অনন্ত রায়হান

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি রক্তমাখা শার্ট, যে শার্ট হয়ে উঠেছিল একটি পরাধীন জাতির মুক্তির দিশারি। শার্টটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের, যাঁকে আমরা ‘শহীদ আসাদ’ নামে চিনি।
১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আসাদ ছিলেন তৎকালীন প্রগতিশীল রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা হল (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) শাখার সভাপতি এবং ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক। কেবল ছাত্র রাজনীতিই নয়, নরসিংদীর শিবপুর, হাতিরদিয়া ও মনোহরদী এলাকায় শক্তিশালী কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা।
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় ছাত্র-জনতার ১১ দফা কর্মসূচির মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া আসাদ শহীদ হন এবং অনেকে আহত হন।
আসাদের আত্মত্যাগ উনসত্তরের গণ-আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিয়েছিল সারা দেশে। আলোকচিত্রী রশীদ তালুকদারের ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিল আসাদের রক্তভেজা শার্ট।
ওই দিন গুলিস্তান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জনতার মিছিলে লাঠির মাথায় আসাদের শার্ট ঝুলানো দেখার পর কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। কবি সেখানে আসাদের শার্টকে তুলনা করেছিলেন ‘আমাদের প্রাণের পতাকা’ হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন—
‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা / সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক; / আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’
সেই একই উত্তাল সময়ে তরুণদের মিছিলে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কবি হেলাল হাফিজ লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত পঙ্ক্তি— ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় / এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
অন্যদিকে কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় আসাদের মৃত্যুহীন উপস্থিতিকে তুলে ধরেছিলেন এই ভাষায়— ‘ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক! শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে/ দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা/ তুলবো কেন খিল?/ আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ ফিরবে সে মিছিল।’
আসাদের রক্ত কীভাবে সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামিয়ে এনেছিল, তার এক মহাকাব্যিক চিত্র পাওয়া যায় কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে। আসাদের শার্ট নিয়ে বের হওয়া সেই বিশাল মিছিলকে ইলিয়াস তুলনা করেছেন উত্তাল সমুদ্র বা নদীর স্রোতের সঙ্গে। তিনি লিখেছেন, ‘কালো কালো হাজার হাজার মাথা এগিয়ে আসছে অখণ্ড স্রোতোধারার মতো। এই বিপুল স্রোতোধারার মধ্যে ঘাই মারা রুই কাতলার ঝাঁক নিয়ে গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসছে কোটি ঢেউয়ের দল। গলি-উপগলি ভরা কেবল মানুষ। দুই পাশের বাড়িগুলোর ছাদ পর্যন্ত মানুষ। গলি-উপগলি থেকে স্রোত এসে মিশে মূলধারার সঙ্গে, মানুষ বাড়ে; নাবাবপুর সামলাতে পারে না।’

ইলিয়াস আরও লিখেছেন, ‘ঢাকায় কি এত লোক বাস করে? মনে হয় ঢাকা শহর তার ৩৫০/৪০০ বছরের বুড়ো হাবড়া, রোগা পটকা লোনা-ধরা গতর ঝেড়ে উঠে ছুটতে শুরু করেছে সামনের দিকে।...দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা তার শীর্ণ তনু একেবারে নিচে ফেলে উঠে এসেছে বিপুল স্ফীত হয়ে। বুড়িগঙ্গার অজস্র তরঙ্গরাশির সক্রিয় অংশগ্রহণ না হলে কি এমন জলদমন্দ্র ধ্বনি উঠতে পারে, “আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”।’
বাংলা সাহিত্যের আরেক জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ উনসত্তরের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন তাঁর উপন্যাস ‘মাতাল হাওয়া’। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন শহীদ আসাদকে। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন—‘সাধারণত কোনো মৃত মানুষ আন্দোলন চালিয়ে নিতে পারেন না, কিন্তু আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান তা পেরেছিলেন। তাঁর রক্তমাখা শার্টই ছিল উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি।’
আসাদ আজ নেই, কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে আছেন সেই অজেয় বীর হিসেবে, যার রক্তমাখা শার্ট আজও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা জোগায়।

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি রক্তমাখা শার্ট, যে শার্ট হয়ে উঠেছিল একটি পরাধীন জাতির মুক্তির দিশারি। শার্টটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের, যাঁকে আমরা ‘শহীদ আসাদ’ নামে চিনি।
১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া আসাদ ছিলেন তৎকালীন প্রগতিশীল রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা হল (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) শাখার সভাপতি এবং ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক। কেবল ছাত্র রাজনীতিই নয়, নরসিংদীর শিবপুর, হাতিরদিয়া ও মনোহরদী এলাকায় শক্তিশালী কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা।
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তায় ছাত্র-জনতার ১১ দফা কর্মসূচির মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া আসাদ শহীদ হন এবং অনেকে আহত হন।
আসাদের আত্মত্যাগ উনসত্তরের গণ-আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিয়েছিল সারা দেশে। আলোকচিত্রী রশীদ তালুকদারের ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিল আসাদের রক্তভেজা শার্ট।
ওই দিন গুলিস্তান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জনতার মিছিলে লাঠির মাথায় আসাদের শার্ট ঝুলানো দেখার পর কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। কবি সেখানে আসাদের শার্টকে তুলনা করেছিলেন ‘আমাদের প্রাণের পতাকা’ হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন—
‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা / সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক; / আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’
সেই একই উত্তাল সময়ে তরুণদের মিছিলে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কবি হেলাল হাফিজ লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত পঙ্ক্তি— ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় / এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
অন্যদিকে কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় আসাদের মৃত্যুহীন উপস্থিতিকে তুলে ধরেছিলেন এই ভাষায়— ‘ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক! শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে/ দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা/ তুলবো কেন খিল?/ আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ ফিরবে সে মিছিল।’
আসাদের রক্ত কীভাবে সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামিয়ে এনেছিল, তার এক মহাকাব্যিক চিত্র পাওয়া যায় কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে। আসাদের শার্ট নিয়ে বের হওয়া সেই বিশাল মিছিলকে ইলিয়াস তুলনা করেছেন উত্তাল সমুদ্র বা নদীর স্রোতের সঙ্গে। তিনি লিখেছেন, ‘কালো কালো হাজার হাজার মাথা এগিয়ে আসছে অখণ্ড স্রোতোধারার মতো। এই বিপুল স্রোতোধারার মধ্যে ঘাই মারা রুই কাতলার ঝাঁক নিয়ে গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসছে কোটি ঢেউয়ের দল। গলি-উপগলি ভরা কেবল মানুষ। দুই পাশের বাড়িগুলোর ছাদ পর্যন্ত মানুষ। গলি-উপগলি থেকে স্রোত এসে মিশে মূলধারার সঙ্গে, মানুষ বাড়ে; নাবাবপুর সামলাতে পারে না।’

ইলিয়াস আরও লিখেছেন, ‘ঢাকায় কি এত লোক বাস করে? মনে হয় ঢাকা শহর তার ৩৫০/৪০০ বছরের বুড়ো হাবড়া, রোগা পটকা লোনা-ধরা গতর ঝেড়ে উঠে ছুটতে শুরু করেছে সামনের দিকে।...দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা তার শীর্ণ তনু একেবারে নিচে ফেলে উঠে এসেছে বিপুল স্ফীত হয়ে। বুড়িগঙ্গার অজস্র তরঙ্গরাশির সক্রিয় অংশগ্রহণ না হলে কি এমন জলদমন্দ্র ধ্বনি উঠতে পারে, “আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”।’
বাংলা সাহিত্যের আরেক জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ উনসত্তরের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন তাঁর উপন্যাস ‘মাতাল হাওয়া’। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন শহীদ আসাদকে। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন—‘সাধারণত কোনো মৃত মানুষ আন্দোলন চালিয়ে নিতে পারেন না, কিন্তু আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান তা পেরেছিলেন। তাঁর রক্তমাখা শার্টই ছিল উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি।’
আসাদ আজ নেই, কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে আছেন সেই অজেয় বীর হিসেবে, যার রক্তমাখা শার্ট আজও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
আজকাল খেলনার দোকানে শুধু ছোট ছেলে-মেয়েদেরই দেখা যায় না, সেখানে পঁচিশ, ত্রিশ এমনকি এর চেয়ে বেশি বয়সীদেরও দেখা মিলছে। এখন তাদেরও দেখা যায় হাসিমুখে বিভিন্ন খেলনা নেড়ে-চেড়ে দেখছেন বা কিনছেন। কোনো শিশুর জন্য নয়, বরং তারা খেলনাটি কিনছেন নিজের জন্যই!
৯ ঘণ্টা আগে
স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বিতর্কিত ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই তত্ত্বে বলা হয়, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতির সংঘাত আর কমিউনিজম বনাম পুঁজিবাদের মতো মতাদর্শভিত্তিক থাকবে না।
১০ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কত টাকা বেতন-ভাতা পান, এ প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বরাবরই কৌতূহলের জন্ম দেয়। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সময় এই আলোচনা আরও জোরালো হয়। বেতনের বাইরে তাঁরা আর কী কী সুযোগ-সুবিধা পান, রাষ্ট্র তাঁদের পেছনে কী ধরনের খরচ বহন করে, এসব নিয়েও মানুষে
১০ ঘণ্টা আগে
পাঠ্যপুস্তকের ভাষা কোনো নিরীহ বস্তু নয়। এর পেছনে থাকে দৃষ্টিভঙ্গি আর রাষ্ট্রের নীরব উপস্থিতি। আরেকটি সত্য হলো, পাঠ্যবই রচনার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় নিরাপত্তা-ভাবনা বড় হয়ে ওঠে: ‘এটা লিখলে বিতর্ক হবে না তো?
১ দিন আগে