সম্পত্তি হস্তান্তর আইন/আলেমদের উদ্বেগ কেন, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আলেমরা। তাঁরা এটি শরিয়ার আলোকে পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের দাবি, আইন সংশোধনের মাধ্যমে মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সম্পত্তি দানের পরও তাঁরা জীবিত পর্যন্ত ভোগ-দখলের অধিকার পাচ্ছেন। তবে কেউ সম্পত্তি হস্তান্তরে শরিয়া মানতে চাইলে, তা তিনি পারবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়েকে দান করলে আগে সম্পত্তিতে মা-বাবার অধিকার থাকত না। এজন্য অনেকেই মেয়েকে বঞ্চিত করতেন। এখন এই সুযোগ থাকবে না। জীবদ্দশায় ভোগ-দখলের আইনি অধিকার নিশ্চিত হওয়ায় মা-বাবার সম্পত্তি দান সহজ হবে।

গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী ‘ট্রান্সফার অফ প্রোপার্টি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়। ১৮৮২ সালের আইনে কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি দান করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সম্পত্তি ভোগের অধিকার হারাবেন। যাঁকে তিনি দান করছেন, তিনি একমাত্র সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগদখলের অধিকার পেয়ে যান। সংশোধনে বলা হয়েছে, সম্পত্তি দান করলেও যতক্ষণ দানকারী জীবিত থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার পাবেন। এমনকি পরে দান পরিবর্তনের চিন্তা করলেও, তাও তিনি পারবেন।

নতুন সংশোধনে কী আছে

ট্রান্সফার অফ প্রোপার্টি (সংশোধন) বিল, ২০২৬–এ বলা হয়েছে, ১৮৮২ সালের আইনে ১২২ ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। এই ধারা ভেঙে ‘১২২এ’ ও ‘১২২বি’ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২২এ ধারায় বলা হয়েছে, ব্যক্তি যখন তাঁর স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করবেন, তখন তিনি সেই সম্পত্তি জীবদ্দশা পর্যন্ত ভোগ করার অধিকার রেখে দান করবেন। সে দান বৈধ বলে গণ্য হবে। এছাড়া যাঁকে সম্পত্তি দান করা হবে, তিনি যদি সম্পত্তি ভোগের আগেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে ১৮৮২ সালের আইন অনুযায়ী, সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে। কিন্তু এখানেও যিনি দান করেছেন, তিনি যদি জীবিত থাকেন, তবে তিনিই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। অর্থাৎ এই সময়কালেও মৃত্যুর আগ দিন পর্যন্ত যিনি দান করবেন, তিনিই সম্পত্তি ভোগের অধিকার পাবেন। আর এই আইনকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না যে, এই আইন বা বর্তমানে কার্যকর অন্য কোনো আইনের অধীনে স্বীকৃত কোনো দান, হেবা বা সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্য কোনো পদ্ধতির বৈধতাকে সীমিত, খর্ব বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত করে।

এই বিলের ধারা ১২২এ– তে দান করার পরও ভোগের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমন ধারা ১২২বি– তে দান বাতিল কিংবা পরিবর্তন করার সুযোগও রয়েছে। ১২২এ ধারায় বলা হয়েছে, যিনি দান করছেন, তাঁর যদি কোনো আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন পূরণের জন্য দান পরিবর্তন বা বাতিল করার প্রয়োজন হয়, তবে তিনি দান পরিবর্তন বা বাতিল করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু এই সুযোগ যিনি দান করছেন, তিনি চাইলেই ব্যবহার করতে পারবেন না। এখানে উভয়পক্ষের সম্মতির (যিনি দান করছেন ও যাঁকে দান করা হচ্ছে) প্রয়োজন হবে। তবে যদি একটি পক্ষ আরেকপক্ষকে অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অসুস্থ, আইনগত অক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে, তাহলে জেলা জজ দান বাতিল বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি করার অনুমতি দিতে পারবেন।

বিলে যেসব সুপারিশ ছিল

গত ২৭ আগস্ট ট্রান্সফার অফ প্রোপার্টি (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্থায়ী কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছে, তা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিলটিতে তিনটি সুপারিশ দিয়েছে স্থায়ী কমিটি।

এসব সুপারিশের কিছু শব্দ ও বন্ধনীর পরিবর্তন। যেমন বিলে থাকা ‘উইশ শেল অলসো ইনক্লুড’ এর পরিবর্তে ‘অ্যান্ড ইনক্লুড’ শব্দ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিলে শুধু ইনজয়জমেন্ট (ভোগ) ছিল, সেখানে লাইফটাইম ইনজয়মেন্ট (জীবদ্দশায় ভোগ) লিখতে বলা হয়েছে।

সংশোধনীর বিষয়ে সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, তাঁরা সুপারিশ আমলে নিয়ে বিলটি পাস করেছেন। অর্থাৎ, বিলটি যখন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ পাবে, তখন এই সংশোধনগুলো থাকবে।

বিরোধিতা কেন, কী বলছেন আলেমরা

সংসদে পাস হওয়ার আগে বিলটির ওপর আলোচনায় তীব্র বিরোধিতা করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাঁরা বিলটি কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী আখ্যা দেন। ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে বিলটির বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

বিলের বিরোধিতা করে রোববার সংসদে জামায়াতের সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আইনটি কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী– এটি শুধু আমার কথা নয়, দেশের প্রখ্যাত আলেম-ওলামায়ে কেরামেরাও বলেছেন। এই আইনের বিষয়বস্তু হলো– আজীবন ভোগ-দখলের বিধান রেখে হেবা (দান)। এটা পরিষ্কারভাবে ইসলামী আইনের বিরোধী।’

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, হেবা এবং মালিকানা হস্তান্তরের বিষয় সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ফারায়েজ আইনের অধীন। সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন কোনো পদ্ধতি বা ধারা যেন মূল ইসলামি মিরাস ও হেবার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে একে সাধারণ হস্তান্তর পদ্ধতি বলা হলেও, বাস্তব প্রয়োগে এটি যেন পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বিবৃতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইনের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এখানে পরিষ্কার করে বলে রাখা দরকার, সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি ইসলামী শরিয়াতে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এখানে নতুন করে কোনো পদ্ধতি সংযোজন করার দরকার নেই, সুযোগও নেই।

বিরোধিতাকে ‘স্ট্যান্ডবাজি’ বললেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল

আইন সংশোধন নিয়ে বিরোধিতাকে ‘স্ট্যান্ডবাজি’ বলছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিউল হক ফয়সাল। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘একেবারেই রং কনসেপ্ট (ভুল ধারণা) থেকে বিরোধিতা করা হচ্ছে। অথবা তাঁরা ইচ্ছা করে এটি করছেন। প্রথম কথা, কুরআনে কোথাও কি বলা আছে দান অবৈধ? জীবদ্দশায় আমি আমার সম্পত্তি কাউকে দিতে পারব না– কুরআনে কি আছে? কোথাও এমন বলা নেই। নতুন বিধান হচ্ছে, আপনি জীবদ্দশায় দান করে দেবেন। তারপরেও আপনি ভোগ করতে পারবেন। জীবদ্দশায় দান করে দিলেন, এখানে কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কী? উনারা একেবারে স্ট্যান্ডবাজি করছেন।’

সংশোধনে জীবদ্দশায় মা-বাবার থাকার নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশে এতদিন মা-বাবার মধ্যে ইনসিকিউরিটি ছিল– জীবদ্দশায় সন্তানকে, বিশেষ করে কন্যাকে সম্পত্তি দান করলে, সেই সম্পত্তিতে তিনি অধিকার হারাবেন। এজন্য সন্তানদের, বিশেষ করে কন্যাসন্তানকে সম্পত্তি দান করতেন না মা-বাবা। বিশেষ বিধানের ফলে মা-বাবা জীবদ্দশায় সম্পত্তি ছেলে-মেয়ে যাঁকেই দান করুক, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারাই তা ভোগ করতে পারবেন। দান করার পরও মা-বাবার সিকিউরিটি নিশ্চিত হলো।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত