আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার/অভ্যুত্থানের এক বছর পর কোন পথে নেপাল, কী পেলেন জেন-জিরা
স্ট্রিম ডেস্ক

এক বছর আগে সরকারের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে নেপালের রাজপথে নেমেছিলেন হাজারো তরুণ। জেন–জি নামে পরিচিত এই তরুণদের আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে। বিক্ষোভ দমনে কারফিউ, গ্রেপ্তার ও গুলিতে বহু মানুষের মৃত্যুর পর শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে হয়। গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার, খুলে যায় নতুন নির্বাচনের পথ।
এরপর মার্চে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে নতুন রাজনৈতিক দল। ৩৫ বছর বয়সী র্যাপার থেকে রাজনীতিক হওয়া বালেন্দ্র শাহ নেপালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু আন্দোলনের এক বছর পর প্রশ্ন উঠছে—রাজপথের তরুণদের দাবিগুলো কি সত্যিই পূরণ হয়েছে?
যেভাবে শুরু হয়েছিল আন্দোলন
২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডু ও নেপালের বিভিন্ন শহরে জেন–জি তরুণদের বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারি কর্মকর্তার সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষোভ আরও বাড়ে। এসব তরুণকে অনেকে ‘নেপো কিডস’ নামে অভিহিত করতেন।
এর কয়েক দিন আগে ‘ক্ষতিকর’ কনটেন্টসংক্রান্ত সরকারি নিয়ম না মানার অভিযোগে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স ও টিকটকসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। বিক্ষোভ শুরুর পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কারফিউ অমান্য করে বিক্ষোভে নামেন তরুণেরা। পুলিশ গুলি চালালে প্রায় ৭৬ জন নিহত হন। আহত হন শত শত মানুষ। গ্রেপ্তার করা হয় বহু বিক্ষোভকারীকে। একপর্যায়ে পার্লামেন্টসহ কয়েকটি সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। পরে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হন।
নির্বাচনে নতুন শক্তির উত্থান
চলতি বছরের মার্চের নির্বাচনে বড় জয় পায় রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পায় দলটি। এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রধান রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএলের আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
আরএসপির নেতা বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি বিক্ষোভের রাজপথের সংগঠক ছিলেন না। তবে নির্বাচনী প্রচারে জেন–জি তরুণদের ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন।
কতটা পূরণ হলো তরুণদের দাবি
জেন–জি আন্দোলনের প্রধান দাবির মধ্যে ছিল দুর্নীতির অবসান, রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহি, ওলির পদত্যাগ, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং নতুন নির্বাচন।
এর মধ্যে বেশ কয়েকটি দাবি পূরণ হয়েছে। ওলি পদত্যাগ করেছেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে এবং নতুন নির্বাচনও হয়েছে।
নেপালের পোখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক যোগ রাজ লামিছানে বলেন, আন্দোলনে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হলেও অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছে। তাঁর মতে, নির্বাচনের ফল পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের হতাশার প্রতিফলন।
গত মার্চে ওলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা এখনো তদন্তের আওতায় থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
তবে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মতো মূল সমস্যাগুলোর তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালাচিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক দিনেশ পৌডেল বলেন, তরুণেরা যে মৌলিক সমস্যাগুলো তুলে ধরেছিলেন, সেগুলো এখনো রয়ে গেছে। তাঁর মতে, নতুন সরকার এলেও শাসনব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তরুণেরা সরকারে, আন্দোলনকারীরা রাজপথে
জেন–জি আন্দোলনের পর কিছু তরুণ নেতা এখন সংসদ ও সরকারে জায়গা পেয়েছেন। অন্যরা এখনো বিভিন্ন নাগরিক ও আন্দোলনকারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে আন্দোলনের ভেতরেই বিভাজন তৈরি হয়েছে।
নেপাল সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি রিসার্চের গবেষণা পরিচালক বিষ্ণু রাজ উপ্রেতি বলেন, রাজনীতিতে তরুণদের প্রবেশ সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি। তাদের অনেকে শিক্ষিত এবং পরিবর্তন আনার আকাঙ্ক্ষা রাখেন।
তবে দলীয় কাঠামো ও পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে তরুণ নেতারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উপ্রেতির ভাষায়, নেতৃত্বের পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এটা ভালো, কিন্তু যথেষ্ট নয়।
গত মে মাসে সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতামত জানতে সরকার ২৯ জন জেন–জি কর্মীকে আমন্ত্রণ জানায়। তাদের মধ্যে ২৫ জন বৈঠক বর্জন করেন। তাদের অভিযোগ, কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের বদলে সরকার সীমিত কিছু বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে।
আন্দোলনের মানুষগুলো কোথায়
গত বছরের বিক্ষোভে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সাবেক পার্লামেন্ট ভবনে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ওই ভবনেই গত বছর বিক্ষোভকারীরা ঢুকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের মতে, শুধু অর্থ দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাদের প্রকৃত দাবি ছিল, যে পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা।
জেন–জি কর্মী আয়ুষ বাসিয়াল বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু মানুষ এখন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের অনেক বিক্ষোভকারী এখনো কারাগারে রয়েছেন।
তাঁর দাবি, অগ্নিসংযোগের অভিযোগে সরকারি হিসাবে ৯০০-এর বেশি এবং বেসরকারি হিসাবে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ কারাগারে রয়েছেন।
এখনো দরকার বড় সংস্কার
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই জেন–জি আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হবে না। প্রয়োজন আইন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কার।
বিষ্ণু রাজ উপ্রেতি বলেন, আমলাতন্ত্রে ব্যাপক সংস্কার ছাড়া আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জন কঠিন। নতুন সরকার এখনো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এ ছাড়া ভারত ও চীনের সঙ্গে নেপালের সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অধ্যাপক দিনেশ পৌডেলের মতে, শহর ও গ্রামের বৈষম্য, শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি ও কৃষকদের মধ্যে দূরত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মতো সমস্যার সমাধান ছাড়া কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সামনে কী
নতুন সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি বলে মনে করেন আন্দোলনকারীরা। আয়ুষ বাসিয়ালের মতে, নেপালে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের প্রত্যাশা ও সরকারের কাজের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান থেকেই হতাশা তৈরি হয়।
তিনি আশঙ্কা করছেন, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে জনগণের হতাশার দ্বিতীয় ঢেউ তৈরি হতে পারে।
তবে দেশটির বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে কিছুটা সময় দেওয়ার পক্ষেও মত রয়েছে। এর মধ্যেই তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজারো মানুষ।
বাসিয়াল মনে করেন, নেপালে বড় কোনো জাতীয় দুর্যোগের সময়ই মানুষ বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়। ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে সংবিধান প্রণয়নের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এবারের দুর্যোগের পরও জাতীয় ঐক্যের এই আবহ হয়তো পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।
(আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান সার্জিল)
.png)








