
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম চত্বরে ইসলামি বইমেলা উদ্বোধনের আগেই দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত মাসব্যাপী এই মেলা উদ্বোধনের কথা আগামীকাল শুক্রবার। তবে মেলায় লিটলম্যাগ কর্নারের জন্য স্টল বরাদ্দ না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লেখকদের একাংশ। এজন্য আয়োজক সংশ্লিষ্ট ‘ধর্মীয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠী’কে দায়ী করছেন তারা।
বিষয়টি নিয়ে কওমি ধারার ছোটকাগজের লেখক-সম্পাদকদের সংগঠন ‘লিটলম্যাগ আন্দোলন’ সোচ্চার হয়েছে। কওমি ধারার রাজনীতিবিদ, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্টরাও জানিয়েছেন উদ্বেগ। তাদের অভিযোগ, মেলা কমিটির ‘ধর্মীয়ভাবে কট্টরপন্থী’ অংশের চাপে লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরামের সভাপতি আমিন ইকবাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, লিটলম্যাগ শিল্প-সাহিত্যের প্রাণ এবং নতুন লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক তৈরির উর্বর বীজতলা। এখান থেকেই অনেক প্রতিভাবান লেখক-সাহিত্যিকের যাত্রার সূচনা হয়। তাই বইমেলার আয়োজন থেকে লিটলম্যাগকে দূরে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, গত বছর ইসলামি বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নার সব ঘরানার লেখক, আলেম ও জাতীয় নেতাদের মিলনমেলা ছিল। এবার স্টল বরাদ্দ নিয়ে যারা টালবাহানা করছে তারা একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের লোক। এই গোষ্ঠী গত মেলাতে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করেছিল। তাদের হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
লেখক ও সিরাত গবেষক মনযূরুল হক বলেন, বাংলাবাজার ঘিরে যে ইসলামি প্রকাশনা শিল্প রয়েছে তার বড় অংশ ওঠে এসেছে ইসলামি ধারার বিভিন্ন সাহিত্যপত্র ও ছোটকাগজের হাত ধরে। এখনকার তরুণরা সেই ধারা ধরে রেখেছেন। এই তরুণরা এবার ‘পয়সাওলা, ইগোয়িস্টিক ও অ্যারোগেন্ট’ এক শ্রেণির প্রকাশকের বাধার মুখে পড়েছেন, যারা মূলত ট্রেডিশনাল মাদ্রাসা ঘরানার সম্পূর্ণ বাইরের।
তিনি আরও বলেন, লিটলম্যাগ কর্নার না দিতে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থিদের দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা স্থায়ী বিরোধের বীজ বপন হলো। আগামীর দিনগুলোতে ইসলামপন্থিদের আন্দোলন-সংগ্রামে এই বিরোধ প্রকট আকারে প্রকাশ পাবে। লিবারেল–উগ্রবাদী বিরোধের দিকে টার্ন নেবে এবং ট্রেডিশনাল মাদ্রাসা পড়ুয়াদের সঙ্গে এলিট সালাফি বিরোধকে সামনে নিয়ে আসবে।
অভিযোগ সালাফি ঘরানার প্রকাশকদের দিকে
বিষয়টি নিয়ে লিটলম্যাগ আন্দোলন বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে স্ট্রিমের কাছে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে সংগঠনটি জানায়, ইসলামি বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নার বরাদ্দের জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনাও হয়েছে। বুধবার বইমেলা কমিটির বৈঠক শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর প্রত্যাশা থাকলেও তা হয়নি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরবর্তীতে যোগাযোগ করা হলে মেলা কমিটির সদস্যরা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেন। কমিটির অন্যতম সদস্য দেওয়ান মাহমুদুল ইসলাম তুষার জানান, ফাউন্ডেশন পক্ষ বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি এবং চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। তবে কমিটির আরেক সদস্য আহমদ রফিক জানান, ফাউন্ডেশনই লিটলম্যাগ কর্নার বরাদ্দে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
পরে সংগঠন থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক রেজ্জাকুল হায়দারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মেলা কমিটির প্রকাশক সদস্যদের একটি অংশ লিটলম্যাগ আন্দোলনের বিষয়ে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিতে অস্বীকার করেছে এবং বিগত বছরের ঘটনাবলি সামনে এনে আপত্তি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে লিটলম্যাগ আন্দোলনের সংগঠক সাঈদ আবরার নদভী স্ট্রিমকে বলেন, আগের বইমেলায় লিটলম্যাগ চত্বরে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের সমাগমকে একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল। লিটলম্যাগ আন্দোলনের কর্মীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের উপস্থিতিতে মেলা চত্বরে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধের ঘটনাও ঘটে।
তাঁর ভাষ্য, লিটলম্যাগের জন্য স্টল বরাদ্দ এখন আর নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মেলা কমিটির একটি প্রভাবশালী অংশের মতাদর্শগত আপত্তি এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে।
লিটলম্যাগ আন্দোলনে যুক্ত একজন সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, প্রকাশক সদস্যদের ওই অংশটি সালাফি ঘরানার। কট্টর মতাদর্শে বিশ্বাসী গোষ্ঠীটি গত মেলাতেও বিরোধ তৈরির চেষ্টা করেছিল। লিটলম্যাগে সব ঘরানার লেখক-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের যাতায়াতকে তারা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।
এদিকে, যোগাযোগ করা হলে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম স্ট্রিমকে বলেন, গত বছর মেলায় গিয়ে প্রকাশকদের একটা অংশের মধ্যে লিটলম্যাগের বিরোধিতা দেখেছেন। তিনি যাওয়ার পর তিনবার আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। এক এনসিপি নেতাকে গালিগালাজও করা হয়। তবে তিনি উত্তেজনা বাড়াতে না চাওয়ায় কিছু করেননি।
মেলার দায়িত্বে থাকা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক রেজ্জাকুল হায়দার স্ট্রিমকে বলেন, নিয়ম মেনে আবেদন না করায় লিটলম্যাগ কর্নারকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এটি মেলা পরিচালনা কমিটির সম্মিলিত সিদ্ধান্ত।
এ সময় মেলা পরিচালনা কমিটির অন্য সদস্যদের নাম ও যোগাযোগ নম্বর চাইলে প্রথমে তিনি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর পাঠাবেন বলে ফোন রাখলেও দুপুরে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি পাঠাননি।
এদিকে, রেজ্জাকুল হায়দারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগ করা হলে লিটলম্যাগ আন্দোলনের সংগঠক জাওয়াদ আহমাদ স্ট্রিমকে বলেন, গত বছর বইমেলায় যেই প্রক্রিয়ায় আবেদনের মাধ্যমে স্টল বরাদ্দ পেয়েছিলাম এবারও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন করেছি। গত জুলাই থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে স্টল বরাদ্দের জন্য যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী স্টল বরাদ্দের বিষয়টি মৌখিকভাবে নিশ্চিতও করেছিলেন।
তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনিক বিষয়গুলো অজুহাতমাত্র। মূলত প্রকাশকদের প্রভাবশালী একটি অংশের বাধায় নতিস্বীকার করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
আজ বিকেল ৫টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি।
.png)
-028855-256x144.webp)





