ফ্যাসিবাদের শোষণ থেকে রাষ্ট্রকে উদ্ধার করতে প্রচলিত ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। সেই সংস্কারের লক্ষ্যেই আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, গণভোটের রায়ের মাধ্যমেই জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণ সম্ভব।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে ময়মনসিংহ সার্কিট হাউস ময়দানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত বিভাগীয় ইমাম সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু এতদিন সেই জনগণকেই বঞ্চিত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ যেন অতীতের মতো না হয়, সে জন্য বিবেকের তাড়নায় গণভোটে অংশ নেওয়া জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে আলী বলেন, সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক হারে ১০০টি আসন থাকবে। কোনো দল মোট ভোটের ৫ শতাংশ পেলেও তাদের ৫ জন প্রতিনিধি সেখানে থাকবেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদকে ‘এমপিদের মুখে স্কচটেপ’ আঁটার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। আলী রীয়াজ জানান, সংস্কার প্রস্তাবে কেবল অর্থবিল ও আস্থা ভোটের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য থাকবে, বাকি ক্ষেত্রে এমপিরা স্বাধীন মতামত দিতে পারবেন।
সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের প্রচারণায় আইনি কোনো বাধা নেই। অতীতে সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই হতো, যা পরিবর্তনের তাগিদ দেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন অপপ্রচার নিয়ে সতর্ক করে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ বা আল্লাহর ওপর আস্থা থাকবে না বলে যে প্রচার চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ‘বোগাস’। তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ার ওপর জোর দেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ১৯৭১ সালের পর এটিই আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ। রাষ্ট্র মর্যাদাপূর্ণ হবে নাকি স্বৈরাচারী, তা ঠিক করতেই এই গণভোট। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ শাম্মীর সভাপতিত্বে সভায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফজলুর রহমান ও ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া বক্তব্য দেন।
ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান
এর আগে সোমবার দুপুরে, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও এক ব্যক্তির ইচ্ছায় দেশ পরিচালনা বন্ধ করতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন যেন ছেলেখেলায় পরিণত না হয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত থাকে, সে জন্যই এই গণভোট।
‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ’ শীর্ষক সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন আলী রীয়াজ। ছবি: সংগৃহীতময়মনসিংহের অ্যাডভোকেট তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ’ শীর্ষক এই সভায় আলী রীয়াজ বলেন, ‘বিগত তিনটি নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। এক ব্যক্তির শাসন দেশকে কোথায় নিয়ে গেছে, তা আমরা দেখেছি। এই অবস্থা পরিবর্তনে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পথরেখা তৈরিতে গণভোটের গোলাপি ব্যালট গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের ঋণ স্বীকার করে তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
‘জুলাই সনদ’ সরকারের একার নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের দলিল উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ও স্বাধীন বিচার বিভাগ গড়তে হলে এই সনদে সম্মতি দিতে হবে। এ সময় তিনি জানান, সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের প্রচারে আইনি কোনো বাধা নেই।
বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, আগে শেখ হাসিনার পছন্দের ব্যক্তিতে কমিশন সাজানো হতো। কিন্তু জুলাই সনদ অনুযায়ী সরকার ও বিরোধী দলের আলোচনার ভিত্তিতে এসব পদে নিয়োগ হবে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন কঠিন করতে উচ্চ কক্ষের সমর্থনের বিধান রাখার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ শাম্মীর সভাপতিত্বে সভায় বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।