বাব এল-মান্দেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে: লোহিত সাগরের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কী বদলে যাচ্ছে?

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

আরবি ভাষায় 'বাব এল-মান্দেব' শব্দগুচ্ছের আক্ষরিক অর্থ "চোখের জলের দ্বার"। ইতিহাসের উত্তাল পথপরিক্রমায় ভৌগোলিক বিপদসঙ্কুলতা ও নৌ দুর্ঘটনার জন্য এই প্রণালির এমন নামকরণ হলেও, একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে এটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফ লাইন হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে, বাব এল-মান্দেব প্রণালি হলো আফ্রিকা মহাদেশের শিং অংশে অবস্থিত জিবুতি ও এরিথ্রিয়া এবং আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত ইয়েমেনের মধ্যবর্তী একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক চ্যানেল।

এটি দক্ষিণ-পূর্বে ভারত মহাসাগরের অন্তর্ভুক্ত এডেন উপসাগরকে উত্তর-পশ্চিমে লোহিত সাগরের সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে। এর উত্তর দিকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে লোহিত সাগর ভূমধ্যসাগরের সাথে যুক্ত হওয়ায় বাব এল-মান্দেব মূলত এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ইউরোপ ও আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাথে যুক্তকারী সংক্ষিপ্ততম সামুদ্রিক সেতু হিসেবে কাজ করে। প্রায় ২০ মাইল (৩২ কিলোমিটার) প্রশস্ত এই জলপথটির ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত ইয়েমেনের প্রশাসনিক এখতিয়ারভুক্ত মায়ুন (পেরিম) দ্বীপ, যা প্রণালিটিকে দুটি পৃথক চ্যানেলে বিভক্ত করেছে। এর মধ্যে পূর্বের চ্যানেলটি 'বাব ইস্কান্দার' নামে পরিচিত, যার প্রস্থ মাত্র ২ মাইল এবং গভীরতা ৩০ মিটার। আর পশ্চিমের বড় চ্যানেলটি 'দাক্কা আল-মায়ুন' নামে পরিচিত, যার প্রস্থ প্রায় ১৬ মাইল এবং গভীরতা ৩১০ মিটার পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেলবাহী সুবিশাল ট্যাঙ্কার চলাচলের জন্য এই পশ্চিম চ্যানেলটিই মূলত ব্যবহৃত হয়।

লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রন

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, এএফপি এবং আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় অঞ্চলে ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আনসারুল্লাহ' (যা হুতি নামে পরিচিত) তাদের সামরিক আধিপত্য চরম মাত্রায় বিস্তৃত করেছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত মোখা শহর, বাব এল-মান্দেব প্রণালির নজরদারিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'এল-ওমারি' সেনাক্যাম্প এবং প্রণালির ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মায়ুন (পেরিম) দ্বীপের পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার দাবি করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। জিবুতি এবং ইয়েমেনের উপকূলে অবস্থানরত সরকারি বাহিনীর পিছু হটার পর হুতি যোদ্ধারা স্থল ও সমুদ্রপথে অগ্রসর হয়ে প্রণালির উত্তর-পূর্ব উপকূলীয় ধুবাব শহরেরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দখল করে।

সংবাদসংস্থা এএফপি- নিশ্চিত করেছে যে, হুতিরা বর্তমানে বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণকক্ষে কার্যত একক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই সামরিক অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি সামরিক বাহিনী মোখা বিমানবন্দর ও তৎসংলগ্ন হুতি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালালেও, ভূ-পৃষ্ঠে হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানোর মতো কোনো বড় ধরনের স্থল পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি। একই সাথে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অবিলম্বে সৌদি অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি এবং রাজনৈতিক আলোচনার আহ্বান বিশ্ব দরবারে এই ঘটনার গভীর ভূ-রাজনৈতিক মাত্রাকে উন্মোচিত করেছে।

ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের উত্থানের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

হুতি আন্দোলনের রাজনৈতিক ও আদর্শগত মূল অনুসন্ধান করতে হলে ইয়েমেনের ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর ইতিহাসের গভীরে যেতে হয়। উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে সায়দা প্রদেশ ঐতিহাসিকভাবে জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের প্রাণকেন্দ্র। শিয়া ইসলামের একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে জায়দিবাদ সুন্নি ও শিয়া ভাবধারার মধ্যবর্তী একটি উদার ধর্মীয় বিশ্বাস ধারণ করে, যারা প্রায় ১,০০০ বছর ধরে (৮৯৭ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত) ইয়েমেনের রাজনৈতিক শক্তিতে 'জায়দি ইমামাত' হিসেবে অধিপতি ছিল। ১৯৬২ সালের ইয়েমেনি বিপ্লবের মাধ্যমে রিপাবলিকান শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে জায়দিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আধিপত্য বিলুপ্ত হয় এবং তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিককরণের শিকার হতে থাকে।

১৯৮০ এর দশকের শেষভাগে এবং ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে সৌদি আরব কর্তৃক ইয়েমেনে সালাফি ও ওয়াহাবি ভাবধারার জোরদার প্রচারের জবাবে জায়দি সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এক ধর্মীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলনের সূচনা হয়। বিশিষ্ট জায়দি আলেম বদরুদ্দিন আল-হুতি এবং তাঁর সুযোগ্য সন্তান হুসাইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নেতৃত্বে ১৯৯২ সালে 'শা বাব আল-মুমিনিন' (বিশ্বস্ত তরুণ দল) গঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে এটি ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক কল্যাণ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করলেও ধীরে ধীরে তা দুর্নীতিবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং তৎকালীন ইয়েমেনের রাষ্ট্রপতি আলি আবদুল্লাহ সালেহের দুর্নীতিগ্রস্ত ও পশ্চিমামুখী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে হুসাইন আল-হুতি সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'আনসারুল্লাহ' (আল্লাহর সাহায্যকারী)। পরবর্তীতে এই হুসাইন আল-হুতির নামানুসারেই পুরো গোষ্ঠী আন্তর্জাতিকভাবে 'হুতি' নামে পরিচিতি লাভ করে।

২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক আক্রমণের পর হুতিদের মধ্যে তীব্র আমেরিকা ও ইসরায়েল বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে ওঠে। ২০০৪ সালে সালেহ সরকার হুতি নেতা হুসাইন আল-হুতিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলে সায়দা অঞ্চলে সামরিক সংঘাত শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে তিনি নিহত হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তাঁর ভাই আব্দুল মালিক আল-হুতি।

২০০৪-২০১০ সালের মধ্যে সরকার ও হুতিদের মধ্যে পরপর ৬টি রক্তক্ষয়ী ‘সায়দা যুদ্ধ’ ঘটে। দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মতে, এই যুদ্ধের ফলে একদিকে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ধসে পড়ে, অন্যদিকে হুতিরা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে গেরিলা কৌশলে পারদর্শী হয়ে ওঠে।

২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর গণঅভ্যুত্থানে পদচ্যুত হন রাষ্ট্রপতি আলি আবদুল্লাহ সালেহ। নতুন রাষ্ট্রপতি আবদ্রাব্বুহ মানসুর হাদির দুর্বল শাসন, জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার ও দেশকে ৬টি ফেডারেল অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনা রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি করে।

এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে ২০১৪ সালে হুতিরা প্রাক্তন শত্রু সালেহের অনুগত সেনা কাঠামোর সাথে অলিখিত জোট গড়ে তোলে। সেপ্টেম্বর মাসে কোনো বড় বাধা ছাড়াই তারা রাজধানী সানা দখল করে। হাদি প্রথমে এডেন এবং পরে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হুতিরা সানায় সমান্তরাল শাসন প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে হুতিরা ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর সমস্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও নৌঘাঁটির পূর্ণ কর্তৃত্ব পায়, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক নৌপথে তাদের প্রভাব বিস্তারের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ইরানের সঙ্গে হুতিদের কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক

ইরানের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক জোট ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ বা 'প্রতিরোধ অক্ষ'-এর কাঠামোগত বিবর্তনে হুতিদের অন্তর্ভুক্তি কেবল এক সাধারণ রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং এক মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার আসাদ সরকার, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস এবং ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ ছিল এই প্রতিরোধ অক্ষের মূল স্তম্ভ। তবে ২০১৪ পরবর্তী সময়ে আনসারুল্লাহ (হুতি) আন্দোলনের কৌশলগত উত্থান তেহরানের জন্য নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করে।

ইরানি নীতিনির্ধারকদের কাছে হুতিরা ভৌগোলিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অবস্থানে অবস্থিত যা সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্ত ঘেঁষে সরাসরি মার্কিন সামুদ্রিক আধিপত্যের কেন্দ্রস্থল লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'চ্যাথাম হাউস' এর বিশ্লেষণ অনুসারে, অতীতে তেহরান-সানা সম্পর্ক প্রধানত ধর্মীয় ও মতাদর্শিক সহানুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ইয়েমেন যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে এটি একটি নিবিড়, প্রাতিষ্ঠানিক ও অত্যন্ত সমন্বিত সামরিক জোটে রূপান্তরিত হয়েছে। হুতিরা কেবল ইরানের নির্দেশ পালনকারী সাধারণ কোনো প্রক্সি হিসেবে কাজ করে না; বরং তারা নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক সত্তা বজায় রেখে তেহরানের আঞ্চলিক কৌশলগত লক্ষ্য বিশেষ করে মার্কিন প্রভাব বলয় প্রতিহতকরণ এবং ইসরায়েলি কৌশলগত ঘেরাও বাস্তবায়নে প্রধান কার্যকর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

হুতিদের আধুনিক সামরিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ইরানের রিভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্স। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্র ও চোরাচালান রুট ব্যবহার করে ইরান হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে।

ইরানি নকশার ভিত্তিতে হুতিরা সোভিয়েত ‘স্কাড’ রূপান্তর করে দীর্ঘপাল্লার ‘বুর্কান-২এইচ’ ও ‘কুদস’ ক্রুজ মিসাইল এবং ‘কাসেফ’ ও ‘সামাদ-৩’ আত্মঘাতী ড্রোন নির্মাণ করে। এছাড়া লোহিত সাগরে আক্রমণের জন্য ‘নূর’ ও ‘আল-মান্দেব’ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং বিস্ফোরকবাহী বোট প্রদান করা হয়। সুইডেনভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস ইন্সটিটিউট এর মতে, কেবল সরাসরি অস্ত্র নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে সানার ভূগর্ভস্থ কর্মশালায় হুতিদের নিজস্ব অ্যাসেম্বল সক্ষমতা তৈরি করে দিয়েছে ইরান।

ইরানের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের একটি মৌলিক নীতি হলো 'অসমমিতিক যুদ্ধ' এবং নিজ সীমান্ত থেকে বহু দূরে প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে শত্রুকে ব্যস্ত রাখা। লোহিত সাগরে হুতিদের এই সামরিক অগ্রগতি তেহরানকে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ছিল পশ্চিমা বিশ্ব এবং সানাই অঞ্চলে থাকা মার্কিন মিত্রদের (যেমন: মিসর, সৌদি আরব ও ইসরায়েল) একচ্ছত্র প্রভাবাধীনে। কিন্তু বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের অবস্থানের মাধ্যমে তেহরান সুদূর পারস্য উপসাগরের সীমা ছাড়িয়ে লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বারে নিজেদের পরোক্ষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সিআইএ ও আল-জাজিরার কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এর মাধ্যমে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে যদি ইরান বা তার পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ করা হয় কিংবা তার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল না করা হয়, তবে তেহরান কেবল হরমুজ প্রণালি নয়, বরং বাব এল-মান্দেব প্রণালি অবরুদ্ধ করে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম।

বাব এল-মান্দেব প্রণালির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ভূ-রাজনীতিতে 'চোকপয়েন্ট' বলতে এমন একটি সংকীর্ণ ও কৌশলগত জলপথকে বোঝায়, যা দুটি বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চলকে যুক্ত করে এবং যার ওপর একক কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণ বা অবরোধ পুরো বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে অচল করে দিতে পারে। বাব এল-মান্দেব প্রণালি হলো বৈশ্বিক সামুদ্রিক মানচিত্রের অন্যতম স্পর্শকাতর ও অপরিহার্য চোকপয়েন্ট।

ভৌগোলিক দিক থেকে এটি ভারতীয় মহাসাগর ও এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগরের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর তথা আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে। উত্তর দিকে কৃত্রিমভাবে নির্মিত সুয়েজ খাল এবং দক্ষিণে প্রকৃতির তৈরি বাব এল-মান্দেব প্রণালি এই দুটি সামুদ্রিক তোরণ মূলত বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে ব্যস্ততম নৌপথ হিসেবে কাজ করে। যদি বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়, তবে উত্তরে সুয়েজ খাল তার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক উপযোগিতা প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। কারণ এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী পণ্যবাহী বা তেলবাহী জাহাজগুলো বাব এল-মান্দেব অতিক্রম না করতে পারলে কোনোভাবেই সুয়েজ খালে পৌঁছাতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা এবং ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এর ডাটাবেজ অনুসারে, সমগ্র বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ১০% থেকে ১২% এবং মোট কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ৩০% এই সংক্ষিপ্ত বাব এল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করে সম্পাদিত হয়। প্রতি বছর প্রায় ১৭,০০০ থেকে ২০,০০০ পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে, যার মোট বাণিজ্যের অর্থনৈতিক মূল্য ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।

জ্বালানি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বাব এল-মান্দেব প্রণালির ভূমিকা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো (সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত) থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬.২ মিলিয়ন থেকে ৮.৮ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রেরণের উদ্দেশ্যে এই প্রণালি অতিক্রম করে। কাতার এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক বিশ্ব এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৮% থেকে ১০% এই লোহিত সাগরীয় পথ দিয়ে ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছায়।

এশিয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হাবগুলো (চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম) থেকে তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স এবং যন্ত্রপাতি এবং ইউরোপ থেকে খাদ্যশস্য (যেমন: গম, ভুট্টা) এই জলপথ দিয়েই দ্রুততম সময়ে দুই মহাদেশের মধ্যে আদান-প্রদান করা হয়ে থাকে।

বাব এল-মান্দেব প্রণালির সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব

বাব এল-মান্দেব প্রণালির ভৌগোলিক গঠন এমন যে, এখানে উপকূলীয় ভূমি এবং দ্বীপগুলোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকে, সে খুব সহজেই সমগ্র সামুদ্রিক চ্যানেলের নিরাপত্তা বা গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। প্রণালির ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইয়েমেনি ভূখণ্ড 'মায়ুন' বা 'পেরিম' হলো একটি আগ্নেয়গিরিজাত দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় ১৩ বর্গকিলোমিটার।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই মায়ুন দ্বীপ দখল করে সেখানে শক্তিশালী নৌঘাঁটি ও বাতিঘর স্থাপন করেছিল, যা দিয়ে তারা সমগ্র লোহিত সাগরের মুখে ব্রিটিশ রাজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করত। পরবর্তীতে স্নায়ুযুদ্ধের যুগে দক্ষিণ ইয়েমেন এবং ইথিওপিয়ায় সোভিয়েত প্রভাবের সময়ও মায়ুন দ্বীপ ছিল অন্যতম প্রধান কৌশলগত পর্যবেক্ষণে রাখার ক্ষেত্র।

হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের ঐতিহাসিক মোখা ও ধুবাব উপকূলীয় অঞ্চল দখল এবং এর সাথে সাথে মায়ুন দ্বীপের পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়া এক বিরাট কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ধুবাব ও মোখা অঞ্চলের উঁচু পাহাড়ি টিলা এবং মায়ুন দ্বীপে আধুনিক সারফেস-টু-সারফেস রাডার, ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং ড্রোন লাঞ্চার বসিয়ে হুতিরা সমগ্র বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরের প্রবেশদ্বারে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজের সুনির্দিষ্ট গতিপথ ও পরিচয় মুহূর্তে সনাক্ত করতে সক্ষম। উপকূলীয় মোখা ও ধুবাব অঞ্চল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলো খুব সহজেই হুতিদের স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল এবং আত্মঘাতী ড্রোনের নাগালে চলে আসে।

মায়ুন দ্বীপে অবস্থিত রানওয়ে এবং সামরিক পরিকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ হলো, যেকোনো সামুদ্রিক জোটের (যেমন: মার্কিন বা পশ্চিমা জোট) বিরুদ্ধে খুব কাছ থেকে ছোট আকারের দ্রুতগামী বিস্ফোরকবাহী রিমোট বোট পরিচালনা করা এবং পুরো চ্যানেলে সামুদ্রিক মাইন স্থাপন করে সামুদ্রিক চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এবং বাব এল-মান্দেবে হুতিদের আধিপত্যের কৌশলগত প্রভাব কী হতে পারে?

মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক ভৌগোলিক মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিমে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের দুটি প্রধান তোরণ রয়েছে একটি হলো পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি, এবং অপরটি হলো লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত বাব এল-মান্দেব প্রণালি।

পারস্য উপসাগরে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস এর নৌবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির উত্তর উপকূল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহারের প্রায় ২০% থেকে ৩০% অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে, লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং এর সংলগ্ন এলাকা বর্তমানে তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হুতিদের সম্পূর্ণ সামরিক হস্তগত।

বিশ্ব ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একক সামরিক ও কৌশলগত অক্ষ মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান ও সবচেয়ে সংবেদনশীল সামুদ্রিক কৌশলগত প্রবেশদ্বারের নিয়ন্ত্রণ একই সাথে নিজেদের হাতে নেওয়ার মতো সক্ষমতা তৈরি করেছে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস' এর কৌশলগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির এই দ্বিমুখী কৌশলগত সংযোগ বা "টুইন চোকপয়েন্ট লিভারেজ" তেহরানকে পশ্চিমা বিশ্ব, ইসরায়েল এবং তাদের বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর একটি অভূতপূর্ব ‘কৌশলগত ভিটো’ প্রদান করেছে। যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় বা তার পারমাণবিক ও তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়, তবে তারা একযোগে হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব এই দুই তোরণ বন্ধ করে দিয়ে পুরো পশ্চিমা অর্থনীতিকে নিমেষে অবশ করে দেওয়ার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা লাভ করেছে।

বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার পারদ চড়ার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ইতোমধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও ভূ-রাজনৈতিক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর বহুমুখী প্রভাব সুস্পষ্ট। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি-র তথ্যমতে, বাব এল-মান্দেবে হুতিদের উপস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদন্ড 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার অতিক্রম করেছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের বিশাল বিশাল শিপিং জায়ান্টগুলো লোহিত সাগরের এই বিপজ্জনক পথ পরিহার করে তাদের কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত 'উত্তমাশা অন্তরীপ' দিয়ে ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হবে।

এশিয়া থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুদামজাতকরণ খরচ মারাত্মকভাবে বাড়ছে, যা ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে নতুন করে জীবনযাত্রার ব্যয় ও তীব্র মূল্যস্ফীতি ডেকে আনবে।

অর্থনৈতিক ধাক্কা কেমন হতে পারে?

লোহিত সাগরে হুতিদের অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, ড্রোন ও সামুদ্রিক মাইনের ভয়ে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ চরম আকার ধারণ করেছে। লন্ডনের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বীমা সমিতিগুলো লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রমকারী যেকোনো জাহাজের জন্য তাদের বীমা প্রিমিয়ামের হার বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সংকটের পূর্বে যা ছিল জাহাজের মোট মূল্যের মাত্র ০.০৫%, সামরিক উত্তেজনার মুখে তা লাফিয়ে ০.৭৫% থেকে ১% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর অর্থ হলো একটি ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যবাহী কন্টেইনার জাহাজের জন্য কেবল লোহিত সাগর অতিক্রম করতেই অতিরিক্ত ৭,৫০,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত কেবল বীমা প্রিমিয়াম গুনতে হবে।

সুয়েজ খাল ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি এড়িয়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে জাহাজ চলাচল করলে প্রতিটি ট্রিপে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৪ দিন অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয় এবং জাহাজগুলোকে প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৩,৮০০ সামুদ্রিক মাইল অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়।

ফিনান্সিয়াল টাইমস এর এক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে প্রতিটি বিশাল কন্টেইনার জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়ার কারণে কেবল অতিরিক্ত জ্বালানি বাবদ প্রতি ট্রিপে প্রায় ১ মিলিয়ন (১০ লাখ) মার্কিন ডলার অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক ধাক্কা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়বে, যা কোভিড-পরবর্তী ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতিকে এক নতুন মন্দার দিকে ঠেলে দিবে।

লোহিত সাগরে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

লোহিত সাগরে হুতিদের কৌশলগত আধিপত্য বিস্তার পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা পুনরুদ্বারের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য পশ্চিমা মিত্রদের সমন্বয়ে ‘অপারেশন প্রস্পারিটি গার্ডিয়ান’ শীর্ষক বহুজাতিক সামুদ্রিক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিজস্ব উদ্যোগে ‘অপারেশন অ্যাস্পাইডস’ শুরু করে।

তবে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট এবং বেলফার সেন্টার এর সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পশ্চিমা সামুদ্রিক জোটগুলোর কৌশলগত কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন ও ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজগুলো আকাশপথে গাইডেড মিসাইল এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেনি। হুতিদের বহু ভূগর্ভস্থ অস্ত্র ভাণ্ডার, গতিশীল ড্রোন লাঞ্চার এবং পাহাড়ি মিসাইল প্যাড ধ্বংস করা বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রায় অসম্ভব।

এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক সমীকরণ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। হুতিদের একটি সাধারণ আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করতে খরচ হয় মাত্র ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ ডলার, যা ধ্বংস করতে পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজগুলোকে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একেকটি ‘এসএম-২’ বা ‘অ্যাস্টার-৩০’ ইন্টারসেপ্টর মিসাইল নিক্ষেপ করতে হচ্ছে। এই অসম আর্থিক ও সামরিক সমীকরণের কারণে মার্কিন ও ব্রিটিশ নৌবাহিনী দীর্ঘমেয়াদে লোহিত সাগরে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান

বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ কেবল পশ্চিমাদের নয়, বরং পূর্বের উদীয়মান পরাশক্তি এবং লোহিত সাগরীয় আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য গুরুতর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে চীনের অর্থনীতি সুয়েজ খাল ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। জিবুতিতে চীনের একমাত্র বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও বেইজিং সরাসরি সামরিক জোটে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। চীনের জাহাজগুলোর ওপর হুতিরা সরাসরি আক্রমণ না করলেও, বৈশ্বিক শিপিং খরচ বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় বাজারে চীনা পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়া বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ কে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

মস্কো লোহিত সাগরের এই সংকটকে পশ্চিমা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যকে দুর্বল করার একটি চমৎকার সুযোগ হিসেবে দেখে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে রাশিয়া মূল সংকটের সমাধান হিসেবে গাজা যুদ্ধ বন্ধ ও আঞ্চলিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে।

এই সংকটে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মিসর। বাব এল-মান্দেব অবরুদ্ধ হওয়ায় সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল অর্ধেকে নেমে এসেছে, যার ফলে সুয়েজ খাল থেকে মিসরের বাৎসরিক রাজস্ব আয় ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত হ্রাস পাবে।

প্রণালির ঠিক উল্টো তীরে অবস্থিত জিবুতি তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন, ফরাসি ও চীনা ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে অস্বীকার করেছে, যাতে হুতিদের সরাসরি আক্রমণ তাদের ভূখণ্ডে না আসে। রিয়াদ চরম সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; কারণ তারা হুতিদের সাথে তাদের ভঙ্গুর শান্তি আলোচনা ভণ্ডুল করতে চায় না। অন্যদিকে, স্থলবেষ্টিত দেশ ইথিওপিয়া তাদের বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথের ওপর চরম অনিশ্চয়তা অনুভব করছে।

অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তির হাতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের চাবিকাঠি

বাব এল-মান্দেব প্রণালির বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা নির্দেশ করে। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ন্ত্রণ কেবল আধুনিক রাষ্ট্রভিত্তিক শক্তিশালী নৌবাহিনীগুলোর (যেমন: ইউএস নেভি, রয়েল নেভি) হাতে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু হুতিদের দ্বারা সমগ্র বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দখল প্রমাণ করেছে যে, একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং সামুদ্রিক মাইনে সজ্জিত একটি অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তি অতি সহজেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পরাশক্তি ও বাণিজ্য জোটগুলোকে একাই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। এটি সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রথাগত সংজ্ঞাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। কৌশলগত এই রূপান্তরটি বিশ্ব বাণিজ্যের চাবিকাঠিকে রাষ্ট্রহীন বা আঞ্চলিক মিলিশিয়াগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক প্রণালিতেও একই ধরণের অসমযুদ্ধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিসমূহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইয়েমেনের সায়দা পাহাড় থেকে উৎসারিত জায়দি আন্দোলন ‘আনসারুল্লাহ’ (হুতি)-র বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং এর কৌশলগত কেন্দ্র মায়ুন দ্বীপ দখল কেবল ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের কোনো অভ্যন্তরীণ অধ্যায় নয়; এটি লোহিত সাগরের ভূ-রাজনৈতিক নকশাকে নতুন করে একে দিয়েছে। তেহরানের 'অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স'-এর নিবিড় সামরিক ও প্রযুক্তিগত সাহায্যে গঠিত এই ক্ষমতা কাঠামো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম সংক্ষিপ্ত সামুদ্রিক তোরণকে নিজেদের কৌশলগত চাপ সৃষ্টির চাবকাঠিতে পরিণত করেছে। এর তাৎক্ষণিক পরিণতি হিসেবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, ট্রানজিট খরচ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অভূতপূর্ব অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বশক্তির সামুদ্রিক টাস্কফোর্স কিংবা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কেউই এখন পর্যন্ত এই অ-রাষ্ট্রীয় পরাশক্তিটিকে সমুদ্রপথ থেকে হটাতে সক্ষম হয়নি।

লোহিত সাগরে স্থায়ী নিরাপত্তা ও বিশ্ব বাণিজ্যকে পুনরায় ঝুঁকিমুক্ত করতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পথ ছেড়ে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকে হাঁটতে হবে। ইয়েমেনে হুতিদের বাদ দিয়ে কিংবা কেবল সামরিক উপায়ে বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। তাই সৌদি-হুতি দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে পূর্ণাঙ্গ জাতিসংঘ মধ্যস্থতাকৃত জাতীয় শান্তি চুক্তিতে রূপান্তর করা জরুরি, যেখানে ইয়েমেনি ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব এবং নৌপথের অবাধ চলাচলের অধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বাব এল-মান্দেব প্রণালির সংকটটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক ভূ-রাজনীতি বিশেষ করে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরী সম্পর্কের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী অস্ত্রসংবরন এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত না হলে লোহিত সাগরে স্থায়ী শান্তি আনা অসম্ভব।

ভবিষ্যতে লোহিত সাগরীয় অঞ্চল এক নতুন বহু-পাক্ষিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখানে আর একক কোনো পশ্চিমা পরাশক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না; বরং হুতিদের মতো অ-রাষ্ট্রীয় আঞ্চলিক গোষ্ঠী, ইরান, চীন, রাশিয়া এবং লোহিত সাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোকে সাথে নিয়েই বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার নতুন চুক্তি ও কাঠামো তৈরি করতে হবে। অন্যথায়, বাব এল-মান্দেব প্রণালি বা "শোকাশ্রুর ফটক" দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির জন্য এক স্থায়ী উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই থেকে যাবে।

  • লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত