এক্সপ্লেইনার/স্মার্টফোনের যুগে সাক্ষরতা: সম্ভাবনা যতটুকু, চ্যালেঞ্জ কি তার চেয়েও বেশি

একসময় পড়তে শেখার জন্য দরকার ছিল বই, খাতা, পেন্সিল আর একজন শিক্ষক। এখন সেই তালিকায় যোগ হয়েছে স্মার্টফোন। ফোনের পর্দায় অক্ষর শেখানো থেকে শুরু করে শব্দ পড়া, উচ্চারণ শোনা, ভিডিও দেখে কোনো বিষয় বোঝা কিংবা নিজের শেখার অগ্রগতি যাচাই—সবই সম্ভব। ফলে সাক্ষরতা অর্জনের সুযোগটি এখন আর শুধু স্কুলঘর বা নির্দিষ্ট সময়ের ক্লাসের মধ্যে আটকে নেই।
এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ৮ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সাক্ষরতা: মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য’।
দেশে সাক্ষরতার কী অবস্থা
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু স্কুলে যাওয়া আর ভালোভাবে পড়তে শেখা এক বিষয় নয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় সর্বজনীন ভর্তি নিশ্চিত হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে মাত্র ৬৪ শতাংশ শিশু। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্কুলে থাকা অনেক শিশুও মৌলিক পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ইউনিসেফ বলছে, কোভিড-১৯ মহামারির আগে বাংলাদেশে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৪৩ শতাংশ পড়ায় দক্ষ ছিল এবং মাধ্যমিক শেষ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ২৫ শতাংশ মৌলিক দক্ষতা অর্জন করেছিল।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ আছে। ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট ফর লাইফলং লার্নিং বাংলাদেশের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের সাক্ষরতার হার ছিল ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রাপ্তবয়স্ক তখনও মৌলিক পড়া ও লেখার দক্ষতার বাইরে ছিলেন। ১৫–২৪ বছর বয়সীদের সাক্ষরতার হার অবশ্য অনেক বেশি—৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে হার নেমে আসে ৩৯ শতাংশে।
বাংলাদেশের সাক্ষরতার সমস্যা এখন শুধু শিশুকে স্কুলে নেওয়ার সমস্যা নয়। যারা স্কুলের বাইরে, যারা পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছে এবং বয়স্ক মানুষ—তাদের কাছে কীভাবে শেখার সুযোগ পৌঁছানো যায়, সেটিও বড় প্রশ্ন।
ডিজিটাল মাধ্যমের সুবিধা
ডিজিটাল মাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর পৌঁছানোর ক্ষমতা। একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসে না বসেও একটি ভিডিও বা অডিও পাঠ বারবার দেখতে বা শুনতে পারেন। কেউ ধীরে শেখে, কেউ দ্রুত—দুজনকেই নিজের গতিতে শেখার সুযোগ দেওয়া সম্ভব।
বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একজন কৃষক দিনের কাজ শেষে রাতে নিজের সুবিধামতো একটি পাঠ দেখতে পারেন। একজন গৃহিণী ঘরের কাজের ফাঁকে শেখার সুযোগ নিতে পারেন। একজন কর্মজীবী মানুষকে আলাদা করে কোনো শিক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার সময় বের করতে নাও হতে পারে। আর ডিজিটাল শিক্ষার জন্য সবসময় কম্পিউটারও দরকার হয় না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় মোবাইল ফোনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪–২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৮ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে। একই সময়ে ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারে স্মার্টফোন ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
সুতরাং যে ঘরে আলাদা কম্পিউটার নেই, সেই ঘরেও যদি স্মার্টফোন থাকে, সেখানে শেখার একটি ডিজিটাল দরজা খুলে যায়।
ডিজিটাল ক্লাস শুধু ভিডিও দেখা নয়
সাক্ষরতা বাড়াতে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহারকে শুধু অনলাইনে বই তুলে দেওয়া হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনার বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে।
ধরা যাক, একজন নতুন শিক্ষার্থী ‘ক’ অক্ষরটি শিখছেন। বইয়ে তিনি শুধু অক্ষরটি দেখলেন। কিন্তু ডিজিটাল কনটেন্টে একই সঙ্গে অক্ষরটি দেখা, উচ্চারণ শোনা, শব্দের সঙ্গে অক্ষরের সম্পর্ক বোঝা এবং অ্যানিমেশনের মাধ্যমে সেটি চেনার সুযোগ পাওয়া যায়। এরপর ছোট একটি অনুশীলন বা প্রশ্নের মাধ্যমে শেখাটি যাচাই করা যায়।
এই পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করতে পারে স্থানীয় ভাষা, পরিচিত চরিত্র ও বাংলাদেশের বাস্তব উদাহরণ। ব্র্যাকের ই-শিক্ষা কর্মসূচিতে জাতীয় শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে তৈরি ইন্টার্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টে ছবি, চার্ট, অডিও, ভিডিও ও অ্যানিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল পাঠকে সহজবোধ্য ও অংশগ্রহণমূলক করা। এ ধরনের কনটেন্ট বিশেষ করে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা প্রচলিত বইভিত্তিক শিক্ষায় সহজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
বাংলাদেশে উদ্যোগ
বাংলাদেশে ডিজিটাল মাধ্যমে শেখার সবচেয়ে পরিচিত সরকারি উদ্যোগগুলোর একটি মুক্তপাঠ। এটুআইয়ের তত্ত্বাবধানে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মে বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ধরনের কোর্স রয়েছে। শিক্ষা, চাকরি, কৃষি, বিদেশে কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সেখানে দেওয়া হয়। কোর্সগুলো বিনামূল্যে এবং শেষ করলে সনদ পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এর গুরুত্ব শুধু দক্ষতা উন্নয়নে নয়। মানুষ যখন অনলাইনে একটি কোর্সে ভর্তি হন, নির্দেশনা পড়েন, ভিডিও দেখেন, প্রশ্নের উত্তর দেন বা নিজের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করেন—তখন তিনি একই সঙ্গে পড়া, বোঝা, লেখা এবং ডিজিটাল ব্যবহারের দক্ষতাও অনুশীলন করেন।
দেশের ডিজিটাল সেন্টারগুলোও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে নাগরিকেরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা নেওয়ার পাশাপাশি মুক্তপাঠের কোর্সও করতে পারেন। স্থানীয় ডিজিটাল সেন্টারের মতো জায়গা ব্যবহার করে প্রযুক্তির সুবিধা এমন মানুষদের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব, যাদের নিজের স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সীমিত।
তবে প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাটিই আবার সবচেয়ে বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪–২৫ সালের জরিপে দেখা গেছে, শহর ও গ্রামের ইন্টারনেট ব্যবহারের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামাঞ্চলে তা ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ৩২ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট।
নারী-পুরুষের ব্যবধানও রয়েছে। ২০২৪–২৫ সালের জরিপের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুরুষদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ, নারীদের ক্ষেত্রে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। মোবাইল ফোনের মালিকানাতেও পুরুষদের সঙ্গে নারীদের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
তাই শুধু ‘সবার হাতে স্মার্টফোন’ বললেই ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ সবার হাতে পৌঁছে গেছে—এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না। এছাড়াও অনলাইনে পাওয়া তথ্য সত্য না মিথ্যা, সেটি যাচাই করার দক্ষতাও সবার সমান নয়।
জরুরি ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ও
আজকের দিনে সাক্ষরতা মানে শুধু কাগজের লেখা পড়তে পারা নয়। মোবাইলের পর্দায় একটি বার্তা পড়া, অনলাইনে কোনো ফরম পূরণ করা, তথ্য খুঁজে বের করা, ভুল তথ্য শনাক্ত করা কিংবা প্রতারণামূলক বার্তা থেকে নিজেকে রক্ষা করাও ক্রমে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল লিটারেসি সেন্টারও ডিজিটাল সাক্ষরতাকে শুধু যন্ত্র ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না। তথ্য অনুসন্ধান ও ব্যবহার, অনলাইন নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ, অনলাইন লেনদেন এবং তথ্য যাচাইয়ের মতো বিষয়ও এর আওতায় রাখা হয়েছে। তাই সাক্ষরতার পরবর্তী ধাপটি হতে পারে তথ্যকে বুঝে ব্যবহার করার ক্ষমতা।
কোভিড-১৯-এর সময় বাংলাদেশে স্কুল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় ডিজিটাল ও দূরশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা যায়, স্কুল বন্ধ থাকার সময়ে মাত্র ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু দূরশিক্ষায় অংশ নিয়েছিল। গ্রামাঞ্চলে অংশগ্রহণ ছিল ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে শহরে তা ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
এই সংখ্যাগুলো একদিকে দেখায় ডিজিটাল মাধ্যমের গুরুত্বের পাশাপাশি সেটি ব্যবহারের সামর্থ্যও তৈরি করতে হবে।
দরকার সবার জন্য সহজ কনটেন্ট
সাক্ষরতা বাড়াতে ডিজিটাল মাধ্যমকে কার্যকর করতে হলে প্রথম কাজ হবে সবার জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য বাংলা কনটেন্ট তৈরি করা। শুধু শহরের স্কুলের শিক্ষার্থীর কথা মাথায় রেখে কনটেন্ট তৈরি না করে প্রাপ্তবয়স্ক, ঝরে পড়া শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ এবং প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন আলাদা করে বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কম ডেটায় চলে এমন কনটেন্ট তৈরি করতে হবে। ভিডিওর পাশাপাশি অডিও, ছবি, ছোট লেখা ও অফলাইন ব্যবহারের সুযোগ থাকলে ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব।
তৃতীয়ত, শিক্ষক ও স্থানীয় শিক্ষা-কর্মীদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে হবে। ইউনেস্কো ও ইউনিসেফও ডিজিটাল শিক্ষাকে কার্যকর করতে শিক্ষক, পরিবার ও শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে মনে রাখা জরুরি, প্রযুক্তি নিজে কাউকে সাক্ষর করে না। সঠিক কনটেন্ট, দক্ষ শিক্ষক, সহজপ্রাপ্য ইন্টারনেট, উপযুক্ত যন্ত্র এবং শেখার সুযোগ—এই পাঁচটি একসঙ্গে থাকলেই ডিজিটাল মাধ্যম সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সাক্ষরতা আন্দোলনের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
তথ্যসূত্র: ইউনেসকো—আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬, ইউনেসকো—বাংলাদেশের সাক্ষরতার তথ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ইউনিসেফ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল লিটারেসি সেন্টার, মুক্তপাঠ ও বিশ্বব্যাংক
.png)








-f85749.jpeg)