জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কী তফাৎ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এই শপথ বাক্য পাঠ করান। বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এরপর একে একে ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে জায়গা পেয়েছেন। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের অনেক প্রতিনিধিকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনমনে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে কাজের এবং ক্ষমতার পার্থক্য ঠিক কতটা।

মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সাংবিধানিক ভিত্তি কী, নিয়োগ প্রক্রিয়া কেমন?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তিনি পছন্দমতো ব্যক্তিদের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করেন। রাষ্ট্রপতি এই নামগুলো অনুমোদন করে তাঁদের নিয়োগ দান করেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উভয়কেই সংসদ সদস্য হতে হয় অথবা টেকনোক্র্যাট কোটায় নির্বাচিত হতে হয়। শপথ গ্রহণের সময়ও উভয় পদধারীকে রাষ্ট্রপতির কাছে একই প্রক্রিয়ায় শপথ নিতে হয়। তবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের পদের ওজনের মধ্যে বিশাল ফারাক লক্ষ করা যায়।

সংসদ ভবনে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বিএনপি নেতারা। ছবি: সংগৃহীত
সংসদ ভবনে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন সালাহউদ্দিন আহমেদসহ বিএনপি নেতারা। ছবি: সংগৃহীত

মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে নীতিনির্ধারণী ক্ষমতায় দুজনের তফাৎ কী?

মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর ক্ষমতার মূল পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে ‘রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬’-এর মাধ্যমে। একজন পূর্ণ মন্ত্রী একটি বা একাধিক মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত তাঁর হাত দিয়েই চূড়ান্ত হয়। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী সাধারণত পূর্ণ মন্ত্রীর একজন সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সহজ কথায় বলতে গেলে মন্ত্রী হলেন একটি মন্ত্রণালয়ের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অভিভাবক। প্রতিমন্ত্রী সেখানে একজন নির্বাহী সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মন্ত্রিসভার বৈঠক ও নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ কার কতটুকু?

সরকার পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চতর স্তর হলো মন্ত্রিসভার বৈঠক বা ক্যাবিনেট মিটিং। এই বৈঠকেই জাতীয় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কেবল পূর্ণ মন্ত্রীরাই এই সভার নিয়মিত সদস্য। তাঁরা পদাধিকারবলে প্রতিটি বৈঠকে উপস্থিত থাকেন এবং ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন। প্রতিমন্ত্রীরা সাধারণত মন্ত্রিসভার নিয়মিত সদস্য নন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আমন্ত্রণ ছাড়া তাঁরা এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। সাধারণত কোনো বিশেষ বিষয়ে যদি প্রতিমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের তথ্য প্রয়োজন হয় কেবল তখনই তাঁকে ডাকা হয়।

প্রতিমন্ত্রীরা কখন স্বাধীন দায়িত্ব পান?

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো মন্ত্রণালয়ে সরকার কোনো পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ দেয় না। এমন পরিস্থিতিতে একজন প্রতিমন্ত্রীকে ওই মন্ত্রণালয়ের ‘স্বাধীন দায়িত্ব’ বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট চার্জ দেওয়া হয়। যখন কোনো প্রতিমন্ত্রী স্বাধীন দায়িত্ব পান তখন তিনি প্রায় একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মতোই ক্ষমতা ভোগ করেন। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে রিপোর্ট করেন এবং মন্ত্রণালয়ের সব নীতিনির্ধারণী ফাইলে স্বাক্ষর করতে পারেন। তবে স্বাধীন দায়িত্ব পাওয়ার পরেও তাঁর পদমর্যাদা কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর স্তরেই থেকে যায়। তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর প্রটোকল বা মর্যাদা দাবি করতে পারেন না।

শপথ নিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রীরা। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল
শপথ নিচ্ছেন প্রতিমন্ত্রীরা। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল

রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় দুই পদের ব্যবধান কতটা?

রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম বা ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুযায়ী পূর্ণ মন্ত্রীদের অবস্থান প্রতিমন্ত্রীদের চেয়ে অনেক ওপরে। পূর্ণ মন্ত্রীদের বেতন-ভাতা প্রতিমন্ত্রীদের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। ‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স রিমিউনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ অনুযায়ী এই সুযোগ-সুবিধাগুলো নির্ধারিত হয়। একজন মন্ত্রী যে ধরনের আবাসন সুবিধা বা অন্যান্য সরকারি সুযোগ পান প্রতিমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে তা কিছুটা সীমিত করা থাকে। প্রটোকলের এই ভিন্নতা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একইভাবে কাজ করে।

ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির নিয়ম কী?

প্রশাসনিক কাজের প্রবাহ বা ফাইল মুভমেন্টের ক্ষেত্রেও দুই পদের মধ্যে স্তরভেদ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সংবেদনশীল এবং নীতিনির্ধারণী ফাইলগুলো সরাসরি পূর্ণ মন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়। প্রতিমন্ত্রী কেবল সেই ফাইলগুলোই দেখার সুযোগ পান যেগুলো মন্ত্রী তাঁর জন্য বরাদ্দ করে দেন। জবাবদিহির ক্ষেত্রেও মন্ত্রী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী তাঁর কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। এই প্রশাসনিক কাঠামোটি সরকারের কাজের স্বচ্ছতা এবং শৃঙ্খলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী পদের মধ্যে দৃশ্যমান অনেক পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় উভয় পদই গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রী যদি একটি মন্ত্রণালয়ের চালিকাশক্তি হন তবে প্রতিমন্ত্রী হলেন সেই শক্তির গতি প্রদানকারী সহযোগী। গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতে এই দুই পদের সমন্বয় জরুরি। নতুন এই মন্ত্রিসভায় পদের এই তফাত থাকলেও সবার লক্ষ একটাই হওয়া উচিত। দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন এবং একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া। পদের মর্যাদাক্রম বা সুযোগ-সুবিধার চেয়ে জনকল্যাণের মানসিকতা থাকলেই কেবল এই বিভাজন সার্থক হবে। আগামী দিনগুলোতে তারেক রহমানের এই মন্ত্রিসভা কতটা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো জাতি। পদমর্যাদা যাই হোক তাঁদের কর্মদক্ষতাই হবে নতুন সরকারের সফলতার আসল মাপকাঠি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত