নেতৃত্ব নিয়ে কি আরও সংকটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৫১
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পতন ও পলায়নের পর দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সংকটজনক সময় পার করছে। বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ে দলটির প্রধান কার্যালয় এখনো অনেকটা পরিত্যক্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। সারাদেশে দলীয় কার্যালয়গুলোরও প্রায় একই অবস্থা। নেতা-কর্মীরাও বিচ্ছিন্ন ও ছন্নছাড়া, অনেকেই কারাগারে। খুব সম্ভবত দলটির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নৈতিক মনোবলও সর্বনিম্ন পর্যায়ে। যদিও আগামী ডিসেম্বরে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার দেশে ফেরার খবরে নানা ধরনের তৎপরতা রয়েছে। কিন্তু দেশে ফিরে তিনি সরাসরি জেলে যাবেন অথবা অন্য কোন দণ্ড ভোগ করবেন—এই বিষয়টি অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবসম্মত নয়। এরইমধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটিতে শেখ হাসিনার অবর্তমানে দলীয় প্রধান কে হবেন—এই ইস্যুতে নতুন বিতর্ক ও দলাদলি শুরু হয়েছে। সবশেষ কলকাতার নিউটাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় এক বৈঠকে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। শেখ সেলিমের সম্ভব্য দলীয় প্রধান হওয়ার বিষয়ে তীব্র বিরোধিতা করেছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা। সবকিছু মিলিয়ে শেখ হাসিনা পরবর্তী আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাব নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ পরবর্তী ভারতবরর্ষে নেহেরু পরিবার, ভুট্টো পরিবার, অং সাং, বন্দরনায়েকে এমনকি রাজাপক্ষে পরিবার নিজ নিজ দেশে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের পরিবারের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খুব সম্ভবত এই প্রভাব ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা খুব সহজে বিলীন হওয়ার নয়। এটা অমোঘ বাস্তবতা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়া দলটির সব শেষ সরকারের পতন ঘটেছে রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এছাড়া ২০০৯-২০২৪ ক্ষমতাসীন সময়ে দলটির মানবাধিকার রেকর্ড ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের খতিয়ান আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে বৈরী পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে দলটিতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছিল। এছাড়া বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনার বয়সও প্রায় ৮০ ছুঁইছুই। এমন বাস্তবতায় দলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা বা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আরও নির্মম বাস্তবতা হলো রক্তাক্ত গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত কোনো কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকের সাথে অনেক দেশের সরকারই কাজ করতে চায় না। তাই বলা যায় নতুন নেতৃত্ব গঠনের জন্য আওয়ামী লীগের ভেতরই তাগিদ রয়েছে।

শেখ পরিবারের বাইরের কেউ দায়িত্ব পেলে দলটির পুনরুত্থান আরও দ্রুত হবে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশার খুব একটা মূল্য আওয়ামী লীগ দেয় বলে মনে হয় না। দলগুলোর প্রধান বিবেচনা থাকে দল ও সরকারের লাগাম নিজের হাতে বা বলয়ে রাখা।

অনেকের প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তিত বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব হয়তো আপাতত শেখ পরিবারের বাইরে থেকে আসতে পারে। ১৯৭৫-পরবর্তী ক্রান্তিকালে জোহরা তাজউদ্দীনের উদাহরণ সামনে এনে অনেকেই নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভি, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, এমনকি সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর কথা আলোচনা করছিলেন। অনেকেরই ধারণা ছিল এই তিনজন হয়তো অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে আপদকালে দলের হাল ধরতে পারবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ হয়তো সে পথে হাঁটছে না। এই সিদ্ধান্ত দলটির জন্য ভালো নাকি আরও আত্মঘাতি তা সময়ই বলে দিতে পারবে।

শেখ পরিবারের বাইরের কেউ দায়িত্ব পেলে দলটির পুনরুত্থান আরও দ্রুত হবে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশার খুব একটা মূল্য আওয়ামী লীগ দেয় বলে মনে হয় না। দলগুলোর প্রধান বিবেচনা থাকে দল ও সরকারের লাগাম নিজের হাতে বা বলয়ে রাখা।

সাংবাদিকতা জীবনে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি কাভার এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে গিয়ে একটা কথা শুনেছিলাম। তা হলো, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের মধ্যেও দল থাকে, আবার সরকারের মধ্যেও সরকার থাকে। সহজ করে বললে, প্রতিটি দলের মধ্যে অতি ক্ষমতাধর রক্তের সম্পর্কভিত্তিক একটি বলয় থাকে, যেটি দলের ভেতরে আরেকটি শক্তিশালী দল। আবার সরকারের ভেতরে অন্য আরও সরকার থাকে, যা দৃশ্যমান সরকারের চাইতেও প্রভাবশালী। জন-আকাঙ্খা ও বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে ‘দলের ভেতরের দল’ অথবা ‘সরকারের ভেতরের সরকার’ যখন সিদ্ধান্ত নেয় তখন হয়তো ক্ষমতার চেয়ার নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জন্য নিশ্চিত হয়; কিন্তু আদতে হেরে যায় রাজনীতি। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এটিই হতে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।

একটা ভিন্ন আলাপ দিয়ে আলোচনাটা শেষ করা যাক। অনেকেই রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে আর বিবেচনায় নিতে চান না। কিন্তু আধুনিক বিশ্ববাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা যায় না। অবশ্যই অপরাধীর বিচার করা যায়। কিন্তু কাউকে তার পছন্দের দলের রাজনীতি থেকে বিরত রাখা প্রায় অসম্ভব। সেই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক ১৬ জুন ২০২৫ বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে সম্প্রতি আইনে পরিবর্তন আনা এবং এ সংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ড নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।’

শুধু তুর্ক নয় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ কোনো দেশ সমর্থন করবে বলে মনে করা বোকামি। বিষয়টির অর্থ দাঁড়ায়, একটা সুবিধাজনক সময়ে আওয়ামী হয়তো আবার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরবে। সেই ফেরার পথে যদি অধিকতর গ্রহণযোগ্য এবং শেখ পরিবারের বাইরে থেকে কাউকে দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়—সেটা আওয়ামী লীগের জন্যেই মঙ্গলজনক বলে অনেকেই মনে করেন। যদিও দলীয় প্রধানদের কাছে এই মনে করা বা না করার খুব একটা মূল্য নেই, তা বলাই বাহুল্য।

রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত