শিশু ধর্ষণ রোধে বৈশ্বিক মডেল

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ১৮: ২৮
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

শিশু ধর্ষণ এতকাল ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু হালে তা রূপ পেয়েছে ‘নিরবচ্ছিন্ন ঘটনায়’। অনেক ক্ষেত্রে ঘটছে আবার দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। এমনকি কখনও কখনও ওই ধর্ষণের নৃশংসতা ‘হত্যা’ পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এই যেমন, গত চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষিত হয়। গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে হত্যা করা হয় (সমকাল- ২২ মে, ২০২৬)।

গত বছরের চিত্র আরো ভয়াবহ। ২০২৫ সালের এক ফেব্রুয়ারিতেই ৩০ জন কন্যাশিশুসহ ৪৮ জন নারী ধর্ষিত হয়। এছাড়া তিনজন কন্যাসহ ১১ জন দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং একজন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটে। আর গত ৫ বছরে (২০২০-২০২৪) ওই চিত্র আরও ভয়ংকর। ওই সময় তিন হাজার ৪৭১ জন কন্যাশিশুসহ অন্তত ছয় হাজার ৩০৫ জন নারী-শিশু ধর্ষিত হয়। এরমধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয় এক হাজার ৮৯ জন নারী ও শিশু, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২০৭ জনকে। এর মধ্যে শিশু ১১৮ জন। (বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন)।

মিরপুরে শিশু রামিসার নৃশংস ধর্ষণ ও মৃত্যুর পর ধর্ষণের বিরুদ্ধে সারা দেশ এখন প্রতিবাদ-আন্দোলনে উত্তাল। গত বছর মাগুরায় বোনের শ্বশুরের হাতে ৮ বছরের শিশু আছিয়ার নৃশংস ধর্ষণ ও মৃত্যুর পরও সারা দেশে একই অবস্থা তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় প্রতিবাদের স্রোত। মাঝখানে কয়েক দিন বিরতি। তারপর আবারও গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় নতুন ধর্ষণের খবর। আবারও প্রতিবাদে উত্তাল হয় দেশ । এভাবেই চলছে। সমাধানটা তাহলে কোথায়?

এটা ঠিক, শিশু যৌন নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীজুড়ে প্রতি পাঁচটি মেয়ের মধ্যে একটি এবং প্রতি তেরোটি ছেলের মধ্যে একটি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই হৃদয়বিদারক পরিসংখ্যানগুলো একেবারে প্রাথমিক চিত্র মাত্র। কারণ অনেক ঘটনা সামাজিক কলঙ্ক এবং প্রতিশোধের ভয়ে রিপোর্ট করা হয় না। বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের মতো একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে; যেখানে সামাজিক রীতি, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা যৌন নির্যাতনের সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে।

শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ এবং ভিকটিমকে ন্যায়বিচার প্রদানে বহু দেশ বহুমাত্রিক ব্যবস্থা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কিছু সফল কৌশল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশে সম্ভাব্য সমাধানগুলো খুঁজে বের করা যেতে পারে।

আইনি সংস্কার এবং কঠোর শাস্তি

শিশু যৌন নির্যাতন রোধে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো অত্যন্ত জরুরি, যা ভিকটিমদের ন্যায়বিচার এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানে শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত আইনের বিধি অত্যন্ত কঠোর। সেখানে অপরাধীদের জন্য দীর্ঘ কারাদণ্ড এবং বাধ্যতামূলক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া ২০১৮ সালে জাপানে বিশেষ আইন প্রণয়ন করে বলা হয়, যে সকল প্রাপ্তবয়স্ক লোক শিশুদের সঙ্গে কাজ করবে, তাদের অতীত ব্যক্তিগত কর্মের ইতিহাস বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যাচাই-বাছাই করা বাধ্যতামূলক। ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরেই, তারা শিশুদের সঙ্গে কাজের সুযোগ পাবে। তাছাড়া সেখানে অপরাধীদের শনাক্ত বা নেটওয়ার্কের আওতায় রাখার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

ভারতে ২০১২ সালের নির্ভয়া গণধর্ষণ মামলার পর সরকার যৌন অপরাধ নিরোধ ও প্রতিকারের জন্য আরও কঠোর শাস্তি আইনে সংযোজন করে, যার মধ্যে শিশু ধর্ষকদের জন্য মৃত্যুদণ্ডও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই আইন ভারতে ‘পকসো’ নামেও পরিচিতি। এই আইনি সংস্কারের ফলে শিশু ধর্ষণের মামলায় কঠোর এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। এই পরিবর্তন ভারতে শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রবল একটা প্রভাব সৃষ্টি করে।

শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম

শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হল সচেতনতা বৃদ্ধি। ডেনমার্ক এবং নরওয়ে তাদের স্কুলগুলোতে এমন কিছু শিক্ষা কার্যক্রম বা প্রোগ্রাম চালু করেছে, যেখানে শিশুদেরকে তাদের শরীর, ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং অবাঞ্ছিত আচরণ সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জনিত অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সম্বন্ধে ধারণা ও কৌশল শেখানো হয়। এ কর্মসূচি বা প্রোগ্রাম তাদের জাতীয় পাঠ্যক্রমের অংশ। ফলে শিশুরা খুব অল্প বয়স থেকেই তাদের শারীরিক নিরাপত্তা, নিরাপত্তার অধিকার ইত্যাদি সম্বন্ধে সজ্ঞান ও সচেতন হয়ে উঠে।

অন্যদিকে একই উদ্দেশ্য আমেরিকায় চালু হয়েছে ‘Not A #Number’ শিরোনামের ক্যাম্পেইন। মূলত শিশু অধিকার সংস্থাগুলোই এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। এ ক্যাম্পেইনে শিশুদেরকে যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতন করা হয়। একই সঙ্গে তাদের বিভিন্ন নির্যাতন-নিপীড়নের ধরন ও লক্ষণ সম্বন্ধে ধারণা দেওয়া হয়।

সামাজিক সমস্যা সমাধানে শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম যে কতটা ফলপ্রসূ ভূমিকা হতে পারে, সে বিষয়ে ভারতের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ ক্যাম্পেইন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ ক্যাম্পেইন বা প্রচারণার ফলে ভারতে যেমন নারী শিক্ষার হার বেড়েছে, একই সঙ্গে লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতাও লক্ষণীয় হারে কমেছে।

বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী ইউনিট

শিশু সুরক্ষায় অনেক দেশ বিশেষায়িত আইন প্রয়োগ ইউনিট গঠন করেছে, যা শুধুমাত্র শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে। যেমন অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ একটি বিশেষ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ইউনিট শিশু নির্যাতন বিষয়ক মামলা তদন্ত, সাক্ষ্য ও নমুনা সংগ্রহ এবং অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একত্রে কাজ করে। এই ধরনের ইউনিটগুলো পেশাদারভাবে এবং বিশেষ গুরুত্বে সঙ্গে শিশু যৌন নির্যাতন মামলা পরিচালনা করতেও সাহায্য করে থাকে। একই সঙ্গে তারা ভিকটিম শিশুদের ‘সাপোর্ট সিস্টেম’ হিসেবেও কাজ করে।

অস্ট্রেলিয়ার মতো যুক্তরাজ্যের পুলিশ বিভাগেও ‘চাইল্ড প্রোটেকশন পুলিশ টিম’ নামে একটি বিশেষ শিশু সুরক্ষা ইউনিট রয়েছে। এ ইউনিটে পুলিশের পাশাপাশি সমাজকর্মী ও শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞও অন্তর্ভুক্ত থাকে। জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্তসহ গোটা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভিকটিম শিশুদের সব রকম পরামর্শ বা সহায়তা প্রদান করাই এ ইউনিটের কাজ।

ধর্ষণের শিকারদের মানসিক সহায়তা

শিশু যৌন নির্যাতনের পরিণাম গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। কানাডা এবং সুইডেনের মতো দেশগুলোতে ধর্ষণের শিকার শিশুদের জন্য মানসিক সহায়তা ব্যবস্থা চালু আছে। এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন থেরাপি, কৌশল, পরামর্শ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার মাধ্যমে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা ধর্ষিত শিশুদের মন থেকে ধর্ষণের ট্রমা বা বিভীষিকা দূর করতে কাজ করে। একইভাবে নিউজিল্যান্ডে ‘স্টপ চাইল্ড অ্যবইউজ নাউ’ ক্যাম্পেইন এবং যুক্তরাজ্যে এনএসপিসিসি-এর মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার শিশুদেরকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য পাঠ

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের মহামারি মোকাবিলা করতে হলে, প্রতিরোধমূলক এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলোর একটি সংমিশ্রণ প্রয়োজন। বৈশ্বিক কৌশলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে, বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন:

আইন ও শাস্তিকে শক্তিশালী করা: বাংলাদেশকে শিশু ধর্ষণের জন্য সর্বোচ্চ সাজাসহ কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। একই সঙ্গে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে বিশেষ আদালত গঠন করা উচিত এবং বিচার নিষ্পত্তির সময়-সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত।

শিক্ষার উদ্যোগ: শিশুদের জন্য যথাযথ সচেতনেতামূলক যৌন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা এবং অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা, যাতে তারা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

ধর্ষিতদের জন্য সহায়তা: মানসিক সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং ভিকটিমদের জন্য আইনি সহায়তা প্রদান।

আইন প্রয়োগে বিশেষায়ন: শিশু ধর্ষণ মামলার জন্য বিশেষ আইন প্রয়োগ ইউনিট গঠন এবং তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান।

রামিসা-আছিয়ার ঘটনাগুলো, বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের এক কঠিন আহ্বান। বিশ্বব্যাপী সফল মডেলগুলি অনুসরণ করে এবং সরকার, নাগরিক সমাজ, এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিশুদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে। সময় এসেছে, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে, আসুন ধর্ষণের মত ঘৃণীত ও বর্বর অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা সামষ্টিকভাবে রুখে দাঁড়াই।

  • আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব: প্রাবন্ধিক ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত