ভাষা শুধু মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, ভাষা একটি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও আত্মপরিচয়ের ধারক। ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকে একটি জনগোষ্ঠীর শতাব্দী-প্রাচীন স্মৃতি, বিশ্বাস, লোকজ জ্ঞান, জীবনবোধ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কোচ জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত থার ভাষা তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ভাষা, যা আজ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চাপে ক্রমেই সংকটের মুখে পড়ছে।
থার ভাষা মূলত কোচ জনগোষ্ঠীর একটি নিজস্ব ভাষা। বাংলাদেশে কোচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে একাধিক ভাষার উপস্থিতি রয়েছে, যেমন: বানাই, তিনিতেকিয়া, থার প্রভৃতি। এই ভাষাগুলোর মাধ্যমে তারা পারিবারিক যোগাযোগ, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক জীবন পরিচালনা করে থাকেন। কোচ জনগোষ্ঠীর এই শাখাগুলোর মধ্যে থার ভাষাভাষী কোচদের বসবাস টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলায়। নাট্যকার সেলিম আল দীন কোচদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সূত্র ধরে থার ভাষার কোচদের ‘কোচ-মান্দাই’ নামে অভিহিত করেছেন।
কোচ-মান্দাইদের ভাষাই হলো থার ভাষা। ভাষার নাম অনুযায়ী কেউ কেউ এই জনগোষ্ঠীকে ‘থারকোচ’ বলেও সম্বোধন করেন। থার ভাষা বর্তমানে আর কথোপকথনের মাধ্যম নয়, বরং এটি তাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে কিছু মানুষের স্মৃতিতে টিকে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ভাষার মধ্য দিয়েই তাদের ইতিহাস ও জীবনদর্শন প্রবাহিত হয়ে এসেছে।
এই সময় থার ভাষা নিয়ে লেখা কেন প্রাসঙ্গিক সে সম্পর্কে কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করা জরুরি, কারণ এই ভাষাটি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। নতুন প্রজন্মের প্রায় সবাই থার ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলে ধীরে ধীরে থার ভাষার ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ছে। যদি এখনই এই ভাষাকে কেন্দ্র করে গবেষণা, লেখা ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই মূল্যবান ভাষাটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে থার ভাষা নানা কারণে সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলা ভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যমের প্রভাব, শহরমুখী জীবনধারা এবং অন্যান্য কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের থার ভাষা শেখাতে আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে শিশু-কিশোররা ছোটোবেলা থেকেই থার ভাষার পরিবর্তে বাংলায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
এছাড়া, থার ভাষার লিখিত রূপ অর্থাৎ সাহিত্য উপাদান না থাকার কারণে এই ভাষা আজ হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। ফলে কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠীর প্রবীণ সদস্যদের মাঝে মৌখিকভাবে প্রচলিত এই ভাষার শব্দভাণ্ডার, গল্প, গান ও প্রবাদ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রবীণ থার ভাষাভাষীদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে থার ভাষার মূল্যবান ভাষাগত জ্ঞানও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে থার ভাষা শুধুই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। তাই এখনই এই ভাষা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা, লিপিবদ্ধকরণ এবং প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
থার ভাষার ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
কোনো ভাষার বিকাশ ও টিকে থাকার পেছনে তার ভৌগোলিক অবস্থান ও সামাজিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। থার ভাষার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। কোচ–মান্দাই জনগোষ্ঠী বসবাসের এলাকা, জীবনযাপন পদ্ধতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগের ধরন সবকিছুই এই ভাষার ব্যবহার ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে।
