
এক মাসও হাতে নেই। আগামী ১০ অক্টোবর ভোরে মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হবে দেবী আহ্বানের আয়োজন। সনাতন সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এরইমধ্যেই হয়তো দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। হয়তো প্রস্তুতি চলছিল বরিশালে পুলক চ্যাটার্জির শ্রীনাথ চ্যাটার্জি লেনের বাড়িতেও। কিন্তু এ বছর দেবীকে আহ্বান করার আগেই বেদনাদায়ক এক বিসর্জন কাব্য লিখে চির বিদায় নিয়েছেন সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি।
বিদায় বেলায় লেখা তাঁর কয়েকটি চিরকুট বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার এক ভীতিকর চিত্র তুলে ধরেছে। একটি পরিবারকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বিভীষিকাময় বাস্তবতার সামনে। ভাবুন তো একবার, এ বছর কীভাবে পূজা কাটবে পুলক চ্যাটার্জির মেয়ে প্রকৃতির! কীভাবে দিন কাটবে তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কার!
আত্মহত্যা মানুষের জীবনের এক চূড়ান্ত বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত। পেশাগত ব্যর্থতা, আর্থিক অবস্থার অবনতি, তীব্র মানসিক চাপ, শারীরিক অসুস্থতা ও সম্পর্কের সমীকরণসহ নানা কারণে অনেকেই নিজের জীবন শেষ করে দেন। চিকিৎসক ও মনঃসমীক্ষণবিদরা মনে করেন, খুব সম্ভবত একাধিক কারণ ও জটিল পরিস্থিতির কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তবে একক কোনো ঘটনার আঘাত তীব্র ও তীক্ষ্ম হলেও যে কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি হয়তো আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এই বেদনাদায়ক মৃত্যুর জন্য তাঁর সাবেক কর্মস্থলকে পুরোপুরি দায়ী করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, ঠিক তেমনি এই মৃত্যুর যথাযথ কারণ অনুসন্ধানও জরুরি। এতে হয়তো আগামীতে কাউকে পুলক চ্যাটার্জির ভাগ্যবরণ থেকে বিরত রাখা যেতে পারে। একটু মনে করিয়ে দেই ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে আরেক বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারও আত্মহননের মাধ্যমে নিজের জীবনের ইতি টেনেছিলেন। বিভুরঞ্জন সরকারও ছিলেন কর্মহীন, ভুগছিলেন শারীরিক অসুস্থতায়।
পুলক চ্যাটার্জি দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র দৈনিক সমকাল-এর বরিশাল ব্যুরোপ্রধান ছিলেন। যদিও ২০২৩ সালের দিকে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, খুব সম্ভবত এই অব্যাহতির আগে পুলক চ্যাটার্জিকে সমকাল কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছিল। তাই সমকাল কর্তৃপক্ষ অন্যায় ও অন্যায্য প্রক্রিয়ায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়েছেন, তা বলার সুযোগ নেই। পুলক চ্যাটার্জি শারীরিকভাবেও অসুস্থ ছিলেন। ফলে উপার্জনহীন এই সাংবাদিকের জীবন নিঃসন্দেহে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা ও আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালের ২২ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে একজন সাংবাদিকের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জোর সুপারিশ ছিল। প্রতিবেদনটির ‘সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও শ্রম আইন’ অংশে বলা হয়—‘সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা মূলত তাদের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের গণমাধ্যম বিকাশে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তার দিকে তেমন নজর দেওয়া হয়নি। বর্তমানে অধিকাংশ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন। তবে তাদের মধ্যে খুব কমই সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধার প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিয়েছে।’ (পৃষ্ঠা: ১১৪)
বিবিসি বাংলার সাবেক সংবাদকর্মী কামাল আহমদের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন প্রতিবেদনে যথাযথভাবেই সাংবাদিকদের আর্থিক ও চাকুরির নিরাপত্তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ছিল কিছু প্রস্তাবনাও। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা নিয়েও বিস্তারিত সুপারিশ ছিল ওই কমিশন প্রতিবেদনে। এছাড়া একজন সংবাদকর্মীর পেশাগত স্বীকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে এক করুণ পরিস্থিতি উঠে এসেছিল ওই প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়—‘বাংলাদেশ সাংবাদিকদের পেশাগত স্বীকৃতি, আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে এখন পর্যন্ত তা শ্রম আইনেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। বিগত সরকারের সময়ে গণমাধ্যমকর্মী আইন নামে একটি নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তবে তা নিয়ে জনমত যাচাই বা অংশীজনদের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। গণমাধ্যমকর্মী আইনের খসড়ায় দেখা যায়, সামান্য কিছু বিষয় ছাড়া তাতে হুবহু শ্রম আইনের ধারাগুলো সন্নিবেশিত করা হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শ্রম আইন কার্যকর করায় কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণেই সংবাদপত্র শিল্পে সাংবাদিক কর্মচারীদের স্বীকৃত অধিকারসমূহের ক্রমাগত লঙ্ঘন ঘটে চলেছে। আবার গণমাধ্যম শিল্প এখন সংবাদপত্রের বাইরেও অনেক বেশি বিস্তৃত। কিন্তু সেই অংশে কাজ করা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো জাতীয় নীতিমালা তৈরি হয়নি। ফলে বিপুল সংখ্যায় গণমাধ্যমকর্মী প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন এবং প্রতিকার পাচ্ছেন না।’ (পৃষ্ঠা: ১১৬)
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বিশেষ করে রাজধানী শহরের বাইরের সাংবাদিকদের দুর্দশা প্রতিদিন বাড়ছে। একটু বয়স ও বেতন বেশি হলেই সংবাদপত্রগুলো আগের কর্মীদের যে কোনো ছুতোয় ছাঁটাই করছেন। সংবাদকর্মীদের বাধ্য করছেন বিজ্ঞাপন সংগ্রহে, সঙ্গে মালিকের এজেন্ডা বাস্তবায়ন তো আছেই। এছাড়াও নানামুখী রাজনৈতিক- অরাজনৈতিক চাপও আছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যেগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের ট্যাগিং। সবকিছু মিলিয়ে মফস্বলের সাংবাদিকরা এক ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন। ঠিক এমন পরিস্থিতির কারণে পুলক চ্যাটার্জির করুণ প্রস্থান কি না, তা একবার ভেবে দেখা দরকার।
বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও স্বল্প জবাবদিহিতার দেশে সাংবাদিকতা খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাজধানীর বাইরের পেশাদার সাংবাদিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই সাংবাদিকরা পুলক চ্যাটার্জির ভাগ্যবরণ করুন, তা কাম্য হতে পারে না। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে আর কাউকে পুলক চ্যাটার্জি বা বিভুরঞ্জন সরকারের ভাগ্যবরণ করতে না হয়। আর কোনো প্রকৃতিকে যাতে পূজার আগে বেদনাদায়কভাবে বাবাকে হারাতে না হয়। একজন মেয়ের ওপর এই অভিঘাত ভয়াবহ।
রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
.png)






