দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণ নিয়ে রুমিনের বক্তব্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য: বাংলাফ্যাক্টের যাচাই

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩: ৪৭
সংসদে বক্তব্য দিচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সংগৃহীত ছবি
সংসদে বক্তব্য দিচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সংগৃহীত ছবি

জাতীয় সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার দেওয়া কিছু বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে চিহ্নিত করেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাফ্যাক্ট। ৯ সেপ্টেম্বর সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিএনপি সরকারের বিভিন্ন সময়ের সংকট, দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণ নিয়ে মন্তব্য করেন।

সংসদে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘প্রত্যেকটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর সারের সংকট হবে না, সারে যারা গরীব কৃষক আছেন তারা সার কারখানায় গিয়ে সেটা লুট করবেন না সেইটাও হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণ খেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেটাও হতে পারে না। সুতরাং বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে ঋণ খেলাপিতে সর্বোচ্চ হওয়া।’

২০০১ সালের দুর্নীতি সূচকের প্রেক্ষাপট

বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) ‘করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স’ (সিপিআই) বা দুর্নীতি ধারণা সূচক অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ তালিকার সর্বনিম্নে (সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ) অবস্থান করেছিল। রাজনৈতিকভাবে এটিকে প্রায়শই ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দায় হিসেবে প্রচার করা হয়।

বাংলাফ্যাক্টের যাচাই অনুযায়ী, ২০০১ সালের সূচক নির্ধারণে এর আগের কয়েক বছরের তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, যার বড় অংশই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের। বিএনপি ক্ষমতায় আসে ২০০১ সালের অক্টোবরে। ফলে ওই বছর বাংলাদেশের সর্বনিম্ন অবস্থানকে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের একক দায় হিসেবে দেখানো যথাযথ নয়।

২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের স্কোর ছিল ০.৪। স্কোর যত কম, দুর্নীতি তত বেশি বোঝায়। পড়ে সরকারের নেওয়া নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ফলে ২০০৫ সালে স্কোর বেড়ে ১.৭ এবং পরবর্তীতে ২.০-এ উন্নীত হয়। অর্থাৎ, বিএনপি সরকারের আমলে দুর্নীতির হার ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। এমনকি দুর্নীতি দমনে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করতে বিএনপি সরকারের আমলেই ২০০৪ সালে স্বাধীন ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক) গঠন করা হয়।

খেলাপি ঋণের সংকটের পেছনের কারণ

রুমিন ফারহানা দাবি করেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই দেশে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো। তবে বাংলাফ্যাক্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে যে উচ্চ খেলাপি ঋণের চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নীতিগত অব্যবস্থাপনা, বিশেষ ছাড়, ঋণ পুনঃতফসিল এবং হিসাবগত কারসাজির ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাফ্যাক্ট বলছে, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক মন্দ ও বেনামি ঋণ দীর্ঘদিন নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) এবং দেশি-বিদেশি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় আগে আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ ও বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য সামনে আসে। ফলে বর্তমানে প্রকাশিত খেলাপি ঋণের পুরো চিত্রকে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া ঋণ হিসেবে উপস্থাপন করলে এর পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে যায়।

পূর্বের বক্তব্যেও তথ্যগত ত্রুটি

সংসদে রুমিন ফারহানার বক্তব্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাসে দেশে ৬২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং ৯ শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে।

তবে বাংলাফ্যাক্টের পূর্ববর্তী অনুসন্ধানে ওই দাবিতেও অসঙ্গতি পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির যাচাই অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা ৯ শতাধিক নয়, ছিল ৯৫টি। এছাড়া চাকরি হারানো ও কারখানা বন্ধের ঘটনাগুলোও তার দাবিতে উল্লেখ করা সময়সীমার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত