বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস/৫ বছরে ৭৬ হাজার আত্মহত্যা, প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগ কী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

আত্মহত্যা নয়, কথা বলুন। ছবি: আনসপ্ল্যাশ থেকে নেওয়া
আত্মহত্যা নয়, কথা বলুন। ছবি: আনসপ্ল্যাশ থেকে নেওয়া

দেশে আত্মহত্যার ঘটনা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে। পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৭৬ হাজার ৩৬১টি আত্মহত্যাজনিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৪২ জনের মতো আত্মহত্যা করেছেন। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৮৮৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালে তা কমে ১৩ হাজার ৯৭৫টিতে দাঁড়ায়।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের হিসাবে আরও ১২ হাজার ৩৩৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ওই ১০ মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। পূর্ণ বছরের হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, আত্মহত্যা এখনো দেশের বড় জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটগুলোর একটি।

সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের সঙ্গেও বর্তমান পরিস্থিতির বড় ব্যবধান রয়েছে। এসডিজি অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রতি লাখে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার ছিল ৭ দশমিক ৬৮। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক শূন্য ৭। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ২ দশমিক ৪-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

পুলিশের হিসাবে আত্মহত্যার ঘটনা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটলেও কয়েকটি জেলায় সংখ্যাটি তুলনামূলক বেশি। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যশোরে ১ হাজার ৪৫৪টি, ঢাকায় ১ হাজার ৪০২টি এবং কুমিল্লায় ১ হাজার ২৮৮টি আত্মহত্যাজনিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আত্মহত্যার সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে মামলার সংখ্যা থেকে সামগ্রিকভাবে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ শুধু কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ও গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

পুলিশের হিসাবে আত্মহত্যার ঘটনা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটলেও কয়েকটি জেলায় সংখ্যাটি তুলনামূলক বেশি। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যশোরে ১ হাজার ৪৫৪টি, ঢাকায় ১ হাজার ৪০২টি এবং কুমিল্লায় ১ হাজার ২৮৮টি আত্মহত্যাজনিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (এনআইএমএইচ) সর্বশেষ জাতীয় জরিপে আত্মহত্যার চিন্তা ও চেষ্টার ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের তরুণদের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে শহরাঞ্চলের ৮ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানিয়েছেন, যেখানে গ্রামাঞ্চলে এ হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

জরিপের তথ্য বলছে, বাল্যবিবাহ, বেকারত্ব ও পারিবারিক সহিংসতার মতো সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যার অভিজ্ঞতা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের চাপ উচ্চশিক্ষিত ও স্নাতক পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যেও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ আত্মহত্যার প্রবণতার পেছনে শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, ব্যক্তির সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক সচেতনতা খুবই জরুরি। আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের একা করে না দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আত্মহত্যায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন উপকরণও তাঁদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। তাঁদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে কেন এমন চিন্তা বা অনুভূতি হচ্ছে, তা জানতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দিতে হবে। পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা একটু খেয়াল করলেই এসব পরিবর্তন বুঝতে পারেন; এ সময় খোলামেলা আলোচনা ও পাশে থাকা আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যায় বাড়ছে উদ্বেগ

জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের সংবাদমাধ্যমভিত্তিক পর্যালোচনায় ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০। ফাউন্ডেশনটি ১৬৫টি জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ হিসাব করেছে। ফলে এটি সরকারি পরিসংখ্যান নয়; সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে পাওয়া সংখ্যা।

২০২৫ সালের ৪০৩ ঘটনার মধ্যে ১৯০ জন স্কুলশিক্ষার্থী, ৯২ জন কলেজশিক্ষার্থী, ৭৭ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ৪৪ জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। মেয়েশিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪৯, যা মোট ঘটনার ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ।

ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে বিষণ্নতা, বেকারত্ব, অভিমান বা আবেগগত সংকট, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিলতা ও শিক্ষাজীবনের চাপসহ বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। তবে আত্মহত্যার মতো জটিল ঘটনাকে কোনো একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক নানা সংকট একসঙ্গে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তানসেন রোজ বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার পেছনে প্রজন্মগত ব্যবধান, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি, শো অফ সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা, বডি শেমিং, পুরোনো আর্থ-সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ার মতো নানা কারণও ক্রিয়াশীল থাকে। বিশেষ করে ২০০৫ সাল থেকে জন্ম নেওয়া তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার পেছনে এসব কারণের ক্রিয়াশীলতা দেখা গেছে।’

আত্মহত্যার চিন্তা ও চেষ্টার ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের তরুণদের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে শহরাঞ্চলের ৮ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানিয়েছেন, যেখানে গ্রামাঞ্চলে এ হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

তিনি আরও জানান, দেশের পত্রপত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টাল থেকে প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গত আট মাসে ২২৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে স্কুল এবং কলেজ পর্যায়ের আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭৪ জন। যার মধ্যে স্কুল ও সমমান পর্যায়ের ১২৭ জন আর কলেজ ও সমমান পর্যায়ের ৪৭ জন। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ১৩২ জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৯২ জন।

তানসেন রোজ বলেন, ‘দেশে ব্যাপকভাবে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হচ্ছে। এজন্য রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসতে হবে। কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এবং মানসিক চিকিৎসক ও সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলরের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।’

২০২৬-২০৩০ জাতীয় পরিকল্পনা

আত্মহত্যা প্রতিরোধে বাংলাদেশ এখন একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। ‘জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬–২০৩০’-এর খসড়া এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গত ২৩ আগস্ট জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আইসিডিডিআরবির উদ্যোগে আয়োজিত টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপের বৈঠকে পরিকল্পনার খসড়া পর্যালোচনা করা হয়। এতে আত্মহত্যার তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি জোরদার, প্রাণঘাতী উপকরণে প্রবেশাধিকার কমানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক দক্ষতা বাড়ানো এবং গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, পরিকল্পনাটির লক্ষ্য আত্মহত্যা প্রতিরোধকে শুধু মানসিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা ও গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা। জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পরিমাপের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে সংকট তীব্র হওয়ার আগেই শনাক্ত করা, দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা, আত্মহত্যার প্রাণঘাতী উপায়গুলোতে প্রবেশাধিকার কমানো এবং আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের পরবর্তী সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত