ব্রিকস সম্মেলন/জোটটি কি আসলেই পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

এবার ব্রিকসের ১৮ তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভারতে। ছবি: সংগৃহীত
এবার ব্রিকসের ১৮ তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভারতে। ছবি: সংগৃহীত

কয়েক মাস ধরে ব্রিকস জোটের একটি সদস্য দেশে হামলা চলছে। ২০২৪ সালে জোটে যোগ দেওয়া দেশটি ব্রিকসের আরও একাধিক সদস্য দেশে হামলা চালাচ্ছে। এই দেশগুলোর নেতারাই দু’দিনের জন্য এক ছাদের নিচে একই কক্ষে বসতে যাচ্ছেন। যুদ্ধ মোকাবিলা কিংবা নিজেদের এবং সংশ্লিষ্ট বহুদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনতে তারা আদৌ কোনো ঐক্যে পৌঁছাতে পারবেন কিনা সে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।

এমন অনিশ্চয়তা সামনে রেখেই শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে ভারতে শুরু হচ্ছে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। শুক্রবার সকালেই দিল্লিতে পৌঁছেছেন জোটের শক্তিশালী শরিক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সম্মেলনের আয়োজক দেশটির আশা জোটটি নিজেদের অবস্থান আরও ভালো করে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারবে।

সম্মেলনের এবারের আসরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ভারত। ছবি: সংগৃহীত
সম্মেলনের এবারের আসরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ভারত। ছবি: সংগৃহীত

বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার জোরালো দাবি নিয়ে গঠিত জোট ব্রিকসে আছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত হওয়া ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।

মূলত পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে গড়ে উঠেছিল ব্রিকস। তবে জোটটির ২০ বছর পূর্তি ঘনিয়ে আসার মুখে বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিকস বিশ্বকে বহুমাত্রিক করতে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও, পশ্চিমাদের বিকল্প হিসেবে একটি সুসংগঠিত ঐক্য হিসেবে গড়ে ওঠার পথচলা এখনো বাকী।

ব্রিকস পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে এমন একটি মঞ্চ তৈরি করেছে, যা গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দরকষাকষির শক্তি দিয়েছে। আংশিক অর্থনৈতিক বিকল্প এনে দিয়েছে। যদিও মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য এবং নীতিগত বিভাজনের কারণে পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ে ব্রিকস সদস্যরা একজোট হওয়ার দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারার বিষয়টিকে ব্রিকসের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরলে চলবে না। বরং পশ্চিমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করতে পারা বা তাদের প্রভাব খাটানো কঠিন করে তোলার ওপরই জোটের সাফল্য নির্ভর করে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক ইমেইল বার্তায় সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের ব্রাজিলীয় গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা এবং এনজো গদিনহো বলেন, ‘ব্রিকস পরিচালিত যেকোনো উদ্যোগকে আমরা সাধারণত অবমূল্যায়ন করে থাকি, কারণ এটি আমাদের প্রত্যাশিত বিপ্লব বা পরিবর্তন আনতে পারছে না।’

বাস্তবতা বিবেচনা করে তারা বলেন,‘নির্দিষ্ট কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য জাতিসংঘের মতো সুসংগঠিত কাঠামো বা সামর্থ্য ব্রিকসের নেই। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য নিজেদের মতামত প্রকাশ করা এবং পশ্চিমাদের এড়িয়ে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই জোটটির অস্তিত্বই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।’

এই বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর লক্ষ্যেই ব্রিকস গড়ে উঠলেও, সেই ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এটি গঠিত হয়নি।

২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছিল। উদীয়মান দেশগুলোর সুবিধার্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সংস্কার আনতে ব্যর্থ হয়েছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউটিও) 'দোহা রাউন্ড'। ওই আলোচনার ব্যর্থতাই ব্রিকসের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছিল।

প্রথম ব্রিকস সামিট ২০০৯ সালের ১৬ জুন রাশিয়ার ইয়েকাটেরিনবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত
প্রথম ব্রিকস সামিট ২০০৯ সালের ১৬ জুন রাশিয়ার ইয়েকাটেরিনবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলীয় গবেষক অলিভেইরা ও গদিনহো বলেন, ‘পরবর্তী ‘উন্নত’ রাষ্ট্র হিসেবে উঠে আসার লড়াইয়ে শীর্ষে থাকা দেশগুলো উপলব্ধি করেছিল, তারা দলবদ্ধ হলে তাদের দাবি-দাওয়া আরও জোরালোভাবে পৌঁছাবে।’

তাঁদের মতে, প্রথাগত আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের গণ্ডির বাইরে গিয়ে নিজেদের যৌথ উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে এসব দেশের প্রচেষ্টা থেকেই ব্রিকসের জন্ম। সেই হিসেবে, জোটের শুরুর উদ্দেশ্যটাই ছিল পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা।

কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শন বার্জেস জানান, বৈশ্বিক সংস্থাগুলো মূলত মার্কিনী-পশ্চিমাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। উদীয়মান দেশগুলোর ভাবনা ছিল এমনই। তাই এই দেশগুলো জোট বেঁধে এই সংস্থাগুলোয় নিজেদের প্রভাব শক্তিশালী করতে চেয়েছিল। এই একই প্রধান লক্ষ্য আজও জোটটিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে।

তাঁর মতে, ব্রিকস দেশগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার মূল দুটি অগ্রাধিকার হলো—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মানদণ্ডে তারা কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে, সে বিষয়ে পশ্চিমাদের অনবরত ‘উপদেশ দেওয়ার’ মানসিকতার অবসান ঘটানো।

জিওস্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষক এবং ‘ফরেন পলিসি ইন ফোকাস’-এর সিনিয়র ফেলো ইমরান খালিদের মতে, এই জোটটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, ক্রয়ক্ষমতার সমতার বিচারে বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশ, জ্বালানি তেল উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

ব্রিকস ও জি-৭ জোটের ভৌগলিক পরিচিতি। ছবি: সংগৃহীত
ব্রিকস ও জি-৭ জোটের ভৌগলিক পরিচিতি। ছবি: সংগৃহীত

তিনি আরও জানান যে,আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী ১১ সদস্যের এই জোটটি এ বছর প্রায় ৩.৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে জি-৭ (G7) জোটের প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ১ শতাংশ।

অলিভেইরা ও গদিনহো বলেন, বিশ্ব জিডিপিতে ব্রিকসের অবদান এখনও জি-৭ জোটের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্লেষকরা এই বিষয়েও একমত হয়েছেন, পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো মার্কিন ডলারের ওপর এর কাঠামোগত নির্ভরতা।

এই ব্রাজিলীয় গবেষকরা বলছেন, ‘ডি-ডলারেলাইজেশন (ডলার-নির্ভরতা হ্রাস) উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও ব্রিকসের বেশিরভাগ বাণিজ্য এখনো মার্কিন ডলারেই হয়। পাশাপাশি অধিকাংশ ব্রিকস দেশ বিপুল ডলার রিজার্ভ ধরে রেখেছে। এটি বিশ্বের প্রাথমিক রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের শক্তিশালী অবস্থানকে তুলে ধরে এবং একটি কাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি করে। এই প্রবণতা জোটটির নীতিগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে।"

চীন রেনমিনবি’র ব্যবহার জোরদার করেছে এবং সৌদি আরব অন্যান্য মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রস্তাব দিলেও ডলার কোনো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে না। অন্তত আগামী এক দশকেও এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত