নিজামুল মুলকের শিক্ষানুরাগ ও নিজামিয়া মাদরাসা

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ৪২
নিজামিয়া মাদরাসা। ছবি: সংগৃহীত
নিজামিয়া মাদরাসা। ছবি: সংগৃহীত

সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সুলতান আল্প আরসালান ও সুলতান মালিক শাহের নাম যেমন সামরিক সাফল্য ও রাজনৈতিক বিস্তারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তেমনি এই সাম্রাজ্যের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়—নিজামুল মুলক তুসি। তিনি ছিলেন সেলজুক সুলতানদের প্রধান উজির। রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে থেকেও তাঁর চিন্তার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও আলেম-উলামার পৃষ্ঠপোষকতা।

রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি শিক্ষাকে তিনি দেখেছিলেন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, সেগুলোর জন্য ওয়াকফ সম্পদ নির্ধারণ এবং আলেমদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তিনি সেলজুক সাম্রাজ্যে একটি বিস্তৃত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁর এই উদ্যোগের সবচেয়ে স্মরণীয় নিদর্শন হয়ে আছে নিজামিয়া মাদরাসা।

বাগদাদে এক নতুন শিক্ষাকেন্দ্র

৪৫৭ হিজরিতে বাগদাদে নিজামিয়া মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয়। দুই বছর পর ৪৫৯ হিজরির জিলকদ মাসে এর নির্মাণ শেষ হয়। মাদরাসার উদ্বোধন হয়েছিল জাঁকজমক আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, বাগদাদের বিপুলসংখ্যক মানুষ এ উপলক্ষে সমবেত হয়েছিল। রাজধানীর প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।

তবে নিজামিয়ার গুরুত্ব শুধু তার বিশাল ভবন কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

বাগদাদের সর্বজনমান্য আলেম আবু ইসহাক সিরাজিকে নিজামিয়ার প্রধান অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি প্রথমে সম্মত হননি। তখন আবু নসরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় বিশ দিন পর আবু ইসহাক সিরাজি সম্মত হলে তিনি নিজামিয়ায় পাঠদান শুরু করেন।

এরপর একে একে ইসলামী জ্ঞানজগতের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। ইমাম আবু হামিদ গাজ্জালি, ইবনে খতিব তাবরিজি, আবুল হাসান ফাসিহিসহ বহু মনীষী বিভিন্ন সময়ে নিজামিয়ার শিক্ষকতা ও নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইমাম আহমদ গাজ্জালি এবং আবুল মাআলি কুতুবুদ্দিন শাফেয়ির মতো আলেমরাও এখানে অধ্যাপনা করেছেন।

নিজামিয়ায় অধ্যাপনা করা সে সময়ের আলেমদের কাছে ছিল বিশেষ মর্যাদার বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ইসলামী জ্ঞানজগতের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতেরা। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই নিযামিয়া পরিণত হয় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্রে।

একটি মাদরাসা থেকে বিস্তৃত শিক্ষানেটওয়ার্ক

নিজামুল মুলকের উদ্যোগ বাগদাদে থেমে থাকেনি। সেলজুক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরেও নিজামিয়া ধারার মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। হেরাত, নিশাপুর, ইসফাহান, মসুলসহ বিভিন্ন শহরের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে খ্যাতিমান আলেমদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

হেরাতের নিজামিয়ায় অধ্যাপনা করেছেন ইমাম গাজ্জালির শিষ্য আবু সাইদ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া। মসুলের নিজামিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আবু হামিদ মুহিউদ্দিন। ইসফাহানের নিজামিয়াতেও উরজানির মতো প্রাজ্ঞ আলেম শিক্ষকতা করেছেন।

ফলে নিজামিয়া একটি নির্দিষ্ট শহরের একটি মাদরাসার নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সেলজুক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নগরকে সংযুক্ত করা একটি বৃহৎ শিক্ষানেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

শিক্ষায় বিনিয়োগ, নাকি সেনাবাহিনীতে?

নিজামুল মুলকের শিক্ষানুরাগের একটি বহুল আলোচিত ঘটনা জড়িয়ে আছে সুলতান মালিক শাহের সঙ্গে। কথিত আছে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি একসময় সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি নিজামুল মুলককে প্রশ্ন করেন—এত অর্থ শিক্ষার পেছনে ব্যয় না করে যদি সেনাবাহিনী গঠনে ব্যয় করা হয়, তাহলে তো সাম্রাজ্যের আরও বিস্তার ঘটানো সম্ভব।

নিজামুল মুলক তখন শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে একটি চমৎকার উপমা দেন। তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর হয়তো কয়েক মাইল দূরে গিয়ে পৌঁছাবে, কোনো শহর জয় করবে, সাম্রাজ্যের সীমানা বাড়াবে। কিন্তু জ্ঞানসাধকদের দোয়ার তীর আসমান পেরিয়ে আরশ পর্যন্ত পৌঁছায়। তাদের জ্ঞান ও দোয়ার আলো কেবল একটি রাজ্য নয়, গোটা দুনিয়াকে আলোকিত করতে পারে।

কথিত আছে, নিজামুল মুলকের এই ব্যাখ্যায় মালিক শাহ এতটাই প্রভাবিত হন যে তিনি আরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।

কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নিজামিয়া?

নিজামিয়া প্রতিষ্ঠার পেছনে শুধু শিক্ষাবিস্তারের আকাঙ্ক্ষা ছিল এমনটা বললে এর পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে সেলজুক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতাও জড়িত ছিল।

একদিকে প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ ও যোগ্য মানুষ তৈরি করা। অন্যদিকে সে সময়কার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুন্নি মতাদর্শকে শক্তিশালী করাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেলজুক সাম্রাজ্যে ইসমাইলি ও বাতেনি মতবাদের প্রভাব বাড়ছিল। তারা কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে নিজেদের মতাদর্শ প্রচার করত। রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি এ নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তৈরি হয়েছিল।

এই বাস্তবতায় নিজামিয়া মাদরাসাগুলো হয়ে ওঠে সুন্নি জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আকিদা, ফিকহ, হাদিস ও ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলার ক্ষেত্রও তৈরি হয় এখানে।

এই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ইমাম গাজ্জালি। ১০৯১ সালে তাঁকে বাগদাদ নিজামিয়ায় অধ্যাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামী দর্শন, আকিদা ও ধর্মতত্ত্বের নানা প্রশ্নে যে গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করেন, তা মুসলিম চিন্তার ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

নিজামিয়ার আলো ছড়িয়ে পড়ল আরও দূরে

নিজামিয়া প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় মাদরাসা প্রতিষ্ঠার প্রবণতা আরও বিস্তৃত হয়। ইরান, খোরাসান ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কুতুবখানা গড়ে ওঠে।

ষষ্ঠ হিজরি শতকে ঐতিহাসিক ইয়াকুত হামাবি মারভ সফর করে সেখানকার বহু মাদরাসা ও গ্রন্থাগারের বিবরণ দিয়েছেন। এসব গ্রন্থাগারের মধ্যে মুসতাওফিয়া কুতুবখানা ছিল উল্লেখযোগ্য। শরফুল মুলক আবু সাইদ মুহাম্মদ ইবনে মানসুর এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মারভে উমাদিয়া ও খাতুনিয়া নামেও বড় মাদরাসার অস্তিত্ব ছিল। নিজামুল মুলকের প্রতিষ্ঠিত একটি গ্রন্থাগারেরও সেখানে উল্লেখ পাওয়া যায়।

জ্ঞানচর্চার এই বিস্তৃতি বোঝা যায় নিশাপুরের একটি ঘটনা থেকেও। ৫৫৬ হিজরিতে সেখানে সংঘটিত এক গোলযোগে ২৫টি হানাফি ও শাফেয়ি মাদরাসা ধ্বংস হয়ে যায় এবং ১২টি গ্রন্থাগার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া ও লুটের শিকার হয়। একটি শহরেই এতগুলো মাদরাসা ও গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব ছিল এই তথ্য থেকে মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তৃতি সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।

খাওয়ারিজমেও সে সময় বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে ইসলামী জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি দর্শন ও অন্যান্য বিদ্যারও চর্চা হতো। পরবর্তী সময়ে ইমাম ফখরুদ্দিন রাজির মতো মনীষীরাও এই অঞ্চলের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

নিজামিয়ার প্রতিষ্ঠার পর বাগদাদেও একের পর এক মাদরাসা গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক ইবনে জুবাইর তাঁর সফরনামায় বাগদাদের বহু মাদরাসার বিবরণ দিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের স্থাপত্য ও বিস্তৃতি এতটাই চমকপ্রদ ছিল যে, কোনো কোনোটি যেন ছোটখাটো একটি নগরীর মতো মনে হতো।

নিজামিয়ার আসল কৃতিত্ব কোথায়

মুসলিম বিশ্বের শিক্ষার ইতিহাসে নিজামিয়া মাদরাসার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—নিজামিয়াই কি প্রথম মাদরাসা?

ইতিহাসের বিস্তৃত পরিসর দেখলে বিষয়টি এত সরল নয়। নিজামিয়ার আগেও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে মাদরাসা ও শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। নিশাপুর, বাগদাদ, মিসর, খোরাসানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আলেমদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, ওয়াকফ ও শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল।

তাহলে নিজামিয়ার বিশেষত্ব কোথায়? এর উত্তর খুঁজতে হবে এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপ্তির মধ্যে। নিজামুল মুলক বিচ্ছিন্ন কিছু শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মধ্যেই থেমে থাকেননি। তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গ্রন্থাগার, ওয়াকফ, বৃত্তি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন। বাগদাদের নিজামিয়া হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে খ্যাতিমান প্রকাশ। আর বিভিন্ন শহরের নিজামিয়াগুলো মিলে তৈরি হয় একটি বিস্তৃত শিক্ষানেটওয়ার্ক।

এই কারণেই নিজামিয়া মুসলিম শিক্ষার ইতিহাসে শুধু একটি মাদরাসার নাম নয়; এটি একটি শিক্ষা-ভাবনার নাম।

সাম্রাজ্যের সীমানা একসময় বদলে গেছে, সেলজুক শাসনের রাজনৈতিক শক্তিও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু নিজামুল মুলকের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে টিকে আছে।

সামরিক বিজয় একটি সাম্রাজ্যের সীমানা বাড়াতে পারে। কিন্তু জ্ঞান একটি সভ্যতার আয়ু বাড়ায়। নিজামুল মুলকের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এখানেই। তিনি বুঝেছিলেন, একটি সাম্রাজ্যকে শুধু তলোয়ার দিয়ে শক্তিশালী করা যায়, কিন্তু একটি সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন জ্ঞান, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

  • ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত