জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

প্রত্যাশা পূরণের দাবির মুখে থাকবেন তারেক রহমান

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ১২
তারেক রহমান। এআই জেনারেটেড ছবি

মন্ত্রিসভায় কাদের নেওয়া হবে, সেটা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে; তবে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার পছন্দমতো মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। একটি উপদেষ্টা পরিষদও করা হয়েছে। দুটির মোট সদস্য সংখ্যা ৬০।

খালেদা জিয়ার তৃতীয় আর সর্বশেষ মন্ত্রিসভায়ও (২০০১-২০০৬) ছিলেন ৬০ জন। এতে জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতা যোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে ‘বিএনপি-জামায়াত’ কথাটা চালু করে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তবে বিএনপি ও জামায়াত এখন পরস্পরের প্রতিপক্ষ। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া নির্বাচনে দল দু’টি পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছে। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও তাদের অংশগ্রহণে নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। হয়েছে আকর্ষণীয়। আর এতে বিপুলভাবে জয় পেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি।

এত বড় বিজয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিও পায়নি। না ভোটের হারে; না আসনে। দুঃখ, খালেদা জিয়া সেটা দেখে যেতে পারেননি। একটি ইতিহাস সৃষ্টিকারী জানাজার ভেতর দিয়ে তিনি এর আগেই যাত্রা করেন অনন্তের পথে।

তারেক রহমান তার পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশের শাসনক্ষমতার শীর্ষে আসীন হলেন। এমন দৃষ্টান্ত কমই আছে। তবে রাজনীতির কেন্দ্রে তিনি এসেছেন হঠাৎ নয়। তার মা খালেদা জিয়া বরং হঠাৎ করে এসেছিলেন। আসতে হয়েছিল তাকে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে– দলের হাল ধরতে। তারপর ক্রমে রচনা করেছেন ইতিহাস। অকালে পিতৃহারা তারেক রহমানও কাছ থেকে দেখেছেন মায়ের এ পথ চলা। শুধু দল পরিচালনা নয়; দু’বার পূর্ণ মেয়াদে সরকার পরিচালনা করেছেন খালেদা জিয়া।

২০০১-পরবর্তী মেয়াদে তারেক রহমানও পরোক্ষে কিছু ভূমিকা রাখেন দল ও সরকার পরিচালনায়। তার ওই ভূমিকা নিয়ে দলেও বিতর্ক ধূমায়িত হয়। এজন্য পরে কম মূল্য দিতে হয়নি। ওয়ান ইলেভেন সরকার তার সঙ্গে কী আচরণ করেছিল, সেটা সবার জানা। তাকে দেশত্যাগেও বাধ্য করা হয়। ওই সরকারের কাজের সুফল পেয়েছিল হাসিনা সরকার। ক্ষমতা হাতে পেয়ে তারা কী করেছিলেন সাড়ে ১৫ বছরে, সেটা নতুন করে বর্ণনার কিছু নেই।

বাংলাদেশের মানুষ এর জবাব দিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। তারপর দোষে-গুণে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামল গেল। ওয়ান ইলেভেন সরকার কিন্তু এদের চাইতে বেশি সময় নিয়েছিল নির্বাচন দিতে। আর সেটি ছিল একতরফা নির্বাচন। পরিস্থিতি দেখে খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জন করতে চেয়েও পারেননি। হয়তো ভেবেছিলেন, পরবর্তী নির্বাচনে স্বাভাবিক পরিবেশ মিলবে। কিন্তু সেটি লাভের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেন শেখ হাসিনা। তার সমর্থকগোষ্ঠী একে স্বাগত জানায়।

এর পর থেকে নির্বাচনের নামে যা হচ্ছিল, তার বর্ণনাও নিষ্প্রয়োজন। জনগণ আর সেইসব দিনে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছে না। ইউনূস সরকারের বড় সাফল্য একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একাংশও এতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। আর তাদের সিংহভাগ জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া প্রতীক ধানের শীষে ভোট দিয়েছে বলেই ধারণা।

গোপালগঞ্জের প্রতিটি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ বারবার জিতেছে যেসব আসনে, তার সিংহভাগে এবার জয় পেয়েছেন তারেক রহমান মনোনীতরা। খেয়াল করার বিষয়, আওয়ামী লীগ তার শক্ত অবস্থান থাকা এলাকায়ও গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেনি। দলটির নেত্রী যেখানে আশ্রিত, সেই ভারতও অবস্থান নিয়েছিল সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পক্ষে। তাদের এ অবস্থানও হয়তো আওয়ামী লীগকে প্রভাবিত করেছে।

তারেক রহমানের বিএনপি বিপুল জয় পেয়েছে, এটা বড় কথা নিশ্চয়। এটাও কম বড় নয় যে, কী অঙ্গীকার করে তিনি এমন জয় ছিনিয়ে এনেছেন। তারেক রহমান অবস্থান নিয়েছিলেন মধ্যপন্থা থেকে উদারপন্থার দিকে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কিন্তু উগ্রপন্থার একটা নজিরবিহীন উত্থান হয়েছিল। তারা দাবি করছিল, অভ্যুত্থানটি তাদের। ক্ষমতাচ্যুত পক্ষও বলে যাচ্ছিল, ‘জঙ্গি হামলা’য় সরকারের পতন ঘটেছে। কিছু ভুল থাকলেও নাকি এমন কোনো অপরাধ ছিল না যে, দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের পতন ঘটাবে!

জোর করে কাউকে সংস্কারে সম্মত করানো যাবে না। বিগত সরকার আমলের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য নতুন করে সময়ও দিতে হবে। তবে কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনায় বিলম্বের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের মানুষ জানে, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন দল ও সরকারের অপরাধ কী। তবে দলটির একাংশ নিশ্চয় নিরপরাধ। ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমান এদের জন্যও ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠার আওয়াজ তুলেছিলেন। শান্তি মানে অবশ্য ন্যায়বিচারের দাবি পরিহার করা নয়। তারেক রহমান নির্বাচনের কিছুদিন আগেও সাক্ষাৎকারে বলেন, কোনো দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী নন। এমনটিও বলেন, শেখ হাসিনা ও রেহানার ছেলেমেয়েরা রাজনীতিতে ফিরতে পারেন– জনগণ চাইলে। দেশের স্বার্থ বজায় রেখে প্রতিবেশি ভারতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহের কথাও জানান নির্বাচনী ইশতেহারে। খোদ অন্তর্বর্তী সরকার যখন উগ্রবাদীদের ব্যাপারে নীরব ছিল এবং দেশময় চলছিল তাদের রমরমা, তখন তারেক রহমানের এসব অবস্থান গ্রহণ কম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না।

এটি বরং তাকে শক্তিশালী করেছে; কেননা এর ফলে মধ্য আর উদারপন্থী জনতা কাতারবদ্ধ হয়েছে বিএনপিকে জয়যুক্ত করতে। তাদের মনে শংকা ছিল জামায়াত জোটের জিতে যাওয়ার বিষয়ে। দেরিতে দেশে ফিরে তারেক রহমান যে দলকে খুব সামলাতে পেরেছিলেন, সেটাও তো নয়। এত সক্রিয় ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ কখনও ছিল না বিএনপিতে। কোনো দলেই বোধহয় কখনও ছিল না এমন পরিস্থিতি। এ কারণেও বিএনপি কিছু আসন হারিয়েছে।

জামায়াতও কিছু আসন হারিয়েছে ইসলামী আন্দোলন নামের দলটি তার জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায়। আসন সমঝোতা বা জোটের ক্ষেত্রে এসব অবশ্য হয়েই থাকে। কিন্তু দলে এসব ঘটা বিপজ্জনক। তবে বেশি বিপদ হয়নি আর সেখানে একটা ভূমিকা রেখেছে আওয়ামী লীগারদের ভোট।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনও অনেকাংশে জয় করতে পেরেছেন তারেক রহমান। দেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা; যিনি বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, সংশয়বাদী নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতের আওয়াজ তুলেছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যেও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছেন তিনি, যেখানে গোষ্ঠীতান্ত্রিক পুঁজিবাদের উত্থান দেখতে হয়েছিল।

এ অবস্থায় কত বড় কিংবা কত ছোট মন্ত্রিসভা তিনি গড়েছেন, সেটা বড় কথা নয়। মন্ত্রিসভার নির্দিষ্ট কোনো আকারের কথা তো বলা নেই। কাকে নিয়েছেন আর কাকে নেননি, সেটাও মুখ্য নয়। মন্ত্রী আর উপদেষ্টাদের তিনি বদলাতেও পারবেন। এটা তার টিম। মন্ত্রীরা প্রথমত তার কাছে দায়বদ্ধ আর গোটা মন্ত্রিসভা দায়বদ্ধ সংসদের কাছে।

সংসদে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে কতটা কী অগ্রগতি এবার হয়, সেটা বড় বিষয়। নির্বাচনের সঙ্গে এ প্রশ্নে গণভোটও করা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আসা এ বাস্তবতা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যাবে না। তাহলে কথা উঠবে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারেক রহমান সরকার আগের ধারাতেই চলতে চাইছে। গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণ তো কম ছিল না। হতাহতের মধ্যে তাদের সংখ্যাই বেশি। তাছাড়া সংস্কারে তারা আরও আগে থেকে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিএনপি যখন ‘রাষ্ট্র মেরামতে’ ৩১ দফা ঘোষণা করে, তখন শেখ হাসিনার শাসনামল চলছিল। জেলে ছিলেন খালেদা জিয়া। আর বিএনপি ছিল কার্যত তারেক রহমানের নেতৃত্বে।

এ অবস্থায় তিনি কি সংস্কার প্রশ্নে নেতিবাচক অবস্থান নেবেন? অন্তর্বর্তী সরকার আয়োজিত সংস্কার আলোচনায় যেসব প্রশ্নে বিএনপি সম্পূর্ণ একমত ছিল, অন্তত সেগুলোর বাস্তবায়নে তারেক রহমান দ্রুত এগোবেন বলেই প্রত্যাশা। নইলে শুরুতেই একটা বাজে দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হবে।

এদিকে সাধারণ মানুষ আশা করে আছে আইনশৃঙ্খলার দ্রুত উন্নতি দেখতে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শুরু হতে যাচ্ছে রমজান। গেল রমজানে পণ্যবাজার ব্যবস্থাপনায় সাফল্য দেখিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এবারও এ লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। রমজানে পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখলে মানুষ নিশ্চয় অন্তর্বর্তী সরকারকেই বেশি দায়ী করবে। তারপরও কাজ দেখানোর সুযোগ থাকবে নতুন সরকার, বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রীর।

এ মন্ত্রণালয় যাকে দেওয়া হয়েছে, তার হাতে অবশ্য আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় রয়েছে। সত্যি বলতে, কোনো মন্ত্রণালয়ই গুরুত্বহীন নয়। তবে কিছু মন্ত্রণালয় কৌশলগতভাবে গুরুত্ববহ। এমন একাধিক মন্ত্রণালয় বরাবরের মতো প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে রেখেছেন। তবে যে কোনো মন্ত্রী ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর কম দায় আসবে না। তাদের ব্যর্থতার দায় বেশি করে তারেক রহমানের ওপর আসবে, যারা আগে কখনও মন্ত্রিত্ব করেননি।

প্রতিমন্ত্রীদের সবাই নতুন মন্ত্রী। মন্ত্রীদেরও অধিকাংশ এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাহীন। সে অর্থে অভিজ্ঞতা নেই তারেক রহমানেরও। দল আর সরকার পরিচালনা তো এক নয়। ২০২৬-এর বাংলাদেশ পরিচালনাও অনেক বেশি কঠিন। নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানও প্রত্যাশার দিক দিয়ে দেশকে বদলে দিয়েছে। তবে মানুষ বড় একটা বদলায়নি। ব্যবস্থাও অপরিবর্তিত। সংস্কার সে জন্য প্রয়োজন বৈকি। তার জন্য ঐকমত্যও লাগবে নতুন করে।

জোর করে কাউকে সংস্কারে সম্মত করানো যাবে না। বিগত সরকার আমলের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য নতুন করে সময়ও দিতে হবে। তবে কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনায় বিলম্বের সুযোগ নেই। একটা ‘হানিমুন পিরিয়ড’ অবশ্য থাকবে। তবে বাস্তব কারণেই সেটা বেশি দীর্ঘ হবে না।

কথা তো অনেক বলা হয়েছে। বারংবার আশাহত মানুষ সেগুলো বিশ্বাস করে কমই। তারা দেখতে চায় প্রত্যাশা পূরণের মতো কাজ। মূল দু’তিনটি ক্ষেত্রে আশাবাদ জাগিয়ে তোলার মতো কাজ দেখতে পেলেই আরও বেশি করে পাশে এসে দাঁড়াবে মানুষ। সেইসব ক্ষেত্রের কথা নতুন করে বর্ণনারও কিছু নেই।

বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘদিন দূরে ছিলেন তারেক রহমান। তা সত্ত্বেও দেশের তৃণমূল পর্যন্ত যোগাযোগ কম ছিল না তার। একটি উৎপীড়িত দলের মাধ্যমে তার সেই যোগাযোগও এখন দেশ পরিচালনার কাজে আসবে।

  • হাসান মামুন : সাংবাদিক, কলাম লেখক
Ad 300x250

সম্পর্কিত