বিদ্রোহী: তৎকালীন রাজনীতি, কবিতা ও নজরুল
-207c16-480x270.webp)
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবিনশ্বর রচনা তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। বিখ্যাত এই কবিতা নজরুলকে এনে দিয়েছে ‘বিদ্রোহী কবি’ খেতাব। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বয়স একশ বছর অতিক্রান্ত। কবিতার জন্ম থেকে আজ অবধি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ‘বিদ্রোহী’ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অতিক্রান্ত শত বছরেও এই কবিতার ধার লুপ্ত হয়নি, কবিতা পাঠে আসেনি কোনো ক্লান্তি, কবিতাপ্রেমীদের সঙ্গে ঘটেনি কোনো ক্ষণিকের বিচ্ছেদ। কী আছে ‘বিদ্রোহী’তে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লেখা হয়েছে হাজার পৃষ্ঠা। প্রাপ্তির খাতাও কম নয়। তবু শত বছর পরেও ‘বিদ্রোহী’ প্রতি পাঠে ধরা দেয় নতুন করে। বাংলা কবিতার যেকোনো সমীকরণে ‘বিদ্রোহী’ অনিবার্য হয়ে ওঠে। কবির সংশয়হীনতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ হয়ে ওঠে ‘বিদ্রোহী’। বিষয়-বৈভব ও রচনার অসাধারণত্ব লক্ষ্য করে কেউ কেউ ‘বিদ্রোহী’ রচনায় অলৌকিকত্বের প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন। যেন কাজী নজরুল ইসলাম দৈবতাড়িত হয়ে ‘একরাত্রি’তে নির্মাণ করেন ‘বিদ্রোহী’র সৌন্দর্য-সৌধ।
কিন্তু ব্যক্তি যতই মহান ও কালোত্তীর্ণ হোন না কেন, ব্যক্তির পরিচয় ও তাঁর সৃষ্টির শেকড় নিহিত থাকে সমাজ ও সময়ের অন্দরে। তাই যেকোনো রচনার দৃশ্যমান সময়সীমা নির্ধারণ করা যায় বটে দিন-তারিখের হিসেব মিলিয়ে, কিন্তু সেই রচনার ‘নির্মাণ’ জুড়ে থাকে প্রবহমান কাল, দেশ ও সমাজ, রাজনীতি ও ব্যক্তির অভিজ্ঞতা। ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় বাংলার সমাজ ও রাজনীতির ঠিক কোন প্রবাহে জন্ম নিল ‘বিদ্রোহী’; বাংলা কবিতার ঠিক কোন বাঁক-বদলে অনিবার্য হয়ে উঠল ‘বিদ্রোহী’; ‘বিদ্রোহী’ কি আসলেই অলৌকিক— বর্তমান আলোচনায় সেসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা রয়েছে। পাশাপাশি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সঙ্গে সঙ্গে অন্বিষ্ট ‘বিদ্রোহী নজরুল’ও।
বিদ্রোহী’ কবিতায় ‘আমি’র আড়ালে কাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে কোনো একক সত্তায় আবদ্ধ করে রাখেননি। তিনি একই সঙ্গে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রতীক। ‘আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,/আমি অবসান, নিশাবসান!/ আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য,/মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য!’। তিনি এই কবিতায় হিন্দু ও ইসলামী মিথের দ্বৈতধারাকে একসঙ্গে ধারণ করেছেন। তাঁর এই সমন্বয়বাদী ‘আমি’ তৎকালীন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও জনস্রোতের বিভেদ ঘুচিয়ে অভিন্ন বিপ্লবী পথের সন্ধান দেয়। তাঁর সমস্ত আক্রোশ, সমস্ত বিদ্রোহ ও ধ্বংসকামী মনন আপাত অর্থে নঞর্থক মনে হলেও সেগুলো মূলত অত্যাচারী শাসক, শোষক ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হুঙ্কার।
তাই নজরুল বলেন, ‘আমি সেই দিন হব শান্ত,/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,/অত্যাচারীর খড়গ্ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—/বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত।’’ তবে ব্যক্তি ‘আমি’র এই সীমাহীন সম্প্রসারণ এবং অক্লান্ত অনুপ্রাসে গাঁথা পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তির পসরা বাংলা কবিতার ধারায় আকস্মিক হলেও অত্যাচারী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কবির এই রণ-হুঙ্কারী উচ্চারণ আকস্মিক নয়। লক্ষ্যণীয়, ঔপনিবেশিক পরিকাঠামোয় তখন সমগ্র ভারতবর্ষ রাজনৈতিক অস্থিরতায় কম্পমান। ১৯১৯-২২ সাল ভারতীয় রাজনীতির এক উত্তুঙ্গ মুহূর্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়দের সমর্থন পেতে ভারতের স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রিটিশ সরকার।
দেশ-প্রশ্নে তাই কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশের পক্ষে বাঙালি পল্টনে ছুটে গেছেন যুদ্ধে। যুদ্ধ ফেরত নজরুল যখন ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরছেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সর্বময় প্রকাশ ততদিনে ঘটে গেছে। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর গান্ধী প্রথমে সত্যাগ্রহ, তারপর স্বরাজ ও কয়েকদিনের ব্যবধানে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে মিত্র শক্তিগুলোর মধ্যে তুরস্ক সাম্রাজ্য ভাগ-বাটোয়ারা করতে সচেষ্ট ব্রিটিশ রাজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি। মুসলিম খেলাফতের বিরুদ্ধে ব্রিটিশের এমন অবস্থানে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মুসলমান সমাজ। তারা গড়ে তোলেন সর্বভারতীয় খেলাফত আন্দোলন। বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদের পরে এ-দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বৈরি মনোভাব বিরাজ করছিল, যুগপৎ খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে তাঁরা একত্রিত হয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এমন মুহূর্তে নজরুলের কলকাতায় আগমন। সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জোয়ার খুব সহজেই তাঁকে প্লাবিত করেছে।
ব্রিটিশের পক্ষে বাঙালি পল্টনে যে বছর নজরুল যোগ দেন, সে বছরই ঘটে গেছে রুশ বিপ্লব। ১৯১৮-তে যুদ্ধ শেষে রুশ বিপ্লবের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে ভারতে, বাংলায়। কলকাতায় এসে তাঁর পরিচয় ঘটে মার্কসীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের সঙ্গে। মুজাফ্ফর আহমেদের সাহচার্য ক্রমেই তাঁর মধ্যে সাম্যবাদী ভাবনার ভিত পাকাপোক্ত করে। যদিও পার্টি রাজনীতিতে নজরুল কখনও জড়িত হননি, তবু তাঁর মধ্যে সাম্যবাদী ভাবনার স্ফুরণ দুর্দান্তভাবে লক্ষ করা গেছে এ-সময়ের কবিতাগুলোতে। ‘বিদ্রোহী’ লেখার কালে তিনি মুজাফ্ফর আহমদের সঙ্গেই থাকতেন। বিপ্লবী মননের প্রভাবে তিনি এতটায় প্রভাবিত ছিলেন যে তাঁর অগ্নি-বীণা উৎসর্গ করেছেন আরেক ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী বারীণ ঘোষকে। সুতরাং বিপ্লবী রাজনীতি ও বিশ্বাসের ভরপুর আয়োজন তাঁর চতুর্পার্শ্বে বর্তমান ছিল।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ঐক্যতান’ কবিতায় অখ্যাতজনের কবির জন্য প্রতীক্ষা করেছেন যে কবি আছেন মাটির কাছাকাছি। তিনি বলছেন, ‘সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি’। ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় বাংলা কবিতার যে ধারা তৈরি হয়েছিল উনিশ শতক জুড়ে সে ধারায় রবীন্দ্রনাথ শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আপন মহিমায় পাশ্চাত্যের উদার বুর্জোয়া পুঁজিবাদের আলোয় ভারতবর্ষীয় জীবনকে দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর সূর্যের ন্যায় স্বয়ং উপস্থিতিতেই বাংলা কবিতার ধারায় অন্যান্য ‘নতুন’ কবিদের প্রবেশ ঘটে। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের বলাকার স্বরে অনেকেই নতুন দিনের আহ্বান শুনেছিলেন। কিন্তু কলকাতা কেন্দ্রিক এই নতুন সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সঙ্গে কলকাতার বাইরে সমগ্র বাংলার প্রান্তিক মানুষের ক্ষীণ যোগাযোগের কথা আজ সর্বজন স্বীকৃত। একান্তই ঔপনিবেশিক কলকব্জায় গড়ে ওঠা এই সাহিত্য কাঠামোতে সাহিত্যের উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ই শহরবাসী আধুনিক নাগরিক ভদ্রলোক। সেখানে ‘মাটির কাছাকাছি থাকা অখ্যাতজনের কবি’ কোথায়?
নজরুল সেই অখ্যাতজনের কবি। বাংলা কবিতায় যার প্রয়োজন ও আগমন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। পারিবারিক ও অর্থনৈতিক জীবনে নজরুল কলকাতা কেন্দ্রিক আধুনিক কাব্যধারার একবারেই বাইরের মানুষ ছিলেন। তাঁর মতো মানুষের যখন কলকাতার ‘দরবারে’ কবিতা লেখার সময় ও সুযোগ হবে, অনিবার্যভাবেই তিনি সেই সব সাধারণের ভাষায় ও সাধারণের আকাঙ্ক্ষার কবিতা লিখবেন। লিখেছেনও তাই। তাঁকে সচেতনভাবে রবীন্দ্র-কাব্যপ্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার যুদ্ধ করতে হয়নি। গণমানুষের কবি হিসেবে তাঁর কবিতা ও স্বর হয়েছে ব্যতিক্রমী। সে স্বরে ‘অলস শব্দসুষমা’র বিপরীতে সৃষ্টি হয়েছে বীরত্বব্যঞ্জক গতি। সে স্বর হয়েছে বিপ্লবী, বিদ্রোহী।
কবির ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার প্রাক্কালে তাঁর কুমিল্লার জীবন, অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। ১৯২১-এ যখন তিনি কুমিল্লা যাচ্ছেন, তখন সর্বভারতীয় আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়েছে বাংলার পূর্বপ্রান্তের শহর কুমিল্লায়। এখানে বিপ্লবী যুগান্তর দলের গোপন বিপ্লবী বসন্ত কুমার মজুমদারের মাধ্যমে কুমিল্লার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তাঁর দ্রুত যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সভায় নজরুলের ভরাট গলার গান ও কবিতার মাধ্যমে তাঁর নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি এখানেই নতুনের জয়গান গেয়ে ‘প্রলয়োল্লাস’ রচনা করেন।
মাঝখানে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থেকে ফিরে হতাশা ও বিরহে গান লিখলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মধ্যে পূর্বাবস্থা ফিরে আসতে শুরু করে। এ পর্যায়ে তিনি বারবার কলকাতা-কুমিল্লা, কুমিল্লা-কলকাতা করেছেন। কুমিল্লায় তাঁর ডাক পড়ত রাজনৈতিক অঙ্গনে, জনসভায়। ক্রমেই সর্বভারতীয় রাজনীতির ত্রিমুখী ধারার সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়ে পরাধীন দেশমাতৃকার জন্য আবেগে উদ্বেলিত তরুণে পরিণত হন। তাঁর এই অসীম আবেগের প্রকাশ ঘটতে থাকে তাঁর কবিতায়, দেশাত্মবোধক গানে। এমনই উদ্দীপনায় ভরা মন নিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরেছেন ১৯২১-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে।
এ সময়ই ‘এক রাত্রে’ তিনি লেখেন তাঁর অমর, অবিনশ্বর ও বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। এই ‘একরাত্রি’র রচনা কোনো দৈব আকস্মিকতা নয়। তাঁর যুদ্ধফেরত সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা, কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের সাহচার্যে ক্রমশ দৃঢ় হয়ে ওঠা বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনা, ব্যক্তিজীবনের পুঞ্জীভূত আবেগ— এই সব কিছুর দীর্ঘকালীন সঞ্চয় সে রাতে ভাষা খুঁজে নিয়েছিল ‘বিদ্রোহী’র মধ্যে।
অর্থাৎ কবির ব্যক্তিজীবন ও মানস, রাজনীতির বিচিত্র পরিস্থিতি ও ভারতীয় সর্বসাধারণের রাজনৈতিক আন্দোলনের এমন এক সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছিল যে, ‘বিদ্রোহী’ তখন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কেউ কখনও শ্লথ বা অলস ভঙ্গিতে পড়তে পারবেন না। ভারতবর্ষীয় রাজনীতির সেই উন্মাতাল পরিস্থিতিতে, যে কবির গায়ে আঁচ লেগেছে আন্দোলনের, বিপ্লবের, গণমানুষের মুক্তির, তাঁর দ্বারা এমন বিপ্লবী সুর তুলে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তাই প্রচলিত কাব্যধারায় ‘বিদ্রোহী’ এক বিপ্লবী বাঁক, উন্মাতাল রাজনৈতিক বাতাবরণে ‘বিদ্রোহী’ এক প্রকাণ্ড বিস্ফোরণ, ব্যক্তি কবির জীবনে ‘বিদ্রোহী’ তাঁর অবিচ্ছেদ্য খেতাব।
লেখক: গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক
.png)









