ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন সালমান রুশদি, পদক তুলে দেবেন কিরণ দেশাই

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ২৮
সালমান রুশদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
সালমান রুশদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

লেখক হিসেবে জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মান পেতে যাচ্ছেন সালমান রুশদি। আজীবন সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে দেওয়া হবে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের ‘মেডাল ফর ডিস্টিংগুইশড কন্ট্রিবিউশন টু আমেরিকান লেটার্স’।

বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, আগামী ১৮ নভেম্বর নিউইয়র্কে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডসের অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই পদক তুলে দেবেন তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও লেখক কিরণ দেশাই।

৭৯ বছর বয়সী রুশদি গত এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তবে আমেরিকান সাহিত্যজগতে তাঁর অবস্থান তৈরি হয়েছে নাগরিকত্ব পাওয়ার অনেক আগেই। ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া এই লেখক কৈশোরে যুক্তরাজ্যে চলে যান। পরে দীর্ঘদিন লন্ডনে থাকার পর এখন নিউইয়র্কে বসবাস করছেন স্ত্রী ও লেখক র‌্যাচেল এলিজা গ্রিফিথসের সঙ্গে।

রুশদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর দেশটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের এই স্বীকৃতিকেও তিনি অনেকটা সেই অনুভূতির মতোই দেখছেন। তাঁর মতে, এতদিন আমেরিকায় থেকে এবার এই পুরষ্কার আমেরিকান সাহিত্যের পরিসরে আরও আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে জায়গা করে নেওয়ার অনুভূতি দিচ্ছে ।

ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশনের দেওয়া ‘ডিস্টিংগুইশড কন্ট্রিবিউশন টু আমেরিকান লেটার্স’ পুরস্কারের ৩৯তম পুরস্কারজয়ী হচ্ছেন রুশদি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্ম নেওয়া চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে তিনি এই সম্মান পাচ্ছেন। তাঁর আগে এই পদক পেয়েছেন কানাডায় জন্ম নেওয়া সল বেলো, চিলির ইসাবেল আয়েন্দে এবং সুইডেনে জন্ম নেওয়া আর্ট স্পিগেলম্যান। রুশদির পাশাপাশি এবারের অনুষ্ঠানে শিশু বিশেষজ্ঞ ও সাক্ষরতা আন্দোলনের কর্মী পেরি ক্লাসকেও সম্মান জানানো হবে। তিনি পাবেন আমেরিকান সাহিত্য সমাজে অসামান্য অবদানের জন্য ‘লিটারারিয়ান অ্যাওয়ার্ড’।

বই দিয়েই স্মরণীয় হতে চান

সালমান রুশদি পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে লিখছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২০টির বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’, যে উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বুকার পুরস্কার পান। উপন্যাসটি স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজকে কেন্দ্র করে লেখা এবং আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে বিবেচিত।

তবে রুশদির নামের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। বইটির কিছু অংশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ হয়। ১৯৮৯ সালে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি রুশদির মাথার মূল্য নির্ধারণ করে ফতোয়া জারি করেন। এরপর বহু বছর তাঁকে নিরাপত্তার মধ্যে ও অনেকটা আত্মগোপনে থাকতে হয়।

২০২২ সালের হামলা, তারপর ‘নাইফ’

রুশদির জীবনে আরেকটি ভয়াবহ অধ্যায় আসে ২০২২ সালে। নিউইয়র্কের পশ্চিমাঞ্চলে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে মঞ্চে ওঠার সময় তাঁর ওপর ছুরি নিয়ে হামলা হয়। গুরুতর আহত হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। হামলায় তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয় এবং শরীরে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুর ক্ষতি হয়।

সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি লেখেন স্মৃতিকথা ‘নাইফ’। বইটিতে হামলার ঘটনা, তার পরবর্তী শারীরিক ও মানসিক লড়াই এবং আবার লেখালেখিতে ফিরে আসার গল্প উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে বইটি ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের নন-ফিকশন বিভাগে মনোনয়নও পায়। এটি ছিল রুশদির প্রথম ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন। ‘নাইফ’ অবলম্বনে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রও ১৭ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

তিন শহরে গড়ে উঠেছে তাঁর জীবন

রুশদি নিজের জীবনকে তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করেন দক্ষিণ এশিয়া, লন্ডন ও নিউইয়র্ক। তাঁর লেখালেখিতেও এই তিন ভৌগোলিক পরিসরের ছাপ স্পষ্ট। তিনি নিজেকে মূলত একজন ‘শহুরে লেখক’ হিসেবে দেখেন। বড় শহরের বৈচিত্র্য, সংঘাত, অনিশ্চয়তা এবং নানা সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান তাঁর লেখায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রুশদির মতে, কোনো লেখককে ‘আমেরিকান’ হতে হলে তাঁর গল্পের পটভূমি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র হতে হবে এমন নয়। তাঁর নিজের লেখায় ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের নানা অঞ্চল উঠে এসেছে। তিনি নিজেকে আমেরিকায় বসবাসকারী অভিবাসী লেখকদের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ মনে করেন।

ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রুথ ডিকি বলেন, রুশদির বিস্তৃত সাহিত্যকর্ম দেখিয়েছে সাহিত্য কীভাবে মানুষের গল্প, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতে পারে। তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পে বাস্তব ও কল্পিত নানা ভূগোল উঠে এসেছে, যা প্রজন্ম ও দেশের সীমা পেরিয়ে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। রুশদি অবশ্য নিজের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নিয়ে খুব বেশি ভাবতে চান না। তাঁর ইচ্ছা, শেষ পর্যন্ত তাঁকে যেন মনে রাখা হয় তাঁর বইগুলোর জন্য; একটি তাকজুড়ে সাজানো বইয়ের সারির জন্য, যার মলাটে লেখা থাকবে তাঁর নাম।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত