


‘যেদিন মুই তোমাক পতথম দেখচোম, সেইদিন থাইকেই মুই তোমাক ভালোবাসি ফেলচোম...’—গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষার এমন মায়াবী আর আবেগময় প্রকাশ আজ আর আগের মতো শোনা যায় না। আধুনিকতা, শহরমুখী জীবনযাত্রা আর প্রমিত বাংলার প্রভাবে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে রংপুরি বা কামতাপুরি উপ-ভাষার এই স্বতন্ত্র রূপটি। সচেতন মহল মনে করছেন,


ভাষা কখনও নিছক যোগাযোগের উপায় নয়। ভাষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি জাতির ইতিহাস, স্মৃতি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের বিন্যাস। ভাষা যখন আঘাতপ্রাপ্ত হয়, জাতির আত্মাও আহত হয়। আবার ভাষা যখন জাগ্রত হয়, তখন জাতিসত্তা শক্তিরূপে উদ্ভাসিত হয়।


মৌলভীবাজারের একটি চা বাগানে বাস দুই বোন– ভেরোনিকা কেরকেটা ও খ্রিস্টিনা কেরকেটার। তাদের আরেক পরিচয়– ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ‘খাড়িয়ার’ শেষ দুই কথক। তাঁদের কণ্ঠ থেমে গেলে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে ভাষাটি। কারণ, চেষ্টা করেও কাউকে শেখাতে পারেননি ভাষাটি।


সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের সালামনগরে শহীদ সালামের বাড়ির অদূরে ২০০৮ সালে নির্মিত ‘ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’ বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। একতলা ভবনের ভেতরে ১১টি আলমারিতে প্রায় তিন হাজার বই থাকলেও পাঠক নেই বললেই চলে।




একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পলাশ-শিমুলের রঙে রাঙানো এক শোকাবহ অথচ গৌরবের দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার রাজপথে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের বুকের তাজা রক্তে লেখা হয়েছিল মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। সেই রক্তস্রোত আজ বিশ্বস্বীকৃত।


বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য আরও একটি রক্তাক্ত ইতিহাস রচিত হয়েছিল ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে বরাকের রাজপথে প্রাণ দেওয়া ১১ ভাষা শহীদ আজ আমাদের কাছে বিস্মৃতির অতলে।


ভাষাবিজ্ঞানের চিরায়ত ধারণায় বলা হতো, কোনো ভাষা একবার তার শেষ স্থানীয় বক্তা বা নেটিভ স্পিকাকে হারালে, অর্থাৎ মৃত বা বিলুপ্ত হলে, তা আর কখনোই স্বাভাবিক কথ্যরপে ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু গত শতকে ইউরোপের একটি প্রান্তিক ভাষা এই অসম্ভবকে সম্ভব করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।


বিশ্বজুড়ে ভাষার তালিকা বা ক্যাটালগ তৈরি করা সংস্থা এথনোলগের তথ্যমতে, ইংরেজি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কথিত ভাষা। ১৮৬টি দেশে প্রায় দেড় শ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে প্রতি ১০ জনের মধ্যে দুজন মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষ একে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।


