
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অর্থনীতির সচলতার প্রধান শর্ত হলো নাগরিকদের নিরাপদ গমনাগমন। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজনে নারীদের চলাচলের স্বাধীনতা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম মানদণ্ড। এই প্রেক্ষাপটে ‘পিংক বাস’ বা নারী বান্ধব বাস সেবা কেবল এক জোড়া গণপরিবহন নয়, বরং এটি নারীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সামাজিক অগ্রগতির এক অনন্য প্রতীক।
প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে এ দেশের লাখ লাখ নারীকে এক অদৃশ্য আত্মিক ও মানসিক লড়াইয়ে নামতে হয়। তারা কেবল গন্তব্যে পৌঁছাবার দ্রুততম পথ খোঁজেন না, খোঁজেন সবচেয়ে নিরাপদ পথটিও। পোশাকের ধরন থেকে শুরু করে কোন রাস্তায় হাঁটবেন,কার পাশে দাঁড়াবেন সবকিছুই পরিমাপ করতে হয় গণপরিবহনে নিয়মিত মুখোমুখি হওয়া যৌন হয়রানি ও ভিড়ের অভিজ্ঞতার আলোকে।
নারীদের এই নিত্যদিনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভোগান্তি কমাতে সম্প্রতি 'পিংক বাস' বা নারীবান্ধব বিশেষ বাস সার্ভিসের ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। হালকা গোলাপি রঙে আঁকা এই বাসগুলোকে উপস্থাপন করা হচ্ছে নারীদের জন্য এক নিরাপদ চলাচলের মাধ্যম হিসেবে।
তবে নারীদের জন্য পৃথক গণপরিবহনের ইতিহাস কিন্তু খুব নতুন নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপ ও আমেরিকার রেলে নারীদের জন্য আলাদা কামরা বরাদ্দের মাধ্যমে এর ধারণাগত সূচনা হয়। তবে আধুনিক বাস সেবায় ‘পিংক বাস’ এর বহুল ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা শুরু হয় একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে।
২০০০ এর দশকে মেক্সিকো সিটিতে প্রথম ব্যাপকভাবে গোলাপি রঙের 'গো পিংক' বাস চালু করা হয়। এরপর ভারত, পাকিস্তান, মিশর, ব্রাজিল, ও নেপালের মতো দেশগুলোতেও নারীদের গণপরিবহনে হয়রানি ও যৌন নিগ্রহ রোধে এই বাস সেবা চালু করা হয়। ভারত ও পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে রাজ্যভিত্তিক 'পিংক বাস' প্রকল্প নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
বাংলাদেশে নারীদের জন্য পৃথক বাস সেবার ধারণাটিও নতুন নয়। এদেশে নারীদের জন্য আলাদা বাস সেবার ইতিহাস শুরু হয় বিআরটিসি'র মাধ্যমে। ৮০ ও ৯০ এর দশকে 'মহিলা বাস' নামে কিছু দ্বিতল বাস চালু হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রচারের অভাব ও পর্যাপ্ত বাসের সংকটে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের দিকে বিআরটিসি পুনরায় নারীদের জন্য বিশেষ বাস চালু করে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের কথা চিন্তা করে 'পিংক বাস' বা নারীদের জন্য সংরক্ষিত বাস চালুর দাবি ও উদ্যোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
যদিও গণপরিবহনে নারীদের ভিড়, কটুকাটব্য এবং শারীরিক হয়রানির শিকার হওয়া একটি বৈশ্বিক সমস্যা, পিংক বাস এই সমস্যাগুলোর একটি কার্যকর ও তাৎক্ষণিক সমাধান এনে দেয়।
প্রথমত, নারীরা যখন জানেন যে তাঁদের যাতায়াত নিরাপদ, তখন তাঁরা দূরবর্তী স্থানে গিয়েও কাজ করতে দ্বিধা করেন না। পিংক বাস নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে আত্মবিশ্বাস জোগায়।
দ্বিতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা হয়রানি ও ভিড়ের ভয়ে অনেক সময় দূরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। পিংক বাস তাঁদের জন্য একটি সুরক্ষিত মাধ্যম তৈরি করে। তৃতীয়ত, প্রতিদিনের যাতায়াতে হয়রানির ভয় না থাকায় এটি নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি অনেক নারীর জন্য সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এলেও, মূল নীতিগত জায়গায় এটি একটি মারাত্মক বার্তা দেয়। পিংক বাস মূলত মূল সমস্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এটি পরোক্ষভাবে মেনে নেয় যে, সাধারণ গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।
পিংক বাস ধারণার মূল সংকট হলো, এটি সমস্যার সমাধান না করে উল্টো তার চরিত্রকে স্থায়ী রূপ দেয়। নারীদের জন্য আলাদা বাস বরাদ্দ করে নগর কর্তৃপক্ষ আসলে সমাজকে একটি ক্ষতিকর বার্তা দেয়—সাধারণ বাসগুলো পুরুষদের জন্য, আর সেখানে নারীদের যাতায়াত ঝুঁকি সাপেক্ষ। এটি নিরাপত্তার দায় পুরোপুরি নারীর উপর চাপিয়ে দেয়। সাধারণ বাসে কোনো নারী হয়রানির শিকার হলে মানুষ তখন অবলীলায় প্রশ্ন ওঠাবে "কেন তিনি পিংক বাসের জন্য অপেক্ষা করলেন না?"
নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা বা বিলাসিতা হতে পারে না; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বাস্তবমুখী বিচারে, একটি পুরো শহরে নারীদের চাহিদার তুলনায় পিংক বাসের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। সীমিত রুট ও নির্দিষ্ট সময়ের কারণে নাইট শিফটে কাজ করা বা প্রান্তিক এলাকার কর্মজীবী নারীদের কাছে এই সুবিধা প্রায় অকার্যকর।
আর তাই, যদিও পিংক বাস তাৎক্ষণিক স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর কিছু চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
স্বল্পতা ও অনিয়মিত সময়সূচি: চাহিদার তুলনায় পিংক বাসের সংখ্যা কম হওয়ায় নির্দিষ্ট বাসটি কখন আসবে তা জানার কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা অধিকাংশ জায়গায় নেই। ফলে নারীদের দীর্ঘ সময় বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়, যা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে এবং তাঁদের নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
মূল সমস্যার আড়াল: অনেক বিশ্লেষকের মতে, নারীদের জন্য আলাদা বাস চালু করা একটি 'সাময়িক সমাধান'। এটি মূল সমস্যা—অর্থাৎ মূলধারার গণপরিবহনে পুরুষদের মানসিকতা ও আচরণের পরিবর্তন ঘটাতে সহায়তা করে না, বরং নারীদের আলাদা করে ফেলে।
পিক ও অফপিক আওয়ারের অর্থনৈতিক সমীকরণ: ঢাকার মতো শহরে অফিস বা স্কুল শুরুর এবং ছুটির সময় (পিক আওয়ার) পিংক বাসে প্রচণ্ড ভিড় হয়। কিন্তু দুপুরের দিকে বা অফপিক আওয়ারে বাসগুলো প্রায় খালি অবস্থায় যাতায়াত করে। অতীত বলে, সার্বিক পরিচালনা খরচ তুলতে না পেরে বিআরটিসি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেয় বা রুট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। অপরদিকে, পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় বা নির্দিষ্ট রুটে শুধু নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রী হওয়ায় পরিবহন সংস্থাগুলো অনেক সময় পিংক বাস পরিচালনাকে লাভজনক মনে করে না।
কিশোর সন্তান: সাধারণত পিংক বাস বা নারীদের জন্য সংরক্ষিত বাসে ছোট শিশুদের (ছেলে বা মেয়ে) মা বা নারী অভিভাবকের সঙ্গে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ছেলেসন্তানের বয়স যদি ১২ থেকে ১৪ বছর অতিক্রম করে বা তাকে শারীরিক গঠনে একজন পূর্ণবয়স্ক কিশোর/তরুণ মনে হয়, তবে বাসের সুপারভাইজার বা অন্য নারী যাত্রীদের পক্ষ থেকে অনেক সময় আপত্তি ওঠে। সার্বজনীন কোনো নির্দিষ্ট আইনি নীতি না থাকায় ক্ষেত্রবিশেষে এটি চালক ও বাসের সহকারীদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
অসুস্থ নারীর সাথে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অভিভাবক: আমি মনে করি, এটি পিংক বাসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি। নীতিগতভাবে পিংক বাসে কোনো পূর্ণবয়স্ক বা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে উঠতে দেওয়া হয় না, তা তিনি কোনো অসুস্থ বা বৃদ্ধা নারীর অভিভাবক, স্বামী বা সহায়তাকারী হলেও। ফলে কোনো অসুস্থ নারী একা যাতায়াত করতে না পারলে, তাঁর পক্ষে পিংক বাস ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তাঁদের সাধারণ গণপরিবহন বা বিকল্প বাহন বেছে নিতে হয়। যা অনেক নারীদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ চাহিদা ও জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের অবহেলা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চালু হওয়া সাধারণ বা পিংক বাসগুলোর বেশিরভাগই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) নারীদের ওঠার উপযোগী নয়। হুইলচেয়ার ওঠার র্যাম্প কিংবা বয়স্ক নারীদের জন্য ওঠানামার সহজ ব্যবস্থা না থাকায় জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা এই সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
নারী চালক ও সহকারী সংকট: বিশ্বজুড়ে অনেক দেশে পিংক বাসের চালক, কনডাক্টর এবং সুপারভাইজার সবাই নারী হলেও বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। এদেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পেশাদার নারী চালক ও বাসের স্টাফের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে নারী বাসগুলোতে চালক ও হেল্পারদের বড় অংশই পুরুষ। এটি অনেক সময় নারীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও বাসের মূল ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
ফলে আমাদের যা প্রয়োজন, তা হলো পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে সবার জন্য নিরাপদ করা, নারীদের আলাদা করে সরিয়ে রাখা নয়। এর জন্য নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রশাসনকে কয়েকটি মূল জায়গায় কাজ করতে হবে। প্রতিটি বাস ও বাস স্টপে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং ইমার্জেন্সি বাটন সংযোগ করতে হবে। পিংক বাস সহ প্রতিটি বাসে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আনয়ন করতে হবে যাতে বাসটির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা সহজ হয়।
বাসে প্রশিক্ষিত পরিদর্শক ও নিরাপত্তা কর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মোবাইল অ্যাপ বা দ্রুত মেসেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়রানির তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাসে নারী নির্যাতনকারী বা হয়রানিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে একটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সর্বোপরি প্রতিটি স্কুলে এবং পরিবারে শিশুকাল থেকে নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে, লিঙ্গভিত্তিক নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে যেন এই শিশুরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হয়ে উঠবে তখন তাদের মধ্যে যেন লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমূলক আচরণ তৈরি না হয়।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ‘পিংক বাস’ কোনো স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার প্রতীক বা কেবল একটি পরিবহন সেবা নয়, এটি নারীদের নিরাপদে চলাচলের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত, সমতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সেতু। যতদিন না সাধারণ গণপরিবহন নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সম্মানজনক হয়ে উঠছে, ততদিন পিংক বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, রুট সচল রাখা এবং নিয়মিত সময়সূচি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
তবে, বাংলাদেশে এই সেবা সফল করতে হলে শুধু বাসের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না; প্রয়োজন আধুনিক রুট ট্র্যাকিং অ্যাপ, নমনীয় অভিভাবক নীতিমালা এবং বাসে নারী স্টাফ বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। সবচেয়ে বড় কথা, পিংক বাস যেন স্থায়ী কোনো 'বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা' না হয়ে ওঠে। মূলধারার সাধারণ বাসগুলোতে চালক সহকারীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, কঠোর আইন এবং পুরুষ যাত্রীদের মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমেই কেবল প্রতিটি পরিবহনকে সবার জন্য সমান নিরাপদ করা সম্ভব।
পিংক বাস হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই মূল সমস্যা সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। নারীদের এমন একটি শহরের দরকার নেই যেখানে নিরাপদে চলতে হলে তাদের আলাদা হয়ে থাকতে হয়। দিনশেষে নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের যেকোনো বাসে, যেকোনো সময়ে নিরাপদে যাতায়াত করার অধিকার রয়েছে। রং মেখে সমস্যা ঢেকে রাখার সময় পার হয়ে গেছে, এখন পুরো ব্যবস্থাটা বদলানোর সময়।
- লেখক: সিনিয়র লেকচারার, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
.png)
-b52d51.jpeg)
-028855-256x144.webp)




