২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেন। সেদিন সন্ধ্যায় আমি ভিয়েনার এক হোটেলে ছিলাম। সব ইঙ্গিত বলছিল ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং পারমাণবিক আলোচনার অন্য পক্ষগুলো একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেকেই আমাকে এমনটাই বলেছিলেন। ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্যরাও একই কথা বলেছিলেন।
তারপর ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলো। সেই চুক্তি আর কখনো দিনের আলো দেখেনি। ইরানি প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। তাঁরা ভাবলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব আর আগের মতো থাকবে না। এই মূল্যায়ন তেহরানের নেতৃত্বের কাছে পাঠানো হলো। ইরানি কর্মকর্তাদের মুখে তখন টিভি শো ‘গেম অব থ্রোনস’ থেকে ধার করা বাক্য ‘শীত আসছে’ বা ‘উইন্টার ইজ কামিং’ ঘুরছে। বড্ড সরল-সোজা চিন্তা নিয়ে ইরান ভাবল, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ইউরোপ তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়বে। পশ্চিমের ঐক্য ভেঙে যাবে আর ইরানের দরকষাকষির অবস্থান শক্তিশালী হবে।
শীত এল এবং চলেও গেল, ইরানের বাজি ব্যর্থ হলো। তেহরানের এই কাল্পনিক প্রত্যাশার কারণে তারা চুক্তি থেকে বঞ্চিত হলো। ওই চুক্তি হয়তো বাইডেন প্রশাসনের সময়ে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করতে পারত। ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই ভুল বিচার এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হচ্ছে না, বরং এটি একটি পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন বা ধাঁচ।
এই প্যাটার্ন আবার দেখা দিয়েছে। বর্তমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, তেহরান যেভাবে আলোচনাকে বোঝে আর ওয়াশিংটন যেভাবে তা চালায়—এই দুয়ের মধ্যে ফারাক বাড়ছে। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকা এক আঞ্চলিক কূটনীতিক একে ‘ভেলোসিটি গ্যাপ’ বা গতির ব্যবধান বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের কারণেই সপ্তাহ কয়েক আগে যুদ্ধ লাগেনি। তাঁর উদ্বেগ কেবল দুই পক্ষের মতবিরোধ নিয়ে নয়। তিনি মনে করেন সময়ের হিসাব বুঝতে মৌলিক ভুল হচ্ছে। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সরকার কোনো প্রথাগত আমেরিকান প্রশাসন নয় যারা পরিচিত প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দে চলে। ট্রাম্প দ্রুত এবং দৃশ্যমান বিজয় চান, ধৈর্য তাঁর কৌশলগত স্বভাব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকের বার্তা পরিষ্কার, ইরান যদি মনে করে তারা আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত আলোচনা টেনে নিয়ে যাবে এবং সুবিধা আদায় করবে, তবে তা হবে মারাত্মক ভুল। ইরান যে কূটনৈতিক সময়সীমাকে বাস্তবসম্মত মনে করছে, তার অনেক আগেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ধৈর্য শেষ হয়ে যাবে।
গত জুনে ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, তার ঠিক আগের রাতের কথা। ইরানি কর্মকর্তারা কূটনৈতিক ইঙ্গিত দেখে ভেবেছিলেন মাসকাটে ষষ্ঠ দফার আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল আঘাত হানবে না। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বিশ্বাস করতেন কোনো হামলা হলে তা শুধু পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতেই হবে, তেহরানে নয়।
এর বদলে ভোরের আগেই ইরানের রাজধানী বিমান হামলার শব্দে কেঁপে উঠল। ড্রোন অপারেশন চালানো হলো। ১২ দিনের যুদ্ধে দেশের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশই নিহত হলেন। শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি মার্কিন হামলার অনুমোদন দিলেন।
ইরানি কর্মকর্তারা স্বীকার করলেন, হামলার আগে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো থেকে সরানো হয়নি। তেহরান ভাবতেই পারেনি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়াবে, কিন্তু ঠিকই জড়িয়েছিল।
কাতারের আল-উদেদ বিমানঘাঁটিতে ইরানের প্রতীকী হামলার পর যুদ্ধবিরতি দিয়ে সংঘাত শেষ হয়। তখন ইরানি কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন আলোচনা আবার পরিচিত শর্তে শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা মৌলিকভাবে বদলে গেছে, যুদ্ধ হয়ে গেছে। মূল অবকাঠামো অকেজো এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে। পারমাণবিক বা আঞ্চলিক—উভয় ক্ষেত্রেই ইরানের দরকষাকষির ক্ষমতা বা লিভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবুও ইরান এমন আচরণ করছে যেন আলোচনার কাঠামো এখনো আগের মতোই আছে। জুনের যুদ্ধের পরপরই এক সাবেক ইরানি কর্মকর্তা বলেছিলেন, সমস্যা অজ্ঞতা নয়; সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা বা ইনার্শিয়া। এখানকার এস্টাবলিশমেন্ট বা শাসকরা ২০১৫ সালের মডেলেই আটকে আছে।
২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন চুক্তি একটি বিরল পরিস্থিতির ফল ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, তেহরানের কৌশলগত নমনীয়তা ও আপস করার মতো আন্তর্জাতিক পরিবেশ তখন ছিল। আজ এর কোনটিই নেই। এখন ওয়াশিংটন পারমাণবিক বিধিনিষেধের পাশাপাশি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ও কথা বলতে চায়। ফলে পুরোনো আলোচনার টুলবক্স বা সরঞ্জামগুলো এখন অকেজো। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তেহরান নতুন কৌশলগত সংঘাত মোকাবিলা করতে চাইছে পুরোনো সময়ের ধারণা দিয়ে।
