হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত