জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

ইলিয়াস বলতেন তাঁর রক্তের গ্রুপ ‘পি’

ধ্রুব সাদিক
ধ্রুব সাদিক

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এআই জেনারেটেড ছবি

কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আড্ডায় মজা করে বলতেন, তাঁর রক্তের গ্রুপ পি অর্থাৎ পোয়েট।’ তিনি মনে করতেন, লেখকদের রক্ত হলো আলাদা, অন্যের রক্তের সঙ্গে মিলবে না। কিন্তু তাই বলে লেখকদের জন্য জীবনের একটা সিংহাসন তিনি দাবি করতেন? না। লেখক বলে যে যাবতীয় বেপরোয়া জীবনযাপনের লাইসেন্স আছে, এই ব্যাপারটিকেও তিনি মানতেন না।

তিনি মনে করতেন, ‘জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের মতো লেখাও একটা কাজ। আর লেখা দাবি করে ব্যাপক শ্রম ও নিষ্ঠা।’ যে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি শিক্ষকতা করতেন, সেই একই নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি লিখতেন। ইলিয়াসের ডায়েরি সম্পাদনা করতে গিয়ে শাহাদুজ্জামান এও দেখেছেন, সাহিত্যিক দলাদলিতে তীব্র বিরূপতা পোষণ করা ইলিয়াসের ক্ষোভ ছিল দলবাজ লেখকদের প্রতি।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা সাহিত্যের মাইয়েস্ত্রো কথাসাহিত্যিক। ইলিয়াস পাঠের আনন্দ এই, যে, পাঠক যদি কষ্ট করে মনোযোগ ঠিক রেখে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে শব্দের সঙ্গে শব্দমিছিলের বহমান প্রবাহের সঙ্গে ইলিয়াসের জাদুকরী উপমায় মুগ্ধ হয়ে একপ্রকার চরমানন্দে ডুবে যে যাবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কার আশায় হাত নাড়াতে নাড়াতে তমিজের বাপ মূলত আসমানের মেঘ তাড়ায়? শুধুই মুন্সির? মুন্সিকে যদি এক নজর দেখা যায়—এই আশায় তমিজের বাপ হাত নাড়াতে নাড়াতে আসমানের মেঘ খেদায়? দারুণ খটকা লাগতে পারে; এমনকি মস্তিষ্ক হয়তো হালও ছেড়ে দিতে চা’বে কয়েকবার; কিন্তু, আপাত এইসব ব্রেইনখেলাগুলো যখন ক্লিয়ার হবে, তখন, যেমন বলা হয় উপত্যকা পথ পাড়ি দিয়ে মনে পুলক কাজ করে, পুলকিত হতে হয়, স্নিগ্ধ সমীরণ শিহরণ আনে অনুভব করে:

‘...তা না হয় হলো, কিন্তু এখন থেকে দুই বছর সোয়া দুই বছর পর, না-কি আড়াই তিন বচ্ছরই হবে, বিলের পানি মুছতে মুছতে জেগে-ওঠা ডাঙার এক কোণে চোরাবালিতে ডুবে মরলে তমিজের বাপটা উঠবে কোথায়...’

‘খোয়াবনামা’ এবং ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুটি অনন্যসাধারণ বই, যার তুলনীয় গুটিকতেক বই বিশ্বসাহিত্যে আছে। ইলিয়াসের লেখার ধরনে মার্কেস-এর জাদুবাস্তবতা টের পাওয়া যায়? উল্লেখ করি, মার্কেস এবং মার্কেসের লেখার স্টাইলটি শহীদুল জহির, মামুন হুসাইন প্রমুখরা মুগ্ধতা থেকে বাংলা সাহিত্যে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন; এবং আরও অনেকেই আলোড়িত-বিলোড়িত হয়ে থাকলেও থাকবেন। তবে, গভীরে যদি দৃষ্টিপাত করি, এটা অনুধাবিত হতে বিশেষ বাধাগ্রস্ত হতে হয় না, যে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, জহির রায়হান প্রমুখ জাদুবাস্তবতার দারুণ প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন এমনকি যখন বিশ্বসাহিত্যে মার্কেসের জাদুবাস্তবতা আলোচিত হয়ে ওঠেনি।

আজ ২৯ বছর হলো ইলিয়াস চলে যাওয়ার। সেই পাখির মতো সকালটা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বড় বিরক্ত করছিল? করলেও করতে পারে। কেননা, স্বর্গ কোথাও আছে কি, না-আছে, আর তিনি তা জানেন কি, না-জানেন, তা আমাদের জানা না-থাকলেও আমরা জানি তিনি মগ্ন ছিলেন করতোয়া মাহাত্ম্যে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ধরনটি ইলিয়াসের একান্ত নিজস্ব। ইলিয়াস মূলত বাংলার বাস্তবতা, মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিবিম্বন ঘটিয়েছেন তাঁর সাহিত্যকর্মে। তবে, বলতে দ্বিধা নেই, মহৎ সাহিত্যকর্ম আসলে এতটাই মহান হয়ে ওঠে যে, তখন এই সব ধরন বা স্টাইল নিয়ে বিশেষ একটা ভাবনা আর কাজ করে না। যেমন অভিদের মেটামরফোসিস বা কাফকার মেটামরফোসিস বা কামুর স্ট্রেইঞ্জার বা হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি, বা ব্রাদার কারামজভ বা আনা কারেনিনা... আমরা আর মোটেও এসব গ্রন্থের স্টাইল নিয়ে বিশেষ ভাবিত হই না।

বয়ানের ঢঙটি ইলিয়াসের সূক্ষ্ম, যা তাঁর পাঠককে শুধু মোহিত করে রাখে তাই নয়, চিন্তার চ্যুতি-বিচ্যুতির দোলাচলের পর একটা অতল ধাক্কা দিয়ে দেয়; তখন পাঠক শুধু হাবুডুবু খেতে থাকে একটা বিশাল জমিনে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এ অনুধাবন করা যায়: কার চিন্তায় বুঁদ হবে পাঠক? ওসমান, হাড্ডি খিজির নাকি গণঅভ্যুত্থানের সেইসব দিন সেইসব রাত্রির প্রেক্ষাপটে?

নগর ঢাকা, ঢাকার উপকণ্ঠের প্রতিদিনের অনেক চিত্রই ইলিয়াস তাঁর ডায়েরিতে টুকে রাখতেন। সুতীব্র অন্তর্দৃষ্টি এবং যেহেতু তিনি কবিও ছিলেন, যার কারণে কারণ অজ্ঞাত হাড্ডি খিজিরের বুক বুলেটবিদ্ধ হওয়ার কালে বলা কথাটি ‘কোন হালায় রে বুকের উপর ট্র‍্যাক চাপায় দেয়’ পুরো গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার কারণকে যেন এককথায় নির্দেশ করে দেয়।

সেসব না হয় আলোচনা হলো, হবে। ইলিয়াসের সাহিত্যে সংগ্রাম তো একটা বিশাল জায়গা দখল করে আছে; আর আমরা জ্ঞাত থাকি: এই সংগ্রাম আকস্মিক নয়, অনাদিকালের। ইলিয়াসের সংগ্রাম প্রসঙ্গে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর কথা পাঠ করি, ‘মানুষের বিদ্রোহের আর লড়াইয়ের স্মৃতি থেকে যায় তার অবচেতনার পরতে পরতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এবং তা বেরিয়ে আসে কখনো মন্ত্র বা গানের শোলক হয়ে, কখনো আঁকিবুকি টানা নকশার ভেতর দিয়ে, আবার কখনো বা স্বপ্ন ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে।’

আজ ২৯ বছর হলো ইলিয়াস চলে যাওয়ার। সেই পাখির মতো সকালটা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বড় বিরক্ত করছিল? করলেও করতে পারে। কেননা, স্বর্গ কোথাও আছে কি, না-আছে, আর তিনি তা জানেন কি, না-জানেন, তা আমাদের জানা না-থাকলেও আমরা জানি তিনি মগ্ন ছিলেন করতোয়া মাহাত্ম্যে।

ইলিয়াস আসন পাতেন কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছের মাথায়। সেই তখন থেকে দিনের বেলা রোদের মধ্যে রোদ হয়ে ছড়িয়ে থাকেন সারাটা বিলজুড়ে। আর রাতভর বিল শাসন করেন ওই পাকুড়গাছের ওপর থেকে; তিনি আকাশের মেঘ খেদান, ভেড়ার পাল সাতড়ে পার করেন, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গরুর দালালের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেন... ফলে আমাদের আর সৌভাগ্য হলো না করতোয়ার মাহাত্ম্য আর তার শব্দবাক্যের শিল্পে অবগাহন করার।

গভীর শ্রদ্ধা জানাই, মায়েস্ত্রো...।

ধ্রুব সাদিক: কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত