শিক্ষকের কথা বলার স্বাধীনতা

আলমগীর খান
আলমগীর খান

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ০৬
এ দেশে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা শুধুই পরীক্ষা ও পাশের নম্বরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছবি: এআই জেনারেটেড
এ দেশে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা শুধুই পরীক্ষা ও পাশের নম্বরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছবি: এআই জেনারেটেড

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম, এমন আলোচনা এখন চার দিকেই। কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এর একটা বড় নজির হতে পারে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষকদের মারধর করা থেকে সকল রকমের অসম্মানের মর্মান্তিক চর্চা। এমন পরিস্থিতির জন্য কেবল শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকেরাও দায়ী। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিদেশে ভর্তি হতে গেলে তাকে এক বা একাধিক শ্রেণি নিচে ভর্তি হতে হয়। এদেশে শিক্ষাটা পৃথিবীতে এখন এক হাস্যকর বস্তু, যেখানে শিক্ষিত মানুষ বলতে বোঝায় সনদপত্রধারী কিছু ব্যক্তি। আপন আপন বিষয় নিয়ে তাদের বেশিরভাগের দরদ, আগ্রহ, কৌতূহল ও প্রশ্ন কিছুই নেই।

এ দেশে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা শুধুই পরীক্ষা ও পাশের নম্বরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পরীক্ষাব্যবস্থাটিকে সচল রাখবার জন্য দালানকোঠা, শিক্ষক, পাঠ্যবই, নিয়মনীতি ইত্যাদি মিলে একটা জড়যন্ত্র সবার উপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে যেখানে শিক্ষা বাদে সবকিছুই ভালোভাবেই বর্তমান। প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করার কথা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বিরাটকায় যন্ত্রে তারা এখন স্ক্রু ও নাটবল্টু মাত্র; এর মূল চালক নিয়মনীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার ধ্বজাধারীরা। শিক্ষার উদ্দেশ্যও অনেকদিন যাবৎ— লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে। এই দর্শন অনুযায়ী যেসব কর্ম করে, তা ভালমন্দ যাই হোক, গাড়িঘোড়ায় চড়া যায় তাই লেখাপড়ার চেয়ে মূল্যবান।

অথচ মানুষের জন্মগ্রহণ করার পরও সামাজিকভাবে আরেকবার জন্মগ্রহণ করার প্রয়োজন হয়, যা সম্ভব হয় শিক্ষার মাধ্যমে। অতএব শিক্ষক দ্বিতীয় পিতা বা মাতার মতো, যাঁর কাছে শিক্ষার্থী সন্তানতুল্য। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শিখন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যা গড়ে তোলে তাই শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু দালানকোঠা, পরীক্ষা ও নিয়মনীতিকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাটি আবর্তিত হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েরই এখন ত্রাহি অবস্থা। শিক্ষকদের নিয়মিত হেনস্থার ঘটনা তারই একটা অশুভ নিদর্শন।

দেশজুড়ে বেশ কিছু বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে কোনো কথার কারণে। দীর্ঘদিন ধরে এটাই দেশে শিক্ষাব্যবস্থার একটা করুণ চিত্র। এমন নজির পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। শিক্ষকদের পাঠদানের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দেশে বাকবিতণ্ডা ঘটে থাকে। কিন্তু তা নিয়ে শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষককে অপদস্থ করা বা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা কোথাও ঘটে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একশো বছর আগে ১৯২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্যে ‘মর্কট মামলা’ বা স্কোপস ট্রায়াল পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছিল। স্কুল শিক্ষক জন টি. স্কোপস শ্রেণিকক্ষে ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়ানোর জন্য মামলার শিকার হন। আদালত তাঁকে জরিমানা করলেও উচ্চ আদালত তা বাতিল করে দেয়। চিন্তার স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা যা নিয়ে পরে নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এবং বাংলাদেশেও এর অনুবাদ মঞ্চস্থ হয়েছে।

বাংলাদেশে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে টেনেসি রাজ্যের মতো কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু তারপরও শিক্ষকগণ নানারকম হুমকির শিকার হন। শ্রেণিকক্ষে তাঁদের কোনো কথাকে রেকর্ড করে কোনো শিক্ষার্থী তা সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ইচ্ছে হলেই কেউ শিক্ষককে তুলে দিচ্ছে উগ্র জনতার হাতে। পুলিশও অনেক সময় পরিস্থিতি শান্ত করতে শিক্ষকের পক্ষ না নিয়ে বরং তাঁকেই আটক করছে।

চতুর্থ শতকে খ্রিস্টান মব কর্তৃক হাইপেশিয়াকে হত্যা থেকে স্কোপস মামলা পর্যন্ত সর্বত্রই প্রকাশ্য কারণ হিসেবে এসেছে ধর্মীয় আবেগে আঘাতের প্রসঙ্গ। আধুনিক কালে কোনো উন্নত দেশে এমন ঘটনা আর ঘটে না। আমাদের দেশের অনেক ছেলেমেয়েই সেসব দেশে পড়াশোনা করছে, কিন্তু সেখানে তারা গিয়ে উন্নত শিক্ষাগ্রহণে কোনো আপত্তি করে না। অথচ এদেশেই পাঠ্যপুস্তক বা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কথা নিয়ে অসহিষ্ণুতা লেগেই আছে। এর কারণ প্রধানত রাজনৈতিক। কোনো পক্ষ রাজনৈতিক স্বার্থে এসব ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ফায়দা লুটতে চায়। পরিকল্পিত উসকানির মাধ্যমে এখানে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয় যাতে জনগণের দৃষ্টি প্রকৃত সংকট থেকে সরিয়ে রাখা যায়।

পূর্বেকার এই অসহিষ্ণু অবস্থা বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে। যা একসময় হঠাৎ ঘটা কোনো ঘটনা ছিল, তা এখন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাকস্বাধীনতা সংবিধানে স্বীকৃত হলেও বর্তমানে তা কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারীদের কব্জায়। কোনো কোনো সমাবেশ বাকস্বাধীনতার অবাধ ক্ষেত্র হলেও শ্রেণিকক্ষ সেই সুযোগ হারাচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী যেখানে বাকস্বাধীনতায় অন্য কোনো বিধিনিষেধ থাকা উচিত নয়, তা হলো শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে মত ও বিরুদ্ধ মত চর্চার স্থানই তো শিক্ষাকেন্দ্র। পাঠ্যপুস্তককে বটিকা আকারে গিলিয়ে দেওয়া আর প্রশ্নবিহীন জনগোষ্ঠী তৈরির চেষ্টা আসলে গরু মোটাতাজাকরণ ওষুধের মতো শিক্ষাপ্রয়োগ।

বাংলাদেশে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে টেনেসি রাজ্যের মতো কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু তারপরও শিক্ষকগণ নানারকম হুমকির শিকার হন। শ্রেণিকক্ষে তাঁদের কোনো কথাকে রেকর্ড করে কোনো শিক্ষার্থী তা সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

এই উদ্দেশ্য সফল করতে হলে শিক্ষকের মুখ আগে বন্ধ করা প্রয়োজন। এর আগেই অবশ্য দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় শিক্ষককে অযোগ্য ব্যক্তিতে পরিণত করা হয়েছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মানসম্মত শিক্ষকের অভাব এখন জাতীয় সংকট। শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় পক্ষপাতিত্ব এই মানহীনতাকে আরও প্রকট করেছে। সেইসঙ্গে পরীক্ষা ও সনদকেন্দ্রিক ব্যবস্থা কোচিং ও গাইড বইকে অপরিহার্য করে তুলে প্রকৃত শিক্ষককে অপাঙ্ক্তেয় করে ফেলেছে। এমতাবস্থায় সংকটাপন্ন এই শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করার ভার উগ্র জনগোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দিলে হিতে বিপরীত হবে।

শিক্ষাকাঠামোর আমূল পরিবর্তন এখন জরুরি। পরীক্ষা ও সনদ-নির্ভর ব্যবস্থার বদলে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষাকে ব্যবসায় পরিণত না করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হতে হবে একে মনুষ্যত্বের বিকাশকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। বেতনভুক্ত পণ্ডিত ও আমলাদের সম্পাদিত পাঠ্যপুস্তককে জ্ঞানার্জনের একমাত্র বাহন না করে শিক্ষাকে গ্রন্থাগারকেন্দ্রিক করতে হবে। আফ্রিকান প্রবাদ অনুযায়ী— একটি শিশুকে মানুষ করে গড়ে তুলতে একটি পুরো গ্রাম প্রয়োজন।

বর্তমানের এই বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশ থেকে শিক্ষাকে সবার আগে রক্ষা করা প্রয়োজন। শিক্ষকের বাকস্বাধীনতার সীমা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। সেই সীমা লঙ্ঘনের জন্য তিনি কেবল প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন, অন্য কারো কাছে নয়। শ্রেণিকক্ষে বাকস্বাধীনতার সীমা অবশ্যই পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডির চেয়ে সহস্রগুণ বেশি হতে হবে। অশালীন বা দলীয় প্রচার না হলে, স্রেফ যুক্তিপূর্ণ কোনো কথা বলার জন্য শিক্ষক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া আর কারও কাছে জবাবদিহি করবেন না— রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই নিশ্চয়তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সর্বস্তরে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের বাকস্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

  • লেখক: সম্পাদক, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি (ছোটকাগজ)
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত