মতামত/আগে উন্নয়ন পরে শিক্ষা, এই ‘ভ্রান্ত নীতি’ শেষ হবে কবে

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস। এই দিবসের শুরু ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কোর ১৪তম সাধারণ অধিবেশনে যেখানে দিবসটি বিশ্বব্যাপী উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৬৭ সাল থেকে দিবসি উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর এই দিবসে ইউনেস্কো বিশ্বে সাক্ষরতা সম্পর্কে সার্বিক অবস্থার কথা জানায়।

এ কথা শত ভাগ সত্য যে পরিবর্তনের জন্য সাক্ষরতা ও শিক্ষার চেয়ে প্রবল শক্তিধর আর কিছু নেই। অথচ এখানেই আমাদের বোধের চরম ঘাটতি। বাংলাদেশে অতীতের ঔপনিবেশিক পরাধীন আমল থেকে এ পর্যন্ত শিক্ষার এ প্রবল শক্তিকে কখনই অনুধাবন করা হয়নি। তাই কাজেও লাগানো হয়নি। অথচ বিভিন্ন দেশ তা কাজে লাগিয়ে আজ বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে। আমাদের আশেপাশেই এমন দেশ রয়েছে কয়েকটি। অবশ্য জাপানের কথা আসে সবার আগে।

শিক্ষার এই শক্তি নিয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন অনেক লিখেছেন। তাঁর ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘সামাজিক সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে, বিশেষ করে মৌলিক শিক্ষায়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটাতে প্রধান উদাহরণ অবশ্যই জাপান। এটা অনেক সময় ভুলে যাওয়া হয় যে, ইউরোপে যেখানে কয়েক দশক ধরে শিল্পায়ন চলছিল সেসময় তারচেয়ে বেশি সাক্ষরতার হার ছিল জাপানে, যেখানে তখনো শিল্পায়ন ঘটেনি। জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিষ্কারভাবেই শক্তি লাভ করেছে মানবসম্পদ উন্নয়ন থেকে যা নতুন সৃষ্ট সামাজিক সুযোগ বৃদ্ধির ফল। পূর্ব এশীয় বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে যে পূর্ব এশীয় মিরাকলের কথা বলা হয় তা বৃহদংশে অনুরূপ ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত।’

অমর্ত্য সেন এখানে এই ভ্রান্ত ধারণাকে পুরোপুরি খণ্ডন করেন যে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকারের সম্প্রসারণ যা মানবোন্নয়ন নামে পরিচিত তা কেবল ধনী দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য বিলাসিতা, পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর জন্য অপরিহার্য নয়। তাদের আগে উন্নতি প্রয়োজন, পরে শিক্ষাসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণের বিলাসিতা সাজে। এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণার বিপরীতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এই বাঙালি অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে, পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর জন্য এইসব সামাজিক সুযোগসমূহ আগেভাগেই বৃদ্ধি করা আরও বেশি প্রয়োজন।

চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশেই শিক্ষার এই জীবন ও সমাজ পরিবর্তনকারী ভূমিকা স্পষ্ট। কিন্তু আমাদের দেশে চলছে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার ভ্রান্ত নীতি। অর্থাৎ আমরা ধরে নিয়েছি আগে উন্নতিটা হোক, পরে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটু একটু করে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে থাকব।

পূর্ব এশীয় ওইসব সফল দেশ সম্পর্কে দার্শনিকতুল্য অমর্ত্য লিখেছেন, ‘ওই সব দেশ তুলনামূলকভাবে আগেই শিক্ষার ও পরবর্তীতে স্বাস্থ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেশিরভাগক্ষেত্রে তারা তা করেছে দারিদ্র্যের শৃঙ্খল ভাঙার আগেই। আর তারা যেমন বীজ বুনেছে তেমনই ফসল তুলেছে। আসলে, হিরোমিৎসু ইশি যেমন দেখিয়েছেন, জাপানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে মানবসম্পদ উন্নয়ন বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে মেইজি আমলের (১৮৬৮–১৯১১) শুরুতে। এটা কোনোভাবেই জাপানের ধনী ও সমৃ্দ্ধ হয়ে ওঠার পিছে পিছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।’

অমর্ত্য সেনের মতে শিক্ষার মতো মানবোন্নয়নমূলক বিষয়সমূহ প্রথম ও প্রধানত গরিবের বন্ধু, ধনী ও বড়লোকদের জন্য অতটা নয়। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদির সম্প্রসারণ জীবনের মানোন্নয়নে ও সমৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। যথেষ্ট প্রমাণ আছে যে, স্বল্প আয়ের একটি দেশও যদি স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার সবার জন্য নিশ্চিত করে তবে তা পুরো জনগোষ্ঠির জীবনকাল ও জীবনযাপনের মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করতে পারে।’

চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশেই শিক্ষার এই জীবন ও সমাজ পরিবর্তনকারী ভূমিকা স্পষ্ট। কিন্তু আমাদের দেশে চলছে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার ভ্রান্ত নীতি। অর্থাৎ আমরা ধরে নিয়েছি আগে উন্নতিটা হোক, পরে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটু একটু করে শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে থাকব। আপাতত যাদের টাকা পয়সা আছে, যারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নামের পণ্যসমূহ কিনতে পারবে, এসব তাদের ঘরেই যাক। অন্যদেরও যখন টাকাপয়সা হবে, তখন তারাও এসব ক্রয়ের বিলাসিতা করতে পারবে। অন্যদিকে অমর্ত্য সেনের মতে— না, যারা গরিব ও যাদের টাকাপয়সা নেই তাদেরই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকারসমূহ সবার আগে প্রয়োজন। উন্নতিটা কেবল পরে হলেই চলবে যে তা নয়, উন্নতি ওই সব মানবোন্নয়নের পিছে পিছে এমনিতেই আসবে, আসতে বাধ্য।

সেইসঙ্গে এও বোঝা প্রয়োজন যে, সাক্ষরতার ধারণাটি আগের মতো সংকীর্ণতায় আবদ্ধ রাখার মতো ভুল আর কিছুতে নেই। আমাদের দেশে এখনো কেবল নাম লিখতে পারা অর্থাৎ দস্তখত করতে পারাকেই সাক্ষরতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখনো এর গুরুত্ব নেই বলা যাবে না, কিন্তু আধুনিক বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতামূলক সময়ে এরকম দক্ষতা জোনাকির আলোর মত নগণ্য। সন্দেহ নেই ঘোর অন্ধকারে জোনাকির আলোই অশেষ মূল্যবান, কিন্তু এখন যে মোমবাতির বা চেরাগের যুগও আর নেই। এখন তো বৈদ্যুতিক বাতির বা এলইডি বাতির যুগ। এর মধ্যে জোনাকি আলোর ঠাঁই কই?

ইউনেস্কো বলছে, ‘সাক্ষরতা সবার জন্য প্রযোজ্য মৌলিক মানবাধিকার। এটা অন্যান্য মানবাধিকার উপভোগের, বৃহত্তর স্বাধীনতা লাভের ও বৈশ্বিক নাগরিকত্ব অর্জনের দরজা খুলে দেয়। সাক্ষরতা হচ্ছে জনগণের জন্য বৃহত্তর জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, মানসিকতা ও সদর্থক আচরণ অর্জনের ভিত্তি যা সমতা ও বৈষম্যহীনতাকেন্দ্রিক দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সংস্কৃতি, আইনের শাসন, ঐক্য, ন্যায়বিচার, বৈচিত্র্যময়তা ও সহনশীলতাকে লালন করে এবং নিজের, অন্যের ও এই গ্রহের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরিতে সহায়তা করে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও এমনকি ২০২৪ সালে বিশ্বে ৭৩ কোটি ৯০ লাখ তরুণ ও যুবক সাক্ষরতার মতো মৌলিক দক্ষতা থেকে বঞ্চিত ছিল। একই সময়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৪ জন শিশুই ন্যূনতম পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। আবার ২০২৩ সালে ২৭ কোটি ২০ লাখ শিশু ও কিশোর ছিল স্কুল-বহির্ভূত।’

পাঠদক্ষতার দিক থেকে বৈশ্বিক এই চিত্রের তুলনায় বাংলাদেশের শিশুদের অবস্থা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দেখা যাচ্ছে ইউনেস্কোর ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যেও সাক্ষরতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হয়েছে। যা শুধু পড়তে ও লিখতে পারায় সীমাবদ্ধ নয়। যদিও এটুকুও আমরা ভালোমতো অর্জন করতে পারিনি।

সাক্ষরতা দ্বারা তাই এখন শুধু সাক্ষরতার চেয়ে বৃহত্তর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কথা ভাবতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা বলতেও এখন আর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বোঝালে চলবে না, অন্তত অষ্টম শ্রেণি বা তারচেয়ে বেশি বুঝতে হবে। আমরা যাকে শিক্ষার হার বলে তৃপ্তি বোধ করছি তাকে কেবল পরিমাণের পাল্লায় না মেপে মানের মাপকাঠিতেও মাপার অভ্যাস করতে হবে। সাক্ষরতা, প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষিতের হার ইত্যাদি বিষয়গুলোতে সংজ্ঞার চৌহদ্দি এখন অনেক দূর সম্প্রসারিত করতে হবে। তবেই কেবল বিশ্বের দরবারে অন্যদের সঙ্গে সমমর্যাদায় বসা যাবে।

জীবন ও সমাজ পরিবর্তনে সাক্ষরতা ও শিক্ষার শক্তি পুরোপুরি অনুধাবন করলেই কেবল আমরা একটি প্রকৃত কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারব। তা না হলে ফি বছর সাক্ষরতা দিবস আসবে আর যাবে; উদযাপন হবে; বক্তৃতা, আলোচনা ও টকশো হবে; কিন্তু চেরাগের আলোকেই আমরা সেরা ভেবে উল্লসিত হবো, ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক বাতির আলোর দেখা মিলবে না। বিলাসসামগ্রী, যুদ্ধাস্ত্র, বড়লোকের ভোগ্যপণ্যসমূহের ক্রয় দু-চার দিন, মাস বা বছরও ঠেকিয়ে রাখলে জাতির কোনো অমঙ্গল হবে না। কিন্তু গরিবের সাক্ষরতার ও মানসম্মত শিক্ষার মৌলিক অধিকার এক মুহূর্তের জন্য স্থগিত করলে এ দেশ ও জাতি পিছিয়ে যাবে কয়েক দশক।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত