ad

সুন্দরবনের ‘কুরিয়ার কিং’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ১৪
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

শুরুটা ছিল মাত্র দুটি ভ্যান দিয়ে। চার দশক পর এখন ৬৪ জেলায় ৭৮০-এর বেশি শাখা ও এজেন্ট অফিস, কর্মী প্রায় ১০ হাজার। দেশের মোট কুরিয়ার ডেলিভারির প্রায় ৪০ শতাংশই করে সুন্দরবন কুরিয়ার। নতুন প্রজন্মের অ্যাপভিত্তিক কুরিয়ার কোম্পানির ভিড়েও কীভাবে এত শক্তিশালী এই পুরোনো প্রতিষ্ঠান? পেছনের গল্পটাই বা কী? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

একটা পরীক্ষা করা যেতে পারে। ঢাকার বাইরে কোনো জেলা শহর কিংবা উপজেলার বাজারে গিয়ে যদি একজনকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘একটা কার্টন ঢাকায় পাঠাবো, কোথায় যাবো?’ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর আসবে, সুন্দরবন কুরিয়ার।

অথচ সুন্দরবনকে আমরা কখনো ইনফ্লুয়েন্সার ক্যাম্পেইন করতে দেখি না। কোনো সেলিব্রিটিও বলেননি, ‘আপনার পার্সেল সুন্দরবনে পাঠান।’ নতুন টেকনোলজি স্টার্টআপের মতো তাদের কোনো ব্র্যান্ড স্টোরিও শোনা যায় না। তবু ২০২২ সালে কুরিয়ার সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের হিসাবে দেশের কুরিয়ার বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল সুন্দরবনের দখলে। তখন সারা দেশের কুরিয়ার কোম্পানিগুলো মিলে দিনে প্রায় সাড়ে সাত লাখ পার্সেল ডেলিভারি করলে সুন্দরবন একাই করত প্রায় তিন লাখ।

এই আধিপত্য তৈরি হলো কীভাবে?

দুটি ভ্যান থেকে দেশজুড়ে, শুরুটাই ছিল সুন্দরবনের বড় সুবিধা

সময়টা ১৯৮৩ সাল। বাংলাদেশে পার্সেল পাঠানোর ব্যবস্থা বলতে মূলত ডাক বিভাগ এবং এয়ার এক্সপ্রেস সার্ভিস। এয়ার এক্সপ্রেসের একটা বড় সীমাবদ্ধতা ছিল, এটি বিমানবন্দর ও বিমান পরিবহন অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।

জার্মানি থেকে দেশে ফিরে দুই তরুণ, ইমামুল কবীর শান্ত এবং হাফিজুর রহমান পুলক ভাবলেন, পার্সেল যদি আকাশের বদলে সড়ক দিয়ে মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া যায়? সেই ভাবনা থেকেই ১ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে সুন্দরবন কুরিয়ারের যাত্রা শুরু। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় একটি ছোট অফিস রুম। লক্ষ্য ছিল সহজে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া।

কুরিয়ার ব্যবসার সবচেয়ে বড় ইনফ্লুয়েন্সার হলো গ্রাহকের আগের সফল ডেলিভারি এক্সপেরিয়েন্স। আর সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন হলো, একজন মানুষ যখন অন্যজনকে বলেন, ‘সুন্দরবনে দিয়ে দেন, পৌঁছে যাবে।’ বাংলাদেশের কুরিয়ার বাজারে সুন্দরবন সম্ভবত এই একটি বাক্য তৈরি করতেই চার দশক ব্যয় করেছে।

তখন আরও কয়েকটি বেসরকারি ডেলিভারি কোম্পানি বাজারে এলেও সুন্দরবন শুরু থেকেই সড়কভিত্তিক কুরিয়ার মডেলে জোর দিয়েছিল। আজকের সময়ে ব্যাপারটা খুব সাধারণ। কিন্তু ব্যবসার ভাষায়, এখানে প্রথম যে সুবিধাটা সুন্দরবন পেয়েছিল, তার নাম ফার্স্ট-মুভার অ্যাডভান্টেজ।

