ফিরোজ আহমেদের মতামত/সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে আলোচনা কেন জরুরি

সম্পত্তিতে পিতা-মাতার অধিকার রক্ষার খুবই প্রয়োজনীয় একটা আইনি বন্দোবস্ত হিসেবেই ‘১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’-এর উদ্যোগের কথা বলতে হবে। আমাদের সবারই চেনা পরিচিত মানুষ এ রকম পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, সন্তানদের সম্পত্তি দান করার পর তাদের দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে। ধনী ও নিম্নবিত্ত— সকল শ্রেণিতেই এটা দেখেছি।
এই আইনের প্রয়োজন নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন আসতেই পারে, একটা হলো ২০১৩ সালের পিতা–মাতার ভরণপোষণ আইন ইতিমধ্যেই আছে। সেখানেও উত্তরটা এই যে, সেক্ষেত্রে বাবা-মাকে মামলায় যেতে হয়, সন্তানের বিরুদ্ধে যা তারা করতে চান না। বর্তমান আইনেও পিতামাতাকে মামলা করতে হবে কি না, এই প্রশ্নে আজকে প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে আইনমন্ত্রীর কথাটা আরও গুরুত্ব দিয়ে বলা সম্ভব ছিল।
একটা বিষয় তো পরিষ্কার যে, এই আইনে দাতা ভোগ দখলের অধিকার সংরক্ষণ করার কারণে তার ভোগের স্বত্ব অনেক বেশি স্পষ্ট। ফলে মামলার সংখ্যা কমে যাওয়ারই কথা; এ বিষয়ের দিকে তিনি আরও জোর দিয়ে বলতে পারতেন।
বলা ভালো, এই আইনে সম্পত্তি হস্তান্তর একটা শর্তযুক্ত উপহার। আইনি ধারণার কোনো ব্যত্যয় এটা নয়, যতক্ষণ না দানের শর্ত হিসেবে বেআইনি কিছু করতে বলা হয়।
ইসলামী আইনের ‘হেবা’ ধারণার সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। কিন্তু হেবার বিধান এখানে রদ বা বাতিল করা হয়নি। বরং নতুন একটা অধিকার ও সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে যা বয়স্ক মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বহু মুসলিম দেশেই এটা আগে থেকেই রয়েছে।
কিন্তু অন্য একটা বিষয়ে সমালোচনা করতেই হবে। বর্তমান সরকার প্রায় কোনো কাজই সমাজে যথাযথ আলোচনা, সংলাপ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করছে না।
মনে রাখতে হবে যে, সংসদই বিতর্ক ও আলাপের একমাত্র পরিসর না। আমাদের অধিকার আছে সরকার যে আইনগুলো প্রণয়ন করছে, তা নিয়ে একটা লম্বা সময় ধরে আলোচনা ও পরস্পরের যুক্তিগুলো শোনার।
এই নতুন আইনের বেলায় যেমন, যারা এই ইতিবাচক আইনটির সুবিধা ভোগ করবেন, আলোচনা-বিতর্ক হয়নি বলে তারা আদৌ এর ঘাত-প্রতিঘাতগুলো উপলব্ধি করবে না। বলা যায় এটা এক রকমের অগ্রগতি চাপিয়ে দেয়া। চাপিয়ে দেয়ার চর্চা ও সংস্কৃতি তৈরি হলে তা দিয়ে নিপীড়নও চাপিয়ে দেয়া যায়। বরং মানুষকে যুক্ত করাটা সমাজে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি করার জন্য জরুরি।
অন্য আরও একটা বিষয় হলো, বিরোধী দল এই আইনের বিরোধিতা করছে; একটা দীর্ঘ আলাপের পরিসর তৈরি হলে রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণভাবে নাগরিকরা প্রস্তুতি নিতে পারতেন, জনমত যাচাই করতে পারতেন। সমাজে আলোচনার মধ্য দিয়ে যদি এই আইনের পক্ষে একটা শক্তি তৈরি হয়, তার বিরোধিতা করার আগে কয়েকবার ভাবতেন।
বিরোধী দল যে ওয়াকআউট ইত্যাদি করল, তা নিয়ে মানুষ ততটা আলোচনা করবে না। কারণ অধিকাংশ মানুষ এই আইন এবং এর উদ্যোগ সম্পর্কে আসলে তেমন কিছুই জানে না। আইনমন্ত্রী নিজেও আজ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু ধর্মীয় আইন বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করছেন। খুব সীমিত পর্যায়ে এই বিষযে কিছু আলাপ বছর দশেক ধরেই হয়েছে। কিন্তু কখনোই খুব জোরালো হয়নি।
ধর্মীয় সংবেদনশলীতার কারণে এই আইনের দুটো দিক আছে। একটা তো সব আইনেরই যা থাকে, তা হলো কার্যপ্রক্রিয়ার দিক। বহুক্ষেত্রেই দেখা যায়, আইন প্রণয়নে যথাযথ সময় না নিলে, আলোচনা না করলে এগুলো ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়। এতে আরও জটিলতা তৈরি হয়।
আরেকটা হলো, একটা আইনের সাংস্কৃতিক অভিঘাত। আইয়ুব খানের আমলে মুসলিম পারিবারিক আইনের সংস্কার নিয়ে এখনও যে তর্ক বিতর্ক হয়, তার কারণ ওই আইন ধার্মিক মুসলমানদেরও ফিকহ নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে। একাধিক বিয়ে সংক্রান্ত আইনের সংস্কারও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রেখেছে। এই বিষয়গুলোকে কিছু আলেমের হাতে সীমিত না রেখে সকলের আলাপের বিষয়ে পরিণত করেছে, আলেমদের মধ্যে অনেকেই ইতিবাচক ও প্রগতিশীল ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন।
এই আলোচনাগুলো সমাজে বাড়তে থাকলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়েই ধর্মীয় উৎসজাত বহু আইনের সংস্কার সম্ভব। তা করা বহু আগেই আমাদের জন্য জরুরি হয়ে গিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে সে রকম প্রস্তুতি সমাজে তৈরি হতে পারতো। বিশেষ করে নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আলোচনাও বারবার সামনে আসা জরুরি। বহু কন্যাসন্তান এখন পিতামাতার দায়িত্ব পালন করেন। আমার পর্যবেক্ষণে এই সংখ্যাটা পুত্রদের চাইতে বেশি। আইন সংস্কার করা হলে এই দায়িত্ব পালন আরও সহজ ও কম অর্থনৈতিক চাপের হবে, সমাজে ন্যায্যতাও আরও শক্তিশালী হবে।
আইনটা যতই ভালো হোক, চাপিয়ে না দিয়ে সমাজের ভেতরে আলোচনাটা তুলে তারপর ধীরে ধীরে সেটাকে আইনের রূপ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলে সমাজের বহু স্তরের মানুষ এই আইন প্রণয়নে নিজেও অংশীদার বলে ভাবার সুযোগ পেতেন। এর মাধ্যমে আইনের সামাজিক শক্তি তৈরি হতো। এটা নিয়ে ধর্মীয় জিগির তোলার রাজনীতি করা কঠিন হতো।
এই আইনের বেলায় শুধু নয়, বিদ্যুৎ বলুন, পদ্মা ব্যারেজ বলুন, বিচার বা সংস্কার বলুন— সব বিষয়েই বর্তমান সরকারের সাধারণ প্রবণতা এটাই। তাদের কাজের পদ্ধতি অস্পষ্ট, মানুষ তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু জানে না। এটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য না।
● ফিরোজ আহমেদ: লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক
.png)








