আইন করে গালাগাল বন্ধ করা যাবে?

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ৫৬
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজনৈতিক বিতর্কের সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে জাতীয় সংসদ। এই সংসদেই সম্প্রতি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি দলের কিছু সংসদ সদস্য তাঁকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

সংসদীয় বিতর্কের সৌন্দর্যই হলো একজন সদস্য সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করবেন, অন্যজন তার জবাব দেবেন; কিন্তু সেটি কোনোভাবেই ব্যক্তিগত অপমান বা আক্রমণে রূপ নেবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুজন প্রয়াত পার্লামেন্টারিয়ানের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। ওই ঘটনার সাক্ষী আমি নিজেই। নবম সংসদে কোনো একটা বিষয় নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল। তখন বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ফ্লোর নিয়ে বললেন, ‘মাননীয় স্পিকার বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বলে এখানে উল্লেখ করতে পারছি না।’ জবাবে আওয়ামী লীগের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, কে কী স্পর্শ করলে কাতর হয়, সেটা বলা মুশকিল।’ তখন সংসদে হাসির রোল পড়ে যায়।

রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও দুজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান একটি অশ্লীল ইঙ্গিত করলেও সেখানে কোনো শাব্দিক অশ্লীলতা ছিল না। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিষোদ্গার ছিল না। যদিও এই নবম সংসদেই দুই দলের সংরক্ষিত নারী আসনের বেশ কয়েকজন সদস্য দুটি দলের জীবিত ও প্রয়াত নেতাদের নিয়ে যেভাবে বিষোদ্গার করেছেন; গালাগাল করেছেন—সেটি খুবই লজ্জার। তৎকালীন স্পিকার আব্দুল হামিদ অসংসদীয় ভাষায় বক্তব্যের বিষয়ে রুলিং দিয়েছেন। অনেক শব্দ এক্সপাঞ্জ (প্রত্যাহার) করেছেন। একই সংসদে গালাগালি ও বিষোদ্গার যেমন হয়েছে, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কও হয়েছে।

এবার আসা যাক সোশ্যাল মিডিয়ায় গালাগাল, অশ্লীলতা ও অবমাননার প্রসঙ্গে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারার অপব্যবহারের কারণে এ নিয়ে অব্যাহত বিতর্কের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ সালে তৈরি করেছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সেখানেও কথিত ধর্মীয় অবমাননা এবং মানহানির সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ছিল না। রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে আইনটির যথেচ্ছ প্রয়োগ হয়েছে। অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে কথিত মানহানির অভিযোগে অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকে জেল খেটেছেন। এখনও সেসব মামলার ঘানি টানছেন অনেকে ।

রাগ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গালাগাল শুধু বাংলা ভাষায় নয়, সব ভাষাতেই এবং জাতির মধ্যেই আছে। কিন্তু সেই গালাগাল বা স্ল্যাংয়ের মাত্রা কতটুকু এবং এর দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রের কী ক্ষতি হচ্ছে—সেটি হচ্ছে মূল আলোচনা।

বিতর্কের মুখে সরকার ওই আইনটিও বাতিল করে ২০২৩ সালে প্রণয়ন করে সাইবার নিরাপত্তা আইন। তাতেও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন রহিত করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে। বিএনপি সরকার গঠনের পরে এই অধ্যাদেশটি বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।

এরইমধ্যে এর খসড়া প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন টিআইবিসহ বিভিন্ন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম থেকে এই প্রস্তাবিত আইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। এই আইনেও এমন কিছু বিষয় রাখা হয়েছে বা কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। সেই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে অতীতের মতোই বিরোধী ও ভিন্নমত দমনে এই আইনের প্রয়োগ (মূলত অপপ্রয়োগ) করা হতে পারে।

এরকম বাস্তবতায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে সোশ্যাল মিডিয়ায় গালাগাল ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধে আইন করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ‘বাকস্বাধীনতার নামে বিভিন্ন অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যে অশালীন গালিগালাজ, সাইবার বুলিং ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতাকে বিনষ্ট করছে। আমাদের প্রধান কাজ হলো এই সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা। এই দুটো বিষয়কে কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়া কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে অংশীজনদের সাথে আলোচনা চলছে।’

তথ্যমন্ত্রী মূলত সাইবার সুরক্ষা আইনেই এমন কিছু বিধান রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় গালাগাল ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধ করা যায়। প্রশ্ন হলো, গালাগালকে কি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ যদি আরেকজনকে উদ্দেশ করে গালি দেয়, অশালীন বাক্য লেখে বা বলে—তার শাস্তি কী হবে? গালাগালের জন্য কি কাউকে জেল দেওয়া যাবে?

সম্প্রতি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ এনে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেছেন সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক তরুণ। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের একজন বিশিষ্ট নাগরিক, এমনকি যেকোনো সাধারণ নাগরিককে গালাগালি করাও সামাজিক দৃষ্টিতে অপরাধ বা নৈতিকতার বিচারে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তার শাস্তি কী? দেখা গেলো পুলিশ সিফাত আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায়। তার মানে প্রধানমন্ত্রীকে গালাগাল করে সিফাত যেমন একটি অপরাধ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারও কি তার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করলেন?

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৫০৪ ধারায় ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে অপমান করা বা এর মাধ্যমে উসকানি দিয়ে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ হয় এমন পরিস্থিতি তৈরি করলে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া কারো সম্মানহানির উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা মানহানিকর অভিযোগ করাও দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার আলোকে অপরাধ। প্রকাশ্যে গালিগালাজ করা ২৯৪ ধারায় অপরাধ।

এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি জনসমক্ষে বা তার কাছাকাছি অশ্লীল কথা বলেন, এবং তা অন্যদের বিরক্তির কারণ হয়, সেটিও অপরাধ হতে পারে। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ মাস কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয়ই। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নারীকে তার শালীনতা ও মর্যাদা হানি করার উদ্দেশ্যে কোনো কথা, শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা কোনো আচরণ করা হলে সেটিও অপরাধ এবং এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয়ই।

তার মানে প্রচলিত আইনেই গালাগাল বা ব্যক্তিগত অপমানের শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও নতুন আইন করতে হচ্ছে কেন? বিদ্যমান আইনের সংশোধন করে এই বিধান যুক্ত করার যুক্তি কী? যুক্তি হলো, যখন দণ্ডবিধি তৈরি করা হয়, তখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে সংঘটিত অপরাধ আর সোশ্যাল মিডিয়া তথা সাইবার দুনিয়ায় সংঘটিত অপরাধ এক নয়। যে কারণে সাইবার দুনিয়ার অপরাধ দমন ও প্রতিহত করতে আলাদা আইনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। আইন করে গালাগাল, ব্যক্তিগত আক্রমণ, ট্যাগিং ও বিষোদ্গার কি বন্ধ করা যাবে? কেননা, বিষয়টা যতটা না আইনি তার চেয়ে বেশি শিক্ষা ও রুচির সাথে সম্পর্কিত।

রাগ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গালাগাল শুধু বাংলা ভাষায় নয়, সব ভাষাতেই এবং জাতির মধ্যেই আছে। কিন্তু সেই গালাগাল বা স্ল্যাংয়ের মাত্রা কতটুকু এবং এর দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রের কী ক্ষতি হচ্ছে—সেটি হচ্ছে মূল আলোচনা। অস্বীকার করা যাবে না, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে নানা কারণে সমাজের মানুষের ভেতরে বিভাজন বেড়েছে। মানুষ কথা বলা বা ব্যক্তিগত মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়েছে। নিজের যুক্তি প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অন্যকে অপমান অপদস্থ করার প্রবণতা বেড়েছে।

পৃথিবীর সকল মানুষ আমার মতো করে ভাববে, বলবে ও লিখবে, তা তো হয় না। প্রত্যেকের চিন্তা, মত ও মতবাদ, আদর্শ, ভাষা ও বলার ভঙ্গি আলাদা। সুতরাং একই বিষয়ে দশজন মানুষের দেখা, বলা ও লেখার ভঙ্গি যদি দশরকমের হবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু তার এই বলা ও লেখার কারণে কোনো একটি রাজনৈতিক বলয়ে ঠেলে দেওয়া বা ট্যাগ দেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতা অতীতেও ছিল। সেটি সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বেড়েছে।

মনে রাখতে হবে, কেবল কঠিন আইন করে সব অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। সাইবার স্পেসে সত্যতা যাচাই না করে যেকোনো মানহানিকর তথ্য বা পোস্ট শেয়ার দেওয়াও যে অপরাধের আওতায় পড়ে, সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এর প্রচার দরকার। সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নানাভাবে প্রচার চালানো দরকার যে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও গালাগাল করলে তার কী শাস্তি হবে।

এখন ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে তৃণমূলের মানুষেরাও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারী। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই ডিজিটাল লিটারেসি নেই। অর্থাৎ কোন কথাটি বললে বা লিখলে সেটি অপরাধের পর্যায়ে পড়বে—সেটি সুস্পষ্টভাবে তাদেরকে জানানো প্রয়োজন। অশ্লীল শব্দ ও গালাগাল অনেক সময় হুমকি, হয়রানি ও সহিংসতায় উসকানি এমনকি হেইট স্পিচের পর্যায়ে যে চলে যেতে পারে, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক করা দরকার। এই কাজটি শুধু সরকারের একার নয়। বরং গণমাধ্যমেরও।

আইন করে সমাজ থেকে গালাগাল ও অশ্লীলতা দূর করা যাবে কি না সেটি বড় প্রশ্ন। তেমনি একটি আইনি কাঠামো বা আইনি সুরক্ষা না থাকলে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টিরও শঙ্কা তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে অপরাধের সংজ্ঞায় গালাগাল, অশ্লীলতা, হুমকি, ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে হয়রানি, সহিংসতায় উসকানি, যৌন হয়রানি—ইত্যাদির ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট থাকতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমনকি সাইবার নিরাপত্তা আইনেও ধর্মীয় অনুভূতির কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ছিল না। যে কারণে খুব সহজেই আইনের অপপ্রয়োগ করা গেছে।

সাইবার সুরক্ষা আইনে যদি সত্যি সত্যি গালাগাল, অশ্লীলতা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধের বিধান রাখা হয়, সেখানে সংজ্ঞায় বিষয়গুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এগুলো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, সেখানেও কোনো ধরনের ধোঁয়াশা রাখা যাবে না। কারণ আইনের অপপ্রয়োগ হয় মূলত এই অস্পষ্টতার কারণে। সবচেয়ে বড় কথা, ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট এবং সাইবার দুনিয়ায় গালাগাল, ট্যাগিং, বিষোদ্গার বন্ধে প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং সহনশীলতার চর্চা।

গণতান্ত্রিক সমাজে চরম স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। আর বাকস্বাধীনতা একটি কাণ্ডজ্ঞান। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সংবিধান ও আইন একজন নাগরিককে আইনি সুরক্ষা দিতে পারে। তবে ব্যক্তি হিসেবে তিনি যদি আরেকজনের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে না পারেন; যদি মতপ্রকাশ বা বাকস্বাধীনতার নামে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন, সেটি খুব বিপজ্জনক।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত