জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদে আলোচনা ইতিবাচক

জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকট নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা নিছক রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এটি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিল্পে গ্যাস সংকট। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ঘাটতি। পণ্য সরবরাহও চাপে। ফলে সংকটটি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত।
সংসদে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সংকট সমাধানের লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে। স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। পাঁচটি কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫৫০ মেগাওয়াট যুক্ত করার পরিকল্পনাও এসেছে। প্রশ্ন হলো, এগুলো সংকট সামাল দেবে, নাকি সংকটের মূল কারণ আরও কিছুদিন আড়াল করবে?
বড় ঝুঁকি হলো জরুরি সমাধানের নামে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়ানো। গ্যাস সরবরাহ কমলে ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। কিন্তু তার দাম আছে। বৈদেশিক মুদ্রায় মূল্য দিতে হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়ে। কার্বন নিঃসরণও বাড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ এখন নিজেই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিতে। সাম্প্রতিক সংকটে জাহাজের জ্বালানি ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
সংসদের আলোচনায় অতীতের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ এসেছে। বিরোধী পক্ষ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিশেষজ্ঞ দল, যৌথ টাস্কফোর্স ও কার্যকর জরুরি সেল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর গুরুত্ব আছে। কারণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা একক মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। পেট্রোবাংলা, বিপিডিবি, পাওয়ার গ্রিড, বিপিসি ও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে চালালে সমাধান মিলবে না। সমন্বিত জ্বালানি কমান্ড কাঠামো প্রয়োজন।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা’কে রাজনৈতিক মেয়াদের বাইরে নেওয়া। পাঁচ বা দশ বছরের পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। ২০৪০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি চাহিদা, দেশীয় গ্যাস, এলএনজি, কয়লা, তেল, সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের সম্ভাবনা—সবকিছুর সমন্বিত হিসাব প্রকাশ করতে হবে। চাহিদার পূর্বাভাস আসতে হবে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। অনুমান ভুল হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণও ভুল বিনিয়োগে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, কৌশলগত জ্বালানি মজুদকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সংসদের বিশেষ কমিটিও অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুদের সুপারিশ করেছে। তৃতীয়ত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার যত গুরুত্বপূর্ণ; বিদ্যমান ক্ষেত্রের ওয়ার্কওভারও ততটাই গুরুত্ববহ। বাপেক্সকে পেশাদার প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা দরকার। একই সঙ্গে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছ চুক্তি হতে হবে। চতুর্থত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সংকটের বিকল্প নয়, মূল জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। এর বাস্তবায়নে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানার সৌর ব্যবস্থা, নেট মিটারিং, বড় সৌর প্রকল্প—সবগুলোকে একই নীতির আওতায় আনতে হবে। পঞ্চমত, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর আগে এর অপচয় কমানো দরকার। শিল্পে দক্ষ মোটর ও বয়লার, ভবনে শক্তি-সাশ্রয়ী নকশা, দক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ মূল্য ও স্মার্ট মিটারিং চালু করা যেতে পারে।
সংসদে হওয়া আলোচনাটি ইতিবাচক ঘটনা। দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় ঐকমত্যের বিষয়ে পরিণত করার সুযোগ। ২০২৭ সালে কিছুটা স্বস্তি, ২০২৮ সালে আরও স্বস্তি, ২০৩০ সালে সংকটমুক্তির লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য পথনকশা। কে কী করবে, কত বিনিয়োগ লাগবে, কোন সময়সীমায় কী ফল আসবে—সবকিছুর হিসাব চাই। গ্যাস-বিদ্যুৎ এখন আর কেবল উন্নয়নের উপকরণ নয়। এটি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের ভিত্তি। বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিকে তাই ‘সংকট ব্যবস্থাপনা’ থেকে ‘নিরাপত্তা স্থাপত্যে’ রূপান্তর করা প্রয়োজন।
.png)


