নজর কেড়েছে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন

সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে যে শ্লথগতি ছিল, সেটা জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত অধিবেশনে কেটে যাওয়ার ঘটনা ইতিবাচক। সব কয়টি কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন সম্পন্ন হওয়াটা স্বস্তির, যদিও এটা ঘিরে বিতর্ক রয়েছে। অধিবেশনে উত্থাপিত ছয়টি বিলই পাস হয়েছে, যার কয়েকটি আবার জন্ম দিয়েছে আলোচনার। সংবাদপত্রের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোয়ও এসব ইস্যু আলোচিত হচ্ছে।
তৃতীয় অধিবেশন স্বল্পস্থায়ী হলেও এতে সব কয়টি কমিটি গঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ একাধিক বিল পাসের ঘটনা সংসদ সক্রিয় হয়ে ওঠার লক্ষণ বলা যেতে পারে। সমাপনী অধিবেশনে স্পিকারও সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে কিছু বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর এই কথা সঠিক যে, সংসদে মতপার্থক্য হওয়াই স্বাভাবিক। তবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কিংবা অন্য কারো বক্তব্য চলাকালে এর প্রতিক্রিয়ায় সীমা লংঘনের দিকে সবারই দৃষ্টি রাখা উচিত। নইলে সার্বভৌম সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে। সদ্যসমাপ্ত অধিবেশনে একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য সরকারের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখার সময় আশপাশ থেকে গালাগালের শিকার হওয়ার অভিযোগ গুরুতর। স্পিকারও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের বক্তব্য শুনে তাঁর ‘অনুভূতির প্রতি সম্মান’ জানিয়েছেন।
সমাপনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা স্বভাবতই চলমান বিভিন্ন ইস্যুতে রেখেছেন দীর্ঘ বক্তব্য। সংসদের বাইরেও তাঁরা নানা উপলক্ষে এসব বক্তব্য রাখছেন। তৃতীয় অধিবেশন চলাকালে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের চট্টগ্রাম অভিমুখি লংমার্চ আলোচিত হয়েছে। কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হওয়াটাও ইতিবাচক। সংসদ চলাকালে রাজপথে যেতে বিরোধী দল কেন উৎসাহী, এর ব্যাখ্যা অবশ্য চেয়েছেন অনেকে। তবে কেউ তাদের কর্মসূচি পালনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। সরকারের দিক থেকে অসহযোগিতা কিংবা বাধাদানের চেষ্টাও পরিলক্ষিত হয়নি। সেটি ঘটলে কেবল রাজপথ উত্তপ্ত হতো না; সংসদেও পড়ত এর প্রভাব। আমরা লক্ষ করেছি, লংমার্চ শেষে বিরোধী দলগুলো সংসদে ফিরে এসে এর কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসার পর জাতীয় সংসদকে কার্যকর করা এবং এটিকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু করে তোলার কথা বলা হয়েছে অনেক। তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলা যাবে না। মাঝে তো সুষ্ঠুভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সংস্কৃতিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। তাতে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর সরকার হয়ে ওঠে চরম স্বেচ্ছাচারী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা করেছে, সন্দেহ নেই। এটাকে সফল করতে সংসদকে কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে থাকলেও বিরোধী দল দুর্বল অবস্থানে নেই। তারা ভোটও কম পায়নি। তাঁদের কাছেও প্রত্যাশা কম নয়। এ অবস্থায় কেবল অধিবেশন নয়; সংসদীয় কমিটিগুলোতেও তাঁদের জোরালো অংশগ্রহণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই সনদে হওয়া ঐকমত্য অনুসরণ করে কমিটিগুলো গঠিত হয়নি বলে অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। বিশেষত সরকারের জবাবদিহি ও সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত কমিটিগুলোর সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া উচিত বলে মত আগে থেকেই ছিল। হালে এটা আরও জোরদার। স্পিকারও এ সম্পর্কিত কিছু বক্তব্য রেখেছেন, যা প্রণিধানযোগ্য। সরকার পক্ষের উচিত হবে সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে হলেও উত্থাপিত অভিযোগ নিষ্পত্তির পথে এগোনো।
আর যেসব বিল নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়ে গেল; পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকলে তা গ্রহণেও বাধা নেই। আইন হয়ে যাওয়ার পরও তার সীমাবদ্ধতা দূর করা যায়। সংসদ ও সংসদীয় কমিটিতে যথেষ্ট আলোচনার পর সম্ভাব্য সব অভিমত ধারণ করে আইন প্রণয়নই কাম্য। এ ক্ষেত্রে সংসদের বাইরের অংশীজনদের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া গেলে সেটাও গণতন্ত্রকে জোরদার করবে।
.png)



