হামে হাজার শিশুর মৃত্যু: রাষ্ট্র কি পরের দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত

হামে হাজার শিশুর মৃত্যু: রাষ্ট্র কি পরের দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত। স্ট্রিম গ্রাফিক
হামে হাজার শিশুর মৃত্যু: রাষ্ট্র কি পরের দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত। স্ট্রিম গ্রাফিক

হাম থেকে এক হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য-দুর্যোগ। সেই সঙ্গে তা রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা-ক্ষমতারও এক নির্মম পরীক্ষা। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৯। আক্রান্ত প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার। এই রোগ টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায়। একে একসময় নির্মূলের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই রোগেই এত শিশুর মৃত্যু! আমরা এখন এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছি—এত বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই রাষ্ট্র কেন নড়ল না?

উত্তরটি শুধু টিকার ঘাটতিতে নেই। ২০২৪–২৫ সালে এমআর টিকার সরবরাহ-সংকট, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির অনুপস্থিতিতে দেশে বিপুলসংখ্যক টিকাবঞ্চিত শিশু তৈরি হয়েছে। এপ্রিল-মে মাসের জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতেও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়। পরে শুরু হয় বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশু খোঁজার ‘মপ-আপ’ অভিযান। অর্থাৎ সংকট যখন বড় হয়ে উঠেছে, তখনও আমরা পুরো সমস্যাটি সময়মতো শনাক্ত করতে পারিনি।

অথচ বাংলাদেশ দেখিয়েছে যে সে চাইলে পারে। ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে হাম টিকার প্রথম ডোজের আওতা ৭৪ থেকে ৯৪ শতাংশে উঠেছিল। দ্বিতীয় ডোজ চালুর পর তার আওতাও ৯৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০১৪ সালের গণটিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ৫ কোটি ৩৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। সাফল্যের মডেল আমাদের অজানা নয়। ব্যর্থ হয়েছি সেই ব্যবস্থাকে ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখতে।

এবারের সবচেয়ে বড় ঘটনা টিকার সংখ্যায় নয়। আশংকিত হওয়ার ব্যপার হচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। সংক্রমণ বাড়ার সময় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আগেভাগে শনাক্ত করা, আক্রান্তদের আলাদা রাখা, কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় করা—এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট জোরালোভাবে নেওয়া হয়নি। আর সংকটের গুরুত্ব স্বীকার করতেও সংশ্লিষ্টদের যেন অনীহা ছিল।

আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির পুরোনো একটি দুর্বলতা আছে। আর তা হল খারাপ খবরকে খারাপ খবর হিসেবে স্বীকার না করা। সংকট স্বীকার করলে দায়িত্ব নিতে হয়, সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ব্যর্থতার হিসাব দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করলে রোগ থেমে থাকে না। শুধু রাষ্ট্রের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে আরও দেরি হয়।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও আমরা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখছি। প্রতিবছর বর্ষা আসে। এডিস মশা বাড়ে, সংক্রমণ বাড়ে। বাড়ে মৃত্যুর সংখ্যা। তারপর শুরু হয় অভিযান। অথচ প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থাকে যথেষ্ট। কোভিড এবং ২০২৩ সালের ভয়াবহ ডেঙ্গু আমাদের যথেষ্ট শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সংকট চরমে ওঠার আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়নি।

এবারও কি আরেকটি তদন্ত কমিটি করেই দায়িত্ব শেষ হবে? প্রয়োজন তো স্থায়ী জনস্বাস্থ্য জরুরি-ব্যবস্থা। কোন পর্যায়ে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাবকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে গণ্য করা হবে? তখন স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, সমাজকল্যাণসহ কোন প্রতিষ্ঠান কী করবে? জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার দায়িত্ব কী? এসব আগে থেকেই লিখিত ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’-এ নির্ধারিত থাকতে হবে। জরুরি সময়ে যেন কোনো সিদ্ধান্ত আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে না থাকে।

প্রয়োজন প্রতিটি শিশুমৃত্যুর স্বাধীন ‘ডেথ রিভিউ’। শিশু কেন মারা গেল—দেরিতে হাসপাতালে আসায়, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতায়, নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায়? এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে পরের শিশুটিকে কীভাবে বাঁচানো হবে?

আর প্রয়োজন তথ্যের স্বচ্ছতা। সামগ্রিক সংক্রমণ, মৃত্যু, টিকাদানের আওতা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তথ্য জনগণের কাছ থেকে গোপন করার কোনো যুক্তি নেই। তথ্য প্রকাশ করলে সরকারের সমালোচনা হতে পারে। আর তথ্য গোপন করলে নষ্ট হবে মানুষের আস্থা। আর আস্থাহীন জনগণ কোনো জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে কার্যকরভাবে যুক্ত হয় না।

এই হাজার শিশুকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু এত মৃত্যু কি এবারও আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কোনো বদল আনতে পারবে না? এখন সরকারের সামনে আসল পরীক্ষা। দোষী খোঁজার পাশাপাশি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে পরের মহামারি আসার আগেই রাষ্ট্র প্রস্তুত থাকে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত