দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ/যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ৯/১১-এর আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে
স্ট্রিম ডেস্ক

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দিন দিন চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। সন্ত্রাস দমনের জন্য বরাদ্দ সম্পদ অন্য ধরনের হুমকি মোকাবিলার প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিজ্ঞ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দায়িত্ব ছাড়ছেন এবং সন্ত্রাসের ঝুঁকি নিয়ে একধরনের ‘আত্মতুষ্টি’ তৈরি হচ্ছে। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।
আজ ৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে ভয়াবহ ওই হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। এরপর কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, উগ্রবাদ ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ে।
গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর মতো ভয়াবহ মাত্রার আর কোনো সফল সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। উগ্র ইসলামপন্থী মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হামলার সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম। তারপরও বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, দেশটিতে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি আবারও বাড়ছে। কেউ কেউ এ পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করছেন। তাঁদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন কিছু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যেগুলোকে বিশেষজ্ঞরা যথাযথ বা বিবেচনাপ্রসূত মনে করছেন না।
এ ছাড়া মাদক কারবারি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে আরও জরুরি কিছু সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ কমে যাচ্ছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা। তাদের আশঙ্কা, অর্থের সংকট, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চলে যাওয়া, সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে আগের মতো গুরুত্ব না দেওয়া এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আবার এমন একটি পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যা ২০০১ সালের হামলার আগে দেখা গিয়েছিল।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ ব্রুস হফম্যান ৯/১১-এর দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, সেই সময়ের বিশৃঙ্খলা দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো সন্ত্রাসের হুমকিকে হালকাভাবে নেবে না। কিন্তু তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সেই সতর্কতা কমে এসেছে। হামলার ২৫ বছর পর এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সতর্ক করে বলছেন সন্ত্রাসবিরোধী যে বিশাল কাঠামো ৯/১১-এর পর তৈরি করা হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কেন কমেছে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা
৯/১১-এর পর প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করা। আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘ যুদ্ধ, আল-কায়েদা ও পরে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযান সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল সন্ত্রাস দমন। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বদলাতে শুরু করে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পায়। বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, এই পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এর ফলে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে লোকবল ও অর্থ কমে গেছে। সুফান সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক কলিন ক্লার্ক বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন অর্থ, জনবল ও আত্মতুষ্টি এই তিন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। প্রায় ২০ বছর ধরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ’ চালানোর পর অনেক কর্মকর্তা অন্য ধরনের হুমকির দিকে যেতে চেয়েছেন।
ট্রাম্প আমলে নতুন বিতর্ক
বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার বড় একটি অংশ এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন সন্ত্রাসবিরোধী নীতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে এবং কোন হুমকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে মাদক কার্টেল, বামপন্থী সহিংসতা ও বিভিন্ন গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডানপন্থী উগ্রবাদ বাড়ার ঝুঁকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে সমালোচনা রয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আরও অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনে গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার শীর্ষ পদে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের বড় পর্যায়ের আইন প্রয়োগ বা গোয়েন্দা ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। কলিন ক্লার্কের মতে, এতে গোয়েন্দা সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মধ্যে মনোবল কমেছে।
সীমিত সম্পদ, বাড়ছে ঝুঁকি
২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য মোট প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে মেক্সিকোর মাদক কার্টেলগুলোর মতো অপরাধী গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, অর্থ ও জনবল সীমিত। তাই নতুন নতুন হুমকি মোকাবিলায় একই সম্পদ ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষক দেবোরাহ মারগোলিন মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল আগের তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তাঁর মতে, কৌশলটি বাস্তব হুমকির চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আল-কায়েদা বা ইসলামিক স্টেটের মতো সংগঠন আর হুমকি নয়। সমস্যা হলো, একই সঙ্গে এতগুলো হুমকি মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগের মতো অঢেল সম্পদ নেই।
৯/১১-এর আগের ভুল কি আবার হচ্ছে
৯/১১ এর আগে আল-কায়েদা একাধিক হামলা চালিয়েছিল। ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা হয়। ২০০০ সালে ইয়েমেনের কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল এ আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য একে অপরের সঙ্গে যথেষ্ট ভাগাভাগি হয়নি। এফবিআই ও সিআইএর মধ্যে তথ্য সমন্বয়ের ঘাটতিও ছিল। ৯/১১ নিয়ে কংগ্রেসের তদন্তে এসব ব্যর্থতা উঠে আসে।
বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের ভয়, একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা আবার তৈরি হচ্ছে ওয়েস্ট পয়েন্টের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক গবেষক ডন রাসলার সতর্ক করে বলেছেন, সন্ত্রাসবাদ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি। তবে কম লোকবল ও কম সম্পদের কারণে দেশটিকে আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকি পূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ এর মতো বড় হামলা আর হয়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে হুমকি শেষ হয়ে গেছে, বরং হুমকির ধরন বদলেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১ এর পর যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস ইসলামপন্থী উগ্রবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ১০০টির বেশি হামলা হয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞদের মূল সতর্কবার্তা হলো ৯/১১ এর মতো আরেকটি হামলা না হওয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না।
সন্ত্রাসবাদ হয়তো আগের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু হুমকি রয়ে গেছে। আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কোনো হুমকি দীর্ঘদিন চোখে না পড়লেই সেটি অদৃশ্য হয়ে যায় না। ২৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া। বিশেষজ্ঞরা এখন ভয় পাচ্ছেন, নতুন বাস্তবতায় সেই একই ভুল যেন আবার ফিরে না আসে।
(দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)
.png)
-b52d51.jpeg)
-028855-256x144.webp)




