
৯/১১-এর হামলা নিয়ে আমার পড়া সবচেয়ে ভালো লেখাগুলোর একটি হলো ‘ডায়েরি অব ডিজাস্টার’ নামের একটি ছোট রচনা। এটি লিখেছিলেন ২৫ বছর বয়সী সাংবাদিকতার ছাত্র নিকোলাস স্প্যাংলার। তিনি এখন লং আইল্যান্ডের ‘নিউজডে’ পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন।
সেদিন সকালে তিনি ঘটনাচক্রে ডাউনটাউনেই ছিলেন, আর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের এতটাই কাছে ছিলেন যে প্রথম ও দ্বিতীয় বিমান হামলার মাঝের সময়টাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। গ্রাউন্ড জিরোর প্রথম কয়েক ঘণ্টার ভয়ংকর সব স্মৃতিকথা তিনি লিখেছেন।
তিনি শুনেছিলেন নর্থ টাওয়ার থেকে লাফিয়ে পড়া মানুষদের শরীর ফুটপাতে আছড়ে পড়ার শব্দ, আর সেই সঙ্গে ভবনের বাইরের স্পিকার থেকে তখনও বেজে চলা শান্ত সুরের গান। একটা পাতাঝরা গাছের নিচে পড়ে ছিল বস্তায় মোড়ানো একটি বিচ্ছিন্ন পা। দ্বিতীয় টাওয়ার ধসে পড়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই কিছু দর্শনার্থী স্প্যাংলারকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাদের একটা স্মারক ছবি তুলে দেন। যেন এটা ছিল দুনিয়ার শেষ, অথবা অন্তত একটা জগতের সমাপ্তি। মানুষ তখনও বুঝতে পারছিল না ঠিক কেমন আচরণ করা উচিত।
যা দেখেছিলেন তা সম্পর্কে স্প্যাংলার কয়েকদিন পর লেখেন—আমাদের এখনকার জীবনযাপনের ধরন যেন ওই কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। আমেরিকান মূল্যবোধ—আমরা বিশ্বকে যেভাবে দেখি এবং তাতে নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করি—তা টুকরো টুকরো হয়ে গেছে এবং হয়তো একে বাতিলই করে দিতে হবে।
কিন্তু তিন মাস পর যখন তিনি নিজের সেই লেখাটাই আবার পড়েন, তখন তার মনে হয়েছিল এটা ঠিক ছিল না। তিনি লেখেন, আমাদের জীবনযাপনের ধরন শেষ হয়ে যায়নি, বরং এতে একটা বিরতি এসেছিল মাত্র। আর আমেরিকান মূল্যবোধ বলে যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে, তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। কিছু মানুষের জীবনে সেই দিনের ক্ষত চিরস্থায়ী হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ মানুষই তার চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ ঘটনা দিয়েই প্রভাবিত হচ্ছি।
--4fca91.jpg)
৯/১১ কি সত্যিই সবকিছু বদলে দিয়েছিল? বছরের পর বছর ধরে, অন্য অনেক বিষয়ে দ্বিমত থাকা মানুষগুলোও এই একটা প্রশ্নে সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। এর বিপরীতে কিছু বলাটা যেন ছিল ভুক্তভোগীদের প্রতি, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মারা যাওয়া সেনা ও সাধারণ মানুষদের প্রতি, এমনকি বিমানবন্দরে জুতো খুলতে বাধ্য হওয়া সাধারণ মানুষের বিবেচনাবোধের প্রতিও এক ধরনের অসম্মান।
কিন্তু এই প্রশ্ন আর তার উত্তর—দুটোই সবসময় এই ধারণা নিয়ে রঙিন ছিল যে, ৯/১১-এর পর সবকিছু বদলে যাওয়ারই কথা ছিল। অর্থাৎ এই আক্রমণ যেন যুক্তরাষ্ট্রকে একটা পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, যাতে তারা পাস বা ফেল যেকোনো একটা করতে পারে।
পঁচিশ বছর পর, এখন কিছুটা দূরত্ব থেকে বিষয়টা বিচার করা সম্ভব। আমাদের আজকের বাস্তবতার অনেকখানিই সরাসরি ৯/১১ থেকে উঠে এসেছে। তাই কেউ সৎভাবেই বলতে পারবে না যে এটা আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল না—চারদিকে ছড়িয়ে থাকা নজরদারি প্রযুক্তি, আমেরিকার প্রতিটি সামরিক অভিযানের সঙ্গে জুড়ে থাকা অনির্দিষ্ট সমাপ্তিহীনতা, আর দৈনন্দিন জীবনের ব্যাপক সামরিকীকরণ—এসবই তার প্রমাণ। তবে একই সঙ্গে, এই বাস্তবতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলো দেখলে বোঝা যায়, ৯/১১-এর প্রভাব একসময় যতটা একক বা অনন্য মনে হতো, আসলে ততটা নয়। এটা আমেরিকার ভেতরের ফাটল ধরার গল্পের একেবারে শুরুর আতশবাজি নয়, বরং এটা একটা মাঝপথের অধ্যায়।
৯/১১-এর প্রায় প্রতিটি বিবরণেই সেদিনের আবহাওয়ার কথা আসে। সবাই বলেন, সেদিন ছিল নিউইয়র্কের একদম নিখুঁত সকাল। আকাশ ছিল অস্বাভাবিক রকমের নীল, কোথাও একটুও মেঘ ছিল না।
রিচার্ড বেক তাঁর ২০২৪ সালের বই ‘হোমল্যান্ড’-এ লিখেছেন, আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১ নর্থ টাওয়ারে আঘাত করার কয়েক মিনিট আগেই ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ অনুষ্ঠানে জি ই কোম্পানির ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি নিয়ে একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চলছিল, যেখানে ‘ডিশওয়াশারে আগুনের শিকার’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল। এই দৃশ্যটাই যেন ৯/১১-এর আগের দুনিয়ার এক কার্টুন চিত্র। রোদ আর প্রশান্তির এক জায়গা, যেখানে কেউ জানে না তারা আসলে কতটা ভালো আছে, আর পরিস্থিতি কতটা খারাপ হতে চলেছে।
কিন্তু ৯/১১-এর আগের সময়টা সাধারণ মানুষের কল্পনায় যতটা শান্ত মনে হয়, বাস্তবে আমেরিকা তার চেয়েও অনেক বেশি অস্থির একটা সময় পার করছিল। ইতিহাসের সমাপ্তির স্বস্তির মধ্যেও বামপন্থী ও ডানপন্থী—দুই পক্ষই ছিল এক ধরনের অস্বস্তিতে। হামলার পর দেশের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমাদের ধারণা তৈরি হয় হতবাক টিভি সংবাদ উপস্থাপকদের সরাসরি সম্প্রচার দেখে, কিন্তু ‘আকস্মিক আঘাত’ আর ‘অবাক হওয়া’—এই দুটো ঠিক এক জিনিস নয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রথম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হামলার মাত্র আট বছর, আর ওকলাহোমা সিটি বোমা হামলার মাত্র ছয় বছর পরে ছিল। এই নতুন ট্র্যাজেডি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আগের পুরনো বিতর্কগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়ে।

বাম-উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মতে, এই হামলাকে অকল্পনীয় মনে করাটা আসলে এক অগ্রহণযোগ্য অজ্ঞতা মেনে নেওয়ারই সমান। আমেরিকার বিশ্বব্যাপী আধিপত্য যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল, আর স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী শান্তির মধ্যেও বিশ্বের অনেক জায়গায় যে সংঘাত টিকে ছিল, সেই বিষয়ে অজ্ঞতা। সুসান সনট্যাগ ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-এ লিখেছিলেন, ইতিহাস সম্পর্কে সামান্য সচেতনতাই আমাদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে যে সবেমাত্র কী ঘটল আর ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে।
ডানপন্থীদের মধ্যে, এই হামলা এক ধরনের আশা জাগিয়েছিল—স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকার নমনীয়তা এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে প্রকাশ্য দেশপ্রেম নিয়ে উদারপন্থীদের যে দোদুল্যমানতা ছিল, তা হয়তো এবার একটা কাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে যাবে। একে একটা নতুন পার্ল হারবার বলাটা একই সঙ্গে একটা বর্ণনা আর একটা প্রত্যাশাও ছিল। সম্প্রতি এক পডকাস্টে গায়ক ড্যারিল ওর্লি—যাঁর গাওয়া ইরাক আক্রমণের পক্ষে সমর্থনসূচক গান ‘হ্যাভ ইউ ফরগটেন?’ ২০০০-এর দশকের একটা গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল—৯/১১-এর দিনে ন্যাশভিলের বাইরে রাস্তার পাশে আমেরিকান পতাকা উড়তে দেখার বিস্ময়ের কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, জায়গাটা যেন ইতিমধ্যে একটা প্যারেড রুটে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, আর মনে মনে ভেবেছিলেন—লাল, সাদা, নীল পতাকা ওড়াতে আমাদের এতদূর পর্যন্ত যেতে হলো?
শেষ পর্যন্ত অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র নিজের সম্পর্কে কোনো গভীর আত্ম-সচেতনতা বা আত্ম-উপলব্ধি পায়নি। দেড় দশক পর তারা যা পেয়েছিল তা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাঁর ২০১৬ সালের নির্বাচনী বিজয়কে সাংবাদিক স্পেন্সার অ্যাকারম্যান তার ২০২১ সালের বই ‘রেইন অব টেরর’-এ ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অবক্ষয়ী পর্যায়ের’ চূড়ান্ত পরিণতি বলে বর্ণনা করেছেন।
রিয়েলিটি-টিভি সেলিব্রেটি থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার পথে ট্রাম্প ৯/১১-পরবর্তী ডানপন্থীদের চরম ইসলামভীতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন (যেমন গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ নিয়ে আতঙ্ক, ওবামার জন্মসনদ নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব), আবার একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে দুই দলের ভেতরেই ক্রমবর্ধমান যে অসন্তোষ ছিল, ২০১৬ সালের মধ্যে তা হতাশায় পরিণত হয়েছিল, সেই পথ দিয়েও গিয়েছিলেন। বেশিরভাগ আমেরিকান তখন বিশ্বাস করতেন, ৯/১১-পরবর্তী দেশের সামরিক তৎপরতা একটা ভুল ছিল—আর ট্রাম্পই প্রথম রিপাবলিকান প্রার্থী, যিনি সেই ধারণাকে সমর্থন করে এই বড় নিষেধাজ্ঞাটা ভেঙেছিলেন। তিনি তার প্রথম মেয়াদে এই সামরিক তৎপরতা কমানোর তেমন কোনো চেষ্টাই করেননি, বরং দ্বিতীয় মেয়াদে তা বেশ উৎসাহের সঙ্গেই বাড়িয়েছেন।
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে ৯/১১-পরবর্তী যুগের মূর্খতার একটা যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে দেখাটা দীর্ঘদিন ধরেই আকর্ষণীয় মনে হয়েছে, আর এটাকেই উদারপন্থীদের এই দাবির সমর্থন হিসেবে দেখা হয়েছে যে, সেই যুগে দেশপ্রেমের নামে ডানপন্থীদের যে আহ্বান ছিল, তা আসলে দেশের ভেতরেই ক্ষমতা দখলের একটা কৌশল ছিল। কিন্তু ট্রাম্প ইতিহাসকে, এমনকি সাম্প্রতিক ইতিহাসকেও নতুন করে বিচার করার একটা সুযোগ করে দিয়েছেন, যা ৯/১১-কেন্দ্রিক মূল গল্পটাকে আরও জটিল করে তোলে।
তার প্রথম মেয়াদের শেষের দিকে যে চরম ডানপন্থী উগ্রবাদের শুরু হয়েছিল, তা দেখতে ৯/১১-পরবর্তী সামরিকীকৃত রাষ্ট্রের স্পেশাল-অপারেশন স্টাইলের মতো মনে হলেও, আসলে এটা বেশি ঋণী ছিল ১৯৯০-এর দশকের ঘটনাগুলোর কাছে। রুবি রিজ, ওয়াকো এবং সেই সময়কার বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনীর কাছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে একটা জবাবদিহিহীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পরিণত করাটা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের শুরুর দিনে মানবাধিকার কর্মীদের করা সবচেয়ে ভয়াবহ আশঙ্কাগুলোকেই যেন সত্যি করে তুলেছে। কিন্তু এটা এখন কাজ করছে অভিবাসন-বিরোধী এক দৃষ্টিভঙ্গির সেবায়, যা ৯/১১-পরবর্তী সন্ত্রাস-আতঙ্ক থেকে যতটা না নিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি নিয়েছে আগের দশকগুলোর প্যাট বুকানন আর স্যাম ফ্রান্সিসের মতো ব্যক্তিত্বদের পুরনো রক্ষণশীল দেশপ্রেমী চিন্তাধারা থেকে।
জন গ্যাঞ্জ তাঁর বই ‘হোয়েন দ্য ক্লক ব্রোক’-এ (যা সেই সময়ের অবহেলিত অস্থিরতার ইতিহাস নিয়ে লেখা) বলেছেন, ট্রাম্পের ২০১৬ সালের বিজয় ছিল ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে অসম্পূর্ণ অবস্থায় থাকা কিছু বিষয়ের সুনির্দিষ্ট রূপ। পেছন ফিরে দেখলে বোঝা যায়, ৯/১১ একই সঙ্গে একটা বিরতি এবং একটা গতিবর্ধক—উভয়ই ছিল সেই মেরুকরণ ও সমস্যার জন্য, যা তখন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। এটা আমেরিকানদের কিছুক্ষণের জন্য এসব সমস্যা উপেক্ষা করার সুযোগ দিয়েছিল, যতক্ষণ না সেগুলো দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আবার ফিরে আসে।
৯/১১-কে একেবারে অনন্য বলে দাবি করার অর্থ হলো এই ধারণা মেনে নেওয়া যে, জনজীবনের যুগ-বিভাজন সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে ভূ-রাজনীতিকে ঘিরেই তৈরি হয়। যারা স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দেখেছেন, অথবা ভিয়েতনাম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বেঁচে ছিলেন, তাদের কাছে এই ধারণাটা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের পরে জন্ম নেওয়া কারও কাছে এটা ততটা সত্যি নয়।
আপনি যদি বার্লিন প্রাচীর ভাঙার কথা মনেই না রাখতে পারেন, কিন্তু আপনার কৈশোর কেটে থাকে সোশ্যাল মিডিয়া আর সেলফোনের মধ্যে দিয়ে, তাহলে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে স্পষ্ট বিভাজন রেখাগুলো আসলে প্রযুক্তিগত—আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সাথে সাথে এটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটা বোঝা যায় জেন জি-দের ধার করা নস্টালজিয়ায়, যেখানে বিশের কোঠায় থাকা তরুণ-তরুণীরা অতীতের কিছু অংশকে সোনালি যুগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছে—যেমন ‘ফ্রেন্ডস’ সিরিজ, জন এফ কেনেডি জুনিয়র ও ক্যারোলিন বেসেট কেনেডি, ৯০-এর দশকের হাই-স্কুলের হোম ভিডিও, মিউজিক ভিডিও, আর এলিয়েন অ্যান্ট ফার্ম কিংবা পাডল অফ মাডের মতো ব্যান্ডের কনসার্ট ফুটেজ।
এই নিদর্শনগুলো ৯/১১-এর আগে ও পরে—দুই সময় জুড়েই ছড়িয়ে আছে। আর এগুলো যে হারানো সরলতার প্রতিনিধিত্ব করে, তার সঙ্গে সেই হামলার আসলে কোনো সম্পর্কই নেই। এগুলোর প্রতি আগ্রহের আসল কারণ হলো এমন একটা সময়ের স্মৃতিচারণ, যখন মানুষ বন্ধুদের সাথে সামনাসামনি বসে গল্প করত, ক্লাব বা মিউজিক ফেস্টিভ্যালে অচেনা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নাচত-ঘামত; কিশোর-কিশোরীরা ক্লান্ত সেলিব্রিটির মতো ক্যামেরার সামনে পোজ না দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মজা করত; আর জনপ্রিয় সংস্কৃতি হতে পারত উচ্চকিত ও বোকা রকমের, যা আজকের ডিজিটাল নজরদারির যুগের মতো এতটা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের শিকার হতো না। এই সবকিছুর ওপর যে আকৃতি অশুভভাবে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা টুইন টাওয়ার নয়—সেটা হলো আইফোন।
তবে সমাজের এমন অনেক পরিবর্তনের সঙ্গে ৯/১১-কে আলাদা করে বিচার করাটা কঠিন, যেগুলোর সঙ্গে এর আসলে কোনো সরাসরি সম্পর্কই নেই। সম্প্রতি আমি যখন প্রথমবার ৯/১১ মেমোরিয়াল ও মিউজিয়াম পরিদর্শনে যাই, তখন সেখানকার কেন্দ্রীয় প্রদর্শনীতে—যেখানে হামলার দিনের ঘটনাগুলো মিনিট ধরে ধরে সাজানো আছে—প্রায় এক ঘণ্টা কাটাই। ভিডিও ও স্থিরচিত্র, কাঁচের নিচে সংরক্ষিত ধ্বংসাবশেষ দেখতে গিয়ে আমি সেই হামলার ভয়াবহ কিন্তু পরিচিত গল্পের চেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়েছিলাম ২৫ বছর আগের নিউইয়র্কের সাধারণ জীবনযাত্রার প্রমাণগুলো দেখে। এমন একটা জীবন, যা আমি নিজেও যাপন করেছি, কিন্তু হঠাৎ করেই তা যেন অনেক দূরের কিছু মনে হচ্ছিল।
আমি বিশেষভাবে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া একগাদা ফ্লপি ডিস্কের সামনে, যেগুলো ধুলোয় ঢাকা পড়ে ছিল যেন কোনো প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন। মনে করার চেষ্টা করছিলাম আমি নিজে শেষ কবে ফ্লপি ডিস্ক ব্যবহার করেছিলাম—সম্ভবত ৯/১১-এর খুব বেশি পরে নয়। আমার মনে হলো, এই ডিস্কগুলো যে দুনিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে—যেখানে ডিজিটাল জীবন ছিল, কিন্তু সেটা তখনও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি—সেই দুনিয়াটা আমার সন্তানদের কাছে আমেরিকার মাটিতে বড় কোনো সন্ত্রাসী হামলার মতোই অকল্পনীয় ঠেকবে।
এরপর থেকে আমি ভাবছি, জাদুঘরে সংরক্ষিত এই মুহূর্ত সম্পর্কে আমার বয়সী মানুষরা এমন কী জানি, যা আমার সন্তানরা কখনোই জানবে না। এটা হয়তো ৯/১১-এর একান্ত নিজস্ব কিছু নয়, কারণ এ নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু সেই দিনের রেকর্ড খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়—তখন পুলিশ অফিসাররা কেভলার বর্ম পরতেন না, ড্রোন বা প্যালান্টির সফটওয়্যারও ব্যবহার হতো না; ভিডিও ফুটেজ ধারণ করতেন পেশাদার ও নিবেদিতপ্রাণ কিছু শৌখিন মানুষ, হাজার হাজার স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ক্যামেরা নয়; পাবলিক জায়গায় তখনও প্রতিবন্ধক খুঁটি বসানো হয়নি; নিখোঁজ প্রিয়জনদের খোঁজে মানুষ হাতে লিখে লিফলেট বিলাত, কারণ তখনও গুম হয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া—তা ভালো হোক বা মন্দ—একটা বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবেই ছিল।
এটা এমন একটা দেশের চিত্র, যে বিশাল এক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল—তার কিছুটা ছিল ৯/১১-এর সরাসরি ফল, কিছুটা নয়। এত দূর থেকে এই দুটোকে আলাদা করে চেনাটাও কঠিন, কারণ হামলার প্রতিধ্বনি মিশে গেছে তারই পরবর্তী আরও অনেক প্রতিধ্বনির সঙ্গে, ফলে সবকিছু কিছুটা ঝাপসা হয়ে গেছে। তবে আপনি যদি সেদিন সেখানে থেকে থাকেন, তাহলে এখন এটা স্পষ্ট বুঝতে পারবেন—আজ আমরা যে সব সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছি, তার অনেক কিছুই তখনও চলমান ছিল, শুধু তখন সেগুলোকে এতটা অনিবার্য বা এড়ানো-অসম্ভব মনে হতো না। ৯/১১-এর বেশিরভাগ বর্ণনাকারী সেদিন সকালের আকাশের কথা যেভাবে বলেন, তা মোটেও বাড়িয়ে বলা নয়—আকাশটা সত্যিই সেদিন দেখার মতো ছিল। বাতাস ছিল অবিশ্বাস্য রকমের পরিষ্কার।
• চার্লস হোমানস: দ্য টাইমস ও দ্য টাইমস ম্যাগাজিনের রাজনীতিবিষয়ক প্রতিবেদক
(নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত)
.png)
-b52d51.jpeg)
-028855-256x144.webp)




