বঙ্গীয়-বদ্বীপের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা ফিরে তাকিয়েছি বাংলাদেশের গত দুই হাজার বছরের পথপরিক্রমায়। জানার চেষ্টা করেছি, কীভাবে গড়ে উঠেছে এ জনপদের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। এই লেখায় থাকছে ১৯০৩ সালে বঙ্গীয়-বদ্বীপের শেষপ্রান্ত সুন্দরবনে আসা স্কটিশ ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের আদ্যোপান্ত।
গৌতম কে শুভ
বঙ্গীয়-বদ্বীপের শেষপ্রান্তে সুন্দরবন। গঙ্গা ও মেঘনার মোহনায় আবহমানকাল থেকে গড়ে উঠেছে এ ম্যানগ্রোভবহুল অরণ্য। ১৯০৩ সালে সুন্দরবনের প্রতিকূল ও প্রান্তিক অঞ্চলে আগমন ঘটে ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন নামে এক স্কটিশ ব্যবসায়ীর। হ্যামিলটনের সুন্দরবনে আসাকে বঙ্গীয়-বদ্বীপের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
কারণ, ম্যানগ্রোভে ঘেরা সুন্দরবন এলাকায় হ্যামিলটনের কৃষির জাদুতে উন্নয়নের স্রোত বইতে শুরু করেছিল সেই বিশ শতকের শুরুর পর্বে। শুধু তা-ই নয়, সমবায়ের মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারাও বদলে দেন তিনি। তখন হ্যামিলটনের এই ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বরা। আর হ্যামিলটনের এই ‘কল্পরাজ্য’ দেখতে সুন্দরবনেও গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
হ্যামিলটনের এই উদ্যোগ সুন্দরবনের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা বলাই বাহুল্য। এতে করে একদিকে যেমন প্রান্তিক অঞ্চলে উন্নয়নের পথ খুলে যায়, তেমনি বাংলা অঞ্চলে প্রথম সমবায়েরও সূচনা ঘটে। তবে এ-ও বলা দরকার, হ্যামিলটনের সুন্দরবন-রাজ্য ছিল সমবায় ও কৃষি উন্নয়নের একটি ইউটোপিয়ান পরীক্ষা। যা তাঁর জীবদ্দশায় আলোড়ন তুললেও টেকসই হয়নি। উন্নয়নের ভেতরে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি, সমষ্টিগত মালিকানা ও দায়িত্বের অভাব ছিল তাঁর প্রধান সীমাবদ্ধতা।
হ্যামিলটন যেভাবে সুন্দরবনে
স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন ১৮৬০ সালে স্কটল্যান্ডের একটি ছোট দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম হওয়ায় মাত্র ১২ বছর বয়সেই নেমে পড়েন পারিবারিক ব্যবসার কাজে।
২০ বছর বয়সে তিনি ‘ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি’ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমে তখনকার বোম্বে আর এখনকার মুম্বাইতে আসেন। এরপর ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ শুরু করেন। গ্রামের মানুষের দুরাবস্থা এই সাহেব গোত্রের মানুষকে ব্যথিত করেছিল। এ থেকেই অত্যাচারিত ও অবহেলিত বাংলা অঞ্চলের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। এদিকে ইউরোপে ছোটো ছোটো দেশগুলোতে তখন চলছে সমবায়ের জোয়ার। এই পরিস্থিতিতে হ্যামিলটন কোম্পানির প্রধান হিসেবে ১৮৯৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর কলকাতায় আসেন। কলকাতায় থাকাকালীনও তিনি দেখেন গ্রাম বাংলার মানুষ অত্যাচারিত আর উপেক্ষিত। একদিন কোম্পানির প্রধান কেরানি উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিনি শুনতে পান সুন্দরবনের মানুষের দুঃখ-কষ্ট।
হ্যামিলটনের নজরে আসে সুন্দরবনের গোসাবা, রাঙাবেলিয়া ও সাতজেলিয়া দ্বীপ। সে সময় এ অঞ্চল ছিল ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে ঢাকা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায় কখনোই ছিল না সুন্দরবন। তাই সেখানে কোনো জমিদারও ছিল না।
১৯০৩ সালে হ্যামিলটন এই তিনটি দ্বীপের ১৪৩, ১৪৮ ও ১৪৯ লটে প্রায় ৯০ হাজার বিঘা জমি ৪০ বছরের জন্য ইজারায় নেন। এখানে প্রথম বসতি গড়ার জন্য আহ্বান জানানো হয় সৎ ও কর্মঠ কৃষক পরিবারদের। এরপর ১৯০৯ সালে সাতজেলিয়াতেও ৪০ হাজার বিঘা জমি ইজারা নেন তিনি। এভাবে হ্যামিলটন গোসাবা, রাঙাবেলিয়া ও সাতজেলিয়া দ্বীপে নিজস্ব এস্টেট স্থাপন করেন।
হ্যামিলটনের কো-অপারেটিভ এস্টেট
