leadT1ad

যেভাবে এই মাটি ও পলির দেশ

বঙ্গীয়-বদ্বীপের সমাজ, রাজনীতি ও মতাদর্শ নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা ফিরে তাকিয়েছি বাংলাদেশের গত দুই হাজার বছরের পথপরিক্রমায়। জানার চেষ্টা করেছি, কীভাবে গড়ে উঠেছে এ জনপদের সমাজ, রাজনীতি ও মতাদর্শ। লেখাটি বিখ্যাত ডাচ নৃবিজ্ঞানী ভেলাম ভান সেন্দেলের ‘হিস্টোরি অব বাংলাদেশ’ বই থেকে নেওয়া। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ জনপদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ নামে ইউপিএল থেকে প্রকাশিত হয়েছে এই বইয়ের অনুবাদ।

স্ট্রিম ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ১৬: ৩৮
বঙ্গীয়-বদ্বীপের মানচিত্র। ছবি: বাংলাপিডিয়া

কল্পনা করুন, আপনি হিমালয়ের ওপরে আকাশে অবস্থান করছেন। এবার নিচের দিকে তাকান। তুষারাবৃত ও রুক্ষ গাছপালায় ছেয়ে যাওয়া জনমানবশূন্য পাহাড়ি এক ভূখণ্ডের দৃশ্য আপনার নজরে পড়বে। এরপর যদি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাকান, তাহলে পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝামাঝি এক বিস্তৃত প্লাবন সমভূমি আবিষ্কার করবেন। সুবিশাল ঝলমলে সবুজ এই অঞ্চলটিই হলো বাংলাদেশ।

আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাংলাদেশ সম্পর্কে লেখা একটি বইয়ের সূত্রপাত কেন হিমালয় থেকে করতে হলো। কারণটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ: হিমালয় ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকত না। এক অর্থে হিমালয়ের যে অংশটি চ্যাপটা হয়ে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে, সেটিই মূলত বাংলাদেশ। প্রতি বসন্তে এ পর্বতের বরফ গলতে শুরু করে। সেই বরফগলা পানি মাটিকণার সঙ্গে মিশে অসংখ্য নদীতে পরিণত হয় এবং সমুদ্রে পতিত হয়। নদীগুলো যখন নিচু সমতল ভূমিতে গিয়ে পৌঁছায়, তখন তাদের গতি কমে আসে। পানির সঙ্গে মিশে থাকা মাটিকণা পলি হিসেবে সঞ্চিত হয়ে হয়ে বদ্বীপ অঞ্চল গড়ে তোলে। এই শতাব্দীপ্রাচীন প্রক্রিয়া এমন এক অঞ্চল গড়ে তুলেছে, যা বর্তমানে আমাদের কাছে বাংলাদেশ নামে পরিচিত। এ ভূখণ্ডটিতে নতুন নতুন পলি
সঞ্চয়ের কারণে সমুদ্র প্রতিবছরই একটু একটু করে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে।

বাংলার বদ্বীপ আয়তনে বিশাল। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা হিমালয় থেকে ছুটে আসা বিপুল পরিমাণ জলরাশিকে এই অঞ্চলের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হতে হয়। হিমালয়ের দক্ষিণে অসংখ্য শাখানদী ও নদী মিলিত হয়ে প্রমত্ত গঙ্গার সৃষ্টি করেছে। এই নদী ভারতের ভেতর দিয়ে পূর্ব দিকে শত শত কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ জনপদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ জনপদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীত

হিমালয়ের উত্তরে রয়েছে আরেকটি বড়ো নদ-ব্রহ্মপুত্র, যার উৎপত্তি তিব্বতে। এটি রাজধানী লাসাকে অতিক্রম করে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে তীক্ষ্ণভাবে বাঁক নিয়ে গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এরপর পর্বতমালার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতের সুদূর উত্তর-পূর্ব কোণ দিয়ে প্রবেশ করেছে। তারপর এটি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল দিয়ে যমুনা নাম নিয়ে প্রবেশ করেছে। এটি বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে গঙ্গা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে একত্রে সাগরে গিয়ে পড়েছে। দুটি নদীই বিশাল: গঙ্গা প্রায় ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত এবং অবিশ্বাস্য মনে হলেও ব্রহ্মপুত্র কোথাও কোথাও ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত।

এই হলো মোটাদাগে বাংলাদেশের নদীর ভূগোল। নিবিড়ভাবে এ বদ্বীপের ভূগোল পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাবেন অসংখ্য নদী এঁকেবেঁকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহৎ নদী মেঘনা, যা পূর্ব দিক থেকে দেশটিতে প্রবেশ করেছে। ভারতের সীমানা অতিক্রম করে আরও ৫০টির বেশি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এসব নদ-নদী কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছে, আবার কিছুদূর গিয়ে বিভক্ত হয়েছে এবং পুনরায় যুক্ত হয়ে এক জটিল জলপথ-নদীর খাত, খালবিল ও হাওর-বাঁওড় সৃষ্টি করেছে। আদিকালে বদ্বীপের সমস্ত ছোটো-বড়ো নদীগুলোর পূর্বাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। ফলে পশ্চিমের নদীখাতগুলো (বর্তমানে ভারতের অভ্যন্তরে) শুকিয়ে যেত। অসংখ্য নদী উর্বরা পলির পুরু স্তর জমিয়ে জমিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তর নদীর বদ্বীপ গড়ে তুলেছে। পলিমাটির সবটাই যে বাংলাদেশে জমা হয়েছে, তা নয়। প্রতিবছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি পলি ভারত মহাসাগরে পতিত হয়, যা পৃথিবীর বৃহত্তম নিমজ্জিত বদ্বীপ সৃষ্টি করেছে। এর সর্বাধিক পুরুত্ব ১৬ কিলোমিটারের বেশি এবং মহাসাগরের তলদেশের দক্ষিণ দিকে ৩ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, যা শ্রীলঙ্কাকে অতিক্রম করে গেছে।

পূর্ব, উত্তর এবং পশ্চিম দিকে উঁচু ভূমি ও পাহাড়বেষ্টিত বঙ্গীয় বদ্বীপটি মূলত একটি সরু চোঙার মতো কাজ করে থাকে, যার ভেতর দিয়ে বদ্বীপের আয়তনের তুলনায় ১০ গুণের চেয়ে বড় এলাকার পানি প্রতিবছর সাগরে গিয়ে পড়ে। সে পানির পরিমাণ রীতিমতো বিস্ময়কর, প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি কিউবিক মিটার/ঘনমিটার। এ পানির বেশির ভাগ পলিমিশ্রিত অংশ বদ্বীপের ভেতর দিয়ে মে এবং অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রবাহিত হয়। তখন সেখানকার নদীগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে।

এ প্রবল শক্তিগুলো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলেছে এবং জনজীবনে আজও এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। তবে বদ্বীপের প্রধান নদীগুলোই এ ভূখণ্ডে পানির একমাত্র উৎস নয়। আরও দুটি উৎস থেকে প্রাপ্ত পানি বাংলাদেশে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে-বৃষ্টি ও সমুদ্রের পানি।

হিমালয় ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকত না। এক অর্থে হিমালয়ের যে অংশটি চ্যাপটা হয়ে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে, সেটিই মূলত বাংলাদেশ।

প্রতিবছর জুন মাসে নদীগুলো যখন পানিতে ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন বাংলাদেশের আকাশের রূপও বদলাতে শুরু করে। শীতকালে আকাশ নীল থাকে এবং বৃষ্টি হয় কদাচিৎ। তবে মে মাসের শেষে বা জুনের প্রথমে যখন তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তখন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে ঘন মেঘ জমতে থাকে। সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের সময় বায়ু প্রচুর জলীয়বাষ্প বহন করে এবং বাংলাদেশে মুষলধারায় বৃষ্টিপাত ঘটায়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

এভাবে বর্ষাকালের আগমন ঘটে। এশিয়ার এই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বর্ষা সত্যিই অভূতপূর্ব। তখন যে কেবল দিনরাত বৃষ্টি হয় তা-ই নয়, হাঁটুসমান কাদাও জমে যায়। এ সময় বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়, সেটিও বিপুল। আবহাওয়াবিদদের কাছে বিশ্বব্যাপী চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি একটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বলা হয়, উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী ছোট গ্রাম চেরাপুঞ্জিতে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এখানে মৌসুমি বায়ু মেঘালয়ের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। ফলে কয়েক মাস ধরে টানা বৃষ্টিপাত চলতে থাকে। এখানে বছরে গড়ে ১১ মিটার বৃষ্টি হয়। এ পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১ মিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনে পানির তৃতীয় উৎস সমুদ্র। শুকনো মৌসুমে (অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত) বঙ্গোপসাগর থেকে লোনাপানি বিভিন্ন চ্যানেল দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত প্রবেশ করে। ফলে বদ্বীপের নিম্নাঞ্চল লবণাক্ত হয়ে পড়ে। উপরন্তু নিম্ন বদ্বীপাঞ্চল বেশ চ্যাপটা ও সমতল: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর ভূমির উচ্চতা তিন মিটারের কম। ফলে এখানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ার-ভাটার সময় বছরে অন্তত একবার সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ঘটে। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং এর অদূরে অবস্থিত দ্বীপগুলো তখন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়ে। বদ্বীপের উপকূলবর্তী অঞ্চল পরিবেষ্টন করে থাকা ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এ সময় কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে আঠারো শতক থেকে মানুষের কার্যকলাপের কারণে এই বনটি আয়তনে ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় মোকাবিলায় পৃথিবীর এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটি যে পুরোপুরি অপ্রতিরোধ্য, এমনও নয়। ২০০৭ সালের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবনে সরাসরি আঘাত হানলে অসংখ্য গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়।

ওপরে আলোচিত তিন ধরনের পানির উৎস-নদী, বৃষ্টি ও সাগর-বাংলাদেশকে দ্বিমুখী প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শীতকালে পানি শুকিয়ে নদীগুলো সরু হয়ে যায়। তখন আকাশ থাকে নিদাঘ নীল, লবণাক্ত পানি ধীরে ধীরে প্রবেশ করে। প্রকৃতি তখন যেন সদয় হয়ে ওঠে ও প্রতিপালকে রূপান্তরিত হয়। তবে গ্রীষ্মে প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন বাংলাদেশ এক দ্বিচারী বৈশিষ্ট্যের ভূখণ্ডে পরিণত হয়। এই সময়ে নদীগুলো প্রশস্ত হয়, প্রবল বৃষ্টিপাত হতে থাকে। সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হলে বিপরীত দিক থেকে আসা যাবতীয় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বন্যা হয়।

সব নদীতে যদি একই সময়ে জোয়ার আসে, তাহলে তীর উপচে ভূমি প্লাবিত হয়। এভাবে নদীগুলো নতুন নতুন গতিপথ সৃষ্টি করে থাকে, যা সক্রিয় বদ্বীপের বৈশিষ্ট্য।

গ্রীষ্মকালীন বন্যা এ দেশে জীবনযাত্রারই একটি অংশ। প্রতি গ্রীষ্মে প্রধানত বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হয়। নদীর কারণেও বন্যা হতে পারে। সাধারণত বড়ো নদীগুলোর নিজ নিজ পানির সর্বোচ্চ প্রবাহ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঘটে থাকে। তবে সব নদীতে যদি একই সময়ে জোয়ার আসে, তাহলে তীর উপচে ভূমি প্লাবিত হয়। এভাবে নদীগুলো নতুন নতুন গতিপথ সৃষ্টি করে থাকে, যা সক্রিয় বদ্বীপের বৈশিষ্ট্য।

বছরের পর বছর একই গতিপথ ধরে পানিপ্রবাহের কারণে নদীতে পলি সঞ্চিত হতে হতে তা অগভীর হয়ে পড়ে। এতে নদীর গতি ধীর হয়ে যায় এবং অনেক সময় স্থবির হয়ে পড়ে। একই গতিপথ ধরে পানিপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে অনেক সময় দুই পাড় ঘেঁষে পলির বাঁধ গড়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও নদীর তলদেশ ভরাট হতে হতে একসময় নদী প্লাবন সমভূমির সমান্তরাল কিংবা তার চেয়েও উঁচু হয়ে যেতে পারে। তবে অস্বাভাবিক পরিমাণ পানি এ গতিপথের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে তীরে ভাঙন ধরে এবং নদী উপচে পানিপ্রবাহের জন্য নতুন ও নিচু গতিপথ সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে পুরোনো গতিপথ অশ্বখুরাকৃতির হ্রদ হিসেবে টিকে থাকে কিংবা গাছপালায় ঢেকে যেতে পারে।

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এমন অসংখ্য বিচরণশীল নদীর চিহ্ন লক্ষ করা যায়। বদ্বীপে সাধারণত অতিবৃষ্টি এবং নদীতে প্লাবনের কারণেই বন্যা হয়ে থাকে, তবে পাহাড়ে অতিবর্ষণের ফলে সৃষ্ট ঢলের পানি প্রবাহিত হয়ে অথবা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের কারণেও বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে।

বৃষ্টিপাত, নদীর প্লাবন, পাহাড়ি ঢল ও উপকূলবর্তী জলোচ্ছ্বাসের সমন্বয়ের দরুন বাংলাদেশে বন্যানিয়ন্ত্রণ অসম্ভব ব্যাপার। এমনকি বর্তমান সময়ে এসেও আসন্ন বন্যার সময়কাল, এলাকা অথবা ব্যাপকতার পূর্বাভাস পাওয়াই কঠিন, নিয়ন্ত্রণ করা তো দূরের কথা। বন্যার ব্যাপকতাও একেক বছর একেক রকম হয়। কয়েক বছর পরপর বড় বন্যা হয় এবং এ ধরনের বন্যায় কখনো কখনো দেশের প্রায় ৭০ ভাগ অঞ্চল প্লাবিত হয়।

জনজীবনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, বন্যার ভালো ও মন্দ—দুই দিকই আছে। বছর বছর বন্যা হলে তা পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর মাটির উর্বরতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলে। উর্বর পলির কারণে ফসলের প্রাচুর্য লাভ ও শুরু থেকেই কৃষি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বন্যার অনিয়ন্ত্রিত বৈশিষ্ট্য এবং প্রতি ১০ বছর বা তার কাছাকাছি সময়ে প্রবল বন্যার পুনরাবৃত্তি মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। পানির পরিমাণ দিয়ে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় করা যায় না। আমরা দেখব যে বাংলাদেশের মানুষ ধীরে ধীরে নিয়মিত প্লাবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। কিছু কিছু বন্যা অন্যান্য বন্যার তুলনায় ভয়ংকর হয়ে ওঠে পানিপ্রবাহের প্রাবল্য ও দ্রুততা এবং জমিতে পানির স্থায়িত্বের কারণে। তাই পাহাড়ি ঢল ও উপকূলবর্তী জলোচ্ছ্বাসের পানির পরিমাণ কম হলেও এবং তুলনামূলকভাবে কম অঞ্চল প্লাবিত করলেও তার ক্ষতির পরিমাণ মারাত্মক হতে পারে।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল চট্টগ্রামে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বিভিন্ন জল খাত দিয়ে বিশাল বিশাল ঢেউ চট্টগ্রামের পার্শ্ববর্তী এলাকা ও দ্বীপগুলোতে আছড়ে পড়ে। ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পূর্ব সতর্কীকরণ সত্ত্বেও ৩০ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার পরও উপকূলবর্তী গ্রামগুলোর প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ জলে ভেসে যায়। সরকারি হিসাবমতে, এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতামূলক সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা না থাকার কারণে ১৯৭০ সালে হতাহতের সংখ্যা ছিল আরও বেশি। নোয়াখালী উপকূলে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল।

উল্টো দিকে এসব বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়জনিত বন্যার তুলনায় বিস্তৃত অঞ্চলকে প্লাবিত করলেও বৃষ্টি বা নদীর প্লাবন যদি স্বল্প দিন স্থায়ী হয়, তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। বরং এ ধরনের বন্যার পর সাধারণত ফসলের বাম্পার ফলন হয়। তবে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে। ১৯৮৮ সালের বন্যায় বাংলাদেশের ৬৬ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এই বন্যা ১৫ থেকে ২০ দিন স্থায়ী হওয়ায় তা শস্য, সম্পত্তি, চাষের মাছ ও অন্যান্য সম্পদের মারাত্মক ক্ষতি করে। পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের জীবনহানি ঘটে। ১০ বছর পর আবারও এক বন্যায় দেশের ৬০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। এটি যেহেতু ৬৫ দিন স্থায়ী ছিল, তাই এর ক্ষয়ক্ষতিও আগের তুলনায় বেশি ছিল।

ডাচ নৃবিজ্ঞানী ভেলাম ভান সেন্দেল। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
ডাচ নৃবিজ্ঞানী ভেলাম ভান সেন্দেল। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

এ রকম প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ভূখণ্ডে বসবাসের অর্থ হলো ভূমি ও পানির নিরন্তর পরিবর্তনপ্রবণ সীমান্তের ধারার সঙ্গে বসবাস করা। এ পরিবর্তনপ্রবণ সীমান্ত বাংলাদেশের ইতিহাস ও এ দেশের মানুষের জীবনাচরণকে দীর্ঘকাল যাবৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। নিয়মিত বিপর্যয় সত্ত্বেও মানুষ সফলতার সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও জলমগ্ন বদ্বীপীয় প্রকৃতির সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৩৪২ জন লোক বাস করে। দেশে জমির ওপর মানুষের যে চাপ, তা প্রকারান্তরে আদি পরিবেশগত সীমানার তাৎপর্য প্রমাণ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলের কিনারবর্তী মানুষের জীবনাচরণ আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন জলমগ্ন এলাকার সঙ্গে বাংলাদেশিদের আবাসের সীমারেখা ক্রমশ কমে আসছে। নিচু জমি, উপকূলীয় অঞ্চল, ঝড়-বন্যার সংস্পর্শে আসা দ্বীপগুলোতে তাদের বসতি স্থাপন করতে হচ্ছে। ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল ও চরে বসবাসরত বাংলাদেশি অধিবাসীরা দিন দিন প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এভাবে ক্রমাগত জলের কাছাকাছি বিপজ্জনক জীবনে নিজেদের সমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

প্লাবনে গঠিত সমভূমি বাংলাদেশের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের ৮০ ভাগ অঞ্চল প্লাবনভূমির অন্তর্ভুক্ত। তবে বাংলাদেশের সমগ্র ভূভাগ সমতল নয়। পূর্ব সীমানায় বদ্বীপটিকে ঘিরে থাকা কিছু খাড়া পাহাড় দেশটির জাতীয় সীমানার ভেতর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা দেশটির ভূগোলে একদমই ভিন্ন প্রকৃতির ভূখণ্ড যুক্ত করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটে অবস্থিত এসব পাহাড় বাংলাদেশের নমনীয় মাটির অনেক নিচের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সংঘটনের দিকে নির্দেশ করে। এখানে টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষ হয়: হিমালয় এবং বাংলাদেশের পাহাড়সমূহ (এর বাইরে মিয়ানমার ও উত্তর-পূর্ব ভারত অঞ্চলের কিছু কিছু পাহাড়) এ সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয়।

সব নদীতে যদি একই সময়ে জোয়ার আসে, তাহলে তীর উপচে ভূমি প্লাবিত হয়। এভাবে নদীগুলো নতুন নতুন গতিপথ সৃষ্টি করে থাকে, যা সক্রিয় বদ্বীপের বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের তল দিয়ে সংগঠিত এ ভূ-আন্দোলনের ফলে বঙ্গীয় বদ্বীপের কোনো এলাকা উত্থিত হয়েছে, আবার কোনো এলাকা দেবে গেছে। উত্থিত ভূখণ্ড প্লাবনভূমির মধ্যে দ্বীপের মতো দেখায়
(যেমন উত্তর-পশ্চিম দিকে বরেন্দ্র ভূমি ও মধ্য বাংলাদেশে মধুপুর) এবং দেবে যাওয়া অঞ্চল (হাওর, বিল) বিশালাকৃতির মৌসুমি হ্রদে পরিণত হয়েছে। টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়া বদ্বীপের কাঠামোকে ঢালু করে নদীগুলোকে পূর্ব দিকে ক্রমশ ঠেলে দিচ্ছে। এই অস্থিতিশীল ভূতাত্ত্বিক কাঠামো বাংলাদেশে নিয়মিত ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। যদিও অধিকাংশ ভূমিকম্পই দুর্বল। তবে ব্যাপক ধ্বংস সাধন করতে পারে, এমন ভূমিকম্প ঘটারও আশঙ্কা আছে।

বাংলাদেশের সমাজ/মানব ইতিহাসে প্রাকৃতিক পরিবেশ কখনোই কেবল একটি পটভূমির ভূমিকা পালন করেনি, যাকে ঘিরে ইতিহাসটি তৈরি হয়েছে। বরং সময় ও প্রাকৃতিক শক্তিই এখানে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, সামাজিক বিন্যাসকে বিপর্যস্ত করেছে ও শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করেছে। উদাহরণস্বরূপ ১৭৮০ সালের ভূমিকম্প ও বন্যার কথা উল্লেখ করা যায়। এর ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পাল্টে যায় এবং অসংখ্য গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। তৎকালীন নদীতীরবর্তী ব্যবসাকেন্দ্রগুলোর পতন ঘটে। সাম্প্রতিক ইতিহাসের কথা টানলে দেখা যায়, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করতে পারার কারণে তদানীন্তন সরকার
বিতর্কের মুখে পড়ে এবং শাসনের বৈধতা হারায়। এর পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যায় যে ক্ষতি সাধিত হয়, তা সে বছরের জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের চেয়েও বেশি ছিল।

বঙ্গীয় বদ্বীপ দখলকারী সকল সম্প্রদায় ও শাসকগোষ্ঠীর জন্য এর প্রাকৃতিক পরিবেশের সঠিক ব্যবস্থাপনা বরাবরই মুখ্য চিন্তার বিষয় ছিল। বাংলাদেশের জনগণ কখনোই নিজেদের এই মিথ্যা আশ্বাসে প্রবোধ দেয়নি যে তারা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। তারা এমন এক পরিবেশে বাস করে, যেখানে মাটি ও পানি সহাবস্থান করে এবং এসব উপাদানের মধ্যে সীমারেখা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে জনবসতির বিন্যাস সব সময়ই পরিবর্তনশীল এবং কখনো কখনো ক্ষণস্থায়ী। বাংলাদেশের গ্রামগুলোকে বলা হয় পরিবর্তনশীল।

গ্রামগুলো একটি কেন্দ্রীয় চত্বরের চারদিকে গুচ্ছবদ্ধভাবে বিন্যস্ত নয়। এদের কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই কিংবা যৌথভাবে সেচকার্য পরিচালনার জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ নয়। বরং গ্রামগুলো ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা বাড়ি বা ছোটো পাড়ায় বিভক্ত। মাঝারি বন্যা হলে পানি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বাড়িগুলো উঁচু ভিটার ওপর নির্মিত হয়। বর্ষাকালে বাড়ি বা পাড়াগুলোকে একেকটি দ্বীপ বলে মনে হয়।

কমসংখ্যক গ্রামীণ বসতি স্থায়ী বা টেকসইরূপে নির্মাণ করা হয়ে থাকে। আর সনাতন পদ্ধতির সেচকাজ যেহেতু বিশেষভাবে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল, তাই যৌথ সেচব্যবস্থা গড়ে তোলার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। এই সক্রিয় বদ্বীপে জমির পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্রামবাসীকে প্রায়শই বসবাসের স্থান পরিবর্তন করতে হয় এবং নতুন করে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হতে হয়।

এভাবে ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পদের পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে। এই পরিবর্তনশীল ও খণ্ডিত জনবসতির ধারা গ্রামীণ রাজনীতির বৈশিষ্ট্য
নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশি গ্রামগুলো একজন একক গ্রামপ্রধানের নেতৃত্বের অধীনে নিবিড়ভাবে ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায় নয়। বরং গ্রাম্য সমাজ পরিবার ও পাড়ার নেতাদের দ্বারা গঠিত সদা পরিবর্তনশীল জোটের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে শাসকগোষ্ঠীকে সব সময়ই গ্রামের ভূমি ও জলের সীমান্তের এই পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার পথ খুঁজে বের করতে হয়েছে।

বঙ্গীয় বদ্বীপ দখলকারী সকল সম্প্রদায় ও শাসকগোষ্ঠীর জন্য এর প্রাকৃতিক পরিবেশের সঠিক ব্যবস্থাপনা বরাবরই মুখ্য চিন্তার বিষয় ছিল। বাংলাদেশের জনগণ কখনোই নিজেদের এই মিথ্যা আশ্বাসে প্রবোধ দেয়নি যে তারা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।

বাংলাদেশের অধিবাসীদের ভবিষ্যতের যে কোনো পরিবর্তন মোকাবিলা করতে হলে নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে বা সমাধানের পন্থার নবায়ন করতে হবে। ধারণা করা হয় যে বন উজাড়, মাটিক্ষয়, হিমালয়ের গলতে থাকা হিমবাহ ইত্যাদির কারণে ভরা মৌসুমে নদীগুলোতে পলি সঞ্চয়ের পরিমাণ ও পানির প্রবাহ-দুটোই বাড়াবে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে একমত যে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে যে সমস্ত দেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

তবে এ পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা থেকে বলা যায় যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশে বন্যার প্রার্দুভাব, মৌসুমি ঝড় ও খরা বৃদ্ধি পেয়েছে-এমন প্রচলিত ধারণা সঠিক নয়। অন্যদিকে বিশ্বে যখন পানির সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির প্রাচুর্যের বিষয়টি এর জন্য বিশেষ সম্পদে রূপান্তরিত হয়ে উঠতে পারে। এটি নিশ্চিত যে বাংলাদেশে স্থল ও তিন ধরনের পানির উৎস-নদী, বৃষ্টি ও সাগরের মধ্যকার সহাবস্থান ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত