আজকাল খেলনার দোকানে শুধু ছোট ছেলে-মেয়েদেরই দেখা যায় না, সেখানে পঁচিশ, ত্রিশ এমনকি এর চেয়ে বেশি বয়সীদেরও দেখা মিলছে। এখন তাদেরও দেখা যায় হাসিমুখে বিভিন্ন খেলনা নেড়ে-চেড়ে দেখছেন বা কিনছেন। কোনো শিশুর জন্য নয়, বরং তারা খেলনাটি কিনছেন নিজের জন্যই!
পোকেমন কার্ড, লেগো বা প্লাশটয়, কিছুই এখন আর শুধু শিশুদের খেলনা নয়। এমনকি অফিসের জেন-জি থেকে মিলেনিয়াল, এদের ডেস্কেও দেখা মেলে বিভিন্ন খেলনা বা একশ্যান ফিগারের। এটি এখন শুধু মজা নয়, হয়ে উঠেছে শৈশবের অনুভূতির পুনরুদ্ধার, আবেগের প্রকাশ। এই প্রবণতা এখন বৈশ্বিক বাজারেও আলোড়ন সৃষ্টি করছে।
এই নতুন প্রজন্মকে বিশ্বব্যাপী বলা হচ্ছে ‘কিডাল্ট’—ইংরেজিতে ‘kidult’। প্রাপ্তবয়স্ক হলেও তাদের অনুভূতি শৈশবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্বব্যাপী খেলনার বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই বাজারের ২৮ শতাংশ ক্রেতাই প্রাপ্তবয়স্ক। অর্থাৎ প্রায় প্রতি চারটি খেলনার মধ্যে একটিই বড়রা নিজেই কিনে নিচ্ছে।
শুধু পশ্চিমা বিশ্বেই নয়, আমাদের দেশেও ধীরে ধীরে এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জায়গা করে নিচ্ছে।
কেন এই ঝোঁক
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ একটাই—নস্টালজিয়া। নস্টালজিয়া মানে শুধু অতীতের কথা মনে পড়া নয়; এটা এক ধরনের আবেগী আশ্রয়। শৈশবের সেই সময়, যখন দায়িত্ব ছিল কম, আনন্দ ছিল বেশি, আর জীবন ছিল তুলনামূলক সহজ—সেই অনুভূতিটুকু আবার ছুঁয়ে দেখতে চাওয়াই মানুষকে খেলনার দিকে টেনে আনে।
অনলাইন রিসার্চ প্ল্যাটফর্ম ‘সায়েন্স ডিরেক্ট’ এর এক গবেষণা বলছে, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই নস্টালজিয়াকে মানসিক স্বস্তি ও আবেগের উৎস মনে করেন, বিশেষ করে যখন বাস্তব জীবনের দায়িত্ব, চাপ, অফিসের জমে থাকা কাজ আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি- মনকে ক্লান্ত করে তোলে। এই স্মৃতি জড়িয়ে থাকা খেলনা কিনেও তারা সেই সুখের মুহূর্তগুলো ফিরে পেতে চান। সেই অনুভূতির জন্যই তারা অনায়াসে টাকা খরচ করতে প্রস্তুত থাকেন।
এই নস্টালজিয়া মূলত এক ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক কম্ফোর্ট-মেকানিজম’। অর্থাৎ পুরোনো দিনের ভালো সময়ের অনুভূতি আমাদের স্মৃতিতে থেকে যায়, কষ্টের সময় আমরা সেসব আঁকড়ে ধরে ভালো থাকতে চাই। এগুলো মূলত আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন বুষ্ট করে, যা খুশির অনুভূতি দেয় এবং মানসিক চাপ কমায়।
শুধু ডেটা বা পরিসংখ্যান নয়, বাস্তবেও আপনি যদি ঢাকা শহরের পথ ধরে হাঁটেন, শহরের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসগুলোর কাছে ছোট্ট টয় বা গেম শপে বড়দের পোকেমন ব্যাগ, ডিজাইন ফিগারেট বা বিভিন্ন লেগো কিটও খুঁজে পাবেন।
কিডাল্ট প্রজন্ম। ছবি: সংগৃহীতএছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, এই প্রজন্ম এখন নিজেরা অর্থ উপার্জন করেন। তাই ছোটবেলায় বাবা-মার কাছে কান্নাকাটি করেও যে শখ বা আবদার পূরণ হয়নি, নিজের উপার্জনেই এখন তারা সেই শখ মেটাতে পারেন। এটি তাদের এক ধরনের ‘সেলফ স্যাটিস্ফেকশন’ দেয়।
বিভিন্ন ফিগারেট, হট হুইলস বা লাবুবু ডলের মতো ডিজাইনার ফিগারগুলোও বড়দের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে শুধু দেখতে সুন্দর বলেই নয়, বরং এগুলো সংগ্রহ করা মানে নিজের রুচি, আবেগ আর পরিচয় প্রকাশ করা। অনেক ক্ষেত্রেই এর মাধ্যমে অন্যের সঙ্গে স্মৃতি রোমন্থন করা যায়, যা নতুন ‘নেটওয়ার্কিং’ এর রাস্তা করে দেয়। অফিস ডেস্কে রাখা একটি ছোট গাড়ি অনেক সময় হয়ে ওঠে চাপের মাঝখানে এক টুকরো স্বস্তি।
ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ টুরকুর এক গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগ, একাকীত্ব ও মানসিক চাপ বাড়ার কারণে বিশেষ করে তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা প্লাশ টয় ও কালেক্টিবল পণ্যকে মানসিক সান্ত্বনা ও প্রশান্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন গবেষণায় বলা হয়, স্ট্রেস মোকাবিলায় এটি মাইন্ডফুলনেস চর্চার মতোই মানসিক স্বস্তি দেয়। কঠিন এই পৃথিবীতে নরম খেলনা মনকেও নরম রাখে।
শুধুমাত্র পণ্যই নয়
আগে খেলনা মানেই ছিল শিশুদের আনন্দ। এখন খেলনা মানে—নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক।
একজন ৩০ বছর বয়সি মানুষ যখন মিনিসো থেকে প্লাশ বা কোনো লেগো কিনছেন, তখন তিনি আসলে শুধু টাকা খরচ করছেন না; তিনি নিজের জন্য একটু আনন্দ কিনছেন।
সায়েন্স ডিরেক্ট এর গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ যখন অনিশ্চয়তা, চাপ বা একঘেয়েমির মধ্যে থাকে, তখন পরিচিত স্মৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। খেলনা সেই স্মৃতিগুলোকে ছোঁয়ার সবচেয়ে সরাসরি উপায়। গান, সিনেমা বা ছবির চেয়েও খেলনার প্রভাব বেশি কারণ খেলনা স্পর্শ করা যায়, ধরে রাখা যায়।
বাজার বদলে যাচ্ছে, কৌশলও
এই আবেগকে খুব ভালোভাবেই বুঝেছে ব্যবসায়ীরা। তাই খেলনার বাজার এখন দুই ভাগে নয়—শিশু ও বড়—বরং একসঙ্গে দুদিকেই তাকাচ্ছে। অনেক বড় ব্র্যান্ডসহ, খেলনা প্রস্তুতকারকরা এখন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেগো ১৮+ কালেকশন বা মারভেল কমিক্সের বিখ্যাত চরিত্রের স্পেশাল সিরিজ বানাচ্ছে।
কিডাল্ট প্রজন্ম খেলনা পছন্দ করে। ছবি: সংগৃহীতলন্ডন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স সংস্থা ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনাল এর এক রিপোর্টে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে প্রাপ্তবয়স্কদের খেলনা কেনার হার প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। একটি প্রিমিয়াম লেগো সেট বা সীমিত সংস্করণের ফিগারের দাম অনেক সময় কয়েক হাজার টাকা হয় কিন্তু চাহিদা কমে না। ঢাকায় মিনিসো, গিফট শপ কিংবা অনলাইন স্টোরগুলোতে এই পরিবর্তন স্পষ্ট। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোকান গুলোতে বেশিরভাগ পণ্যই এখন বড়দের জন্য সাজানো।
ডেটা কী বলে, কিছু কঠিন সংখ্যা
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক লাইসেন্স গ্লোবাল ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বয়স্করা বিশ্ব খেলনা বিক্রির বাজার প্রায় ২৮ শতাংশ দখল করেছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে এক বছরে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি খেলনা বিক্রি হয়েছে।
এছাড়াও, ইউরোপের পাঁচ প্রধান দেশে প্রাপ্তবয়স্করা মোট বাজারের প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এশিয়ায় চীনের পপ মার্ট ২০২৩ সালে এক ব্র্যান্ড থেকেই ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউয়ান বিক্রি করে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি ইউরোপে ২০২৫ সালে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নিজের বা অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্কের জন্য খেলনা কিনেছে। খেলনা এখন কেবল শিশুদের নয়, বরং একটি লাইফস্টাইল ও নস্টালজিয়া-নির্ভর ভোক্তা সংস্কৃতির অংশ।
বাংলাদেশেও রঙিন ভবিষ্যৎ
এই বৈশ্বিক প্রবণতা ঢাকার মতো শহরেও ধীরে-ধীরে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমাদের দেশের এই বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ হাজার কোটি পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও এক্সপোর্ট উভয় ক্ষেত্রেই নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অর্থাৎ শুধু বড়রা শখে নয় বরং ব্যবসা, বিনিয়োগ ও পেশাদার শিল্প হিসেবে খেলনার বাজার এখন ঢাকায়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
আজকের দিনে খেলনা মানে শুধু খেলা নয়। এটি এক ধরনের আবেগী ভাষা, যা বড়রা ব্যবহার করছে নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্য।
যেখানে জীবন দ্রুত, কঠিন আর চাপের, সেখানে খেলনা মানুষকে একটু থামতে শেখায়। মনে করিয়ে দেয়—একসময় আমরা সবাই শিশু ছিলাম, আর সেই শিশু এখনো কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে।