ডেঙ্গু প্রতিরোধে সময়োচিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি

ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়—বাংলাদেশের জন্য এটি পুনরাবৃত্ত জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি, যা প্রতিবছর হাজারো পরিবারকে আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ উদ্বোধন করলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৪৩ হাজার ৮২৩ জন; মৃত্যু হয়েছে ১২১ জনের। এরপর মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মারা গেছেন অন্তত ২৪ জন। ৮ সেপ্টেম্বর একদিনেই মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের এবং হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৭১ জন– যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক রেকর্ড। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীও সতর্ক করেছেন, বিগত তিন-চার বছরের উপাত্ত ও জলবায়ু-বিশ্লেষণ অনুযায়ী সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের শুরুতেই সংক্রমণ সর্বোচ্চে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশে বর্ষাকাল শুরু হয় এপ্রিল-মে থেকেই আর এডিস মশার প্রজনন সবচেয়ে বেশি ঘটে জুন থেকে আগস্টের মধ্যে। প্রতিবছর প্রায় একই প্যাটার্নে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সংক্রমণের চূড়া দেখা যায়। অথচ ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরোধ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে– যখন পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটিকে প্রকৃত পূর্বাভাসভিত্তিক প্রস্তুতি বলা যায় না।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের অধিকাংশ পৌর ও স্থানীয় সরকার সংস্থার হাতে পর্যাপ্ত জনবল, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা কিংবা সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র ও ছাদবাগানে জমে থাকা পানি এখনো মশক প্রজননের প্রধান উৎস হয়ে আছে; অথচ এসব ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ ও জরিমানার ব্যবস্থা দুর্বল। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি রোধেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ঘাটতি রয়েছে, যদিও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও দীর্ঘদিনের। সঙ্গে জবাবদিহিতে রয়ে গেছে অস্পষ্টতা। এসব কাঠামোগত ঘাটতি পূরণ না করে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় কিছু দ্রুত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, ব্যাপক ফগিংয়ের বদলে উপাত্তনির্ভর, হটস্পট-কেন্দ্রিক লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম জোরদার। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি হাসপাতালে নির্দিষ্ট শয্যা ও চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বসীমা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। তৃতীয়ত, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও ভবন মালিকদের জন্য মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে প্রয়োগ। চতুর্থত, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপাত্ত একীভূত করে পূর্বাভাসভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে প্রচারাভিযান সঠিক সময়ে শুরু করা যায়। পঞ্চমত, দৈনিক রোগী ও মৃত্যুর তথ্য এলাকাভিত্তিকভাবে প্রকাশ করতে অনলাইন ড্যাশবোর্ড চালু করা, যাতে সংশ্লিষ্ট সবাই নিজ নিজ এলাকার ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, গৃহায়ণ, শিক্ষা, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, গণপূর্ত, পরিবেশ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে এ লক্ষ্যে একই কাঠামোয় আনতে হবে। নির্মাণস্থলে জমে থাকা পানি, ছাদে পরিত্যক্ত পাত্র, ভাঙা ড্রেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ—এসব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ‘অ্যাড্রেস’ করতে পারবে না। ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে বলা যায় নগর শাসনের আয়না। মশা যেখানে জন্মায়, সেখানে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতিও অনেকটা দৃশ্যমান।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশের এখন আর ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ থাকার সুযোগ নেই। রোগী বাড়ার পর রোগ ব্যবস্থাপনার চেষ্টা বাড়ানো, মৃত্যুর পর কারণ খোঁজা এবং মশা বেড়ে ওঠার পর ওষুধ ছিটানো—এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। বিশ্ব দেখিয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন কিছু নয়। তবে তার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্য, স্থানীয় সরকার, নাগরিক অংশগ্রহণ ও কঠোর জবাবদিহিকে একসঙ্গে কার্যকর করতে হয়। অক্টোবর আসার আগেই সেটি করে দেখাতে সচেষ্ট হতে হবে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র কীটনাশক নয়—সময়োচিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
.png)


-7be686-256x144.webp)
