মৃত্যুবার্ষিকী/শাহ আবদুল করিম যেভাবে গানে নিজের সময়কে ধরেছেন
স্ট্রিম ডেস্ক

গরু চরানোর সময় হাতে একতারা নিয়ে গান গাইতেন শাহ আবদুল করিম। যে বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে মহাজনের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে। কখনো গরু চরিয়েছেন, কখনো মুদির দোকানে কর্মচারী ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ বলতে নৈশ বিদ্যালয়ের আট দিন। এরপর সেই স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়।
শাহ আবদুল করিমের সংগীতশিক্ষা অবশ্য কোনো শ্রেণিকক্ষে হয়নি। কালনী নদী, হাওরের জল, বর্ষার দিন, গ্রামের মানুষের জীবন আর গানের আসরই ছিল তাঁর শিক্ষার জায়গা। কিশোর বয়সে গাজী-কালুর গান, কবিগান ও মালজোড়ার আসরে অংশ নিতে শুরু করেন। এসব আসরে গান ছিল একাধারে পরিবেশনা, তর্ক ও তাৎক্ষণিক সৃষ্টির বিষয়। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর গানের ভাষা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওস্তাদ কমর উদ্দিনের কাছে গানের প্রথম পাঠ নেন করিম। পরে সাধক রশীদ উদ্দিনের কাছ থেকেও শিক্ষা পান। লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, হজরত মনসুরসহ বাউল-ফকিরদের গান ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন। শরিয়ত, মারফত, নবুয়ত ও বেলায়েতের মতো তাত্ত্বিক বিষয়ও তাঁর গানে এসেছে।
তবে শাহ আবদুল করিমের গানের সবচেয়ে স্বতন্ত্র উপাদান ছিল নিজের সময় ও পরিবেশ। হাওরের মানুষ কীভাবে বাঁচে, কীভাবে কাজ করে, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে—এসব তাঁর গানে উঠে এসেছে খুব স্বাভাবিকভাবে। নদী, নৌকা, বর্ষা কিংবা গ্রামের জীবন সেখানে অভিজ্ঞতারই অংশ।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর গানে এসেছে দারিদ্র্য, বৈষম্য, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনা। পাশাপাশি ছিল দেহতত্ত্ব, মনের মানুষ, প্রেম ও বিচ্ছেদ। ফলে তাঁর গানকে শুধু আধ্যাত্মিক সংগীত বা গণসংগীত—কোনো একক পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না।
রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনেও তাঁর গান সক্রিয় ছিল। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে গান গেয়েছেন, অংশ নিয়েছেন কাগমারী সম্মেলনে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও তাঁর গান মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর কাছে গান ছিল নিজের বক্তব্য প্রকাশের পাশাপাশি জনজীবনের কথাও বলার একটি মাধ্যম।

ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর গানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। স্ত্রী আফতাবুননেছাকে তিনি ডাকতেন ‘সরলা’ নামে। দারিদ্র্যের মধ্যে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু করিমকে নাড়া দেয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে লেখা গানগুলোর একটি—‘আর জ্বালা সয় না গো সরলা / আমি তুমি দুজন ছিলাম / এখন আমি একেলা।’ এখানে বাউল দর্শনের বদলে সামনে আসে ব্যক্তিগত বিচ্ছেদের সরল ভাষা।
জানা যায়, চল্লিশের দশকেই হাওরাঞ্চলে করিমের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল। তখন তাঁর গান মূলত গ্রাম ও স্থানীয় আসরকেন্দ্রিক। পরে রেডিও, ক্যাসেট ও টেলিভিশনের মাধ্যমে তা বৃহত্তর শ্রোতার কাছে পৌঁছায়। নব্বইয়ের দশকে শহুরে শ্রোতাদের মধ্যে তাঁর গান নতুন করে পরিচিতি পায়।
এরপর করিমের গান ঢুকে পড়ে নতুন ধারায়। ব্যান্ড, ফিউশন ও রিমিক্সের মাধ্যমে তরুণ শ্রোতারা তাঁকে আবিষ্কার করে। ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’ কিংবা ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’—এসব গান লোকগানের প্রচলিত পরিবেশের বাইরে নতুন শ্রোতা পায়।
করিম এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি স্বাগতও জানাননি, আবার প্রত্যাখ্যানও করেননি। তাঁর গান নতুন শিল্পীরা গাইছেন, এতে তিনি আনন্দ পেয়েছেন; কিন্তু কথা ও সুর বিকৃত করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। বাউল পরিচয়কেও তিনি বাহ্যিক সাজসজ্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাছে বাউলজীবন ছিল একটি সাধনার পদ্ধতি।
শাহ আবদুল করিমের সংগীতের বড় একটি অংশ অবশ্য সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছে। কবিগানের আসরে একই গান দ্বিতীয়বার না গাওয়ার কথা তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হওয়া অনেক গান আর সংরক্ষিত হয়নি। তাঁর মোট গানের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন হিসাব আছে। জানা যায় তিনি পাঁচ শতাধিক গান লিখেছিলেন।

দেশের বাইরেও তাঁর গান পৌঁছেছিল জীবদ্দশায়। ১৯৬৪ ও ১৯৮৫ সালে ইংল্যান্ডে গিয়ে অনুষ্ঠান করেন। তাঁর গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং বিদেশি শিল্পীরাও তা পরিবেশন করেছেন। বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে, তাঁর সংগীত ও দর্শন নিয়ে গবেষণাও হয়েছে।
২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহ আবদুল করিম মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরও গানগুলো নতুন শিল্পীদের পরিবেশনায় ফিরে এসেছে। ডিজিটাল মাধ্যম সেই বিস্তার আরও বাড়িয়েছে।
শাহ আবদুল করিমের সংগীতের শক্তি তাঁর বিষয়বৈচিত্র্যে। একই শিল্পীর গানে পাওয়া যায় ভাটি অঞ্চলের জীবন, ব্যক্তিগত প্রেম, বাউল দর্শন, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তিনি লোকসংগীতের প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করেও নিজের সময়ের প্রশ্নগুলোকে সেখানে জায়গা দিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর গান একটি নির্দিষ্ট সময়ের দলিল হয়ে থেকেও পরের প্রজন্মের কাছেও ব্যবহারযোগ্য ও শ্রুতিমধুর থেকে গেছে।
.png)
-7be686-256x144.webp)









