এক্সপ্লেইনার/বদলে গেছে সাক্ষরতার সংজ্ঞা, আপনি কি সাক্ষর

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

‘সাক্ষর’ মানে কি শুধু নিজের নাম লিখতে পারা? একটি চিঠি পড়ে বুঝতে পারা? নাকি ব্যাংকের ফরম পূরণ, ওষুধের গায়ে লেখা নির্দেশনা পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া? বাজারের হিসাব কষতে পারাও কি সাক্ষরতার অংশ? কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে ‘সাক্ষরতা’র সংজ্ঞাও। একসময় পড়তে ও লিখতে পারাই ছিল সাক্ষর হওয়ার প্রধান শর্ত। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে আদমশুমারিতে সাক্ষরতার সংজ্ঞা বদলেছে। কখনো পড়তে ও লিখতে পারা, কখনো চিঠি লেখার সক্ষমতাকে ধরা হয়েছে সাক্ষরতার মাপকাঠি হিসেবে।

কিন্তু আজকের বিশ্বে সাক্ষরতা শুধু অক্ষর চেনা বা লেখাপড়ার দক্ষতায় আটকে নেই। আন্তর্জাতিকভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেখা ও পড়া বুঝে ব্যবহার করা, তথ্য শনাক্ত ও মূল্যায়ন করা, যোগাযোগ এবং সংখ্যাগত দক্ষতা। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে ডিজিটাল ও তথ্য সাক্ষরতাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

শুধু নাম সই করতে পারলেই কি সাক্ষর

নিজের নাম লিখতে বা সাক্ষর করতে পারা আধুনিক অর্থে সাক্ষরতার পূর্ণ সংজ্ঞা নয়। বাংলাদেশে অতীতে সাক্ষরতার মাপকাঠি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পুরোনো জনশুমারি-ভিত্তিক সংজ্ঞায় একটি সহজ চিঠি পড়তে ও লিখতে পারার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষণাতেও দেখা যায়, বিবিএসের ‘রিপোর্টেড লিটারেসি’ পদ্ধতিতে পরিবারের সদস্য সাক্ষর কি না, তা মূলত উত্তরদাতার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হতো। অর্থাৎ শুধু নিজের নাম লিখতে পারা আর কোনো লেখা পড়ে বুঝতে পারা এক বিষয় নয়। এ কারণেই সাক্ষরতার হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কারণ মানুষ নিজেকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বললেও বাস্তবে পড়া, লেখা ও বোঝার দক্ষতা পরীক্ষা করলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

সরকারের সংজ্ঞায় সাক্ষরতা কী

বাংলাদেশের সরকারি নীতিগত সংজ্ঞা বর্তমানে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ধারণার সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারি মতে, সাক্ষরতা বলতে শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, পড়তে পারা, অনুধাবন করা, মৌখিক ও লিখিতভাবে বিষয় ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন এবং গণনা করতে পারার সক্ষমতাকেও বোঝানো হয়।

২০১১ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় সাক্ষরতা মূল্যায়ন কাঠামোতে সাক্ষরতাকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। সেখানে ‘প্রাথমিক স্তরের সাক্ষরতাকে মূল্যায়ন করা হয় সহজ বাক্য পড়া ও লেখা, যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের মতো চারটি মৌলিক গাণিতিক নিয়মকে বোঝা ও তা প্রয়োগ করে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় কাজে এসব জ্ঞানকে ব্যবহার করতে পারা। যেমন, কোনো ছোট লেখা পড়ে তার অর্থ বোঝা, বাজারের হিসাব করা, টাকার পরিমাণ মিলিয়ে দেখা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে রাখা।

‘উচ্চতর স্তরের সাক্ষরতাকে মূল্যায়ন করা হয়, বিভিন্ন ধরনের লেখা সাবলীলভাবে পড়াতে পারা, গাণিতিক যুক্তি বোঝা এবং বাস্তব জীবনে এসব দক্ষতার স্বাধীন প্রয়োগ করতে পারা। অর্থাৎ সাক্ষরতা মানে শুধু অক্ষর চেনা নয়, সেই অক্ষর দিয়ে তৈরি তথ্যকে কাজে লাগাতে পারাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইউনেস্কোর চোখে সাক্ষরতা

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ইউনেস্কোর সংজ্ঞায়। ইউনেস্কোর মতে, সাক্ষরতা হলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মুদ্রিত ও লিখিত উপকরণ শনাক্ত, বোঝা, ব্যাখ্যা করা, তৈরি করা, যোগাযোগ এবং গণনা করার সক্ষমতা। এটি কোনো একবার অর্জন করে শেষ হয়ে যায় এমন বিষয় নয়, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষতার ধারাবাহিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। তবে বড় পরিবর্তনটি হলো আগে সাক্ষরতা বলতে ধরা হতো, ‘পড়তে ও লিখতে পারে কি না?’ কিন্তু এখন সাক্ষরতার মান ধরা হয়, ‘যা পড়ছে, তা বুঝে ব্যবহার করতে পারছে কি না?’

ইউনেস্কোর মতে, শুধু সহজ বাক্য পড়তে ও লিখতে পারলেই একজন মানুষকে পুরোপুরি সাক্ষর বলা যায় না। কারণ আধুনিক সমাজে সাক্ষরতা বলতে শুধু পড়া ও লেখার দক্ষতাকে বোঝায় না। এর সঙ্গে তথ্য খুঁজে বের করা, তথ্যের অর্থ বুঝতে পারা, সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং অন্যের সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করার সক্ষমতাও থাকতে হবে। তাই বর্তমান সময়ে সাক্ষরতা হলো এমন একটি দক্ষতা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কাজ ও সমাজে প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝে তা কাজে লাগাতে পারে।

অন্যান্য দেশের মানদণ্ড কী

প্রতিবেশি দেশ ভারতের জনগণনায় একজন ব্যক্তিকে সাক্ষর হিসেবে গণ্য করা হয়, যদি তিনি কোনো একটি ভাষায় বুঝে পড়তে এবং লিখতে পারেন। একইভাবে, শুধু নিজের নাম লিখতে বা সই করতে পারলেই কাউকে সাক্ষর হিসেবে ধরা হয় না। এ ক্ষেত্রে সাক্ষর হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা, যেমন স্কুলের নির্দিষ্ট শ্রেণি পাস করা বা কোনো সনদ অর্জন করা, বাধ্যতামূলক নয়।

এই সংজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘পড়া, লেখা এবং বোঝার সক্ষমতা’—তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের পুরোনো জনশুমারি-ভিত্তিক সাক্ষরতার সংজ্ঞার সঙ্গেও এর একটি উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে, কারণ সেখানেও শুধু পড়তে বা লিখতে পারার পরিবর্তে পড়া ও লেখার বিষয়টি বুঝতে পারার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতাকে শুধু ‘সাক্ষর’ ও ‘নিরক্ষর’ এই দুই ভাগে দেখা হয় না। দেশটির বিভিন্ন শিক্ষা কাঠামো যেমন- ন্যাশনাল সেন্টার ফর এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস (এনসিইএস), অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) এবং প্রোগ্রাম ফর দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যাডাল্ট কম্পিটেন্সিজ (পিআইএএসি) কাঠামো অনুযায়ী, সাক্ষরতা বলতে শুধু পড়তে বা লিখতে পারাকেই বোঝায় না, সমাজ ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ, নিজ লক্ষ্য অর্জন এবং জ্ঞান ও সক্ষমতা বিকাশও এর অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষতার মাপকাঠিতে তাই একজন মানুষ একটি ছোট বাক্য পড়তে পারছে কি না সেটিই মূল বিষয় নয়, বরং তিনি একটি ফরম, ওয়েবসাইট, নির্দেশনা, তালিকা কিংবা একাধিক তথ্যসূত্র থেকে তথ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সাক্ষরতার হার কোন মানদণ্ডে মাপে ইউনেস্কো

ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকস (ইউআইএস) লিটারেসি ইন্ডিকেটরস মেটাডেটা ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমার মানুষের মধ্যে কত শতাংশ পড়তে ও লিখতে পারেন, সেটিই সাক্ষরতার হার। সাধারণত ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সীদের সাক্ষরতাকে বলা হয় প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার। আর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে বলা হয় যুব সাক্ষরতার হার। একটি নির্দিষ্ট বয়সগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যার কত অংশ পড়তে ও লিখতে পারেন সাক্ষরতার হার মূলত সেই চিত্রই তুলে ধরে।

কিন্তু এই হার বের করার পদ্ধতি সব দেশে এক নয়। কোথাও জনগণনার সময় মানুষকে জিজ্ঞেস করে তথ্য নেওয়া হয়, কোথাও সরাসরি দক্ষতার পরীক্ষা নেওয়া হয়। বাংলাদেশে এ নিয়ে বিতর্কের বড় জায়গাটি হলো সাক্ষরতা কীভাবে মাপা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজে বা পরিবারের সদস্য যে তথ্য দেন, তার ভিত্তিতে সাক্ষরতার হার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কেউ নিজেকে সাক্ষর দাবি করলেই যে তিনি বাস্তবে পড়তে ও লিখতে পারেন, তা সবসময় নাও হতে পারে।

বাস্তবে লেখা ও পড়ার দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে নিজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাক্ষরতার হারে তাই পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন গবেষণাতেও এই দুই পদ্ধতিতে পাওয়া ফলাফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানের প্রমাণ পাওয়া গেছে ।

ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার অর্থও বদলাচ্ছে

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের যুগে একজন মানুষ কাগজের বই পড়তে পারেন কিন্তু অনলাইনে পাওয়া তথ্য সত্য না মিথ্যা তা যাচাই করতে না পারলে তার সাক্ষরতার সক্ষমতা কতটা কার্যকর? এই প্রশ্নই এখন নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। ইউনেস্কো বলছে, ডিজিটাল ও তথ্যসমৃদ্ধ সমাজে সাক্ষরতার ধারণা এখন পড়া, লেখা ও গণনার প্রচলিত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর বাইরে তথ্য শনাক্ত করা, বোঝা, ব্যাখ্যা, তৈরি করা ও যোগাযোগের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সাক্ষরতার লড়াই এখন শুধু অক্ষর চেনানোর লড়াই নয়, তথ্য বোঝার এবং তা দিয়ে নিজের জীবন পরিচালনার সক্ষমতাও।

বাংলাদেশে ‘সাক্ষর’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি শব্দে দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারি ব্যবস্থায় এর ধারণা এখন পড়া ও লেখার পাশাপাশি অনুধাবন, যোগাযোগ ও গণনার মতো দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিকভাবেও সাক্ষরতার ধারণা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। তাই কোনো দেশের সাক্ষরতার হার ৮০, ৯০ বা ১০০ শতাংশ এই সংখ্যা দেখেই শিক্ষার মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। জানতে হবে, সেই হার কোন সংজ্ঞায়, কোন বয়সগোষ্ঠীতে এবং কোন পদ্ধতিতে মাপা হয়েছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত