ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি
সাখাওয়াত হোসেনঢাকা

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে একটি অর্থায়ন চুক্তি সই করেছে সরকার। ৩ সেপ্টেম্বর এ চুক্তি সই হয়। ইউনিটটি নির্মাণ হলে ইআরএলের পরিশোধন সক্ষমতা বেড়ে তিনগুণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির আওতায় ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার অর্থায়ন করবে আইডিবি। এ ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে সিকিউরড ওভার ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর বা নিউইয়র্ক ফেডের প্রত্যেক কার্যদিবসে ঘোষিত বেঞ্চমার্ক সুদহার) সঙ্গে অতিরিক্ত আরো ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এসওএফআরের সর্বশেষ ঘোষিত হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তুলনামূলক উচ্চ সুদহারের বিপরীতে ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ধরা হয়েছে মাত্র পাঁচ বছর। বছরে দুই কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য এ ঋণ পরিশোধের সময়কাল ধরা হয়েছে ১৫ বছর।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো নিম্ন থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় আইডিবি, বিশ্বব্যাংক, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন অ্যাজেন্সি (জাইকা) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিদেশি ও বহুপক্ষীয় ঋণদাতারা এখন বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণের বিপরীতে সুদের হার ধরছে আগের চেয়ে বেশি।
অতীতে জ্বালানি খাতে বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে এ প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল হবে তুলনামূলক বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ডিজেল, পেট্রোলসহ প্রতি বছর গড়ে মোট ৫৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের মাধ্যমে ইআরএলের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এ আমদানি-নির্ভরতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর থেকেও অনেকখানি চাপ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলমের মতে, ইআরএলের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি উন্মুক্ত করে দেয়ার বিষয়ে সরকারের ওপর বেসরকারি ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বেসরকারি খাতের জন্য এ সুযোগকে উন্মুক্ত করে দেয়া হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ইআরএলের বার্ষিক জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মোট অভ্যন্তরীণ চাহিদার অর্ধেকই ইআরএলের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে । প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষের সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে ২০৩০ সাল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইআরএলের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম আরো অনেক আগেই শেষ হওয়া উচিত ছিল। দেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক গড় চাহিদা ৭০ লাখ টনের আশপাশে। বর্তমানে ইআরএলের মাধ্যমে এ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
ইআরএল নির্মাণ হয় ১৯৬৮ সালে। সে সময় দেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা ছিল ২০ লাখ টনের কিছু কম, যা পরিশোধনাগারের প্রকৃত সক্ষমতার (১৫ লাখ টন) কাছাকাছি। সময়ের আবর্তে পরিশোধনাগারের যন্ত্রপাতি পুরনো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর সক্ষমতাও কমতে থাকে। যদিও দেশে এর বিপরীতে চাহিদার পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতাও।
২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রধান উপদেষ্টার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়বিষয়ক বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক ম তামিম। আরো অনেক আগেই ইআরএলের সক্ষমতা বাড়ানো উচিত ছিল বলে মনে করছেন তিনি।
ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে প্রথম উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১০ সালে। এর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করানো হয়। মূলত অর্থায়নের অভাবেই বছরের পর বছর আটকে ছিল প্রকল্পটি। এ নিয়ে অতীতে বেশ কয়েকবার বিদেশি অর্থায়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো ফলপ্রসূ হয়নি।
গণঅভ্যুত্থানে পতনের আগে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এ নিয়ে চুক্তি সম্পাদনের আগে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় বৈঠক হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকারঘণিষ্ঠ কনগ্লোমারেট এস আলমের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে তৎকালীন সরকারের মধ্যে বেশ অনুকূল মনোভাব দেখা গেছে। এক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছাও বড় ভূমিকা রেখেছে। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেয়া প্রকল্প প্রস্তাবের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ইআরএলের জমিতে পরিশোধনাগারের নতুন ইউনিটের ৮০ শতাংশ মালিকানা চেয়েছিল এস আলম গ্রুপ। অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার পিপিপির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ বাতিল করে দেয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ২৭৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা জোগান দেয়ার কথা সরকারের। আর বাকি ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ইআরএলের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়।
তবে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রকল্পের অর্থায়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনে। ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করে আইডিবি। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সংস্থাটির এ-সংক্রান্ত এক প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইআরএলের বর্তমানে চালু ইউনিটটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানী করা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু করা গেলে সেখানে বিশ্বের অন্যান্য স্থান থেকে আনা জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াকরণের প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সংকটে গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ইআরএলের পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। এর পর সৌদি আরব থেকে লোহিত সাগর দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নতুন চালান আসার পর গত ৮ মে তা পুনরায় চালু হয়।
স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি পরিশোধনের সীমিত সক্ষমতাকে দেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে মূল্য পরিস্থিতি অস্থিশীল হয়ে পড়লে এ সংকট আরো অনেক বেশি প্রকট হয়ে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ ও এপ্রিলের দিকে জ্বালানি খাতে রেশনিং শুরু করতে বাধ্য হয় সরকার। সে সময় বাংলাদেশে জ্বালানি রপ্তানীকারক দেশগুলোর কয়েকটি ফোর্স মেজর ঘোষণায় বাধ্য হয়। প্রসঙ্গত, ফোর্স মেজর হলো অনিবার্য পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে (বাণিজ্য) চুক্তির শর্তপূরণের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত ঘোষণার আইনী প্রক্রিয়া প্রক্রিয়া।
ওই সময় দেশের ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় প্যানিক বায়িংয়ের প্রবণতা দেখা দেয়। পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনগুলোয় দেখা যায় লম্বা লাইন। যদিও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে অনেককেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে ডিজেল ছাড়া অন্য সব ধরনের জ্বালানি তেলের চাহিদা স্থানীয়ভাবেই পূরণ করা যাবে। একই সঙ্গে ডিজেলের ক্ষেত্রেও আমদানীনির্ভরতা অনেকটাই কমে যাবে। বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদায় ডিজেলের অবদান প্রায় ৬৫ শতাংশ।
ম তামিমের মতে, পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়লে সামনের দিনগুলোয় বিপিসির পক্ষে পেট্রোল রফতানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর শামসুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় সামনের দিনগুলোয় পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা কমতে পারে।
.png)
-b52d51.jpeg)
-028855-256x144.webp)

-3a0718-256x144.webp)


-58db6b-256x144.webp)