ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদ আব্দুল জব্বারের স্মৃতি ধরে রাখতে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি জাদুঘর। কিন্তু প্রতিষ্ঠার দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও এটি আজও পূর্ণতা পায়নি। নেই কোনো ঐতিহাসিক স্মারক বা শহীদের ব্যবহৃত কোনো বস্তু। ফলে ‘ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার স্মৃতি জাদুঘর’ এখন কেবল নামেই জাদুঘর হিসেবে টিকে আছে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আব্দুল জব্বার। তার বীরত্বগাথা স্মরণে ২০০৮ সালে তার জন্মভিটা পাঁচুয়া গ্রামে (বর্তমান নাম ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার নগর) নির্মাণ করা হয় ‘ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’। প্রায় ১ হাজার ৪৬০ বর্গফুট আয়তনের এই প্রতিষ্ঠানে ৪ হাজারের বেশি বই থাকলেও নেই পাঠকের আনাগোনা।
সরেজমিনে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাদুঘর প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সারা বছর এখানে তেমন কোনো কর্মকাণ্ড থাকে না। জাদুঘরে শহীদের একটি ছবি ছাড়া তার ব্যবহৃত কোনো পোশাক, ঘড়ি বা অন্য কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। দর্শনার্থীরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে শহীদের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
জাদুঘরের গ্রন্থাগারিক মো. কায়সারুজ্জামান জানান, সরকারি ছুটির দিন (শুক্র ও শনিবার) জাদুঘর বন্ধ থাকে। পাঠাগারে ৪ হাজার ১৭৫টি বই থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় পাঠক সংখ্যা খুবই কম। তিনি আরও বলেন, ‘দর্শনার্থীরা এসে শহীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখতে চান, কিন্তু আমাদের সংরক্ষণে কিছু না থাকায় আমরা তা দেখাতে পারি না।’
শহীদ আব্দুল জব্বারের চাচাতো ভাই জয়নাল সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি এলেই কেবল লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। এখানে একটি কলেজ করার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। জাদুঘরে স্মৃতিচিহ্ন থাকলে মানুষ আরও আকৃষ্ট হতো।’
গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এন. এম. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সমস্যা ও লোকবলের অভাব রয়েছে। তবে জাদুঘরটিকে তথ্যচিত্র ও বই দিয়ে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। শহীদ মিনার পুনর্নির্মাণ এবং একটি স্থায়ী মঞ্চ তৈরির মাধ্যমে এটিকে শিক্ষামূলক বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, ১৯১৯ সালে জন্ম নেওয়া আব্দুল জব্বার পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা দিনে মাতৃভাষার টানে মিছিলে যোগ দিয়ে তিনি ইতিহাস হয়ে যান। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ময়মনসিংহবাসী।