leadT1ad

পশ্চিম বাংলার লোকেরা পূর্ব বাংলার মানুষের চেয়ে বেশি হিসাবি, কারণ এখানকার ভূমি সব সময় উর্বর ছিল না

বঙ্গীয়-বদ্বীপের সমাজ, রাজনীতি ও মতাদর্শ নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ফিরে তাকিয়েছি বাংলাদেশের গত দুই হাজার বছরের পথপরিক্রমায়। ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে বঙ্গীয়-বদ্বীপের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলার বিভিন্ন ভাঙা-গড়া নিয়ে কথা বলেছেন ইতিহাসবিদ ও গবেষক আজিজুল রাসেল

স্ট্রিম ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ২০: ৪১
আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ২১: ১৩
ইতিহাসবিদ ও গবেষক আজিজুল রাসেল। স্ট্রিম গ্রাফিক

স্ট্রিম: বঙ্গীয়-বদ্বীপের গঠন এ অঞ্চলের ভূমি ও রাজনীতি পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার পরিসরে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?

আজিজুল রাসেল: বাংলা বঙ্গীয় বদ্বীপের যে গঠন, এটা তো একদিনে হয়নি। বহু বছর লেগেছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এটা হয়েছে। এখানে নদী, পাহাড়, এমনকি হিমালয়ও যুক্ত আছে। দুটো প্রধান নদী এখানে ভূমিকা রেখেছে। হিমালয় থেকে যে বরফ গলে পানির স্রোত প্রবাহিত হয়েছে, তা এই বদ্বীপ গঠনে কাজ করছে। এটা একটা হাজার বছরের প্রক্রিয়া এবং প্রক্রিয়াটা একভাবেই চলেছে, এমন নয়। একেকটা সময়ে পরিবর্তন এসেছে।

মোটা দাগে যদি দেখি, বঙ্গীয়-বদ্বীপের যে গঠন, তাতে পশ্চিম বাংলাটা একটু ওপরের দিকে এবং পূর্ব বাংলাটা একটু নিচের দিকে। সেক্ষেত্রে পানি যেহেতু ক্রমাগত ঢালুতে নেমেছে, ফলে সময় যত গড়িয়েছে, পূর্ব বাংলার ভূমি আরও উর্বর হয়েছে। আর পশ্চিম বাংলার ভূমিটা অনেকটা আস্তে আস্তে লাল মাটির মতো রূপ নিয়েছে, যেখানে আয়রনের পরিমাণ বেশি। ফলে পূর্ব বাংলার তুলনায় এ অঞ্চলের কিছু কিছু জায়গা অনুর্বর হয়েছে।

ভূমির গঠনের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের, মূলত বদ্বীপের পূর্বাংশের ভূমি অনেকটাই সমতল। অনেকেই যাকে ‘ফ্ল্যাট প্লেইন’ বা বন্যাবিধৌত সমভূমি বলে থাকেন।

আমি মনে করি, শুধু বঙ্গীয়-বদ্বীপের নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার ভূমি গঠন, তাদের ভূগোল, সেখানকার রাজনীতি ওই অঞ্চলের কাজ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। তবে এটা বলা যাবে না যে ভূমিই মানুষের জীবনটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তাহলে তা প্রাচ্যবাদী চিন্তাভাবনা হয়ে যায়। সেখানে মানুষেরও একটি মিথস্ক্রিয়া থাকে। মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে, পুরো বদ্বীপের মানুষের মধ্যে কিছু জায়গায় ঐক্য রয়েছে–জীবনযাপন ও রাজনীতিতে। আবার কিছু ভিন্নতাও রয়েছে। যেমন, পশ্চিম বাংলার ভূমি যেখানে একটু অনুর্বর হয়েছে, সেখানে মানুষকে কৃষি বা অন্য পেশা বেছে নিতে হয়েছে। ঐতিহাসিক রিচার্ড এম ইটন তাঁর ‘দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দি বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার ১২০৪-১৭৬০’ বইয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিকতার শুরুর ‍দিকে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার ফলে পশ্চিম বাংলার পরিবেশ খারাপ হচ্ছে, জমি অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পূর্ব বাংলায় কৃষি আরও উৎপাদনশীল হচ্ছে। তাই মানুষ এখানে বেশি চলে এসেছে।

এটা পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। বিশেষত, এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। আবার, পূর্ব বাংলার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছিল। একদিকে ছিল আরাকান রাজ্য, যেখান থেকে মানুষ এসে ফসল লুট করত। অন্যদিকে, মোঘলদের কাছে অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, খাদ্য সরবরাহ ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা বাংলাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের 'ব্রিজহেড' (শত্রুর এলাকায় প্রথম পা রাখার একটি সুরক্ষিত জায়গা, যা থেকে আক্রমণকারী বাহিনী নিজেদের অবস্থান আরও প্রসারিত করতে পারে) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার উৎপাদনশীল কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আবার, পশ্চিম বাংলা রাজনৈতিকভাবে কিছুটা অস্থিতিশীল ছিল মোঘল ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। তখন এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি সংঘাত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ, এখানে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা সক্রিয় ছিল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে, বিশেষ করে কলকাতা একটি সম্মুখ ক্ষেত্র হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে কাজ করেছে। এ মেট্রোপলিটন শহর থেকে কাঁচামাল এবং উদ্বৃত্ত সম্পদ শোষণ করা হতো।

আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

স্ট্রিম: অনেক গবেষক বলেন, এই বদ্বীপ পরিবেশগতভাবে এ অঞ্চলের সমাজ ও সংস্কৃতি বারবার নিয়ন্ত্রণ করেছে। আপনি কী মনে করেন?

আজিজুল রাসেল: এটা অনেক গবেষক বলেন। সম্প্রতি এটা আরও বেশি বলা শুরু হয়েছে। যেমন, ইফতেখার ইকবাল তাঁর ‘দ্য বেঙ্গল ডেল্টা’ বইতে দেখিয়েছেন, বাস্তুতন্ত্র, অর্থাৎ পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো কীভাবে আসলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। এই পরিবর্তনগুলো বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। এটা মানুষের জীবনযাত্রা, রাজনৈতিক কাজ, সংস্কৃতি—সবকিছুর ওপরই একটি বড় প্রভাব রেখেছে।

যেমন, রিচার্ড এম ইটনের বইতে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে পরিবেশ বদলের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। ফলে কিছু কিছু জায়গা অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে, পরিত্যক্ত হচ্ছে, আবার নতুন জায়গা তৈরি হচ্ছে। সেখানে মানুষ আসছে। আর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে।

এক্ষেত্রে আমরা যদি সুন্দরবনের দিকে তাকাই, দেখব যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজরা সুন্দরবন কেটে মানুষকে সেখানে চাষাবাদ করাচ্ছে। মানুষকে একেবারে প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে। ফলে সেখানে একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগও তৈরি হচ্ছে। মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে। যেমন ১৯৭০ সালের ভয়াবহ সাইক্লোনে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল। যখন মানুষ বিপর্যস্ত অবস্থায় মানসিক চাপের মধ্যে থাকে, তখন বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘটতে দেখা যায়। যেমন, ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবাল বলেছেন, ফরায়েজি আন্দোলনের একটি বড় কারণ হলো, পরিবেশগত পরিবর্তন। পরিবর্তনটি কৃষকদের বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় হতে প্রভাবিত করেছে।

রেললাইন যখন প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেল। ফলে কৃষির উর্বরতা গেল কমে। এই বিষয়গুলো মানুষ বিভিন্নভাবে মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। কখনো ঔপনিবেশিক সরকারের সঙ্গে লড়াই করে, কখনোবা নিজেরা সংগ্রাম করে।

আবার দেখি, ভৌগোলিক অবস্থার কারণে এ অঞ্চলে পাট উৎপাদন বেশি হতো। তারেক ওমর আলী তাঁর ‘দ্য জুট, গ্লোবাল ক্যাপিটাল অ্যান্ড দ্যা লোকাল’ গবেষণায় খুব ভালো করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এখানকার মানুষ পাট উৎপাদন করে একটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই পুঁজিবাদের উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনও জড়িয়ে যাচ্ছে। আবুল মনসুর আহমদের মতো ব্যক্তিত্বরা এই পাটের চাষ থেকে আসা টাকায় পড়াশোনা করেছেন। এসব কারণেই পূর্ব বাংলায় একটা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে। বলাবাহুল্য যে এসব বিষয় পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

পরিবেশের বৈশিষ্ট্যগুলো এখানকার পাট উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত পলিমাটি দিয়েছে। যদিও পাট চাষ করে যতটা লাভ করার কথা, এখানকার কৃষক-শ্রমিকেরা সেই লাভ করতে পারে না। আবার, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষত ১৯৩০-এর দশকে অর্থনৈতিন মন্দার সময়ে, এখানকার পাট চাষীদের ক্ষতি হয়েছে। এমনকি তাদের না খেয়েও থাকতে হয়েছে। মোদ্দাকথা, পাটের দামের ওঠা-নামার ওপর তাদের ভবিষ্যৎও নির্ভর করেছে।

তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এখানে পাটের কারখানা গড়ে ওঠেনি। কলকাতার শিল্পপতিরা কলকাতার হুগলি নদীর তীরে অনেক কারখানা তৈরি করেছে। ফলে পূর্ব বাংলার পাট চাষীরা পর্যাপ্ত লাভের মুখ দেখেনি।

আসলে নানাভাবেই পরিবেশ প্রভাব রেখেছে। আর মানুষও পরিবেশকে সৃজনশীল উপায়ে মোকাবিলা করেছে।

স্ট্রিম: বঙ্গীয়-বদ্বীপ ঘিরে যে সভ্যতার পতন ও বিবর্তন ঘটেছে। তাকে কীভাবে চিহ্নিত করবেন?

আজিজুল রাসেল : আমি কিন্তু এর আগের দুটো প্রশ্নের উত্তরে বলেছি যে পরিবর্তন বা বিবর্তন যা বলি না কেন, তা ঘটছেই। এখানে যখন বদ্বীপটা গঠিত হলো, তখন ভূমি, পরিবেশ, সমাজ ও মানুষের যে রূপ ছিল, তা কি এখন আছে? নেই। পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন, পশ্চিম বাংলার মাটি অনুর্বর হয়েছে আর নদীর গতিপথও পরিবর্তন হচ্ছে।

মোঘল আমলের শুরুতে বা সুলতানি আমলের শেষের দিকে পশ্চিম বাংলায় বিপর্যয় ঘটেছে। পক্ষান্তরে এ সময় পূর্ব বাংলার সমাজ-অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিববর্তন সাধিত হয়েছে। যদিও এ সময়ে পূর্ব বাংলা একটা সীমান্ত অঞ্চলরূপে পরিচিত ছিল। তবে মোঘলরা এখানে রাজধানী করতে চেয়েছে; করেছেও। ঢাকা রাজধানী হওয়ার ফলে এখানে নানা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে। রাজমহল তৈরি হচ্ছে, আবার তার পতনও হচ্ছে। ১৭০৭ সালের দিকে ঢাকা থেকে যখন রাজধানী সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন স্বভাবতই এখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যায়।

মোঘল শাসনামলে ঢাকা বিশ্বজুড়ে একটি বিখ্যাত অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। একজন ইউরোপীয় পর্যবেক্ষক ‘কান্ট্রিস রাউন্ড দ্য ওয়ে' বইয়ে লিখেছিলেন, ঢাকা ঘুরে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন এই দেখে যে কীভাবে ঢাকা একটি স্পন্দনশীল শহর হয়ে উঠেছিল। টেক্সটাইলের একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ঢাকা। ওলন্দাজদের অনেক শিল্পকারখানা এখানে ছিল।

কিন্তু মোঘল আমলের শেষে দিকে ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নেওয়া হলো। এই সময় ধীরে ধীরে ঢাকার অধঃপতন শুরু হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এসে তা আরও বেশি মাত্রায় দেখা যায়। কারণ, ব্রিটিশেরা রাজধানী তৈরি করে কলকাতায়। এভাবেই দিনে দিনে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সভ্যতার বিবর্তন ঘটেছে। এটা শুধু বাংলা বদ্বীপের ক্ষেত্রেই নয়। ইতিহাসকে শুধু একটি ক্ষুদ্র জায়গায় সীমাবদ্ধ করলে হবে না। আসলে বঙ্গীয়-বদ্বীপের ইতিহাসও বৈশ্বিক ইতিহাসের অংশ।

স্ট্রিম : বদ্বীপভুক্ত পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর বৈশিষ্ট্য কী? এই দুই জনপদের মধ্যে বৈসাদৃশ্য কোথায়?

আজিজুল রাসেল: বাংলা ভাগ হওয়া নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। জয়া চ্যাটার্জিরা বলছেন।

পূর্ব বাংলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেশি ছিল। তাই যদি রাজনীতি সংখ্যার ভিত্তিতে হয়, তাহলে মুসলমানরা শক্ত অবস্থানে থাকবেন। অন্যদিকে হিন্দুরা সংখ্যায় কম হলেও, টাকা-পয়সা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে শক্তিশালী ছিলেন।

এই দুই অবস্থার মধ্যে মিলও ছিল, অমিলও ছিল। সংখ্যায় মুসলমানরা এগিয়ে, কিন্তু অর্থনীতির দিক থেকে হিন্দুরা এগিয়ে। এজন্য পশ্চিম বাংলার অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাই বাংলা ভাগের পক্ষে ছিলেন।

দেশ ভাগ হওয়ার পরও দেখা গেল, পূর্ব বাংলার অনেক ধনী হিন্দু পশ্চিম বাংলায় চলে গেছেন। কারণ, তাঁরা মনে করলেন, এখানে তাঁরা নিরাপদ নন। এখানে টাকার ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ কম। তো তাঁরা ভাবলেন, পশ্চিম বাংলায় গেলে তাঁরা নিরাপদ থাকবেন এবং তাঁদের মূলধন বা ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগও বেশি থাকবে।

তবে ভাষার দিক দিয়ে দুই ভূখণ্ড একই ছিল। কিন্তু উপভাষায় পার্থক্য ছিল। সংস্কৃতিতেও মিল ছিল। যদিও অঞ্চলভেদে পার্থক্য চোখে পড়ত।

আবার দুই বাংলার মধ্যে অর্থনৈতিক দিকেও বড় পার্থক্য ছিল। পূর্ব বাংলার মানুষ খরচের ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে উদার। সে তুলনায় পশ্চিম বাংলার লোকেরা বরং বেশি হিসাবি। কারণ হলো, পশ্চিম বাংলার ভূমি সবসময় উর্বর ছিল না। ফলে এখানকার লোকেরা টাকাপয়সার ব্যাপারে সঞ্চয়ী হতে শিখেছিলেন।

অন্যদিকে, ভাগের আগে পূর্ব বাংলা মূলত কাঁচামালের জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। এখান থেকে কাঁচামাল নিয়ে কলকাতায় শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হতো। কিন্তু দেশভাগ হওয়ার পর সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার অর্থনৈতিক আচরণ ও চিন্তায় তৈরি হয় অনেক ফারাক।

পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার রাজনীতিতেও দেখা যায় পার্থক্য। দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলার রাজনীতি স্বভাবতই ভারতের মূল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে তারা কেন্দ্রীয় রাজনীতির অধীন হয়ে পড়ে। তাই নিজেদের আলাদা কোনো ভূমিকা গড়ে তুলতে পারেনি। এ সময় বরং অখণ্ড ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিম বাংলা ধীরে ধীরে পিছিয়েছে।

কিন্তু পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশে আলাদা একটি রাষ্ট্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এ সময় ধীরে ধীরে জন্ম নেয়। পাকিস্তানের ভেতরে থেকেও পূর্ব বাংলা নিজস্ব রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিল। সে চেতনাই পরে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পথ তৈরি করে দেয়।

স্ট্রিম: ইতিহাসের আলোকে বদ্বীপময় বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে কী কী বিবর্তন ঘটে গেছে বলে আপনার মনে হয়?

আজিজুল রাসেল: এটা ঠিক যে পশ্চিম বাংলার পতন হয়েছিল। তবে পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য একটা সুযোগও তো তৈরি হয়েছিল, তাই না? কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষ সে সুযোগকে কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে বা পারেনি, তা দেখার বিষয়।

১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানের শাসন-পীড়ন থেকে মুক্ত হতে বাংলাদেশ নামে নিজেদের রাষ্ট্র তৈরি করে।

তবে মুক্ত হওয়ার পর কী হলো? ফ্রাঞ্জ ফ্যানো বলেছেন, উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়া দেশগুলোর পথ খুব কঠিন হয়। তারা স্বাধীন হয়েও স্বাধীন থাকে না, পরাধীনই থেকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মানুষ স্বাধীন হয়েও সেই পরাধীনের মতোই আছে। মানুষের অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। সব ক্ষেত্রে যে একটা বিকাশ হবে, তা হয়নি। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ থেকে শুরু করে, অর্থনৈতিক মুক্তি–এগুলো আসেনি। কারণ, এখানকার নতুন শাসকগোষ্ঠী একটি ‘নব্য উপনিবেশিক অর্থনীতি’র অংশ হয়ে গেছে।

তবে বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনাও আছে। রয়েছে। এখানে এমন অনেক তরুণ আছেন, যাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন। এগুলো আশা জাগানীয়া ব্যাপার। কিন্তু ওই যে অস্থিরতা, এই অস্থিরতা বাদ দিয়ে আমাদের একটু স্থিতিশীলভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার। কিন্তু আমরা তা পারছি না।

দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলার রাজনীতি স্বভাবতই ভারতের মূল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে তারা কেন্দ্রীয় রাজনীতির অধীন হয়ে পড়ে। তাই নিজেদের আলাদা কোনো ভূমিকা গড়ে তুলতে পারেনি। এ সময় বরং অখণ্ড ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিম বাংলা ধীরে ধীরে পিছিয়েছে।

স্ট্রিম: বঙ্গীয়-বদ্বীপের গঠন এ অঞ্চলের ভূমি ও রাজনীতি পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার পরিসরে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?

আজিজুল রাসেল: বাংলা বঙ্গীয় বদ্বীপের যে গঠন, এটা তো একদিনে হয়নি। বহু বছর লেগেছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এটা হয়েছে। এখানে নদী, পাহাড়, এমনকি হিমালয়ও যুক্ত আছে। দুটো প্রধান নদী এখানে ভূমিকা রেখেছে। হিমালয় থেকে যে বরফ গলে পানির স্রোত প্রবাহিত হয়েছে, তা এই বদ্বীপ গঠনে কাজ করছে। এটা একটা হাজার বছরের প্রক্রিয়া এবং প্রক্রিয়াটা একভাবেই চলেছে, এমন নয়। একেকটা সময়ে পরিবর্তন এসেছে।

মোটা দাগে যদি দেখি, বঙ্গীয়-বদ্বীপের যে গঠন, তাতে পশ্চিম বাংলাটা একটু ওপরের দিকে এবং পূর্ব বাংলাটা একটু নিচের দিকে। সেক্ষেত্রে পানি যেহেতু ক্রমাগত ঢালুতে নেমেছে, ফলে সময় যত গড়িয়েছে, পূর্ব বাংলার ভূমি আরও উর্বর হয়েছে। আর পশ্চিম বাংলার ভূমিটা অনেকটা আস্তে আস্তে লাল মাটির মতো রূপ নিয়েছে, যেখানে আয়রনের পরিমাণ বেশি। ফলে পূর্ব বাংলার তুলনায় এ অঞ্চলের কিছু কিছু জায়গা অনুর্বর হয়েছে।

ভূমির গঠনের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের, মূলত বদ্বীপের পূর্বাংশের ভূমি অনেকটাই সমতল। অনেকেই যাকে ‘ফ্ল্যাট প্লেইন’ বা বন্যাবিধৌত সমভূমি বলে থাকেন।

আমি মনে করি, শুধু বঙ্গীয়-বদ্বীপের নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার ভূমি গঠন, তাদের ভূগোল, সেখানকার রাজনীতি ওই অঞ্চলের কাজ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। তবে এটা বলা যাবে না যে ভূমিই মানুষের জীবনটাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তাহলে তা প্রাচ্যবাদী চিন্তাভাবনা হয়ে যায়। সেখানে মানুষেরও একটি মিথস্ক্রিয়া থাকে। মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে, পুরো বদ্বীপের মানুষের মধ্যে কিছু জায়গায় ঐক্য রয়েছে–জীবনযাপন ও রাজনীতিতে। আবার কিছু ভিন্নতাও রয়েছে। যেমন, পশ্চিম বাংলার ভূমি যেখানে একটু অনুর্বর হয়েছে, সেখানে মানুষকে কৃষি বা অন্য পেশা বেছে নিতে হয়েছে। ঐতিহাসিক রিচার্ড এম ইটন তাঁর ‘দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দি বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার ১২০৪-১৭৬০’ বইয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিকতার শুরুর ‍দিকে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার ফলে পশ্চিম বাংলার পরিবেশ খারাপ হচ্ছে, জমি অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পূর্ব বাংলায় কৃষি আরও উৎপাদনশীল হচ্ছে। তাই মানুষ এখানে বেশি চলে এসেছে।

এটা পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। বিশেষত, এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। আবার, পূর্ব বাংলার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছিল। একদিকে ছিল আরাকান রাজ্য, যেখান থেকে মানুষ এসে ফসল লুট করত। অন্যদিকে, মোঘলদের কাছে অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, খাদ্য সরবরাহ ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা বাংলাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের 'ব্রিজহেড' (শত্রুর এলাকায় প্রথম পা রাখার একটি সুরক্ষিত জায়গা, যা থেকে আক্রমণকারী বাহিনী নিজেদের অবস্থান আরও প্রসারিত করতে পারে) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার উৎপাদনশীল কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

রেললাইন যখন প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেল। ফলে কৃষির উর্বরতা গেল কমে। এই বিষয়গুলো মানুষ বিভিন্নভাবে মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। কখনো ঔপনিবেশিক সরকারের সঙ্গে লড়াই করে, কখনোবা নিজেরা সংগ্রাম করে।

আবার, পশ্চিম বাংলা রাজনৈতিকভাবে কিছুটা অস্থিতিশীল ছিল মোঘল ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। তখন এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি সংঘাত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ, এখানে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা সক্রিয় ছিল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে, বিশেষ করে কলকাতা একটি সম্মুখ ক্ষেত্র হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে কাজ করেছে। এ মেট্রোপলিটন শহর থেকে কাঁচামাল এবং উদ্বৃত্ত সম্পদ শোষণ করা হতো।

আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

স্ট্রিম: অনেক গবেষক বলেন, এই বদ্বীপ পরিবেশগতভাবে এ অঞ্চলের সমাজ ও সংস্কৃতি বারবার নিয়ন্ত্রণ করেছে। আপনি কী মনে করেন?

আজিজুল রাসেল: এটা অনেক গবেষক বলেন। সম্প্রতি এটা আরও বেশি বলা শুরু হয়েছে। যেমন, ইফতেখার ইকবাল তাঁর ‘দ্য বেঙ্গল ডেল্টা’ বইতে দেখিয়েছেন, বাস্তুতন্ত্র, অর্থাৎ পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো কীভাবে আসলে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। এই পরিবর্তনগুলো বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। এটা মানুষের জীবনযাত্রা, রাজনৈতিক কাজ, সংস্কৃতি—সবকিছুর ওপরই একটি বড় প্রভাব রেখেছে।

যেমন, রিচার্ড এম ইটনের বইতে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে পরিবেশ বদলের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। ফলে কিছু কিছু জায়গা অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে, পরিত্যক্ত হচ্ছে, আবার নতুন জায়গা তৈরি হচ্ছে। সেখানে মানুষ আসছে। আর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে।

এক্ষেত্রে আমরা যদি সুন্দরবনের দিকে তাকাই, দেখব যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজরা সুন্দরবন কেটে মানুষকে সেখানে চাষাবাদ করাচ্ছে। মানুষকে একেবারে প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে। ফলে সেখানে একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগও তৈরি হচ্ছে। মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে। যেমন ১৯৭০ সালের ভয়াবহ সাইক্লোনে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল। যখন মানুষ বিপর্যস্ত অবস্থায় মানসিক চাপের মধ্যে থাকে, তখন বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘটতে দেখা যায়। যেমন, ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবাল বলেছেন, ফরায়েজি আন্দোলনের একটি বড় কারণ হলো, পরিবেশগত পরিবর্তন। পরিবর্তনটি কৃষকদের বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় হতে প্রভাবিত করেছে।

রেললাইন যখন প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেল। ফলে কৃষির উর্বরতা গেল কমে। এই বিষয়গুলো মানুষ বিভিন্নভাবে মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। কখনো ঔপনিবেশিক সরকারের সঙ্গে লড়াই করে, কখনোবা নিজেরা সংগ্রাম করে।

আবার দেখি, ভৌগোলিক অবস্থার কারণে এ অঞ্চলে পাট উৎপাদন বেশি হতো। তারেক ওমর আলী তাঁর ‘দ্য জুট, গ্লোবাল ক্যাপিটাল অ্যান্ড দ্যা লোকাল’ গবেষণায় খুব ভালো করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে এখানকার মানুষ পাট উৎপাদন করে একটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই পুঁজিবাদের উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনও জড়িয়ে যাচ্ছে। আবুল মনসুর আহমদের মতো ব্যক্তিত্বরা এই পাটের চাষ থেকে আসা টাকায় পড়াশোনা করেছেন। এসব কারণেই পূর্ব বাংলায় একটা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে। বলাবাহুল্য যে এসব বিষয় পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

পরিবেশের বৈশিষ্ট্যগুলো এখানকার পাট উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত পলিমাটি দিয়েছে। যদিও পাট চাষ করে যতটা লাভ করার কথা, এখানকার কৃষক-শ্রমিকেরা সেই লাভ করতে পারে না। আবার, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষত ১৯৩০-এর দশকে অর্থনৈতিন মন্দার সময়ে, এখানকার পাট চাষীদের ক্ষতি হয়েছে। এমনকি তাদের না খেয়েও থাকতে হয়েছে। মোদ্দাকথা, পাটের দামের ওঠা-নামার ওপর তাদের ভবিষ্যৎও নির্ভর করেছে।

তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এখানে পাটের কারখানা গড়ে ওঠেনি। কলকাতার শিল্পপতিরা কলকাতার হুগলি নদীর তীরে অনেক কারখানা তৈরি করেছে। ফলে পূর্ব বাংলার পাট চাষীরা পর্যাপ্ত লাভের মুখ দেখেনি।

আসলে নানাভাবেই পরিবেশ প্রভাব রেখেছে। আর মানুষও পরিবেশকে সৃজনশীল উপায়ে মোকাবিলা করেছে।

স্ট্রিম: বঙ্গীয়-বদ্বীপ ঘিরে যে সভ্যতার পতন ও বিবর্তন ঘটেছে। তাকে কীভাবে চিহ্নিত করবেন?

আজিজুল রাসেল : আমি কিন্তু এর আগের দুটো প্রশ্নের উত্তরে বলেছি যে পরিবর্তন বা বিবর্তন যা বলি না কেন, তা ঘটছেই। এখানে যখন বদ্বীপটা গঠিত হলো, তখন ভূমি, পরিবেশ, সমাজ ও মানুষের যে রূপ ছিল, তা কি এখন আছে? নেই। পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন, পশ্চিম বাংলার মাটি অনুর্বর হয়েছে আর নদীর গতিপথও পরিবর্তন হচ্ছে।

মোঘল আমলের শুরুতে বা সুলতানি আমলের শেষের দিকে পশ্চিম বাংলায় বিপর্যয় ঘটেছে। পক্ষান্তরে এ সময় পূর্ব বাংলার সমাজ-অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিববর্তন সাধিত হয়েছে। যদিও এ সময়ে পূর্ব বাংলা একটা সীমান্ত অঞ্চলরূপে পরিচিত ছিল। তবে মোঘলরা এখানে রাজধানী করতে চেয়েছে; করেছেও। ঢাকা রাজধানী হওয়ার ফলে এখানে নানা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে। রাজমহল তৈরি হচ্ছে, আবার তার পতনও হচ্ছে। ১৭০৭ সালের দিকে ঢাকা থেকে যখন রাজধানী সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন স্বভাবতই এখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যায়।

মোঘল শাসনামলে ঢাকা বিশ্বজুড়ে একটি বিখ্যাত অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। একজন ইউরোপীয় পর্যবেক্ষক ‘কান্ট্রিস রাউন্ড দ্য ওয়ে' বইয়ে লিখেছিলেন, ঢাকা ঘুরে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন এই দেখে যে কীভাবে ঢাকা একটি স্পন্দনশীল শহর হয়ে উঠেছিল। টেক্সটাইলের একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ঢাকা। ওলন্দাজদের অনেক শিল্পকারখানা এখানে ছিল।

কিন্তু মোঘল আমলের শেষে দিকে ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নেওয়া হলো। এই সময় ধীরে ধীরে ঢাকার অধঃপতন শুরু হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এসে তা আরও বেশি মাত্রায় দেখা যায়। কারণ, ব্রিটিশেরা রাজধানী তৈরি করে কলকাতায়। এভাবেই দিনে দিনে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সভ্যতার বিবর্তন ঘটেছে। এটা শুধু বাংলা বদ্বীপের ক্ষেত্রেই নয়। ইতিহাসকে শুধু একটি ক্ষুদ্র জায়গায় সীমাবদ্ধ করলে হবে না। আসলে বঙ্গীয়-বদ্বীপের ইতিহাসও বৈশ্বিক ইতিহাসের অংশ।

স্ট্রিম : বদ্বীপভুক্ত পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর বৈশিষ্ট্য কী? এই দুই জনপদের মধ্যে বৈসাদৃশ্য কোথায়?

আজিজুল রাসেল: বাংলা ভাগ হওয়া নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। জয়া চ্যাটার্জিরা বলছেন।

পূর্ব বাংলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেশি ছিল। তাই যদি রাজনীতি সংখ্যার ভিত্তিতে হয়, তাহলে মুসলমানরা শক্ত অবস্থানে থাকবেন। অন্যদিকে হিন্দুরা সংখ্যায় কম হলেও, টাকা-পয়সা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে শক্তিশালী ছিলেন।

এই দুই অবস্থার মধ্যে মিলও ছিল, অমিলও ছিল। সংখ্যায় মুসলমানরা এগিয়ে, কিন্তু অর্থনীতির দিক থেকে হিন্দুরা এগিয়ে। এজন্য পশ্চিম বাংলার অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাই বাংলা ভাগের পক্ষে ছিলেন।

দেশ ভাগ হওয়ার পরও দেখা গেল, পূর্ব বাংলার অনেক ধনী হিন্দু পশ্চিম বাংলায় চলে গেছেন। কারণ, তাঁরা মনে করলেন, এখানে তাঁরা নিরাপদ নন। এখানে টাকার ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ কম। তো তাঁরা ভাবলেন, পশ্চিম বাংলায় গেলে তাঁরা নিরাপদ থাকবেন এবং তাঁদের মূলধন বা ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগও বেশি থাকবে।

তবে ভাষার দিক দিয়ে দুই ভূখণ্ড একই ছিল। কিন্তু উপভাষায় পার্থক্য ছিল। সংস্কৃতিতেও মিল ছিল। যদিও অঞ্চলভেদে পার্থক্য চোখে পড়ত।

আবার দুই বাংলার মধ্যে অর্থনৈতিক দিকেও বড় পার্থক্য ছিল। পূর্ব বাংলার মানুষ খরচের ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে উদার। সে তুলনায় পশ্চিম বাংলার লোকেরা বরং বেশি হিসাবি। কারণ হলো, পশ্চিম বাংলার ভূমি সবসময় উর্বর ছিল না। ফলে এখানকার লোকেরা টাকাপয়সার ব্যাপারে সঞ্চয়ী হতে শিখেছিলেন।

অন্যদিকে, ভাগের আগে পূর্ব বাংলা মূলত কাঁচামালের জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। এখান থেকে কাঁচামাল নিয়ে কলকাতায় শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হতো। কিন্তু দেশভাগ হওয়ার পর সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার অর্থনৈতিক আচরণ ও চিন্তায় তৈরি হয় অনেক ফারাক।

পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার রাজনীতিতেও দেখা যায় পার্থক্য। দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলার রাজনীতি স্বভাবতই ভারতের মূল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে তারা কেন্দ্রীয় রাজনীতির অধীন হয়ে পড়ে। তাই নিজেদের আলাদা কোনো ভূমিকা গড়ে তুলতে পারেনি। এ সময় বরং অখণ্ড ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিম বাংলা ধীরে ধীরে পিছিয়েছে।

কিন্তু পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশে আলাদা একটি রাষ্ট্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এ সময় ধীরে ধীরে জন্ম নেয়। পাকিস্তানের ভেতরে থেকেও পূর্ব বাংলা নিজস্ব রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিল। সে চেতনাই পরে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পথ তৈরি করে দেয়।

স্ট্রিম: ইতিহাসের আলোকে বদ্বীপময় বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে কী কী বিবর্তন ঘটে গেছে বলে আপনার মনে হয়?

আজিজুল রাসেল: এটা ঠিক যে পশ্চিম বাংলার পতন হয়েছিল। তবে পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য একটা সুযোগও তো তৈরি হয়েছিল, তাই না? কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষ সে সুযোগকে কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে বা পারেনি, তা দেখার বিষয়।

১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানের শাসন-পীড়ন থেকে মুক্ত হতে বাংলাদেশ নামে নিজেদের রাষ্ট্র তৈরি করে।

তবে মুক্ত হওয়ার পর কী হলো? ফ্রাঞ্জ ফ্যানো বলেছেন, উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়া দেশগুলোর পথ খুব কঠিন হয়। তারা স্বাধীন হয়েও স্বাধীন থাকে না, পরাধীনই থেকে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মানুষ স্বাধীন হয়েও সেই পরাধীনের মতোই আছে। মানুষের অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। সব ক্ষেত্রে যে একটা বিকাশ হবে, তা হয়নি। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ থেকে শুরু করে, অর্থনৈতিক মুক্তি–এগুলো আসেনি। কারণ, এখানকার নতুন শাসকগোষ্ঠী একটি ‘নব্য উপনিবেশিক অর্থনীতি’র অংশ হয়ে গেছে।

তবে বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনাও আছে। রয়েছে। এখানে এমন অনেক তরুণ আছেন, যাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন। এগুলো আশা জাগানীয়া ব্যাপার। কিন্তু ওই যে অস্থিরতা, এই অস্থিরতা বাদ দিয়ে আমাদের একটু স্থিতিশীলভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার। কিন্তু আমরা তা পারছি না।

Ad 300x250

সম্পর্কিত