সাক্ষরতা দিবস/বর্ণমালার বৃত্ত পেরিয়ে: একবিংশ শতাব্দীর সাক্ষরতার নব দিগন্ত

মানবসভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা সবসময়ই মুক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মানুষকে জ্ঞানের আলোয় নিয়ে আসার যে দীর্ঘ অভিযাত্রা, তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল সাক্ষরতা। একসময় একজন মানুষকে সাক্ষর বলা হতো তখনই, যখন তিনি অক্ষর চিনতে পারতেন, পড়তে পারতেন, লিখতে পারতেন এবং নিজের নাম স্বাক্ষর করতে পারতেন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের কাঠামো। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সাক্ষরতার অর্থও।
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের এই মধ্যভাগে এসে বৈশ্বিক উন্নয়ন দর্শন ও সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাধারায় ‘সাক্ষরতা’ শব্দটির ব্যাকরণগত ও প্রায়োগিক সংজ্ঞা আমূল বদলে গেছে। ২০২৬ সালের এই হাইপার-কানেক্টেড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম উৎকর্ষের যুগে সাক্ষরতা কেবল সনাতন অক্ষরজ্ঞানের ফ্রেমে বন্দি কোনো ধারণা নয়, এটি এখন মানব পুঁজি গঠন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির প্রথম শর্ত।
আধুনিক সাক্ষরতা হলো একটি বহুমাত্রিক জীবনদক্ষতা। এটি একজন মানুষকে শুধু কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করে না; বরং তাকে একজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। একজন সাক্ষর ব্যক্তি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে মতামত দিতে পারেন এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারেন।
প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর যখন বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়, তখন তা কেবল উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতায় বা প্রতিপাদ্যের স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ এবং আগামী দিনের সামষ্টিক অগ্রগতির এক বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নপত্র।
এবারের দিবসটির তাৎপর্য আরও গভীর, কারণ ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ষাট বছর পূর্ণ করছে। ১৯৬৫ সালে তেহরানে অনুষ্ঠিত নিরক্ষরতা দূরীকরণবিষয়ক সম্মেলনেই এই দিবসের বীজ বোনা হয়েছিল; ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ইউনেস্কোর চতুর্দশ সাধারণ অধিবেশনে তা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৬৭ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় দাঁড়িয়ে এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬-এর জন্য ইউনেস্কো একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘জনগণ, পৃথিবী এবং সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোতে বসছে এর মূল বৈশ্বিক আয়োজন। প্রতিপাদ্যটির ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি: সাক্ষরতা নিছক ব্যক্তির অর্জন নয়, তা একই সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, এই গ্রহে টিকে থাকা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। প্রায় তিন দশক আগে সাক্ষরতা দিবসের বার্তায় এই দর্শনকে ধারণ করেই বোধ হয় জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান বলেছিলেন, ‘সাক্ষরতা হলো মূলত মানুষের মুক্তির একটি প্ল্যাটফর্ম এবং এটি যেকোনো ধরনের উন্নয়ন প্রচেষ্টার মূল চাবিকাঠি।’
স্বাধীনতার পর পরই, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরবর্তী সময়ে জাতীয় শিক্ষা কমিশন, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের পথে এগিয়ে যায়।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিস্তার, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি কর্মসূচি, নারী শিক্ষার প্রসার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। এই অগ্রগতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো নারী শিক্ষার বিস্তার। কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের সমাজে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি শক্তিশালী হয়েছে। শিক্ষা নারীর আত্মনির্ভরতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশ সাক্ষরতার হারের ক্ষেত্রেও এক অভাবনীয় সামাজিক উল্লম্ফন প্রত্যক্ষ করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাধারণ সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। স্বাধীনতার সময়কার মাত্র ২৫ শতাংশের নিচে থাকা সাক্ষরতার হারের তুলনায় এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী সামাজিক রূপান্তর। প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো সামষ্টিক উদ্যোগের ফলেই এই সংখ্যাগত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়েছে। তবে এই অর্জনের পাশাপাশি বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য, কিন্তু শুধু সংখ্যাগত অগ্রগতি দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারণ করা যায় না। একটি মানুষ অক্ষর চিনতে পারলেই তিনি সম্পূর্ণভাবে শিক্ষিত হয়ে উঠেছেন—এমন ধারণা বর্তমান যুগে আর গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আশাজাগানিয়া সাক্ষরতার হার ও সংখ্যার আড়ালে এখনও গভীর কাঠামোগত ব্যবধান লুকিয়ে আছে। দেশের প্রায় ২২ দশমিক ১ শতাংশ নাগরিক আজও সম্পূর্ণ নিরক্ষরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। তদুপরি, অঞ্চলভেদে এই হারে বড় ধরনের তারতম্য দৃশ্যমান; দেশের কোনো কোনো প্রান্তিক ও চরাঞ্চলের জেলায় শিক্ষার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। এই আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য প্রমাণ করে যে, আমাদের সামষ্টিক উন্নয়ন এখনও সুষম হয়ে ওঠেনি এবং শিক্ষার আলো সমতার ভিত্তিতে সবার ঘরে পৌঁছায়নি।
গবেষণাধর্মী মূল্যায়নে আরও একটি বড় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে, তা হলো ‘সাধারণ সাক্ষরতা’ এবং ‘কার্যকরী সাক্ষরতা’র মধ্যকার বিশাল ব্যবধান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাধারণ সাক্ষরতার হার পৌনে আশি শতাংশের ঘরে হলেও বাস্তব জীবনে পড়তে, বুঝতে, যোগাযোগ করতে এবং সাধারণ গাণিতিক হিসাব সম্পন্ন করার মতো কার্যকরী সাক্ষরতার হার এখনও প্রায় ৬২ দশমিক ৯২ শতাংশে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞায় যারা সাক্ষর, তাদের একটি বড় অংশই বাস্তব কর্মক্ষেত্রে বা দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় সেই অক্ষরজ্ঞানকে ফলপ্রসূভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন না। এখানেই আসে কার্যকরী সাক্ষরতার বিষয়টি। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সাধারণ সাক্ষরতা থেকে গুণগত ও কার্যকরী সাক্ষরতার দিকে অগ্রসর হওয়া।
২০২৬ সালের এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময়ে এই ঘাটতি দেশের শ্রমবাজারের জন্য বড় বিপদের কারণ। আধুনিক অর্থনীতিতে যেখানে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কোডিং বা ডেটা প্রসেসিংয়ের মতো মৌলিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা আবশ্যিক শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে কার্যকরী সাক্ষরতার এই পশ্চাৎপদতা আমাদের সস্তা শ্রমভিত্তিক জনমিতিক লভ্যাংশকে জনস্ফীতি বা বোঝায় পরিণত করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বৈশ্বিক পরিসরেও ছবিটি স্বস্তিদায়ক নয়।
ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় ৭৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ন্যূনতম অক্ষরজ্ঞানহীন, যাদের দুই-তৃতীয়াংশই নারী। এর চেয়েও বড় বৈশ্বিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘শিখন দারিদ্র্য’ বা লার্নিং পোভার্টি, যেখানে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশই একটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত গল্প পড়ে বুঝতে অক্ষম। করোনা মহামারী-উত্তর অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সামষ্টিক চ্যালেঞ্জ এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় যে বড় ধরনের শিখন ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে বিশ্ব আজও পুরোপুরি উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। তারপরও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের নাটকীয় প্রসারের ফলে সনাতন সাক্ষরতা ও আধুনিক কর্মসংস্থানের মধ্যে এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ২০২৬ সালের এই ক্ষণে দাঁড়িয়ে সাক্ষরতা আর কেবল একটি মৌলিক মানবাধিকারের ধারণায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির এক অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতে, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল সাবলীলতা, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা এবং ডেটা লিটারেসি এখন বৈশ্বিক নাগরিকদের জন্য আবশ্যিক যোগ্যতা। ফলে, উন্নত বিশ্ব যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার ও রোবোটিক্স শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে, সেখানে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্ব এখনো মৌলিক অক্ষরজ্ঞান নিশ্চিত করার আদিম লড়াইয়ে অবতীর্ণ। এই বৈশ্বিক বৈষম্য ও শিক্ষাগত মেরুকরণ দূর করাই এখন আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রধানতম বৈশ্বিক এজেন্ডা।
বাংলাদেশে এই সংকট সমাধানের প্রধান আঁতুড়ঘর হলো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা বর্তমানে এক জটিল ও বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিধি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম হলেও গুণগত মানের দিক থেকে এটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, দেশে প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছালেও শিক্ষার মূল ভিত্তি তথা শিখন ফল বা লার্নিং আউটকাম মারাত্মক সংকটে জর্জরিত। প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পন্ন করা প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর তাদের গ্রেড-উপযোগী বাংলা ভাষা পড়তে বা বুঝতে পারে না এবং প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী মৌলিক গণিতে তাদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই মৌলিক শিখন ঘাটতির মূল কারণ হলো শিক্ষকের দক্ষতার অভাব, মুখস্থনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ত্রুটিপূর্ণ অনুপাত। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি আমাদের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতিজনিত অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক আয় কমে যাওয়া এবং অতি অল্প বয়সেই উপার্জনের তাগিদে শিশুদের কাজের বাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হওয়াই এই ঝরে পড়ার মূল কারণ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ঝরে পড়ার প্রবণতা বাংলাদেশে এখন অনেক বেশি, কারণ গ্রামীণ ও শহরতলির দরিদ্র পরিবারগুলো ছেলেদের দ্রুত উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে স্কুল থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। তদুপরি, চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা জিডিপির শতাংশের হিসেবে বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় এখনও অপ্রতুল।
এছাড়াও সাক্ষরতা বিষয়টি এখন আর শুধু খাতাকলমে অক্ষরজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নেই। একবিংশ শতাব্দীর এই চতুর্থ দশকে এসে সাক্ষরতা হয়ে উঠেছে একটি বহুমুখী, গতিশীল এবং জীবনমুখী জীবন-দক্ষতা। ২০২৬ সালের এই হাইপার-ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে একজন প্রকৃত সাক্ষর নাগরিকের যোগ্যতা কেবল শব্দ পড়তে পারার মধ্যে নয়, বরং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং তথ্যের সঠিক বিশ্লেষণী ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বর্তমান শতাব্দীর উপযোগী সাক্ষরতার মূল ভিত্তি হলো ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা, যা মানুষকে ইন্টারনেটের বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে সঠিক তথ্যটি খুঁজে বের করতে, সাইবার ঝুঁকি বুঝতে এবং কোডিং বা ডেটা প্রসেসিংয়ের মতো মৌলিক কাজ সম্পন্ন করতে শেখায়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা, যার মাধ্যমে একজন নাগরিক তথ্যের সত্যতা যাচাই করে ভুয়া খবর ও প্রোপাগান্ডা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বায়নের এই যুগে পরিবেশগত সাক্ষরতা এবং গ্লোবাল সিটিজেনশিপ বা নাগরিক সচেতনতাও এই শতাব্দীর শিক্ষার অন্যতম অংশ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, একবিংশ শতাব্দীর সাক্ষরতা এমন হওয়া উচিত যা একজন মানুষকে কেবল সনাতন ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট দেবে না, বরং তাকে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শ্রমবাজারে টিকে থাকার উপযোগী পেশাদার দক্ষতা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
এই বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের সাথে বাংলাদেশের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং একটি টেকসই, আধুনিক ও জীবনমুখী সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার বিষয়টি পর্যালোচনা করলে একটি মিশ্র ও জটিল সমীকরণ চোখে পড়ে। । বিগত দেড় দশকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ইন্টারনেট সংযোগের বিস্তার ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক প্রসার দেশের মানুষকে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে । প্রাতিষ্ঠানিক উপাত্ত অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষাকে যুক্ত করা হয়েছে এবং মাধ্যমিক স্তরে নতুন কারিকুলামের আলোকে আধুনিক বিষয়গুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই অবকাঠামোগত বা সংখ্যাগত অর্জনের আড়ালে বাস্তব রূপান্তরের সক্ষমতা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশ এই নতুন প্রেক্ষাপটের সাথে পুরোপুরি মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত ডিজিটাল বিভাজনের মুখোমুখি হচ্ছে। শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন, শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতি এবং তথ্য সাক্ষরতার অভাবে সাইবার অপরাধের বিস্তৃতি আমাদের সার্বিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই সুযোগের অসমতা সামাজিক মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে মুখস্থনির্ভরতা এবং সনাতন জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক মূল্যায়নের বৃত্তে বন্দি থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট বা ‘সাধারণ সাক্ষরতা’ পেলেও একবিংশ শতাব্দীর শ্রমবাজারের উপযোগী ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। উপরন্তু, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা বাড়লেও তথ্য সাক্ষরতার অভাবে দেশের একটি বড় অংশ সাইবার ক্রাইম এবং অনলাইন প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি হাতে পৌঁছালেও তা ফলপ্রসূভাবে ব্যবহারের মানসিক ও বৌদ্ধিক সাক্ষরতা আমাদের তৈরি হয়নি।
যদি আমরা জনমিতিক লভ্যাংশকে জনস্ফীতি বা বোঝায় পরিণত করতে না চাই, তবে ২০২৬ সালের এই ক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রথাগত সাক্ষরতার আন্দোলনকে আমূল সংস্কার করতে হবে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক নাগরিক গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, সমাজ ও নীতি-নির্ধারকদের জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, আমাদের শিক্ষাক্রমের আমূল আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রাথমিক স্তর থেকেই মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতি ভেঙে বাস্তবমুখী ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু করতে হবে এবং প্রতিটি স্তরে আইসিটি শিক্ষাকে তাত্ত্বিক বিষয় থেকে বের করে সম্পূর্ণ ব্যবহারিক করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী না হয়ে প্রযুক্তির চালক হতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক উন্নয়ন ও মেধা আকর্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
এক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষকদের জন্য যুগোপযোগী পেডাগোজি ও আধুনিক শিখন পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষকের পদকে সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করতে বেতন কাঠামো উন্নত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, যারা ইতিমধ্যেই প্রথাগত স্কুলিং থেকে ছিটকে পড়েছে বা বয়স্ক জনগোষ্ঠী, তাদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে বিশেষ ‘লাইফ-স্কিল’ ও কারিগরি শিক্ষা চালু করতে হবে। শুধু নাম দস্তখত শেখানো নয়, তাদের মোবাইল ব্যাংকিং চালানো, ই-কমার্স বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো ক্ষুদ্র আয়ের ডিজিটাল কাজ শেখাতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার সুযোগকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে।
সমাজের কোনো অংশ যদি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রান্তিক এলাকার মানুষ এবং যারা কোনো কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে—সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ ইউনেস্কোর মানদণ্ড অনুযায়ী জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশে উন্নীত করা এবং সেই বরাদ্দের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা অতীব প্রয়োজন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়ে বাঙালির হাতে অক্ষর তুলে দিয়েছিলেন; সেই বর্ণপরিচয় ছিল আমাদের প্রথম মুক্তির সোপান। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর নাগরিকের জন্য কেবল বর্ণপরিচয়ই যথেষ্ট নয়,—তার প্রয়োজন বিশ্বপরিচয়; তথ্যকে যাচাই করার, প্রযুক্তিকে বশ মানানোর এবং নিজের অধিকার আদায়ের সামর্থ্য। অক্ষরহীন সমাজ যেমন অন্ধত্বের শামিল, তেমনি কার্যকরী ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাহীন সনাতন অক্ষরজ্ঞানও এক ধরনের পঙ্গুত্ব। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার পুনর্গঠন করে প্রতিটি নাগরিককে কার্যকরী শিক্ষায় দীক্ষিত করার কোনো বিকল্প নেই। তাই ভবিষ্যতের সাক্ষরতা আন্দোলনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যারা শুধু অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নয়; বরং জ্ঞানসম্পন্ন, প্রযুক্তিসচেতন, সৃজনশীল এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হবে।
ষাট বছর পূর্ণ করা আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস তাই আমাদের সামনে কেবল একটি উদ্যাপন নয়, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬-এর এই ক্ষণে দাঁড়িয়ে এটি একটি প্রশ্নপত্রও বটে। উত্তরটি লিখতে হবে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন দিয়ে—তবেই আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের মূল চেতনা বর্ণমালার বৃত্ত পেরিয়ে আধুনিক যুগের উপযোগী প্রকৃত মুক্তির অঙ্গীকারে পূর্ণতা পাবে।
- স্মৃতি রুমানা: লেখক ও প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রশিক্ষক
.png)







