একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পলাশ-শিমুলের রঙে রাঙানো এক শোকাবহ অথচ গৌরবের দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার রাজপথে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের বুকের তাজা রক্তে লেখা হয়েছিল মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। সেই রক্তস্রোত আজ বিশ্বস্বীকৃত। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের এই মিছিল কেবল ঢাকার রাজপথেই থেমে থাকেনি। পৃথিবীর মানচিত্রের বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন সময়ে শাসকের বুলেট, নিবর্তনমূলক আইন আর ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে মানুষ। তাদের কারও জিভ কেটে নেওয়া হয়েছে, আবার কারও বুকে বিঁধেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের বুলেট। চলুন বিস্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দেখে নেওয়া যাক মানভূম থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, আসামের বরাক উপত্যকা থেকে তুরস্কের কুর্দিস্তানে ছড়িয়ে থাকা সেইসব রক্তাক্ত অধ্যায়, যেখানে বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষরের জন্য দিতে হয়েছে চরম মূল্য।
মানভূম: ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন
আমরা যখন ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে গর্ব করি, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করতে হয় যে, ঠিক আমাদের প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গেই ঘটেছিল পৃথিবীর ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২-র বহু আগেই যার সূত্রপাত, আর যার পরিসমাপ্তি ঘটেছে ১৯৫৬ সালে। বলছি মানভূমের ভাষা আন্দোলনের কথা। অবিভক্ত ভারত যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে, তখন থেকেই মানভূমের বাঙালিদের জীবনে নেমে আসে এক কালো ছায়া। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ ও স্বাধীনতার পর বিহার সরকার মানভূমের বাংলাভাষী মানুষের ওপর হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার এক আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে। স্কুলগুলোতে বাংলা মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়, সরকারি দপ্তরে বাংলাকে নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি বাঙালিদের নিজ বাসভূমে বসবাসের জন্য ‘ডোমিসাইল সার্টিফিকেট’ দেখাতে বাধ্য করা হয়, যা ছিল চরম অপমানজনক।
এই অন্যায়ের প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালেই মানভূমে জ্বলে ওঠে বিদ্রোহের আগুন। অতুলচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘লোক সেবক সংঘ’। শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী সত্যাগ্রহ। এই আন্দোলনের সবচেয়ে অনন্য দিক ছিল এর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। মানভূমের লোকগীতি ‘টুসু’ গানকে তারা প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সাংসদ ভজহরি মাহাতো লিখলেন সেই বিখ্যাত গান: “শুন বিহারি ভাই, তোরা রাখতে লারবি ডাণ্ডা দেখাই...”। গ্রামের সাধারণ নারী-পুরুষ এই গানে কণ্ঠ মিলিয়ে অহিংস প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পুলিশ এই টুসু গানের বই বাজেয়াপ্ত করে, গায়কদের গ্রেপ্তার করে। ভাবা যায়? গান গাওয়ার অপরাধে কারাবরণ!
১৯৫৬ সালের এপ্রিল মাসে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। মানভূমের হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে কলকাতা অভিমুখে ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক পদযাত্রা শুরু করেন। এই মিছিলে সামিল হয়েছিলেন বহু নারীও। এই দীর্ঘ সংগ্রামের ফলেই ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর মানভূম ভেঙে পুরুলিয়া জেলার জন্ম হয় এবং তা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯১২ সাল থেকে শুরু হওয়া বঞ্চনা আর ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত চলা এই একটানা সংগ্রাম প্রমাণ করে, মানভূমের লড়াই ছিল বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম ভাষা সংগ্রাম।
বরাক উপত্যকা: একুশের চেতনার আরেক উত্তরাধিকার
ঢাকার একুশে ফেব্রুয়ারির ঠিক ৯ বছর পর, ১৯৬১ সালে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় ঘটেছিল আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। আসাম সরকার যখন অহমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে বিল পাস করে, তখন বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী জনগণ অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। তাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার এই হীন চক্রান্তের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে শিলচর। গঠিত হয় ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’।
১৯৬১ সালের ১৯ মে। শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে ডাকা হয় শান্তিপূর্ণ অবরোধ বা সত্যাগ্রহ কর্মসূচি। হাজার হাজার জনতা রেললাইনে বসে মাতৃভাষার অধিকার দাবি করছিল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই কোনো উস্কানি ছাড়াই প্যারামিলিটারি বাহিনী নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। মাত্র সাত মিনিটের সেই নারকীয় তান্ডবে ঝরে যায় এগারোটি তাজা প্রাণ। শহীদ হন কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদ রঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় কমলা ভট্টাচার্যের নাম। ১৬ বছরের কিশোরী কমলা, যিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন মাত্র। তিনিই বিশ্বের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম নারী শহীদ। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কোনো নারী শহীদ হননি, কিন্তু ১৯৬১ সালের ১৯ মে বরাকের রাজপথ নারীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। কমলা ভট্টাচার্যের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, ভাষার লড়াইয়ে নারীদের ভূমিকা কেবল পর্দার আড়ালে ছিল না, তারাও সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলেন। এই এগারো জন শহীদের রক্তের বিনিময়ে আসাম সরকার বাংলাকে বরাক উপত্যকার দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯ মে তাই বরাকের বাঙালীদের কাছে ‘ভাষা শহীদ দিবস’—একুশেরই আরেক রক্তিম প্রতিধ্বনি।
শ্রীলঙ্কা: একটি ভুল ভাষানীতি ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ
ভাষার প্রশ্নে একটি দেশ কীভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে, তার সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হলো শ্রীলঙ্কা। দ্বীপরাষ্ট্রটির স্বাধীনতার পর ১৯৫৬ সালে উগ্র সিংহলি জাতীয়তাবাদের বশবর্তী হয়ে তৎকালীন সরকার পাস করে কুখ্যাত ‘সিংহল ওনলি অ্যাক্ট’। এই আইনের মাধ্যমে সিংহলি ভাষাকে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হয় এবং সংখ্যালঘু তামিলদের ভাষাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়। ফলে সরকারি চাকরি, শিক্ষা এবং প্রশাসনিক কাজে তামিলরা রাতারাতি অযোগ্য হয়ে পড়ে। নিজ দেশেই তারা হয়ে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
ছবি: সংগৃহীততামিলরা প্রথমে শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র যখন সেই অহিংস আন্দোলনকে দমনের জন্য সহিংস পথ বেছে নেয়, তখন জন্ম নেয় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ। শিক্ষাক্ষেত্রে ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’ বা প্রমিতকরণের নামে তামিল ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পথ সংকুচিত করা হয়। এই ভাষিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনাই তামিল যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে বাধ্য করে। প্রভাকরণের নেতৃত্বে গঠিত হয় এলটিটিই। শুরু হয় তিন দশকব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, যাতে প্রাণ হারায় লক্ষাধিক মানুষ। শ্রীলঙ্কার এই ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ভাষার ওপর আঘাত কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। একটি ভুল ভাষানীতি কীভাবে একটি সমৃদ্ধ জনপদকে বধ্যভূমিতে পরিণত করতে পারে, শ্রীলঙ্কা তার জ্বলন্ত সাক্ষী।
তামিলনাড়ু: দ্রাবিড় আত্মসম্মানের লড়াই
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে, তামিলনাড়ুতেও ভাষার জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস কম পুরনো নয়। এখানে লড়াইটা ছিল হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৩৭ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে যখন জোরপূর্বক হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন থেকেই পেরিয়ার ও আন্নাদুরাইয়ের নেতৃত্বে শুরু হয় হিন্দি-বিরোধী আন্দোলন। তবে এই আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয় ১৯৬৫ সালে, যখন ভারতকে সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণ হিন্দীভাষী রাষ্ট্র করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মাতৃভাষা তামিলের মর্যাদা রক্ষায় এবং হিন্দি আগ্রাসন রুখতে তামিল যুবকরা বেছে নিয়েছিল আত্মাহুতির পথ। ১৯৬৪ সালে চিন্নাস্বামী এবং ১৯৬৫ সালে শিবলিঙ্গম, আরঙ্গনাথনসহ বেশ কয়েকজন যুবক গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দেন। ভাবা যায়? ভাষার জন্য শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া! এই নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও ব্যাপক গণজাগরণের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। আজও তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ভাষা একটি বড় ফ্যাক্টর, যা তাদের দ্রাবিড় পরিচয়কে স্বতন্ত্র করে রেখেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটো: বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ভাষার লড়াই
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, আফ্রিকা মহাদেশেও রয়েছে এর এক রক্তাক্ত অধ্যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকার যখন কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের ওপর জোরপূর্বক কৃত্রিমভাবে বানানো ‘আফ্রিকান্স’ ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন বারুদের স্তূপে আগুনের মতো জ্বলে ওঠে সোয়েটো। কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীরা তাদের মাতৃভাষা এবং ইংরেজির বদলে আফ্রিকান্স ভাষায় গণিত ও সমাজবিজ্ঞান পড়ার নির্দেশ মেনে নিতে পারেনি।
১৯৭৬ সালের ১৬ জুন। জোহানেসবার্গের সোয়েটোতে প্রায় ২০ হাজার স্কুলছাত্র রাস্তায় নেমে আসে। তাদের দাবি ছিল শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে নিজের ভাষার অধিকার। পুলিশ এই শিশু-কিশোরদের মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ১২ বছরের কিশোর হেক্টর পিটারসন। বন্ধু মাবুয়িসা মাখুবো যখন গুলিবিদ্ধ হেক্টরের রক্তাক্ত দেহ কোলে নিয়ে ছুটছিলেন এবং পাশে হেক্টরের বোন আতঙ্কে কাঁদছিলেন—সেই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী হয়ে সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই একটি ছবি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। সোয়েটো অভ্যুত্থানে প্রায় ছয়শ মানুষ প্রাণ হারান, যাদের অধিকাংশই ছিল স্কুলছাত্র। একুশে ফেব্রুয়ারির মতোই ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘যুব দিবস’ হিসেবে পালিত হয়, যা স্মরণ করিয়ে দেয় ভাষার জন্য শিশুদের আত্মবলিদানের কথা।
কুর্দিস্তান: কথা বলার জন্য যেখানে জিহ্বা কেটে ফেলা হতো
ভাষার জন্য সবচেয়ে নির্মম ও দীর্ঘস্থায়ী নির্যাতনের শিকার সম্ভবত কুর্দি জাতি। মধ্যপ্রাচ্যের তুরস্ক, ইরাক, ইরান ও সিরিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই রাষ্ট্রহীন জাতির ওপর নেমে এসেছে ভাষিক গণহত্যার খড়গ। বিশেষ করে তুরস্কে কুর্দি ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য যে আইন করা হয়েছিল, তা আধুনিক সভ্যতায় অকল্পনীয়।
১৯২৪ সাল থেকে তুরস্কে কুর্দি ভাষায় কথা বলা, গান গাওয়া বা প্রকাশনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি কুর্দি বর্ণমালায় থাকা ‘Q’, ‘W’, ‘X’—এই তিনটি অক্ষর ব্যবহার করাও ছিল আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অক্ষরগুলো তুর্কি বর্ণমালায় নেই, তাই এগুলো ব্যবহার করলেই বোঝা যেত এটি কুর্দি ভাষা। ফলে শিশুদের নাম রাখা, চিঠিপত্র লেখা এমনকি বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রেও এই অক্ষরগুলো ব্যবহারের কারণে হাজার হাজার মানুষকে জেল খাটতে হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীতকিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস শুধু জেল-জুলুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৮০-র দশকে তুরস্কের দিয়ারবাকির কারাগারে কুর্দি বন্দীদের ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হতো, তা শুনে শিউরে উঠতে হয়। মাতৃভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ বন্দীদের জিহ্বা কেটে ফেলা হতো। কানে গলানো সিসা ঢেলে দেওয়া হতো। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে কুর্দিদের ওপর রাসায়নিক গ্যাস হামলা চালানো হয়েছে, যার অন্যতম কারণ ছিল তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও ভাষাকে মুছে ফেলা।
ইরানেও কুর্দি ভাষার শিক্ষক ফারজাদ কামানগারকে ফাঁসি দেওয়া হয় ২০১০ সালে, যার অপরাধ ছিল গোপনে শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষা দেওয়া। তবুও কুর্দিরা দমে যায়নি। জেলখানায় জিহ্বা কেটে ফেলার ভয় উপেক্ষা করেও তারা ফিসফিস করে মায়ের ভাষায় কথা বলেছে, লুকিয়ে গান গেয়েছে। লায়লা যানা নামের এক কুর্দি নারী সাংসদ তুরস্কের পার্লামেন্টে কুর্দি ভাষায় শপথবাক্য পাঠ করার সাহসিকতা দেখিয়ে ১৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। কুর্দিদের এই লড়াই আজও চলছে। তাদের কাছে ভাষা মানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা মানে অস্তিত্ব, ভাষা মানে বেঁচে থাকা।
একুশের বিশ্বজনীন দায়
একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আর কেবল বাঙালির শোকের দিন নয়, এটি আজ বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের ভাষিক অধিকার আদায়ের প্রতীক। ১৯৫২ সালে ঢাকা যে মশাল জ্বালিয়েছিল, সেই আলোতেই আমরা আজ দেখতে পাই মানভূমের পদযাত্রা, বরাকের রক্তস্নাত স্টেশন, জাফনার ধ্বংসস্তূপ, সোয়েটোর কিশোর হেক্টরের লাশ আর কুর্দিস্তানের কর্তিত জিহ্বার করুণ ইতিহাস।
আমরা যখন প্রভাতফেরিতে যাই, তখন যেন আমাদের মনে থাকে এই ফুল, এই গান, এই শ্রদ্ধা কেবল রফিক-সালামদের জন্য নয়। এই শ্রদ্ধা সেই কমলা ভট্টাচার্যের জন্য, যিনি ম্যাট্রিক পাসের আগেই গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন। এই শ্রদ্ধা সেই নাম না জানা কুর্দি মায়ের জন্য, যিনি সন্তানের সাথে নিজের ভাষায় কথা বলতে পারেন না। এই শ্রদ্ধা দক্ষিণ আফ্রিকার সেই কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের জন্য, যারা শোষকের ভাষা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সার্থকতা তখনই পূর্ণ হবে, যখন আমরা কেবল নিজেদের ভাষার আবেগে ভেসে না গিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি বিপন্ন ভাষার আর্তনাদ শুনতে পাব। ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছে, তারা যে দেশের বা যে বর্ণের হোক না কেন—তারা সবাই এক পরিবারের। তারা ভাষার শহীদ। তাদের সবার রক্তে মিশে আছে একই স্লোগান—আমার ভাষা, আমার অধিকার। আজকের এই দিনে, বিশ্বজুড়ে সকল ভাষা সংগ্রামীর প্রতি আমাদের বিনম্র ও সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
একুশ মানে মাথা নত না করা। এই মন্ত্রই হোক বিশ্বের সকল ভাষা ও সংস্কৃতির রক্ষকবচ।
আরিফ রহমান: গবেষক ও লেখক