এ কারণেই ইরানি নীতিনির্ধারকরা ক্রমবর্ধমান মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে এখনো শুধু চাপ হিসেবেই দেখছেন। দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী আসার ঘটনাকেও তারা আলোচনার টেবিলে বসানোর কৌশল ভাবছেন; যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন না। এখনো তাদের বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত একটি পারমাণবিক চুক্তি চায় এবং দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে চায়।
সমস্যা যুদ্ধের প্রস্তুতির অভাব নয়। ইরান তার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। পশ্চিমা রিপোর্ট অনুযায়ী তারা অস্ত্রভাণ্ডারও পূর্ণ করছে। সমস্যা হলো পরিচিত কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ইরানের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে ইরানের চারপাশের পরিবেশ বদলে গেছে। বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়া এখন ইরানের কৌশলগত সমীকরণ থেকে পুরোপুরি বাদ। ২০২৩-২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ও হামাস তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতার অনেকটাই হারিয়েছে। ইরাকও নিজের অবস্থান বদলাচ্ছে ও আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে।
ইরানের ভেতরে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার ক্রম বা ধারা অদ্ভুত। প্রথমে বিনিময় হার বা ডলারের দাম, তারপর ভূ-রাজনীতি। ইরানের বড় অংশ আদর্শিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা ভিন্নমতকে বা বিরোধিতাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে।
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের আগে মধ্যপ্রাচ্য যেভাবে ইরানের জন্য প্রতিরোধ তৈরি করেছিল, তা এখন আর পারবে না। তবুও ইরান এমনভাবে আলোচনা করছে যেন আগের অবস্থা এখনো আছে।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের পরেও ইরানি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারি জানির নেতৃত্বে মাসকাট ও দোহার আলোচনা মূলত পারমাণবিক ফাইলেই সীমাবদ্ধ ছিল। ইরানি কর্মকর্তারা এখনো বিশ্বাস করছেন, এই অঞ্চলকে অচল করে দেয় এমন কোনো সংঘাত ট্রাম্প দীর্ঘায়িত করবেন না।
কূটনীতিতে একে ক্লাসিক বা চিরায়ত জুয়া খেলা বলে। কথাটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের ক্ষেত্রেই খাটে। পুরো ঘর পুড়িয়ে ফেলা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তারা ধরে নিচ্ছে উত্তাপ বাড়ানো মানেই নিজেদের চাওয়া আদায় করা।
ইরানের ভেতরে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার ক্রম বা ধারা অদ্ভুত। প্রথমে বিনিময় হার বা ডলারের দাম, তারপর ভূ-রাজনীতি। ইরানের বড় অংশ আদর্শিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা ভিন্নমতকে বা বিরোধিতাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে। তারা অভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে ধর্মীয় মতবাদের সঙ্গে যুক্ত পবিত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের অংশ মনে করে। অন্য অংশ সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থিতিশীলতা চায়। তারা শাসনের সমালোচনা করে ঠিকই কিন্তু স্বৈরাচারী ধারাবাহিকতার চেয়ে জাতীয় বিভক্তি বা দেশ ভেঙে যাওয়াকে বেশি ভয় পায়।
ছোট কিন্তু ক্রমশ সোচ্চার একটি অংশ, বিশেষ করে তরুণরা যুদ্ধকেই সম্ভাব্য মুক্তি বা ‘রাপচার’ হিসেবে দেখছে। তারা একে ধীর জাতীয় পতন থেকে বের হওয়ার পথ মনে করে। তেহরানে সাক্ষাৎকারের সময় কেউ কেউ বলেছে বিদেশি হামলা হয়তো সাধারণ মানুষকে নয় বরং প্রতিষ্ঠানগুলোকেই লক্ষ্য করবে। ফলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দরজা খুলবে। স্পষ্টতই তারা ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসন এবং তার পরবর্তী বিভীষিকা দেখার মতো যথেষ্ট বয়স্ক নয়।
যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়িয়েই চলেছে। আর ইরান এখনো নিশ্চিত যে আলোচনাই শেষ পর্যন্ত সংকট সমাধান করবে। অথচ মার্কিন দাবিগুলো এখন ইরানের প্রতিরোধ ডকট্রিনের মূল স্তম্ভ অর্থাৎ ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিকেই চ্যালেঞ্জ করছে। এমন শর্ত মেনে নিলে ইরান কৌশলগতভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়বে। আর প্রত্যাখ্যান করলে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে।
বিপরীতমুখী শোনালেও এই আত্মবিশ্বাস ইরানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হতে পারে। ইরানের কাছে যা অকল্পনীয়, অভাবনীয় ছিল, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাকে বাস্তব কৌশলগত সুযোগে পরিণত করেছে। দীর্ঘমেয়াদী চাপের লক্ষ্য হয়তো সরকার পতন নয়, বরং ক্লান্তি আর অভ্যন্তরীণ চাপের মাধ্যমে দেশটির গতিপথ বদলে দেওয়া। এমন কৌশল সফল হবে কি না তা নিশ্চিত নয়। ইরানের বহুস্তরের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আকস্মিক পরিবর্তন প্রতিরোধের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
আপাতত ইরানের বিশ্বাস—সমাধান আলোচনার টেবিলেই আসবে। হয়তো তাই হবে, কিন্তু বিপদ লুকিয়ে আছে দুই দেশের চিন্তার পদ্ধতির মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দুই দেশই ভাবছে অন্য পক্ষ আগে চোখের পলক ফেলবে বা পিছু হটবে।
- আলি হাশেম: সেন্টার ফর ইসলামিক অ্যান্ড ওয়েস্ট এশিয়ান স্টাডিজ, রয়্যাল হলওয়ে, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রিসার্চ এফিলিয়েট
ফরেন পলিসি থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