আপনি যদি কোনো প্রতিষ্ঠিত বাজারে নতুন কোম্পানি খোলেন, আপনাকে অন্যের কাছ থেকে ক্রেতা কেড়ে নিতে হবে বা একুয়ার করতে হবে। কিন্তু বাজার যখন তৈরি হচ্ছে, তখন ঢুকলে আপনি ক্রেতা নেওয়ার পাশাপাশি ক্রেতার অভ্যাসও তৈরি করতে পারেন।

বাংলাদেশের বেসরকারি কুরিয়ার ব্যবসার ক্ষেত্রেও প্রায় সেটিই ঘটেছে। শুরুটা অবশ্য খুব একটা সহজ ছিল না। ১৯৮৩ সালে প্রাইভেট কুরিয়ার শুরু হওয়ার সময় সুন্দরবন, কন্টিনেন্টাল, ড্রিমল্যান্ডের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এসেছিল। তখন সরকারি ডাক বিভাগ এর বৈধতা নিয়ে আপত্তি তোলে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং প্রাইভেট কুরিয়ারের পক্ষেই রায় আসে।

সেই সময়ে সুন্দরবন শুধু কুরিয়ার বাজারে ঢোকেনি, বাংলাদেশে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসকে বৈধ একটি ব্যবসার খাত হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে।

চার দশকের বেশি সময় পর গাড়ির বহর দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০০টিতে। সারা দেশে শাখা ও এজেন্ট অফিস রয়েছে ৭৮০টিরও বেশি। সুন্দরবনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, তাদের ১০০টির বেশি নিজস্ব অফিস রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ৫০০টির বেশি এজেন্ট অফিস। এখানেই তাদের সম্প্রসারণ মডেলের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজি দেখা যায়।

সব অফিস নিজের হলে দ্রুত ছড়ানো কঠিন

সুন্দরবনকে বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিজেদের অফিস করতে হলে জায়গা ভাড়া, লোক নিয়োগ, অফিস স্থাপন, বিদ্যুৎ-পানির বিল, নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিটি জায়গার স্থায়ী খরচ বহন করতে হতো।

এখানেই কাজে আসে এজেন্সি মডেল। স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী সুন্দরবনের নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে যান। ফলে কোম্পানি কম মূলধন খরচ করে আরও বেশি জায়গায় নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে পারে। এটি পুরোপুরি ফ্র্যাঞ্চাইজি না হলেও ব্যবসায়িকভাবে অনেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটওয়ার্কের মতো। এই মডেল সুন্দরবনের বিস্তৃতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

মার্কেটিংয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ফিজিক্যাল অ্যাভেইলেবিলিটি বা সহজলভ্য উপস্থিতি। অর্থাৎ ক্রেতা যখন আপনার পণ্য বা সেবা নিতে চাইবেন, তখন আপনি তাঁর নাগালের মধ্যে আছেন কি না। আপনি কোটি টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন করতে পারেন। কিন্তু ক্রেতা যদি পার্সেল হাতে নিয়ে দেখেন, আপনার সবচেয়ে কাছের শাখা ৩০ কিলোমিটার দূরে, তাহলে বিজ্ঞাপন খুব বেশি কাজে আসবে না।

সুন্দরবনের ক্ষেত্রে তাদের শত শত আউটলেটই একেকটা মার্কেটিং টুল। বাজারের মোড়ে একটা হলুদ-নীল সুন্দরবনের সাইনবোর্ড মানুষের মনে ব্র্যান্ডের উপস্থিতি তৈরি করে। তাই যখন কেউ পার্সেল পাঠাতে চান, সবার আগে সুন্দরবনের কথাই মাথায় আসে।

শাখা বাড়ে, নেটওয়ার্ক বাড়ে, কিন্তু খরচ কমে

কুরিয়ার ব্যবসার আরেকটা মজার হিসাব আছে। ধরুন, আপনার শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে অফিস আছে। একজন খুলনার ক্রেতা আপনার কাছ থেকে কী পাবেন? কিছুই না।

এবার খুলনাতেও অফিস খুললেন। নেটওয়ার্ক আরও বড় হলো। তারপর রাজশাহী। রংপুর। বরিশাল। সিলেট। কুমিল্লা। একসময় এমন একটা জায়গায় পৌঁছাবেন, যখন নেটওয়ার্কের প্রতিটি নতুন অবস্থান পুরোনো অবস্থানগুলোকেও আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

এখন রংপুর থেকে খুলনায় পাঠানো যায়। খুলনা থেকে কুমিল্লা। কুমিল্লা থেকে রাজশাহী। রাজশাহী থেকে ঢাকা। একটি নতুন শাখা শুধু একটি নতুন শাখা নয়। এটি পুরো নেটওয়ার্কের সঙ্গে নতুন একটি সংযোগ। ব্যবসায়ের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় নেটওয়ার্ক ইফেক্ট।

সুন্দরবন নিজেকে কখনো সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপের মতো প্রচারণা করেনি। কিন্তু প্রয়োজন হলে প্রযুক্তি নিয়েছে। ব্যবসায়িক কৌশলের ভাষায় এটাকে বলা যায়, টেকনোলজি অ্যাজ ইনফ্রাস্ট্রাকচার, নট মার্কেটিং। দেখানোর জন্য প্রযুক্তি নয়, কাজ সহজ করার জন্য প্রযুক্তি।

এবার এর সঙ্গে আরেকটি থিওরি যোগ করা যাক—ইকোনমিজ অব স্কেল বা ব্যবসার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে গড় খরচ কমে যাওয়া। ঢাকা থেকে রংপুরে একটি কাভার্ড ভ্যান যাবে। সেখানে যদি ৫০টি পার্সেল থাকে, পার্সেলপ্রতি পরিবহন খরচ বেশি। কিন্তু একই ভ্যানে যদি ৫০০ পার্সেল যায়? জ্বালানি খরচ একই। চালকের খরচ একই। গাড়িও একই। কিন্তু প্রতি পার্সেলের গড় পরিবহন খরচ অনেক কম।

এটি একটা ফ্লাইহুইল বা স্বয়ংচালিত প্রবৃদ্ধির চক্র। আর চার দশক ধরে এই চক্রই ঘুরছে সুন্দরবনের পক্ষে। তবে এত বড় নেটওয়ার্ক চালাতে গেলে আরেকটি সমস্যা আসে। ধরুন, ৬৪ জেলার প্রতিটি জেলার সঙ্গে অন্য ৬৩ জেলার সরাসরি গাড়ি চালাতে হবে। এটি ভয়ংকর অদক্ষ ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে সুন্দরবন ব্যবহার করে হাব-অ্যান্ড-স্পোক মডেল।

এটা অনেকটা এয়ারলাইনের মতো। আপনি বরিশাল থেকে সরাসরি বিশ্বের প্রতিটি শহরে ফ্লাইট চালান না। আগে একটা বড় স্টেশনে যান। সেখান থেকে গন্তব্যে। সুন্দরবনের কার্যক্রমেও এক জায়গায় পার্সেল একত্র করার ব্যবস্থা রয়েছে।

২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ১১০টি কাভার্ড ভ্যান ঢাকায় আসে। আবার রাতে ১১০টি ভ্যান ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গার উদ্দেশে বেরিয়ে যায়। শুধু এসব গাড়ির দৈনিক খরচ প্রায় ৩০ লাখ টাকা।

রাতে আপনি যখন ঘুমাচ্ছেন, তখন একটা অদৃশ্য লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক কাজ করছে। এক জেলার পার্সেল আরেক জেলার পার্সেলের সঙ্গে একত্র হচ্ছে। গাড়ি বদলাচ্ছে। হাব বদলাচ্ছে। তারপর আবার গন্তব্য শাখায় পৌঁছে যাচ্ছে।

কুরিয়ার ব্যবসার আসল ‘মূলধন’ কী?