থার ভাষা মূলত বাংলাদেশের টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বসবাসরত কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠীর ভাষা। এসব জেলার গ্রামীণ ও বন-বনানী ঘেরা অঞ্চলের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো থার ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। কোচ–মান্দাই জনগোষ্ঠীর বসবাস প্রধানত গ্রামকেন্দ্রিক। তারা সাধারণত নদী, খাল, কৃষিজমি ও বনাঞ্চলের কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন বজায় রাখার নিমিত্তে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও জীবিকার প্রয়োজনে অনেক পরিবার শহরমুখী হয়েছে। ফলে তারা মূল জনগোষ্ঠী থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে থার ভাষার ব্যবহার দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ, দিনমজুরি, মাছ ধরা, বনজ সম্পদ সংগ্রহ ও ক্ষুদ্র ব্যাবসা। অনেক পরিবার ধানচাষ, সবজি চাষ ও পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত। কিছু মানুষ নির্মাণশ্রমিক, কারখানা শ্রমিক বা পরিবহনখাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ফলে বাংলা ভাষার প্রভাব তাদের জীবনে বেড়েছে অনেক আগে থেকেই। কর্মক্ষেত্রে ও বাজার বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের জন্য অধিকাংশ সময় বাংলার ব্যবহার করতে হয়। ফলে ধীরে ধীরে থার ভাষার ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়েছে এবং বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের মধ্যে।
বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কোচ–মান্দাই জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত সরকার গ্রহণ করেনি। এমনকি উক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেও এ সংক্রান্ত কোনো জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়নি। ফলে শিশুরা বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর থেকেই থার ভাষার পরিবর্তে বাংলায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকরাও সন্তানের ভবিষ্যৎ উন্নতির কথা ভেবে বাড়িতেও বাংলায় কথা বলতে উৎসাহিত করেন। এতে করে তাদের নিজস্ব ভাষা শেখার সুযোগ কমে যায়। ফলস্বরূপ থার ভাষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঠিকভাবে বিকশিত ও প্রবাহিত হয়নি বা এখনো হচ্ছে না। তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি গবেষণার কাজে টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার নলুয়া এবং গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার হবুয়ারচালা গ্রামে থার ভাষা শিক্ষার জন্য এলাকার স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিবর্গ, গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্র চালুর চেষ্টা করছে, যাকে থার ভাষা রক্ষার জন্য একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষা ব্যবহার
নতুন প্রজন্মের মধ্যে অর্থাৎ যাদের বয়স চল্লিশের নিচে তাদের মধ্যে থার ভাষার ব্যবহার একদমই নেই। এমনকি অধিকাংশ তরুণ থার ভাষা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। পঞ্চাশের মধ্যে যাদের বয়স, তাঁদের কেউ কেউ থার শব্দ জানলেও তা ব্যবহার করতে জানেন না। অর্থাৎ থার ভাষা কথোপকথনে তারা দক্ষ নন।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু শিক্ষিত তরুণ অবশ্য নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার জন্য আবার মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তারা গান, কবিতা, গল্প ও সামাজিক মাধ্যমে থার ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য নয়, তবে এই প্রবণতা যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভবিষ্যতে ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের এই আগ্রহ ও প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
থার ভাষার সন্ধান
থার ভাষা নিয়ে আমার আগ্রহের সূত্রপাত মূলত সাহিত্য পাঠ থেকে। বছর কয়েক আগে আমি একবার সেলিম আল দীনের ‘বনপাংশুল’ নাটক পড়ার সময় দেখলাম, এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠী কথা বলে দুর্বোধ্য ঠার ভাষায়, তখন এই শব্দবন্ধটি আমার মনে গভীর কৌতূহল সৃষ্টি করে। এই ‘ঠার ভাষা’ আসলে কী? আর কোচ-মান্দাই কারা? সেই ভাষা আজ কোথায়? এসব প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়ে তোলে। সেই ভাবনা থেকে নাটকে বর্ণিত সেই গ্রামের সন্ধান করি এবং সেই গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। সেই নাটকে নলুয়ার বন, সখিপুর উপজেলার কথা লেখা ছিল। তখন আমি সেই এলাকায় যাই এবং এই ভাষা ও জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। সেখানে যাওয়ার পরে জানতে পারি, কোচ–মান্দাই জনগোষ্ঠীর ভাষার প্রকৃত নাম ‘ঠার’ নয়, বরং ‘থার’। এই নামগত বিভ্রান্তিই আমাকে আরও গভীর অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। এই আগ্রহ থেকেই শুরু হয় আমার মাঠপর্যায়ের কাজ।
প্রথমে আমি সেলিম আল দীনের নাটকে বর্ণিত অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করি এবং সেখানে সরাসরি যাওয়ার পরিকল্পনা করি। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে উক্ত জনগোষ্ঠীর প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে থার ভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ভাষাটির বর্তমান অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি। প্রথম ফিল্ডওয়ার্কে গিয়েই আমি উপলব্ধি করি যে, বইয়ে পড়ে বা দূর থেকে ধারণা নিয়ে কোনো ভাষাকে বোঝা সম্ভব নয়; বাস্তব মানুষের জীবনের মধ্যেই তার ভাষার প্রকৃত রূপ লুকিয়ে থাকে।
থার ভাষা মূলত কোচ জনগোষ্ঠীর একটি নিজস্ব ভাষা। বাংলাদেশে কোচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে একাধিক ভাষার উপস্থিতি রয়েছে, যেমন: বানাই, তিনিতেকিয়া, থার প্রভৃতি। এই ভাষাগুলোর মাধ্যমে তারা পারিবারিক যোগাযোগ, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক জীবন পরিচালনা করে থাকেন।
এই গবেষণা করতে গিয়ে আমার একটা আনন্দের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেটা হলো সেলিম আল দীনের ‘বনপাংশুল’ আমার প্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম। সেই নাটকের নায়িকার নাম সুকি। যখন আমি সখিপুর যাই, তখন আলোচনার সূত্রধরে এই নাটক এবং সেলিম আল দীনের প্রসঙ্গ এলে গ্রামের প্রবীণ সদস্যরা সেলিম আল দীন চিনতে পারলেন এবং কীভাবে তিনি এখানে বসে সেই নাটক লিখেছেন, সেই গল্প বললেন। এমনকি সেই নাটকে বর্ণিত সুকি চরিত্রটি এখনো বেঁচে আছে মর্মে আমাকে জানালেন। এটা জানার পর আমার প্রচণ্ড উৎসাহ হলো, নাটকে বর্ণিত সুকিকে আমি বাস্তবে দেখতে চাই। তাদের কাছে আমার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম এবং সবাই মিলে আমাকে সুকির বাড়িতে নিয়ে গেল। সুকির বাড়িতে গিয়ে জানলাম তার প্রকৃত নাম শান্তি রানি কোচ। সেলিম আল দীন যখন বনপাংশুল লেখেন তখন তখন তিনি তরুণী, কিন্তু এখন তিনি বৃদ্ধা হয়ে গেছেন। তার কাছ থেকেও পেলাম থার ভাষার অনেক তথ্য। এরপর আমার থার ভাষা গবেষণার গতি গেলো বেড়ে।
শান্তি রানি কোচ আমাকে জানালেন যে, শৈশবে ও কৈশোরে নিয়মিত থার ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমি প্রথমবারের মতো থার ভাষার স্বর, শব্দভান্ডার ও বাক্যগঠনের বাস্তব রূপ শুনতে পাই। তিনি আমাকে জানান, একসময় পরিবার ও সমাজে এই ভাষার ব্যবহার ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু ধীরে ধীরে বাংলা ভাষার চাপে থার ভাষা পিছিয়ে পড়েছে।
প্রথম শব্দ সংগ্রহ
প্রথম শব্দ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা ছিল আমার জন্য একেবারেই নতুন ও স্মরণীয়। প্রথমদিকে আমি খুব সাধারণ শব্দ থেকেই শুরু করেছিলাম, যেমন : মানুষ, পানি, ভাত, ঘর, গাছ, যাওয়া, আসা ইত্যাদির থার অনুবাদ কী হবে সেসব। তথ্যদাতার মুখ থেকে শব্দ শুনে তাৎক্ষণিকভাবে নোট নেওয়া, উচ্চারণ বোঝার চেষ্টা করা এবং বারবার যাচাই করা— এই প্রক্রিয়া আমাকে ধৈর্য ও মনোযোগী হতে শিখিয়েছে। অনেক সময় একই শব্দ ভিন্ন ভিন্নভাবে উচ্চারিত হওয়ায় বিভ্রান্তিও তৈরি হতো। সেই সময় ধৈর্য ধরে বারবার একই শব্দ শুনে লিখে নিয়েছি। বুঝতে পেরেছি যে, ভাষা গবেষণা অত্যন্ত ধৈর্যের কাজ।
এই গবেষণার পথে আমাকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্ম থার ভাষা জানে না বা ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়। ফলে প্রকৃত ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন তথ্যদাতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কেউ কেউ ভাষাটি জানলেও লজ্জা বা সংকোচের কারণে প্রকাশ্যে ব্যবহার করতে চান না। তবে এসব সমস্যার মধ্যেও থার ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আমাকে বারবার নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। প্রতিটি নতুন শব্দ, প্রতিটি নতুন বাক্য এবং প্রতিটি তথ্যদাতার স্মৃতিচারণ আমার গবেষণাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। এভাবেই নাটক পাঠ থেকে যে গবেষণার অনুপ্রেরণার বীজ খুঁজে পেলাম তা আরো বৃদ্ধি পেল ফিল্ডওয়ার্কে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ মেলামেশার ফলে।
