
গত শতকের ৮০-এর দশকে যোগাযোগ তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যকলুহান স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিস্তারের প্রেক্ষাপটে মানব সমাজকে চিহ্নিত করেছিলেন বিশ্বগ্রাম হিসেবে। সেই সূত্র ধরে ২০২৬ সালের সময়কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ বললে খুব একটা ভুল হবে না। কারণ ইন্টারনেটের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে বিশ্ব এখন রীতিমতো মানুষের হাতের মুঠোয়।
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫৮০ কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি ৩ জন মানুষের মধ্যে ২ জন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। যার অর্থ হলো সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারকারীরা এখন বিশ্বে সুপারমেজরিটি। খুব সম্ভবত দ্রুত যোগাযোগ, বার্তা (ছবি-ভিডিও-অডিও) বিনিময় এবং যে কারও সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ও থাকার সুবিধার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পৃথিবীতে এতো দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। ফেসবুক, ইনসটাগ্রাম, টুইটার, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ ও ভিডিও বিনিময়ের এই মাধ্যমগুলো এখন গোটা বিশ্বের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একান্ত অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
এই মাধ্যমগুলো মানুষের জীবনকে সহজ করেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এর সঙ্গে বয়ে এসেছে অনিবার্য কিছু বিপদও। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘ডক্সিং’ বা ক্ষতির উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেওয়া।
ডক্সিং শব্দটির উৎপত্তি গত শতকের নব্বয়ের দশকে। এরসঙ্গে সেই সময়ের হ্যাকিং অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে। এর শব্দগত অর্থ হল ড্রপিং ডকস্ বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে অনুমতি ছাড়া কারও নাম, ঠিকানা, ছবি, ই-মেইল, মোবাইল নম্বরসহ অন্যান্য গোপনীয় তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। এরমধ্যে থাকতে পারে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি ও ব্যাংকিং বৃত্তান্ত। যা পরে ঔই ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতি ও সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। করতে পারে মানসিক নিপীড়ন।
শুরুতে এটি শুধু হ্যাকিং এর সংশ্লিষ্ট হলেও বর্তমানে অনলাইন ডক্সিংকে সাইবার পরিসরের অত্যন্ত ঘৃণ্য ও মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যেসব দেশ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, সাক্ষরতা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাক্ষরতা কম সেসব দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিসর বিশেষ করে ফেসবুকে তৈরি হচ্ছে এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতির। যাতে বিপন্ন ও বিপদগ্রস্ত হচ্ছে বহু মানুষের জীবন।
অনলাইনে ডক্সিং বা ব্যক্তিগত তথ্য (অনুমোদনহীন ঠিকানা, ছবি, ফোন নম্বর, ছবি, ভিডিও, অডিও) কীভাবে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ঘটনাটি ২০০৫ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার। সিউলের সাবওয়েতে একজন তরুণীর আদরের কুকুর ট্রেনের ভেতরে প্রাকৃতিক কাজ করে ফেলে। এ সময় ট্রেনের যাত্রীরা ঔই তরুণীকে তাঁর কুকুরের বর্জ্য পরিষ্কার করতে অনুরোধ করেন। যদিও তরুণীটি সেটা করেননি। এ সময় ঔই ট্রেনের একজন যাত্রী এই ঘটনাপ্রবাহের ছবি তোলেন। এরপর এই ছবি জনপ্রিয় একটি কোরিয়ান ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ছবিটি তখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অর্থাৎ ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর অন্যান্য ব্যবহারকারী অনলাইন পরিসরে মেয়েটির নাম, পরিচয় ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেয়। ফলে পরের দিনগুলোতে মেয়েটি জনপরিসরে ক্রমাগত অপমান (বুলিং) এর শিকার হতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এতোটাই অবনতি ঘটে যে মেয়েটি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
২০২৬ সালে এসে এই অপরাধ বিশ্বের নানা প্রান্তে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বহু মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে, সংকুচিত হয়েছে স্বাধীনতা। যে কারণে বিশ্বের তাত্ত্বিকেরা এই প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন প্রযুক্তিভিত্তিক সহিংসতা বা টিএফভি নামে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে সামাজিক যোগাযোগের প্রভাব ও ব্যবহার প্রথম বড় পরিসরে দৃশ্যমান হয়েছিল ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে এটি ভিন্ন মাত্রা পায়। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই প্রভাব নানাভাবে বাংলাদেশে প্রতীয়মান হচ্ছে। যার বৃহৎ অংশ অপরাধমূলক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামী চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের একটি পরিচিত মুখ। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নানা ঘটনাপ্রবাহেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। অতি সম্প্রতি এই শিক্ষকের মোবাইল নম্বর, ই-মেইল আইডি ও বাড়ির ঠিকানা ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে। ফটোকার্ড আকারে তাঁর এই ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন পক্ষ শত্রুতামূলকভাবে ছড়িয়েছে গণহারে। ফলে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে তাঁকে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। বাজে কথা, নোংরা প্রস্তাবের পাশাপাশি দেওয়া হয় হুমকিও। শুধু তাই নয় এক পর্যায়ে নিজের বাসভবনে অবস্থান করাকেও অনিরাপদ হয়ে ওঠে এই শিক্ষকের কাছে।
একই ঘটনা ঘটেছে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ আরও কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক শত্রুতা বিবেচনায় এই ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিসরে বাড়ছেই। অনেকক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে একান্ত ব্যক্তিগত বা বিশেষ মুহূর্তের ছবি। যা আবার অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন একেবারেই ঠাট্টার ছলে।
ডক্সিং এর মাধ্যমে কাউকে অপদস্থ করা, শায়েস্তা করা বা শাস্তি দেওয়ার এই নেতিবাচক চর্চাকে যোগাযোগ তাত্ত্বিকরা ‘ডিজিল্যানটিমজ’ নামের নতুন একটি শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে থাকেন। যার অর্থ হলো কাউকে শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল পরিসরে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা দণ্ড দেওয়া। আর যার মাধ্যম হলো ডক্সিং বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস। আরও সহজ করে বললে এই চর্চাকে উল্লেখ করা যায় সংঘবদ্ধ অনলাইন অবামাননার সঙ্গে।
প্রকৃতপক্ষে ডক্সিং এর মাধ্যমে এই অবামাননা, মানহানি বা বিচার আর শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাস্তবিক জীবনে এর প্রতিফলন ও প্রভাব রয়েছে। যাকে কেন্দ্র করে ঘটতে পারে সংবদ্ধ জনতার আক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশে উন্মত্ত জনতার হাতে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ধ্বংস হয়েছে স্থাপনা ও আগুনে পুড়েছে বহু উপাসনালয় ও আস্তানা। এই নাজুক পরিস্থিতির সঙ্গে যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় ডক্সিং বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় তাহলে বাংলাদেশে আরও বহু মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
অনলাইন পরিসরে গুরুতর অপরাধমূলক এই চর্চা ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শিক্ষা হতে পারে অন্যতম সহায়।
- রাহাত মিনহাজ: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
.png)