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় হ্যামিলটনের আগমন নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এখানে হ্যামিলটনের প্রথম কাজ ছিল জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি উদ্ধার করা, বাঁধ নির্মাণ করা ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। এসব কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দ্বীপগুলোকে বাসযোগ্য বানানো শুরু হয়। ১৯০৪ সালে তৈরি হয় প্রথম গ্রাম। জঙ্গলের কাঠ ও পাতা দিয়ে তৈরি হতে থাকে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। কেমন ছিল সেই ঘরবাড়ির গড়ন? বইপত্র ঘেঁটে জানা যায়, সুন্দরবনে তখন যেভাবে ঘরবাড়ি বানানো হয়েছিল, তাতে ছিল গরান গাছের খুঁটি, বেড়ার ওপরে মাটির প্রলেপের দেওয়াল আর চালে গোলপাতার ছাউনি। কিছু বাড়ি তৈরি হতো মাটির দেওয়াল ও খড়ের ছাউনি দিয়ে।
এরপর জঙ্গল কেটে, মাটি কেটে নদীর বাঁধ উঁচু করে কৃষির জন্য জমি প্রস্তুত করা হয়। শ্রমিকেরা এসেছিলেন বিহার, মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম, উড়িষ্যার কেওনঝড়, বাঁকুড়া ও বীরভূম থেকে। এঁদের বেশির ভাগই ছিলেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। যাঁরা জঙ্গল কাটতে এসেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগ ফিরে গেলেও কিছু আদিবাসী এখানে থেকে যান। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯০৯ সালে গোসাবার মোট লোকসংখ্যা ছিল ৯০০ জন। এর মধ্যে ৬০০ জনই ছিলেন হ্যামিলটনের আনা শ্রমিক আর কর্মচারী।
ধীরে ধীরে সুন্দরবনে খাল ও পুকুর খনন এবং রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হয়। বাঁধের কারণে নোনাজল ঢোকা বন্ধ হলে মাটি মিষ্টি হতে শুরু করে, লবণের পরিমাণ কমে যায়। ফলে সেখানের মাটিতে ফলজ গাছ লাগানোও শুরু হয়। আর এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এখানকার জঙ্গল-জমি ধীরে ধীরে মানুষের বাসযোগ্য ও উন্নত এলাকা হয়ে ওঠে।
একসময় মেদিনীপুরের বিট্রিশবিরোধী সংগ্রামী ও তাঁদের পরিবার নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে বেছে নেন হ্যামিলটনের এই কো-অপারেটিভ এস্টেটকে। পরে জীবন ও জীবিকার সন্ধানে এখানে আসতে থাকে ভূমিহীন মানুষের দল। ঝড়-বন্যা আর মহামারির আতঙ্কেও অনেকে চলে আসেন সুন্দরবনের এ দুর্গম অঞ্চলে। এরপর এখনকার বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চল থেকেও কিছু মানুষ হ্যামিলটনের এস্টেটে আসেন বসতি স্থাপনের আশায়। ফলে ধীরে ধীরে গোসাবা-রাঙাবেলিয়া ও সাতজেলিয়া, তিনটি দ্বীপেই গড়ে ওঠে জনবসতি।
কৃষিতে হ্যামিলটনের অবদান
গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ভারতের কৃষিকাজ যখন পুরোপুরি মানবনির্ভর ছিল, হ্যামিলটন সাহেব সে সময় গোসাবায় ইংল্যান্ড থেকে ট্র্যাক্টর, পাম্প মেশিনসহ নানা যন্ত্রপাতি এনে চাষবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। এর ফলে প্রচলিত লাঙলে নয়, সেখানে চাষ শুরু হয় বিজ্ঞানসম্মতভাবে।
১৯২৯ সালে কৃষকদের জন্য ‘ধর্মগোলা’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেন হ্যামিলটন সাহেব। ধান কাটার সময় কৃষকেরা সেখানে ধান জমা দিতেন। আশ্বিন-কার্তিক মাসে যখন কৃষকদের গোলার ধান কমে আসত, তখন তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ধর্মগোলা থেকে নিতেন ধান।
দরিদ্র চাষিদের রোজগার বাড়ানোর জন্যও হ্যামিলটন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্যোগ নেন। গবাদিপশু পালন থেকে শুরু করে মাছ চাষ, ফল ও সবজির বাগান, তাঁত চালানোসহ বিভিন্ন কুটিরশিল্পের প্রসার ঘটান তিনি। এ সময় হ্যামিলটন সেখানে কৃষি গবেষণাগারও তৈরি করেন। ১৯১৬ সালে তাঁর তত্ত্বাবধানে এই বনাঞ্চলে গড়ে কৃষি সমবায় সমিতি। আর ১৯২২-২৩ সালে গোড়াপত্তন হয় ‘ধান্য বিক্রয় সমবায় সমিতি’র। কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য হ্যামিলটন কৃষি প্রদর্শনীরও আয়োজন করতেন। কেবল এসব করেই হ্যামিলটন ক্ষ্যান্ত হননি, ১৯৩২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গোসাবা রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ইনস্টিটিউশন। পশ্চিমা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই উদ্যোগ গোসাবার চেহারা সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়। শিক্ষার বিস্তারেও হ্যামিলটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এস্টেটে খোলা হয় অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিটি স্কুলের ঘর নির্মাণ, পুকুর খনন ও বাগান তৈরির জন্য ৬–৮ বিঘা জমি দেওয়া হয়েছিল।
১৯২৪ সালে হ্যামিলটন গোসাবা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। হ্যামিলটন তাঁর এলাকার জন্য ১ টাকার কাগজের নোটও চালু করেছিলেন। এই নোটের বিনিময়ে হ্যামিলটনের তৈরি সমবায় থেকে চাল, তেল, কাপড় ও অন্য সব প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত।
হ্যামিলটনের উদ্যোগে তখন গোসাবায় মানুষের জন্য দাতব্য চিকিৎসালয় আর পশুর জন্য পৃথক পশু চিকিৎসালয় গড়ে ওঠে। দেশি গরুর দুধ কম হওয়ার সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে উন্নত মানের ষাঁড় জাহাজে এনে দেশি গরুর সঙ্গে শঙ্করায়ন করান। ফলে দুধের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। দুধ বিক্রি ও বণ্টনের জন্য স্থাপন করা হয় সমবায় ডেইরি। এর সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে পুঁটিমাছ এনে চাষ শুরু করা হয় গোসাবাতে।
হ্যামিলটন চাষের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। লোনামাটি চাষের উপযুক্ত কি না, এক ফসলের বদলে কীভাবে দো-ফসলি জমি করা যায়, এসব নিয়ে অনেক কাজ করেছেন তিনি। তাঁর এস্টেটে তাঁত ও আখ-মাড়াই কল ব্যবহারেরও সুযোগ ছিল।
হ্যামিলটন সব ধর্মকে সমানভাবে দেখতেন। মন্দির-মসজিদ তৈরির জন্য তিনি ভূমি দান করতেন। যদি কেউ জোর করে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করত, তাহলে তিনি ব্যবস্থা নিতেন। একবার এক ফাদারকে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগে তিনি স্টেট থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।
হ্যামিলটনের সমবায় নীতি ও সমাজভাবনা
হ্যামিলটন তাঁর এস্টেটে সমবায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁকে ভারতবর্ষের সমবায়ের জনক বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ১৯০৪ সালে কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি আইন প্রণয়নের জন্য ব্রিটিশ সরকারকে তিনিই প্রভাবিত করেন।
হ্যামিলটন বিশ্বাস করতেন, কৃষিভিত্তিক ভারতের কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নতি একমাত্র সমবায় প্রথার মাধ্যমে শক্তিশালী হবে। গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথও তাঁর সমবায় সম্পর্কে জানতেন। সমবায় ও গ্রাম উন্নয়নের বিকাশ দেখতেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর এস্টেটে এসেছিলেন। গান্ধী নিজে আসতে না পারলেও তাঁর সচিব মহাদেব দেশাইকে গোসাবায় পাঠিয়েছিলেন।
হ্যামিলটন প্রজাদেরকে কিছু নিয়ম মানার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁদের বলা হতো প্রতিবেশীর প্রতি সৎ থাকা, এস্টেটের কাজে সহযোগিতা করা, মাদক দ্রব্য সেবন না করা, প্রত্যেকের শ্রমের যথোচিত মূল্য দেওয়া, পরিবারে ভালো ব্যবহার করা, বিবাদ না করে আপোষ করা এবং সমবায়ের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য বজায় রাখা।
হ্যামিলটনের সমবায়ের মূলনীতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও অবাধ সদস্যপদ নিশ্চিত করা, সদস্যের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, সদস্যের আর্থিক অংশগ্রহণ, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও তথ্য, আন্তঃসমবায় সহযোগিতা এবং সামাজিক অঙ্গীকার।
সমবায়ের ক্ষেত্রে কিছু বিধিও মানতে হতো। যেমন সমবায় ছাড়া কেউ কাজে লোক নিতে পারবে না, সমবায়কে না জানিয়ে কেউ জমি কেনা-বেচা করতে পারবে না এবং উৎপন্ন ফসল সমবায় ছাড়া বিক্রি করা যাবে না। এ সময় গ্রাম উন্নয়ন আর আইন-কানুন রক্ষা করতেন পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা। পঞ্চায়েতের মাধ্যমেই সমবায় গ্রামে-গ্রামে কার্যকরী হয়ে উঠেছিল।
হ্যামিলটন সাহেবের এস্টেটে বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা থাকায় প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ ছিল শিক্ষিত। বিনা পয়সায় চিকিৎসা-ব্যবস্থা ও ওষুধ মিলত। পাঠাগার, খেলাধুলা ও সমাজসেবার সুযোগও ছিল। এখানে কোনো পুলিশ বা কোর্ট ছিল না। ছিল না সরকারি বিধিনিষেধ। তাঁর এস্টেট ছিল প্রায় ম্যালেরিয়ামুক্ত। সেখানে জাতিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, হ্যামিলটনের এই কল্পরাজ্যে দুর্ভিক্ষ ছিল না।
হ্যামিলটনের ইউটোপিয়া, স্বপ্ন ও বাস্তবতা
হ্যামিলটন ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর গড়া রাজ্যর 'একমুঠো মাটি' নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। বছরখানেক পর নিউমোনিয়া রোগে তিনি মারা যান।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই 'কল্পরাজ্য' গড়ার পেছনে তাঁর দর্শন কী ছিল! এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন কলকাতার আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও অনুপ মতিলাল। হ্যামিলটনের লেখা ও বক্তব্য এক জায়গায় করে তাঁরা সম্পাদিত একটি বই প্রকাশ করেছেন। নাম ‘দ্য ফিলোজফার্স স্টোন'।
‘দ্য ফিলোজফার্স স্টোন’ বই থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে স্কটল্যান্ড ছিল প্রবল দারিদ্র্যপীড়িত এক দেশ। তখন স্কটিশ সরকার মনে করছিল, সমবায়ই একমাত্র সমাধান হতে পারে। ছোটবেলা থেকেই তাই সমবায় ব্যবস্থা নিয়ে ধারণা ছিল হ্যামিলটনের। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, ব্রিটিশ উপনিবেশের মানুষের কষ্ট দূর করার। তাই নিজের মতো করে শুরু করেন সুন্দরবনে সমবায় আন্দোলন।
ড্যানিয়েল হ্যামিলটন জীবিত থাকলেই তাঁর এস্টেটের উত্তরাধিকারের উইল করেছিলেন। তাতে বলা ছিল, তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর ভারতে হ্যামিলটনের সমস্ত সম্পত্তি যৌথভাবে চার্চ অব ইংল্যান্ড, চার্চ অব স্কটল্যান্ড ও লন্ডন মিশনারি সোসাইটির ভারতীয় শাখার কাছে চলে যাবে।
অর্থাৎ স্থানীয় কাউকে বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোনো সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে যাননি হ্যামিলটন। তবে দুই চার্চ ও মিশনারি তাঁর এই সম্পত্তির দায়িত্ব নেয়নি। কারণ, তারা মনে করছিল, যৌথভাবে তিন পক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
তাছাড়া, সুন্দরবনের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে হ্যামিলটন যেসব অভিনব ধারণা উদ্ভাবন করেছিলেন, তার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। এ নিয়ে সমালোচকদের বক্তব্য হলো, তিনি চাষিদের হাতে জমির মালিকানা দেননি। কৃষক শুধু বর্গাচাষি ছিলেন, ফলে স্থায়ী নিরাপত্তা ও স্বত্বের অভাব দেখা দেয়।
হ্যামিলটনের পুরো ব্যবস্থা ছিল মূলত ব্যক্তিনির্ভর। মৃত্যুর পর তাঁর উইলে সম্পত্তি বিদেশি চার্চ ও মিশনারির হাতে চলে যাওয়ায় স্থানীয় নেতৃত্ব ও দায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সমবায়ের নীতি নিয়েও ছিল দ্বন্দ্ব। বাইরে থেকে তিনি সমবায়কে গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী ভাবনায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে এর ভেতর ছিল কড়া নিয়ন্ত্রণ। এসবই ড্যানিয়েল ম্যানকিনন হ্যামিলটনের সমবায় প্রথা স্থায়ী না হওয়ার অন্যতম কারণ। তবে স্কটিশ এই সাহেব এ বঙ্গীয়-বদ্বীপে প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে অবদান রেখে গেছেন, তা অবশ্যই স্মরণযোগ্য।
বঙ্গীয়-বদ্বীপের শেষপ্রান্তে সুন্দরবন। গঙ্গা ও মেঘনার মোহনায় আবহমানকাল থেকে গড়ে উঠেছে এ ম্যানগ্রোভবহুল অরণ্য। ১৯০৩ সালে সুন্দরবনের প্রতিকূল ও প্রান্তিক অঞ্চলে আগমন ঘটে ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন নামে এক স্কটিশ ব্যবসায়ীর। হ্যামিলটনের সুন্দরবনে আসাকে বঙ্গীয়-বদ্বীপের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
কারণ, ম্যানগ্রোভে ঘেরা সুন্দরবন এলাকায় হ্যামিলটনের কৃষির জাদুতে উন্নয়নের স্রোত বইতে শুরু করেছিল সেই বিশ শতকের শুরুর পর্বে। শুধু তা-ই নয়, সমবায়ের মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারাও বদলে দেন তিনি। তখন হ্যামিলটনের এই ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বরা। আর হ্যামিলটনের এই ‘কল্পরাজ্য’ দেখতে সুন্দরবনেও গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
হ্যামিলটনের এই উদ্যোগ সুন্দরবনের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা বলাই বাহুল্য। এতে করে একদিকে যেমন প্রান্তিক অঞ্চলে উন্নয়নের পথ খুলে যায়, তেমনি বাংলা অঞ্চলে প্রথম সমবায়েরও সূচনা ঘটে। তবে এ-ও বলা দরকার, হ্যামিলটনের সুন্দরবন-রাজ্য ছিল সমবায় ও কৃষি উন্নয়নের একটি ইউটোপিয়ান পরীক্ষা। যা তাঁর জীবদ্দশায় আলোড়ন তুললেও টেকসই হয়নি। উন্নয়নের ভেতরে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি, সমষ্টিগত মালিকানা ও দায়িত্বের অভাব ছিল তাঁর প্রধান সীমাবদ্ধতা।
হ্যামিলটন যেভাবে সুন্দরবনে
স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন ১৮৬০ সালে স্কটল্যান্ডের একটি ছোট দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম হওয়ায় মাত্র ১২ বছর বয়সেই নেমে পড়েন পারিবারিক ব্যবসার কাজে।
২০ বছর বয়সে তিনি ‘ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি’ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমে তখনকার বোম্বে আর এখনকার মুম্বাইতে আসেন। এরপর ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ শুরু করেন। গ্রামের মানুষের দুরাবস্থা এই সাহেব গোত্রের মানুষকে ব্যথিত করেছিল। এ থেকেই অত্যাচারিত ও অবহেলিত বাংলা অঞ্চলের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। এদিকে ইউরোপে ছোটো ছোটো দেশগুলোতে তখন চলছে সমবায়ের জোয়ার। এই পরিস্থিতিতে হ্যামিলটন কোম্পানির প্রধান হিসেবে ১৮৯৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর কলকাতায় আসেন। কলকাতায় থাকাকালীনও তিনি দেখেন গ্রাম বাংলার মানুষ অত্যাচারিত আর উপেক্ষিত। একদিন কোম্পানির প্রধান কেরানি উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তিনি শুনতে পান সুন্দরবনের মানুষের দুঃখ-কষ্ট।
হ্যামিলটনের নজরে আসে সুন্দরবনের গোসাবা, রাঙাবেলিয়া ও সাতজেলিয়া দ্বীপ। সে সময় এ অঞ্চল ছিল ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে ঢাকা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আওতায় কখনোই ছিল না সুন্দরবন। তাই সেখানে কোনো জমিদারও ছিল না।
১৯০৩ সালে হ্যামিলটন এই তিনটি দ্বীপের ১৪৩, ১৪৮ ও ১৪৯ লটে প্রায় ৯০ হাজার বিঘা জমি ৪০ বছরের জন্য ইজারায় নেন। এখানে প্রথম বসতি গড়ার জন্য আহ্বান জানানো হয় সৎ ও কর্মঠ কৃষক পরিবারদের। এরপর ১৯০৯ সালে সাতজেলিয়াতেও ৪০ হাজার বিঘা জমি ইজারা নেন তিনি। এভাবে হ্যামিলটন গোসাবা, রাঙাবেলিয়া ও সাতজেলিয়া দ্বীপে নিজস্ব এস্টেট স্থাপন করেন।
হ্যামিলটনের কো-অপারেটিভ এস্টেট
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় হ্যামিলটনের আগমন নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এখানে হ্যামিলটনের প্রথম কাজ ছিল জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি উদ্ধার করা, বাঁধ নির্মাণ করা ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। এসব কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দ্বীপগুলোকে বাসযোগ্য বানানো শুরু হয়। ১৯০৪ সালে তৈরি হয় প্রথম গ্রাম। জঙ্গলের কাঠ ও পাতা দিয়ে তৈরি হতে থাকে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। কেমন ছিল সেই ঘরবাড়ির গড়ন? বইপত্র ঘেঁটে জানা যায়, সুন্দরবনে তখন যেভাবে ঘরবাড়ি বানানো হয়েছিল, তাতে ছিল গরান গাছের খুঁটি, বেড়ার ওপরে মাটির প্রলেপের দেওয়াল আর চালে গোলপাতার ছাউনি। কিছু বাড়ি তৈরি হতো মাটির দেওয়াল ও খড়ের ছাউনি দিয়ে।
এরপর জঙ্গল কেটে, মাটি কেটে নদীর বাঁধ উঁচু করে কৃষির জন্য জমি প্রস্তুত করা হয়। শ্রমিকেরা এসেছিলেন বিহার, মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম, উড়িষ্যার কেওনঝড়, বাঁকুড়া ও বীরভূম থেকে। এঁদের বেশির ভাগই ছিলেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। যাঁরা জঙ্গল কাটতে এসেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগ ফিরে গেলেও কিছু আদিবাসী এখানে থেকে যান। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯০৯ সালে গোসাবার মোট লোকসংখ্যা ছিল ৯০০ জন। এর মধ্যে ৬০০ জনই ছিলেন হ্যামিলটনের আনা শ্রমিক আর কর্মচারী।
ধীরে ধীরে সুন্দরবনে খাল ও পুকুর খনন এবং রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হয়। বাঁধের কারণে নোনাজল ঢোকা বন্ধ হলে মাটি মিষ্টি হতে শুরু করে, লবণের পরিমাণ কমে যায়। ফলে সেখানের মাটিতে ফলজ গাছ লাগানোও শুরু হয়। আর এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এখানকার জঙ্গল-জমি ধীরে ধীরে মানুষের বাসযোগ্য ও উন্নত এলাকা হয়ে ওঠে।
একসময় মেদিনীপুরের বিট্রিশবিরোধী সংগ্রামী ও তাঁদের পরিবার নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে বেছে নেন হ্যামিলটনের এই কো-অপারেটিভ এস্টেটকে। পরে জীবন ও জীবিকার সন্ধানে এখানে আসতে থাকে ভূমিহীন মানুষের দল। ঝড়-বন্যা আর মহামারির আতঙ্কেও অনেকে চলে আসেন সুন্দরবনের এ দুর্গম অঞ্চলে। এরপর এখনকার বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চল থেকেও কিছু মানুষ হ্যামিলটনের এস্টেটে আসেন বসতি স্থাপনের আশায়। ফলে ধীরে ধীরে গোসাবা-রাঙাবেলিয়া ও সাতজেলিয়া, তিনটি দ্বীপেই গড়ে ওঠে জনবসতি।
কৃষিতে হ্যামিলটনের অবদান
গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ভারতের কৃষিকাজ যখন পুরোপুরি মানবনির্ভর ছিল, হ্যামিলটন সাহেব সে সময় গোসাবায় ইংল্যান্ড থেকে ট্র্যাক্টর, পাম্প মেশিনসহ নানা যন্ত্রপাতি এনে চাষবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। এর ফলে প্রচলিত লাঙলে নয়, সেখানে চাষ শুরু হয় বিজ্ঞানসম্মতভাবে।
১৯২৯ সালে কৃষকদের জন্য ‘ধর্মগোলা’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেন হ্যামিলটন সাহেব। ধান কাটার সময় কৃষকেরা সেখানে ধান জমা দিতেন। আশ্বিন-কার্তিক মাসে যখন কৃষকদের গোলার ধান কমে আসত, তখন তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ধর্মগোলা থেকে নিতেন ধান।
দরিদ্র চাষিদের রোজগার বাড়ানোর জন্যও হ্যামিলটন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্যোগ নেন। গবাদিপশু পালন থেকে শুরু করে মাছ চাষ, ফল ও সবজির বাগান, তাঁত চালানোসহ বিভিন্ন কুটিরশিল্পের প্রসার ঘটান তিনি। এ সময় হ্যামিলটন সেখানে কৃষি গবেষণাগারও তৈরি করেন। ১৯১৬ সালে তাঁর তত্ত্বাবধানে এই বনাঞ্চলে গড়ে কৃষি সমবায় সমিতি। আর ১৯২২-২৩ সালে গোড়াপত্তন হয় ‘ধান্য বিক্রয় সমবায় সমিতি’র। কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য হ্যামিলটন কৃষি প্রদর্শনীরও আয়োজন করতেন। কেবল এসব করেই হ্যামিলটন ক্ষ্যান্ত হননি, ১৯৩২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গোসাবা রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ইনস্টিটিউশন। পশ্চিমা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই উদ্যোগ গোসাবার চেহারা সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়। শিক্ষার বিস্তারেও হ্যামিলটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এস্টেটে খোলা হয় অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিটি স্কুলের ঘর নির্মাণ, পুকুর খনন ও বাগান তৈরির জন্য ৬–৮ বিঘা জমি দেওয়া হয়েছিল।
১৯২৪ সালে হ্যামিলটন গোসাবা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। হ্যামিলটন তাঁর এলাকার জন্য ১ টাকার কাগজের নোটও চালু করেছিলেন। এই নোটের বিনিময়ে হ্যামিলটনের তৈরি সমবায় থেকে চাল, তেল, কাপড় ও অন্য সব প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত।
হ্যামিলটনের উদ্যোগে তখন গোসাবায় মানুষের জন্য দাতব্য চিকিৎসালয় আর পশুর জন্য পৃথক পশু চিকিৎসালয় গড়ে ওঠে। দেশি গরুর দুধ কম হওয়ার সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে উন্নত মানের ষাঁড় জাহাজে এনে দেশি গরুর সঙ্গে শঙ্করায়ন করান। ফলে দুধের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। দুধ বিক্রি ও বণ্টনের জন্য স্থাপন করা হয় সমবায় ডেইরি। এর সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে পুঁটিমাছ এনে চাষ শুরু করা হয় গোসাবাতে।
হ্যামিলটন চাষের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। লোনামাটি চাষের উপযুক্ত কি না, এক ফসলের বদলে কীভাবে দো-ফসলি জমি করা যায়, এসব নিয়ে অনেক কাজ করেছেন তিনি। তাঁর এস্টেটে তাঁত ও আখ-মাড়াই কল ব্যবহারেরও সুযোগ ছিল।
হ্যামিলটন সব ধর্মকে সমানভাবে দেখতেন। মন্দির-মসজিদ তৈরির জন্য তিনি ভূমি দান করতেন। যদি কেউ জোর করে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করত, তাহলে তিনি ব্যবস্থা নিতেন। একবার এক ফাদারকে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগে তিনি স্টেট থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।
হ্যামিলটনের সমবায় নীতি ও সমাজভাবনা
হ্যামিলটন তাঁর এস্টেটে সমবায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁকে ভারতবর্ষের সমবায়ের জনক বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। ১৯০৪ সালে কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি আইন প্রণয়নের জন্য ব্রিটিশ সরকারকে তিনিই প্রভাবিত করেন।
হ্যামিলটন বিশ্বাস করতেন, কৃষিভিত্তিক ভারতের কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নতি একমাত্র সমবায় প্রথার মাধ্যমে শক্তিশালী হবে। গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথও তাঁর সমবায় সম্পর্কে জানতেন। সমবায় ও গ্রাম উন্নয়নের বিকাশ দেখতেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর এস্টেটে এসেছিলেন। গান্ধী নিজে আসতে না পারলেও তাঁর সচিব মহাদেব দেশাইকে গোসাবায় পাঠিয়েছিলেন।
হ্যামিলটন প্রজাদেরকে কিছু নিয়ম মানার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁদের বলা হতো প্রতিবেশীর প্রতি সৎ থাকা, এস্টেটের কাজে সহযোগিতা করা, মাদক দ্রব্য সেবন না করা, প্রত্যেকের শ্রমের যথোচিত মূল্য দেওয়া, পরিবারে ভালো ব্যবহার করা, বিবাদ না করে আপোষ করা এবং সমবায়ের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য বজায় রাখা।
হ্যামিলটনের সমবায়ের মূলনীতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও অবাধ সদস্যপদ নিশ্চিত করা, সদস্যের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, সদস্যের আর্থিক অংশগ্রহণ, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও তথ্য, আন্তঃসমবায় সহযোগিতা এবং সামাজিক অঙ্গীকার।
সমবায়ের ক্ষেত্রে কিছু বিধিও মানতে হতো। যেমন সমবায় ছাড়া কেউ কাজে লোক নিতে পারবে না, সমবায়কে না জানিয়ে কেউ জমি কেনা-বেচা করতে পারবে না এবং উৎপন্ন ফসল সমবায় ছাড়া বিক্রি করা যাবে না। এ সময় গ্রাম উন্নয়ন আর আইন-কানুন রক্ষা করতেন পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা। পঞ্চায়েতের মাধ্যমেই সমবায় গ্রামে-গ্রামে কার্যকরী হয়ে উঠেছিল।
হ্যামিলটন সাহেবের এস্টেটে বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা থাকায় প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ ছিল শিক্ষিত। বিনা পয়সায় চিকিৎসা-ব্যবস্থা ও ওষুধ মিলত। পাঠাগার, খেলাধুলা ও সমাজসেবার সুযোগও ছিল। এখানে কোনো পুলিশ বা কোর্ট ছিল না। ছিল না সরকারি বিধিনিষেধ। তাঁর এস্টেট ছিল প্রায় ম্যালেরিয়ামুক্ত। সেখানে জাতিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, হ্যামিলটনের এই কল্পরাজ্যে দুর্ভিক্ষ ছিল না।
হ্যামিলটনের ইউটোপিয়া, স্বপ্ন ও বাস্তবতা
হ্যামিলটন ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর গড়া রাজ্যর 'একমুঠো মাটি' নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। বছরখানেক পর নিউমোনিয়া রোগে তিনি মারা যান।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই 'কল্পরাজ্য' গড়ার পেছনে তাঁর দর্শন কী ছিল! এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন কলকাতার আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও অনুপ মতিলাল। হ্যামিলটনের লেখা ও বক্তব্য এক জায়গায় করে তাঁরা সম্পাদিত একটি বই প্রকাশ করেছেন। নাম ‘দ্য ফিলোজফার্স স্টোন'।
‘দ্য ফিলোজফার্স স্টোন’ বই থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে স্কটল্যান্ড ছিল প্রবল দারিদ্র্যপীড়িত এক দেশ। তখন স্কটিশ সরকার মনে করছিল, সমবায়ই একমাত্র সমাধান হতে পারে। ছোটবেলা থেকেই তাই সমবায় ব্যবস্থা নিয়ে ধারণা ছিল হ্যামিলটনের। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, ব্রিটিশ উপনিবেশের মানুষের কষ্ট দূর করার। তাই নিজের মতো করে শুরু করেন সুন্দরবনে সমবায় আন্দোলন।
ড্যানিয়েল হ্যামিলটন জীবিত থাকলেই তাঁর এস্টেটের উত্তরাধিকারের উইল করেছিলেন। তাতে বলা ছিল, তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর ভারতে হ্যামিলটনের সমস্ত সম্পত্তি যৌথভাবে চার্চ অব ইংল্যান্ড, চার্চ অব স্কটল্যান্ড ও লন্ডন মিশনারি সোসাইটির ভারতীয় শাখার কাছে চলে যাবে।
অর্থাৎ স্থানীয় কাউকে বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে কোনো সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে যাননি হ্যামিলটন। তবে দুই চার্চ ও মিশনারি তাঁর এই সম্পত্তির দায়িত্ব নেয়নি। কারণ, তারা মনে করছিল, যৌথভাবে তিন পক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
তাছাড়া, সুন্দরবনের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে হ্যামিলটন যেসব অভিনব ধারণা উদ্ভাবন করেছিলেন, তার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। এ নিয়ে সমালোচকদের বক্তব্য হলো, তিনি চাষিদের হাতে জমির মালিকানা দেননি। কৃষক শুধু বর্গাচাষি ছিলেন, ফলে স্থায়ী নিরাপত্তা ও স্বত্বের অভাব দেখা দেয়।
হ্যামিলটনের পুরো ব্যবস্থা ছিল মূলত ব্যক্তিনির্ভর। মৃত্যুর পর তাঁর উইলে সম্পত্তি বিদেশি চার্চ ও মিশনারির হাতে চলে যাওয়ায় স্থানীয় নেতৃত্ব ও দায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সমবায়ের নীতি নিয়েও ছিল দ্বন্দ্ব। বাইরে থেকে তিনি সমবায়কে গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী ভাবনায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে এর ভেতর ছিল কড়া নিয়ন্ত্রণ। এসবই ড্যানিয়েল ম্যানকিনন হ্যামিলটনের সমবায় প্রথা স্থায়ী না হওয়ার অন্যতম কারণ। তবে স্কটিশ এই সাহেব এ বঙ্গীয়-বদ্বীপে প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে অবদান রেখে গেছেন, তা অবশ্যই স্মরণযোগ্য।
বঙ্গীয় বদ্বীপের সমাজ, রাজনীতি ও মতাদর্শ নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা ফিরে তাকিয়েছি বাংলাদেশের গত দুই হাজার বছরের পথপরিক্রমায়। জানার চেষ্টা করেছি, কীভাবে গড়ে উঠেছে এ জনপদের সমাজ, রাজনীতি ও মতাদর্শ। এই লেখায় গবেষক ও লেখক তারিক ওমর আলির বই ‘আ লোকাল হিস্ট্রি অব গ্লোব
৩৪ মিনিট আগেঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদের ভাষ্যে ‘বদ্বীপে’র নিখুঁত সংজ্ঞার্থ আমরা পাব। কিন্তু আপাতত দেখতে চাই সাহিত্যের সেই সীমা-সরহদ্দ, যেখানে বাংলাদেশের মানুষ ও জনপদকে চিহ্নিত করা যায় বদ্বীপের প্রাকৃতিক ও আঞ্চলিক বিশিষ্টতায়।
৫ ঘণ্টা আগেপূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে, পুরো বদ্বীপের মানুষের মধ্যে কিছু জায়গায় ঐক্য রয়েছে–জীবনযাপন ও রাজনীতিতে। আবার কিছু ভিন্নতাও রয়েছে। যেমন, পশ্চিম বাংলার ভূমি যেখানে একটু অনুর্বর হয়েছে, সেখানে মানুষকে কৃষি বা অন্য পেশা বেছে নিতে হয়েছে।
১ দিন আগেবৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশে বন্যার প্রার্দুভাব, মৌসুমি ঝড় ও খরা বৃদ্ধি পেয়েছে-এমন প্রচলিত ধারণা সঠিক নয়। অন্যদিকে বিশ্বে যখন পানির সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির প্রাচুর্যের বিষয়টি এর জন্য বিশেষ সম্পদে রূপান্তরিত হয়ে উঠতে পারে।
১ দিন আগে