শাল-গজারির গ্রামগুলোতে
থার ভাষা গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক অংশ ছিল মাঠপর্যায়ের কাজ। এই পর্যায়ে আমি সরাসরি থারভাষী অঞ্চলের গ্রামগুলোতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে মিশেছি, তাদের দৈনন্দিন জীবন পর্যবেক্ষণ করেছি এবং ভাষার ব্যবহার কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।
প্রথমেই আমাকে যেতে হয়েছে শাল-গজারি আচ্ছাদিত গ্রামগুলোতে, যেখানে কোচ–মান্দাই জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। অনেক জায়গায় যাতায়াত ছিল কষ্টসাধ্য। কাঁচা রাস্তা, সীমিত যানবাহন ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়েছে। তবে এসব কষ্টের মধ্যেও গ্রামে পৌঁছে মানুষের আন্তরিকতা ও সবুজ বনাঞ্চলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিলেমিশে থাকা, তাঁদের জীবনযাপন আমাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, মুগ্ধ করেছে।
গ্রামে পৌঁছানোর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। প্রথমদিকে অনেকেই আমাকে একটু সন্দেহের চোখে দেখেছেন; কে আমি, কেন এসেছি, কী উদ্দেশ্যে তথ্য নিচ্ছি—এসব প্রশ্ন তাদের মনে ছিল। ধীরে ধীরে স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও প্রবীণদের মাধ্যমে পরিচয় ঘটিয়ে, আমার গবেষণার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তাদের আস্থা অর্জন করতে হয়েছে। বিশ্বাস তৈরি হওয়ার পর মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে শুরু করেছে।
ভাষা, শব্দ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
মাঠপর্যায়ের কাজে তথ্য দানে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা পালন করেছেন প্রবীণ থার ভাষাভাষীরা। তাঁরাই মূলত থার ভাষার জীবন্ত ভাণ্ডার। শৈশব ও যৌবনে নিয়মিত এই ভাষা ব্যবহার করায় তাঁদের স্মৃতিতে এখনো বহু শব্দ, প্রবাদ, বাক্য ও গল্প উজ্জ্বল ভাবে গেঁথে আছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পুরোনো সামাজিক রীতি, উৎসব, পারিবারিক সম্পর্ক ও লোককথার সঙ্গে যুক্ত ভাষার ব্যবহার ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন, যা গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তরুণ প্রজন্মের তুলনায় প্রবীণরাই এখন থার ভাষার শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছেন। তাঁদের স্মৃতির মধ্যেই ভাষার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে। তাই মাঠপর্যায়ে তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া এই গবেষণা কখনোই সম্ভব হতো না। গ্রামে যাওয়া, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, ভাষা রেকর্ড করা এবং প্রবীণ ভাষাভাষীদের অভিজ্ঞতা গ্রহণ—এই চারটি দিক মিলিয়েই আমার ফিল্ডওয়ার্ক ভিত্তিক গবেষণা কাজটি এগিয়ে চলেছে।
থার ভাষার বৈশিষ্ট্য
থার ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে বাংলা ও আশপাশের অন্যান্য ভাষা থেকে আলাদা করে তুলেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাংলা এবং অপরাপর ভাষার সাথে থার ভাষার কিছু মিলও দেখা যায়। থার ভাষার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো যার মাধ্যমে এই ভাষার স্বাতন্ত্র্য স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যাবে ।
উচ্চারণের বৈশিষ্ট্য
কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠীর থার ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই; লেখার সময় সাধারণত বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে থাকে। থার ভাষার উচ্চারণে সাধারণত ঈ, ঊ, ঋ, ঔ-এর ব্যবহার প্রত্যক্ষ করা যায় না। থার ভাষায় ব্যঞ্জনবর্ণ ২৬ টি; সেগুলো হলো : ক, খ, গ, গ, ঘ, চ, ছ, জ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ম, য, র, ল, শ, স এবং হ। থার ভাষার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো : এই ভাষায় ঙ, ঝ, ঞ, ণ, ভ, ষ, ড় এবং ঢ় ব্যবহার খুব বেশি চোখে পড়ে না। ভাষার মধ্যে আঞ্চলিক শব্দের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়। যেমন থার ভাষায় দরজাকে অঞ্চল ভেদে ‘জাপ’ এবং ‘দুয়ার’ বলা হয়। আবার গ্রামকে অঞ্চলভেদে ‘গেরাম’ এবং ‘হারি’ বলা হয়। মানুষকে থার ভাষায় বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে ‘মান্দাই’ বা ‘মেন্দাই’ বলা হয়ে থাকে। এগুলোকে মূলত থার ভাষার উপর স্থানীয় প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু শিক্ষিত তরুণ অবশ্য নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার জন্য আবার মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তারা গান, কবিতা, গল্প ও সামাজিক মাধ্যমে থার ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য নয়, তবে এই প্রবণতা যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভবিষ্যতে ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাদের এই আগ্রহ ও প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
থার কোচ ভাষার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর উচ্চারণের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। পর্যবেক্ষণকালে দেখা গেছে যে, শ্বাসাঘাতের তারতম্যের কারণে শব্দের অর্থ বদলে যায় থার ভাষায়। অর্থাৎ একই শব্দ নির্দিষ্ট ধ্বনিগত বা শ্বাসাঘাতের তারতম্যের কারণে অর্থের ভিন্নতা তৈরি হয়। যেমন, থার ভাষায় ‘না’ শব্দটির তিনটি অর্থ পাওয়া যায়। থার ভাষায় “না ইচ্ছা হেবা” ইচ্ছা এদিকে অর্থ তুমি, আবার “না জাবা” আসো, অর্থ মাছের তরকারি; ‘‘না হেংওয়া নাম্মাই” অর্থ না যাওয়া ভালো। এখানে প্রথম বাক্যের ‘না’-এর উচ্চারণের সময় অল্প জোর দিয়ে উচ্চারণ করা হয় (ঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনির মতো), দ্বিতীয় ‘না’ উচ্চারণের সময় অধিক জোর দিয়ে উচ্চারণ করা হয় (ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনির মতো); আর শেষ বাক্যের ‘না’-এর উচ্চারণ করার সময় জোর দেওয়া হয় না বা শ্বাসাঘাত করা হয় না, অর্থাৎ অঘোষ ধ্বনির মতো ‘নামতো হয়’ উচ্চারিত উচ্চারণের তারতম্যের কারণে না। এই পৃথক অর্থ দাঁড়িয়েছে থার ভাষায়।
থার ভাষার শব্দের ধরন
থার ভাষার শব্দভান্ডারে প্রধানত প্রকৃতি, কৃষিকাজ, পশুপালন, পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্ম ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দ বেশি দেখা যায়। কারণ এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাস করে আসছে। অনেক শব্দ সরাসরি জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়েছে। আবার কিছু শব্দ বাংলা, বোড়ো ও গারো ভাষা থেকে প্রভাবিত হয়ে থার ভাষায় এসেছে। যেমন মাশু অর্থ গরু, পার অর্থ ফুল, মাংসা অর্থ লোক। এই শব্দগুলো থার ভাষায় এসে যুক্ত হয়েছে কালের ধারাবাহিকতায় পাশাপাশি দীর্ঘদিন সহাবস্থানের ফলে। এজন্য থার ভাষার সঙ্গে বাংলা, বোড়ো ও গারো ভাষার কিছু মিল লক্ষ্য করা যায়।
থার ভাষার বাক্যগঠন বৈশিষ্ট্য
থার ভাষার বাক্যগঠন রীতি বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। থার ভাষায় সাধারণত ‘কর্তা+কর্ম +ক্রিয়া’ রীতিতে বাক্য গঠিত হয়। অর্থাৎ ক্রিয়া পদ বাক্যের শেষে বসে। আর ক্রিয়ামূলে, য়া/ইয়া, নিং, নিয়া, গা যুক্ত হয়ে ক্রিয়ার কাল প্রকাশ করে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি বাক্য লক্ষ্য করা যেতে পারে, যেমন—‘আমি ভাত খাই’ বাক্যটি থার ভাষায় হবে “আংয়া মেই চা”। ‘তোমার ঘুম আসে না’ হবে “নানে সেইয়া হেবাজা”, ‘চুপ করে থাকো’ বাক্যটি হবে “যুক্তি কুরি দং”।
এছাড়াও থার ভাষার মধ্যে আঞ্চলিকতার প্রভাব থাকলেও প্রায় সকল অঞ্চলেই অভিন্ন রীতিতে বাক্য গঠিত হয়। যৌগিক, জটিল, কিংবা প্রশ্নসূচক বাক্যের গঠনরীতিও বাংলা ব্যাকরণের মতোই। থার ভাষায় বাক্যগঠন, শব্দের শেষে বিভক্তি যোগ করা এবং প্রশ্নবোধক বাক্য তৈরির ক্ষেত্রে এই মিল বেশি দেখা যায়। আবার বোড়ো ও গারো ভাষার মতো থার ভাষাতেও অনেক শব্দে স্বরের টান ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য রয়েছে, যা ভাষাগুলোর অভিন্ন উৎসের সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করে।
বর্তমানে থার ভাষার অবস্থা
থার ভাষা বর্তমানে একটি গুরুতর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় এই ভাষা ছিল কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানা সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কারণে এই ভাষার ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে থার ভাষা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ভাষার তালিকায় চলে গেছে। থার ভাষা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকলেও, এই ভাষাকে রক্ষা করার জন্য কিছু সচেতন মানুষ ও গবেষক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, গবেষণা, প্রকাশনা এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার মাধ্যমে থার ভাষাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। এই প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে আমার চলমান গবেষণাও কাজও একটি অংশ।
থার ভাষা সংরক্ষণের জন্য আমার দিক থেকে উদ্যোগ হলো IPA যুক্ত থার-বাংলা অভিধান প্রণয়ন। মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রবীণ থার ভাষাভাষীদের কাছ থেকে শব্দ সংগ্রহ করা, তাদের উচ্চারণ রেকর্ড করা, শব্দের অর্থ যাচাই করা—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অভিধানের কাজ এগিয়ে চলেছে। এই অভিধানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সহজেই থার ভাষার শব্দ, অর্থ, IPA-র মাধ্যমে উচ্চারণ এবং ব্যবহার জানতে পারবেন। এটি থার ভাষা সংরক্ষণের একটি স্থায়ী দলিল হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।
থার ভাষা গবেষণা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অভিধান প্রণয়নের পাশাপাশি থার ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করা হচ্ছে। ভাষার ধ্বনি, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, শব্দভান্ডার এবং সামাজিক ব্যবহার নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এই গবেষণার মাধ্যমে থার ভাষার বৈজ্ঞানিক দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপিত হবে এবং বিদ্যায়তনিকভাবে এই ভাষা গবেষণার দিকটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে আরও গবেষণার পথ খুলে দেবে।
থার ভাষা সন্ধান ও থার ভাষা রক্ষার যাত্রা এখনও শেষ হয়নি। অভিধান তৈরি, মাঠপর্যায়ে গবেষণা এবং ভাষার ব্যবহার পুনঃ জাগরণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিটি নতুন শব্দ, প্রতিটি নতুন তথ্য আমাদেরকে থার ভাষার গভীরে নিয়ে যায় এবং দেখায় যে, ভাষা শুধুই কথার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্মারক ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক।
থার ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন স্থানীয় কিছু উদ্যমী তরুণ। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষরা তাদের স্মৃতিতে থাকা শব্দ, গল্প, গান ও প্রবাদ ভাগাভাগি করে গবেষণাকে সমৃদ্ধ করছেন। অনেকেই আন্তরিকভাবে সময় দিয়ে তথ্য দিয়েছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং ভাষা রেকর্ড করতে সহযোগিতা করেছেন। তাদের এই সহযোগিতা ছাড়া থার ভাষা সংরক্ষণের কাজ কখনোই সম্ভব হতো না। বিশেষ করে রায়চাদ বর্মন নামের একজন স্থানীয় গবেষক এই গবেষণায় চমৎকার সহযোগিতা করেছে। তিনি নিজেও থার ভাষার শব্দ সংগ্রহ করে একটি অভিধান তৈরি করেছেন এবং থার ভাষা রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ফলে থার ভাষা সংরক্ষণের এই প্রচেষ্টা একক কোনো ব্যক্তির নয়, বরং গবেষক, স্থানীয় মানুষ এবং সচেতন সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই সত্য আরও গভীরভাবে প্রযোজ্য। কারণ তাদের ভাষা কেবল কথাবার্তার উপকরণ নয়, বরং প্রকৃতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। পাহাড়, নদী, বন, পশু-পাখি, ঋতু, কৃষিকাজ সবকিছুর জন্য তাদের নিজস্ব শব্দ আছে, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। এই শব্দগুলোর মধ্যেই গড়ে ওঠে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববোধ।
থার ভাষা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
থার ভাষা সংরক্ষণ ও প্রসারের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান প্রজন্মের প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। প্রথমত, থার ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্র বৃদ্ধি করতে হবে, যেমন : প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থার ভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে, যাতে নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। ফলে বলা যায়, থার ভাষা রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পর্যায়ে থার ভাষা রক্ষা ও গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল সৃষ্টি করা উচিত। স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাষা শিক্ষার মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যান্য ভাষার সাথে থার ভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। এই স্বীকৃতির ফলে প্রশাসনিকভাবে থার ভাষা ধীরে ধীরে ব্যবহার যোগ্য হয়ে উঠবে, এবং জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ভাষা রক্ষা করা যাবে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে অবশ্যই ভাষার সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে। বিদ্যালয়ে থার ভাষার পাঠ্যসূচি তৈরি, থার ভাষার সাহিত্য ও লোককথা অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষার্থীদের থার ভাষার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। থার ভাষা রক্ষায় গবেষক ও ভাষাবিদদেরও দায়িত্ব স্পষ্ট। গবেষণা, অভিধান ও মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি থার ভাষার ব্যবহার ও বিকাশে উক্ত ভাষাসম্প্রদায়কে সাহায্য করা জরুরি। শুধুমাত্র লিখিত রূপ সংরক্ষণ নয়, মৌখিক সংস্কৃতি, গান, উপকথা ও অনুষ্ঠানও রেকর্ড করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তরুণদের ভূমিকা। নতুন প্রজন্ম যদি ভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারে, তাহলে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। তরুণদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি প্রেম ও ব্যবহার বৃদ্ধি করতে সামাজিক প্রচারণা, সাংস্কৃতিক কর্মশালা, অনলাইন এবং মিডিয়ার সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে এবং এসব উদ্যোগ একত্রে সমন্বিতভাবে গ্রহণ করলে এই ভাষা হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।
থার ভাষার সন্ধান এখনো শেষ হয়নি
থার ভাষা সন্ধান ও থার ভাষা রক্ষার যাত্রা এখনও শেষ হয়নি। অভিধান তৈরি, মাঠপর্যায়ে গবেষণা এবং ভাষার ব্যবহার পুনঃ জাগরণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিটি নতুন শব্দ, প্রতিটি নতুন তথ্য আমাদেরকে থার ভাষার গভীরে নিয়ে যায় এবং দেখায় যে, ভাষা শুধুই কথার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্মারক ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক।
থার ভাষা রক্ষা ও চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের আশা ও দায়বদ্ধতা দুই-ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আশা রয়েছে যে নতুন প্রজন্ম থার ভাষাকে জানবে, ব্যবহার করবে এবং সংরক্ষণে অংশ নেবে। অন্যদিকে দায়বদ্ধতা হলো, শুধু নিজস্ব উৎসাহ নয়, বরং সামাজিক, শিক্ষামূলক ও গবেষণামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে থার ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। চলমান গবেষণার প্রতিটি পদক্ষেপ ভাষাকে জীবন্ত রাখতে সহায়ক হবে, কিন্তু ভাষাকে পরিপূর্ণভাবে টিকিয়ে রাখতে পারে কেবলমাত্র দৈনন্দিন জীবনে এই ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে।
শেষাংশে এসে বলতে চাই, থার ভাষার সন্ধান ও রক্ষার প্রচেষ্টা শুধু গবেষকদের বা বিশেষজ্ঞদের একক দায়িত্ব নয়, বরং এটি কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠীর মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, স্থানীয় অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষ এবং সংস্কৃতি কর্মীদেরও দায়িত্ব। থার ভাষা শেখা, ব্যবহার করা, ভাষা সুরক্ষা করা এগুলি হলো থার ভাষাকে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার কার্যকর উপায়। এর জন্য প্রথম কাজ হলো কোচ-মান্দাই জনগোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করা, আর এই ভাষা পুনরায় ব্যবহার শুরু করা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেই এই ভাষাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। আর তখনই থার ভাষার সন্ধানে এই যাত্রা সফলতা অর্জন করবে।
- হাসান অমিত: উত্তরা ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের শিক্ষক