কুরিয়ার ব্যবসায় ক্রেতা আপনাকে কী দেন? একটা বাক্স? আসলে না। তিনি আপনাকে দেন তাঁর কাগজপত্র, ব্যবসার পণ্য, কোনো উপহার, ল্যাপটপ কিংবা তাঁর ক্রেতার অর্ডার। কুরিয়ার ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন গাড়ি নয়, বিশ্বাস।

২০১২ সালে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে কুরিয়ার সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাফিজুর রহমান পুলক বলেছিলেন, কুরিয়ার ব্যবসার মূল মূলধন হলো ‘বিশ্বস্ততা’। এই আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে। ব্যবসার ভাষায় এটাকে বলা হয় ট্রাস্ট মোট বা আস্থার দুর্গ।

নতুন কোনো কুরিয়ার কোম্পানি আজ হয়তো ১০০টি গাড়ি কিনতে পারে। অ্যাপ বানাতে পারে। ছাড় দিতে পারে। কিন্তু ক্রেতার মাথায় একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, ‘এদের হাতে ৫০ হাজার টাকার জিনিস দিলে ঠিকমতো পৌঁছাবে তো?’

এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞাপন দিয়ে পুরোপুরি কেনা যায় না। বারবার সফলভাবে পণ্য পৌঁছে দিয়েই এটি অর্জন করতে হয়। সুন্দরবনের চার দশকের ইতিহাস এখানে তাদের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য সম্পদ।

টেকনোলজি অ্যাজ ইনফ্রাস্ট্রাকচার, দেখিয়েছে সুন্দরবন

‘ট্র্যাডিশনাল কুরিয়ার’ বললেই মনে আসে খাতা, রসিদ, গোডাউন, ট্রাক। কিন্তু সুন্দরবনের ইতিহাসে রয়েছে প্রযুক্তি গ্রহণেরও আকর্ষণীয় উদাহরণ। ২০১১ সালে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, দেশের কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনলাইন সফটওয়্যার ব্যবহার করে টাকা স্থানান্তর শুরু করার ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিল সুন্দরবন। তখন প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার গ্রাহকের প্রায় ১০ লাখ টাকা স্থানান্তর করত বলে পুলক জানিয়েছিলেন।

সুন্দরবন নিজেকে কখনো সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপের মতো প্রচারণা করেনি। কিন্তু প্রয়োজন হলে প্রযুক্তি নিয়েছে। ব্যবসায়িক কৌশলের ভাষায় এটাকে বলা যায়, টেকনোলজি অ্যাজ ইনফ্রাস্ট্রাকচার, নট মার্কেটিং। দেখানোর জন্য প্রযুক্তি নয়, কাজ সহজ করার জন্য প্রযুক্তি।

আজ কুরিয়ার খাতে ট্র্যাকিং, মার্চেন্ট ড্যাশবোর্ড, বারকোড, ক্যাশ অন ডেলিভারি বা সিওডি ব্যবস্থাপনা—সবই প্রায় প্রচলিত। কিন্তু সুন্দরবনের ডিজিটাল অভিযোজন শুরু হয়েছে ই-কমার্স বুম হওয়ারও অনেক আগে।

সুন্দরবনের একটা ‘চালু ব্যবসা’ বন্ধ করল বিকাশ, তবুও প্রভাব কেন পড়েনি?

একসময় কুরিয়ারের মাধ্যমে টাকা পাঠানো ছিল একটা বড় ব্যবসা। তারপর এলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস। বিকাশ ও অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং মানুষের টাকা পাঠানোর অভ্যাস বদলে দিল। এক পর্যায়ে সুন্দরবনের অর্থ স্থানান্তরের লেনদেন মাত্র দেড় বছরে প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে যায়। প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ টাকার লেনদেন নেমে আসে প্রায় এক লাখ টাকায়।

একটা কোম্পানির জন্য এটা ভয়ংকর ডিসরাপশন বা বাজারের আমূল পরিবর্তন। কিন্তু সুন্দরবন বন্ধ হয়নি। কারণ অর্থ স্থানান্তর তাদের একমাত্র ব্যবসা ছিল না। পার্সেল ডেলিভারি ছিল। করপোরেট ডেলিভারি ছিল। পরিবহন ছিল। পরে ই-কমার্স এল। সুন্দরবনের মূল সক্ষমতা ছিল দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় জিনিস পৌঁছে দেওয়া। একসময় সেই নেটওয়ার্ক দিয়ে টাকা গেছে। পরে টাকা মোবাইলে চলে গেলেও নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা থেকে গেছে।

ই-কমার্স এসে ব্যবসা বাড়ল সুন্দরবনের

বাংলাদেশে ফেসবুক কমার্স ও ই-কমার্সের বিস্তার নতুন কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। পাঠাও, রেডএক্স, পেপারফ্লাই, স্টেডফাস্টের মতো নতুন প্রজন্মের প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্ট-কেন্দ্রিক ডেলিভারি মডেল নিয়ে এসেছে। বাড়ি থেকে পার্সেল সংগ্রহ, ক্যাশ অন ডেলিভারি, রিটার্ন ম্যানেজমেন্ট, মার্চেন্ট ড্যাশবোর্ড, ইনস্ট্যান্ট ট্র্যাকিংসহ নানা সুবিধা তারা দিচ্ছে।

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

তবে এখানে সুন্দরবনের একটা বড় সুবিধা ছিল। ই-কমার্স বুম আসার আগেই তাদের দেশজুড়ে সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি ছিল। ২০১২ সালেই সুন্দরবন আলাদা ই-কমার্স শাখা তৈরি করে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, ঢাকা থেকে বাইরের জেলায় ডেলিভারির জন্য প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি ই-কমার্স কোম্পানি তাদের সেবা ব্যবহার করত। প্রতিদিন ১০ হাজারের বেশি ই-কমার্স পণ্যও তাদের মাধ্যমে ডেলিভারি হতো।

অর্থাৎ ফেসবুকের বিক্রেতারা আসার আগেই সুন্দরবন ডেলিভারির রাস্তা তৈরি করে রেখেছিল। পরে বিক্রেতারা এসে সেই তৈরি রাস্তাতেই পণ্য পাঠাতে শুরু করেন।

সুন্দরবনের ‘ইঞ্জিন’ যেভাবে সারাবছর চালু থাকে

অনেক নতুন কুরিয়ার মূলত ছোট ই-কমার্স প্যাকেজের জন্য তৈরি। সুন্দরবনের ব্যবসা আরও বিস্তৃত। তারা কাগজপত্র নেয়। ই-কমার্সের পণ্য নেয়। ইলেকট্রনিকস নেয়। ভারী পার্সেল নেয়। করপোরেট চালান নেয়। এমনকি আসবাবপত্রও নেয়।

সুন্দরবনের ‘প্লাস পয়েন্ট’ কী? কাভার্ড ভ্যান? অনেক পার্সেল? সব ধরণের পণ্য পাঠানো? সম্ভবত কোনোটাই একা নয়। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো নেটওয়ার্ক। নেটওয়ার্ক একবার বড় হয়ে গেলে প্রতিযোগীর জন্য সমস্যা তৈরি হয়।

মধু, ঘি, সরিষার তেল বা তরলজাত পণ্যের মতো জিনিস পরিবহনের জন্য তাদের রয়েছে আলাদা লিকপ্যাক সার্ভিস। গ্রীষ্মে আবার থাকে ম্যাঙ্গো সার্ভিস বা আম পরিবহন সেবা। মৌসুমি ফলের ডেলিভারি সামলাতে প্রতিবছর তারা অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেয়। আলাদা গাড়ির বহরও যুক্ত করে।

অর্থাৎ একই অবকাঠামো দিয়ে যত বেশি ধরনের সেবা দেওয়া যায়, সুন্দরবন সেটাই করার চেষ্টা করে। অর্থনীতির ভাষায় এটাকে বলা যায় ইকোনমিজ অব স্কোপ। ট্রাক আছে। শাখা আছে। পণ্য বাছাইয়ের ব্যবস্থা আছে। কর্মী আছে। একই নেটওয়ার্ক দিয়ে কাগজপত্র গেল, আম গেল, আসবাবপত্র গেল। নতুন সেবার জন্য নতুন করে কোম্পানি খুলতে হলো না।

তবে শুধু ব্যক্তিগত গ্রাহকের ওপর নির্ভর করলে কুরিয়ার ব্যবসায় সারা বছর একই রকম ব্যস্ততা থাকে না। ঈদে পার্সেল বাড়বে। আমের মৌসুমে ফল বাড়বে। কিন্তু বাকি সময়? এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে করপোরেট গ্রাহক।

ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, ওষুধ কোম্পানি, টেলিকম ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রতিদিন কাগজপত্র ও পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠাতে হয়। একজন ব্যক্তিগত গ্রাহক মাসে একবার কুরিয়ার করতে পারেন। একজন করপোরেট গ্রাহক প্রতিদিন শত শত চালান দিতে পারেন। এটাই বেস লোড বা স্থায়ী ভিত্তির চাহিদা।

বিদ্যুৎকেন্দ্র যেমন একটি স্থায়ী চাহিদা চায়, কুরিয়ার নেটওয়ার্কও তেমন স্থায়ী পার্সেল প্রবাহ চায়। তার ওপর যোগ হয় মৌসুমি ও খুচরা গ্রাহক। সুন্দরবনের দীর্ঘ বি-টু-বি ব্যবসার ইতিহাস তাদের এই জায়গায় বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।

সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ও ঝুঁকি

সুন্দরবনের ‘প্লাস পয়েন্ট’ কী? কাভার্ড ভ্যান? অনেক পার্সেল? সব ধরণের পণ্য পাঠানো? সম্ভবত কোনোটাই একা নয়। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো নেটওয়ার্ক। নেটওয়ার্ক একবার বড় হয়ে গেলে প্রতিযোগীর জন্য সমস্যা তৈরি হয়। কারণ কুরিয়ার ব্যবসায় গ্রাহক শুধু বলেন না, ‘কার ডেলিভারি ভালো?’ তিনি আরও একটা প্রশ্ন করেন, ‘ওদের সার্ভিস আমার এলাকায় আছে তো?’

সুন্দরবন এই দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর অনেক আগেই তৈরি করে রেখেছে।

তবে পুরোনো ও বড় হওয়াই সবসময় সুবিধা নয়। বিশাল নেটওয়ার্ক মানে বিশাল স্থায়ী খরচ। এখন পাঠাও, স্টেডফাস্ট, রেডএক্সের মতো ডিজিটাল-ফার্স্ট বা ডিজিটালকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

২০২৫ সালে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী বলেন, প্রথাগত কুরিয়ারগুলো অনলাইন বিক্রেতাদের বিশেষ কিছু চাহিদা, যেমন বাড়ি থেকে পণ্য সংগ্রহ, পণ্য ফেরত এবং ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, যথেষ্ট ভালোভাবে পূরণ করতে পারেনি।

সুন্দরবনের সামনে এখন একটা প্যারাডক্স বা বিপরীতমুখী বাস্তবতা রয়েছে। যে বিশাল অবকাঠামো তাদের শক্তি, সেটাই যদি প্রতিদিনের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আপডেট করা না হয়, একসময় সেটিই বিশাল খরচের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

অনেক ব্র্যান্ড প্রথমে আউটলেট বানায়। তারপর বিজ্ঞাপন দেয়। তারপর ইনফ্লুয়েন্সার নেয়। তারপর গ্রাহক আসে। সুন্দরবনের যাত্রাটা প্রায় উল্টো। চার দশক পর এসে তাদের নেটওয়ার্কটাই ব্র্যান্ড হয়ে গেছে।

কুরিয়ার ব্যবসার সবচেয়ে বড় ইনফ্লুয়েন্সার হলো গ্রাহকের আগের সফল ডেলিভারি এক্সপেরিয়েন্স। আর সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন হলো, একজন মানুষ যখন অন্যজনকে বলেন, ‘সুন্দরবনে দিয়ে দেন, পৌঁছে যাবে।’ বাংলাদেশের কুরিয়ার বাজারে সুন্দরবন সম্ভবত এই একটি বাক্য তৈরি করতেই চার দশক ব্যয় করেছে।

আর হয়তো সেই কারণেই বড় বড় প্রতিযোগী আসার পরও তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখনো কোনো অ্যাপ, ট্রাক কিংবা অফিস নয়। দেশের মানুষের মাথায় তৈরি হয়ে যাওয়া একটা রুট ম্যাপ। পার্সেল পাঠাতে হবে? কোথাও না কোথাও সুন্দরবন আছেই।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত